কামরুল ইসলাম > আত্মহনন : হেমিংওয়ের শেষ অ্যাডভেঞ্চার >> মৃত্যুদিন

0
394

আত্মহনন : হেমিংওয়ের শেষ অ্যাডভেঞ্চার

On the Star you were forced to learn to write a simple declarative sentence. This is useful to anyone. Newspaper work will not harm a young writer and could help him if he gets out of it in time.
Ernest Miller Hemingway

‘এই যিশু দূর থেকে ভজনার পাত্র নন, এই যিশু এমন একজন যিনি নিজের জীবন দিয়ে এই আদর্শ স্থাপন করেছেন যে, বাধা কত কঠিন সেটা বড় কথা নয়, সেটা পেরিয়ে যাওয়াটাই বড়; পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ সেটা বড় কথা নয়, এগিয়ে চলাটাই বড়, তবেই সম্ভব মানুষের পুনরুত্থান।’ অনেকেই ক্লান্ত, ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত করতল বিছিয়ে শুয়ে থাকা বুড়ো সান্তিয়াগোর মধ্যে যিশুর খোঁজ পেয়েছিলেন। আজ থেকে ৬৩ বছর আগে ১৯৫৪ সালে ভাগ্য ও সমুদ্রের সাথে লড়তে থাকা এক বৃদ্ধ জেলের কাহিনি নিয়ে লেখা ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ উপন্যাসের জন্য নোবেল প্রাইজ পান আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে শিকারে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হলে সে-বছর তিনি সুইডিশ একাডেমিতে সশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি এবং যে কারণে আমরা সেবার নোবেল বক্তৃতা থেকে বঞ্চিত হই।
তিনি ছিলেন গত শতকের সবচেয়ে জনপ্রিয় আমেরিকান ঔপন্যাসিক । তার সময়ে খুব কম লেখকই ছিলেন যাদের জীবন ছিল এতটা বর্নিল ও বিচিত্র। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি কিউবায় কাটিয়েছিলেন। এখানে তিনি একটি খামার বাড়ি ক্রয় করে মৎস্যশিকারসহ নানা ধরনের অ্যাডভেঞ্চার এবং সহিত্যের নানামুখী প্রচারণা ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। শেষ সময়টা তার গেছে বরং বিরূপ সমালোচনায়। ১৯৫০ সালে লেখা তার উপন্যাস ‘অ্যাক্রস দ্য রিভার অ্যান্ড ইনটু দ্য ট্রিজ’ অসফল হলে তার জীবনের শেষ অধ্যায়টা বেশ সমস্যাকীর্ণ হয়ে পড়ে। জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ এক কর্নেলের জীবনকাহিনী নিয়ে উপন্যাসটি রচিত। ১৯৫২ সালে ‘দ্য ওল্ড ম্যান এ্যান্ড দ্য সি’ প্রকাশিত হলে তিনি আবার পাঠকদৃষ্টিতে চলে আসেন। এ উপন্যাস প্রকাশের পর ১৯৫৩ সালে তাঁকে পুলিৎজার পুরস্কার দেওয়া হয় এবং পরের বছরই তিনি নোবেল পুরস্কার পান।
১৮৯৯ সালের ২১ জুলাই এই আমেরিকান ঔপন্যাসিক ইলিনয়েস-এর ওক পার্কে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাল্য ও অবকাশের সময়টা কেটেছে মিশিগানে মৎস্য শিকারে এবং হান্টিং-এ। তাঁর পিতা ছিলেন একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক এবং সৌখিন খেলোয়াড়। মাতা ছিলেন সংগীত ও চিত্রকলায় পারদর্শী। বালকের ভবিষৎ নিয়ে মাতা ও পিতার মধ্যে বিরোধ ছিল। মাতা চেয়েছিলেন ছেলে সংগীতে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটাক। অপরপক্ষে, পিতা তাঁকে বাইরের জগতে টানছিলেন। পিতাই জয়ী হয়েছিলেন অবশেষে। মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি তাঁর হাতে তুলে দেন মাছ ধরার বড়শি এবং এগার বছর বয়সে বন্দুক। শৈশবের দিনগুলো কেটেছে বন্দুক ঘাড়ে জঙ্গলে জঙ্গলে অথবা কোনো বৃহৎ দিঘিতে মাছের সন্ধানে নৌকো বেয়ে। খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে রাতে লন্ঠনের আলোয় বই পড়া ছিলো তাঁর সখ। স্কুলে পড়াকালীন তিনি ডিবেটিং ক্লাবের সদস্য ছিলেন এবং ওয়াটার বাস্কেটবল টিমের ক্যাপ্টেন হিসেবে সাফল্যের সাথে টিম পরিচালনা করেছেন। ভালো সাতারু হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, সেই স্কুল-জীবন থেকেই। স্কুলে পড়াকালীন ইংলিশ কোর্স-এর ছাত্র হিসেবে তিনি ফিকশনের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং তখন থেকেই বিভিন্ন লিটারেরি ম্যাগাজিনে লিখতে শুরু করেন। স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার আগ্রহও তখন থেকেই দেখা যায় তাঁর মধ্যে। ১৯১৭ সালে ওক পার্ক স্কুল থেকে তিনি গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে ১৯১৮ সালে রেড ক্রস-এর অধীন স্বেচ্চাসেবক অ্যামবুলেন্স ড্রাইভার হিসেবে ইতালীয় আর্মির সাথে কর্মরত থেকেছেন। যুদ্ধমাঠের অভিজ্ঞতা আমরা দেখতে পাই তাঁর বিভিন্ন উপন্যাস ও গল্পে। ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই তিনি যখন ইতালীয় আর্মিদের চকোলেট বিতরণ করছিলেন একটি অস্ট্রেলিয়ান মর্টার এসে তাঁকে আঘাত করলে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন এবং তাঁকে মিলানের রেডক্রস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি এমনভাবে আহত হয়েছিলেন যে তাঁকে প্রায় তিন মাস হাসপাতালেই কাটাতে হয়েছিল। এখানেই হেমিংওয়ে এগনেস ভন কুরস্কি-র প্রেমে পড়েন। তিনি ছিলেন আমেরিকান রেডক্রস-এর একজন সেবিকা। ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’-এর ব্রেট অ্যাসলে এবং ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’-এর ক্যাথরিন বার্কলে’র মধ্যে এই মহিলাকে খুঁজে পাওয়া যায়।
যুদ্ধে শেষে তিনি শিকাগোতে ফিরে আসেন এবং ১৯২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর হ্যাডলে রিচার্ডসনকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি টরেন্টোর স্টার পত্রিকার জন্য ভ্রাম্যমাণ করেসপন্ডেন্ট হিসেবে সমস্ত ইউরোপ ভ্রমণ করেন। তাঁর হেড অফিস ছিল প্যারিস। প্যারিসে পৌঁছে তিনি ফোর্ড মেডক্স ফোর্ড, শেরউড অ্যান্ডারসন, জেমস জয়েস, এজরা পাউন্ড, এবং গাট্রুড স্টেইন-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময়ে পত্রিকা অফিস থেকে তাঁর লেখা বার বার ফিরে আসলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অবশেষে ১৯২৬ সালে ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ প্রকাশিত হলে তিনি লেখক হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন। এই উপন্যাসে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে প্যারিসে থেকে যাওয়া হতভাগ্য আমেরিকানসহ অন্যান্য ইউরোপিয়ানদের বোহেমিয়ান, রুটলেস জীবনযাপনের সচিত্র প্রতিবেদন এঁকেছেন যখন কোন নতুন মূল্যবোধ দানা বেঁধে ওঠেনি। এর পর প্রকাশিত হয় ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ ( ১৯২৯), তাঁর বহুল পঠিত উপন্যাস। এ উপন্যাসে যুদ্ধের সময়ে একজন আমেরিকান সৈনিক এবং ইংলিশ নার্সের মধ্যকার ট্র্যাজিক প্রেমকাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এ উপন্যাস লেখার সময় নার্স এগনেসের কথা তাঁর মনে ছিল। প্রথম বিয়ে ভেঙে গেলে হেমিংওয়ে পলিন ফেইফারকে বিয়ে করেন ১৯২৭ সালে। মেয়েটি প্যারিসেই একটি পত্রিকা অফিসে কাজ করতেন এবং বিয়েটি প্যারিসেই অনুষ্টিত হয়। ১৯২৮ সালে তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রীসহ আমেরিকায় ফিরে আসেন এবং ফ্লোরিডার কী ওয়েস্ট-এ বসবাস শুরু করেন। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত তিনি কী ওয়েস্টে-ই বসবাস করেন এবং একজন স্পোর্টসম্যান হিসেবে বেশ খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘গ্রিন হিলস অব আফ্রিকা’। সামাজিক অবক্ষয়সহ সাহিত্য ও শিকারের নানা কাহিনিই এ বই-এর উপজীব্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
১৯৩৬ সালের ১৬ জুলাই ফ্যাসিস্ট এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তিনি রিপাবলিকানদের পক্ষ নেন এবং স্পেনের কৃষকদের নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি সিনেমা (দ্য স্প্যানিশ আর্থ) বানানোর জন্য তিনি ১৯৩৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ মে পর্যন্ত স্পেনে অবস্থান করেন। ১৯৩৭ সালের ১৪ আগস্ট হেমিংওয়ে আবার স্পেনে যান এবং সেখানে ১৯৩৮ সালের ২৮ জানুযারি পর্যন্ত অবস্থান করেন। এসময়ে এখানে তাঁর পরিচয় হয় মার্থা গেলহর্ন-এর সাথে। মার্থা তখন কলিয়ার্স ম্যাগাজিন-এর হয়ে গৃহযুদ্ধ নিয়ে লিখছিলেন। ১৯৩৮ সালের মে মাসে হেমিংওয়ে হাভানায় গেলে মার্থাও তাঁর সঙ্গী হন। ১৯৪০ সালে পলিনের সাথে ছাড়াছাড়ি হলে হেমিংওয়ে মার্থাকে বিয়ে করেন।
ইতোমধ্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এবং হেমিংওয়েও সক্রিযভাবেই আছেন যুদ্ধের মাঠে। এ সময়ে তিনি প্যারিসে অসুস্থ হয়ে পড়লে মার্থা তাঁকে কোনোরকম সেবা যত্ন না করায় তাঁদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তাঁর এ দুঃসময়ে মেরি ওয়াল্স-ই তাকে সেবাযত্ন করেছিলেন এবং হেমিংওয়ে পরে তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় ছোটগল্প সংকলন ‘দ্য ফিফথ কলাম অ্যান্ড ফার্স্ট ফর্টিনাইন স্টোরিজ’, এই সংকলনে স্থান পায় তাঁর বিখ্যাত দুটি গল্প – ‘দ্য শর্ট হ্যাপি লাইফ অব ফ্রান্সিস ম্যাকোম্বর’ এবং‘ দ্য স্নোজ অব কিলিমাঞ্জারো’।
তিনি ছিলেন মূলত বিশ্বভ্রামণিক। কখনো শিকারের নেশায় চলে গেছেন আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে, কখনো সমুদ্রের টানে, আবার কখনো স্পেনে ষাঁড়ের লড়াই দেখতে। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় সাংবাদিক হিসেবে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানেও উপস্থিত হয়েছেন। সেইসব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখেছিলেন ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস (১৯৪০ )’। যুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর মতামত হল : one of the major subjects and certainly one of the hardest to write truly of…।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আবার তিনি সাগ্রহে ছুটে যান যুদ্ধের মাঠে। যুদ্ধ শেষ হলে চলে যান কিউবায়। ইতোমধ্যে পাপা নামে সারা বিশ্বে তিনি পরিচিতি লাভ করেছেন। কিউবায় অবস্থানকালে তাঁর অনেক বন্ধু জুটে যায় যাঁদের পেশা ছিল মাছ ধরা, শিল্প-সাহিত্যের সাথে বলতে গেলে তাঁদের কোন সংশ্রবই ছিল না।
তাঁর শেষ ও চতুর্থ স্ত্রী মেরি ওয়াল্সকে নিয়ে তিনি কিউবায় বসবাস শুরু করলে সে-সময়ে তাঁকে নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছিল। ফিদেল ক্যাস্ট্রো তখন কিউবা থেকে আমেরিকানদের তাড়াচ্ছিলেন এবং সে সময়ে হেমিংওয়ের অনেক ছবি, বই এবং স্মৃতিবহ জিনিসপত্র তার কাছে ছিল। এসবের কিছু জিনিস ঠিকই নিয়ে এসেছিলেন, তবে যা যা আনতে পারেননি, তার জন্য কষ্টও কম ছিল না। আর এই ঘটনায় তিনি এতটা-ই আঘাত পেয়েছিলেন যে, একসময় তিনি স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে পড়েন। তাঁকে মায়ো ক্লিনিকে ভর্তি করে বার দুয়েক ইলেকট্রিক শক দিতে হয়েছিল। তাঁর শেষ জীবনের ট্র্যাজেডির বিবরণ তার নিজের কথায় : ‘

যে মানুষের বয়স বাষট্টি বছর হতে চলেছে সে যখন উপলদ্ধি করে যে সে আর কোনো গল্প কিংবা কোনো বই লিখতে অপারগ, যা একদিন সে নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করেছিলো লিখবে – আপনারাই ভাবুন তার কী ঘটেছে? অথবা এমন কোনো বিষয়, যা একদিন সে তাঁর সুসময়ে নিজের কাছেই অঙ্গীকার করেছিলো।

হেমিংওয়ে তাঁর লেখার স্টাইলের বা লিখনশৈলীর উন্নয়নে অনেকের দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছেন এবং তিনি তা স্বীকারও করেছেন। তিনি এক জায়গায় বলেছেন যে মার্ক টুইন-এর ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব হাকলেবেরি ফিন’ আমেরিকান সাহিত্যে গতি এনেছিল। এই বিশেষ সাহিত্যকর্ম থেকে তিনি শিখেছেন সেই ভাষা যা একজন আমেরিকান বালক অনায়াসে বলতে পারে। এই গ্রন্থের সাহিত্যিক উৎকর্ষ তাঁকে শিখিয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তরের কবিতা আর আমেরিকান কথোপকথনের সজীবতা। মার্ক টুইন-এর ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব হ্যাকলেবেরি ফিন’ এবং হেমিংওয়ের ‘নিক অ্যাডামস’-এর একটি সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে দেখা যায় দুজন আমেরিকান তরুণের জীবনে কীভাবে সন্ত্রাস ও মৃত্যু এসে হানা দিয়েছে। হেমিংওয়ে তাঁর ‘গ্রিন হিল ইন আফ্রিকা’ লেখার ব্যাপারে স্টিফেন ক্রেনের কাছে ঋণ স্বীকার করেছেন। তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন যে তিনি জোসেফ কনরার্ডের কাছেও অনেক কিছু শিখেছেন। হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ এবং শেরউড অ্যান্ডারসনের ‘আই ওযান্ট টু নো হোয়াই’-এর মধ্যে বেশ মিল রয়েছে।
পেইন্টিং ও মিউজিক থেকেও যে তিনি সাহিত্য-শিল্পের অনেক কিছু গ্রহণ করেছেন। এটা তিনি নিজেই বলেছেন। ‘দ্য নিউ ইয়োর্কার’ পত্রিকার লিলিয়ান রসের সাথে এ বিষয়ে তাঁর আলাপের অংশ : ‘প্যারিসের লুক্সেমবার্গ মিউজিয়ামের পেইন্টিংগুলো দেখেও আমি লেখার অনেক কৌশল রপ্ত করেছি। আমি পল সেজানের কাছে শিখেছি কীভাবে ভূদৃশ্য আঁকতে হয়’। তিনি আরো বলেছেন, বিখ্যাত মিউজিশিয়ান জোহান সেবাস্তিয়ান বাখের কাছ থেকে তিনি শিল্পের সংগতিবিষয়ক দীক্ষা পেয়েছেন।
কবি এজরা পাউন্ড (যিনি তাঁর সময়ের প্রায় সব কবির ওপরই বলতে গেলে ওস্তাদগিরি করেছিলেন) প্রথম আবিষ্কার করেন হেমিংওয়ের সৃষ্টিশীল প্রতিভার ঔজ্জ্বল্য। সে সময়ের তরুণ প্রতিভাধর শিল্পী-সাহিত্যিকদের সাথে তিনি স্বেচ্ছায় বন্ধুত্ব করেছেন এবং নানাভাবে সহযোগিতা দিয়েছেন তাঁদের প্রতিভা বিকাশে। এই উদার ও প্রশান্ত হৃদয়ের মানুষটিকে স্পষ্টভাবে চেনা যায় হেমিংওয়ের কথায় : ‘তিনি নিজের বিষয়ে তাঁর প্রতিভা ও শক্তির মাত্র এক-পঞ্চমাংশ খরচ করতেন আর বাকি সমস্ত সময় দিতেন তাঁর বন্ধুদের শিল্পচর্চার উন্নয়ন ও উন্নত জীবন যাপনের চেষ্টায়।’ বন্ধুরা কেউ সমালোচনায় আক্রান্ত হলে তিনি যেমন তাঁদের রক্ষা করতেন, যুক্তির প্রাখর্যে, তেমনি কোন পত্রিকায় কারো ব্যাপারে লিখে তাকে বৃহৎ পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতেও তিনি ছিলেন অকৃপণ। আমরা জানি যে মনরোর ‘পোয়েট্টি’ ম্যাগাজিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখালেখি করে তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের বিশাল পরিসরে পরিচয় করিয়ে দেন এজরা পাউন্ড এবং বলতে গেলে এ ব্যাপারটি তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) নোবেল প্রাপ্তিকে সহজ করে তুলেছিল। এজরা পাউন্ড হেমিংওয়েকে শিখিয়েছিলেন লিটারেচার এবং রিপোর্টিং-এর পার্থক্য। তিনি যেমন এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’কে কেটে-চিরে ঠিকঠাক করে দিয়েছিলেন (এলিয়ট অবশ্য তাঁর সব কাটাছেঁড়া গ্রহণ করেননি), তেমনি তিনি হেমিংওয়ের প্রথম দিককার অনেক লেখাই কাটাছেঁড়া করে শিষ্যের মতোই তাঁকে সাহিত্য করার দীক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন ঘনঘন অ্যাডজেকটিভ ও অ্যাডভার্ব ব্যবহার না করতে। তিনি বলতেন, সজীব কথ্যভাষায় যেটুকু প্রয়োজন কেবল সেটুকুই বলা এবং ভাষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ইমেজিস্ট আন্দোলনের প্রবক্তা হিসেবে তিনি তাঁর কালের কবি ও ফিকশন রচয়িতাদের ওপর এক সুদূরপ্রসারি প্রভাব ফেলেছিলেন। হেমিংওয়ের গদ্যের ওপর এজরা পাউন্ড-এর উপদেশের বাস্তব প্রভাব লক্ষ করা গেছে নানাভাবে। এখানে উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালি রেড়িও-তে ফ্যাসিস্টদের পক্ষে প্রচারণা চালানোও তাঁকে পরবর্তী কালে আমেরিকায় গ্রেফতার করা হয় এবং বিনা বিচারে অনেক দিন কারাগারে রাখা হলে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এজরা পাউন্ড-এর এই দুর্দিনে যাঁরা তাঁর মুক্তির জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং তাঁকে দেশ ছাড়ার শর্তে মুক্ত করেছিলেন তাদের মধ্যে হেমিংওয়ের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
সে-সময়ের উল্লেখযোগ্য লেখক গার্ট্টুড স্টেইন হেমিংওয়ের একজন শিল্পী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। এজরা পাউন্ড-এর মতো তিনি তাঁর লেখায় কলম চালান নি ঠিকই, তবে তিনি উপদেশ ও কথোপকথনের মধ্য দিয়ে তাঁকে লেখার স্টাইল উন্নয়নে সহায়তা করেছেন। এব্যাপারে তিনি এজরা পাউন্ড-এর চেয়ে গার্ট্টুড স্টেইন-এর প্রতি ছিলেন বেশি আস্থাশীল। হেমিংওয়ে নিয়মিত তাঁর সাথে দেখা করতেন এবং শ্রদ্ধার সাথে তাঁর কথা শুনতেন। স্টেইন তাঁর প্রথম দিককার পাণ্ডুলিপিগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়তেন এবং কঠোরভাবে সমালোচনা করতেন। তিনি তাঁকে জার্নালিস্টিক কাজকর্ম ছাড়ার কথাও বলেছিলেন। আরো বলেছিলেন অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ বর্ণনার বিষয়ে সচেতন থাকতে। তিনি সবসময়ই বলতেন যে লেখা কাজটিই মূলত একটি শৃংখলার ব্যাপার। এজরা পাউন্ড-এর মতো তিনিও তাঁকে বেশি বেশি অ্যাডজেকটিভ ও অ্যাডভার্ব ব্যবহার না করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
শিল্পীর সততা বলতে যা বোঝায় তা হেমিংওয়ের ছিল, যে কারণে তিনি যেসব সোর্স থেকে গ্রহণ করেছেন, যাঁদের উপদেশ ও পরামর্শ তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে, তাঁদের কাছে ঋণ স্বীকারে তিনি কখনো কার্পণ্য করেননি। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, অচিরেই তিনি তাঁর লেখার নিজস্ব স্টাইল তৈরি করে ফেলেন এবং অন্যের কাছে মডেলে পরিণত হন। তিনি বলেছেন :

ধ্রুপদী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হলো তা হবে সম্পূর্ণ নতুন যেখানে তার পূর্ববর্তী ক্ল্যাসিকস-এর কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। পৃথিবীতে কোনো কোনো লেখকের জন্মই হয় অন্যকে অন্তত একটি বাক্য লিখতে সহায়তার জন্য। এর মানে এই নয় যে এটা আগের ক্ল্যাসিকস-এর থেকে সে সরাসরি গ্রহণ করবে বা তার মতো হবে।

স্টাইলকে তিনি তুলনা করেছেন স্বচ্ছ ঝরনা থেকে তুলে আনা সেই নুড়ি-পাথরের সাথে যা সজীব, সুন্দর ও স্বতন্ত্র। হেমিংওয়ে তাঁর লেখার ক্ষেত্রে শেষমেশ সেই স্টাইলই খুঁজে পেয়েছিলেন এবং তাঁর সমসাময়িক লেখকরা দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করেছেন যে, উনিশ শতকের আমেরিকান শিল্প-সাহিত্যের বন্ধ্যা মরুকে তিনি কল্পনাতীত শস্যভূমিতে পরিণত করেছিলেন।
আমেরিকার ইডাহোতে জীবরেন শেষ দিনগুলো কাটে তাঁর। স্ত্রীর ছেড়ে চলে যাওয়া, লিখতে না-পারার অক্ষমতা, পুরনো আঘাতগুলোর ব্যথা-বেদনা, সব মিলিয়ে এক দুঃসহ বেদনার মধ্যে তাঁকে বেশ কিছুদিন হাসপাতালেও কাটাতে হয়। সিঁড়ি থেকে পড়ে গেলে তিনি আরো অসহায় হয়ে পড়েন এবং ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’র সেই প্রচণ্ড আশাবাদী মানুষটি যিনি উচ্চারণ করেছিলেন : ‘A man can be destroyed not defeated।’ ১৯৬১ সালের ২ জুলাই বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। আত্মহত্যার আগে তিনি স্ত্রীকে তার শেষ কথাগুলো বলেছিলেন : “Goodnight my kitten.”
তাঁর আত্মহননের ব্যাপারটি ছিল তাঁর জীবনের শেষ অ্যাডভেঞ্চার। তিনি পরাজিত হতে চাননি, তাই বেছে নিয়েছিলেন ধ্বংসের পথ, অনেকের কাছে এ-ও হয়তো জীবনের একধরনের পরাজয়ই, এ নিয়ে বিস্তর বিতর্কও হতে পারে। সেসব বিতর্কে না গিয়ে বিশ্বসাহিত্যের এই মহান দিকপালের প্রতি তার মৃত্যুদিনে রইল আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

[পুনঃপ্রকাশ]