কালাম মাহমুদের গদ্য > প্রচ্ছদপট শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী >> এবং কাইয়ুম চৌধুরীর ৩টি কবিতা

0
622
[সম্পাদকীয় নোট : কাইয়ুম চৌধুরী – বাংলাদেশের শীর্ষ চিত্রশিল্পী। বহুমাত্রিক এই শিল্পী নানা মাধ্যমে নিজের ছবি আঁকার পাশাপাশি গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন আমাদের প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে। বই, পত্রপত্রিকার প্রচ্ছদ, অলঙ্করণ, এমনকি পোস্টারশিল্পী, সুভেন্যুর, বিখ্যাত জনদের প্রতিকৃতি অঙ্কনের কথা ভাবলে তাঁর নামই সবার আগে আমাদের মনে পড়ে যায়। তিনিই আমাদের প্রচ্ছদশিল্পকে আধুনিক নান্দনিকতায় আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছিলেন। তাঁর নিজের চিত্রকর্মও ছিল বাংলাদেশের উজ্জ্বল প্রকৃতি, রং, নিজস্ব ডিজাইন ও কম্পোজিশনে অনন্য। তাঁর ড্রইংয়ের হাতও ছিল তুলনাহীন। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি বলা যায়, তিনি ছিলেন একজন বহুমুখী সৃষ্টিশীল শিল্পী। ছবি আঁকার পাশাপাশি তিনি ছড়া লিখেছেন, কবিতা রচনা করেছেন, লিখেছেন চিত্রশিল্পের উপর গদ্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা। আমাদের কালের শ্রেষ্ঠ একজন সব্যসাচী শিল্পী ও সৃষ্টিশীল লেখক ছিলেন তিনি। আজ তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে তীরন্দাজ-এ প্রকাশিত হল একটি দুর্লভ অগ্রন্থিত গদ্য, যে গদ্যের রচয়িতা আমাদের প্রয়াত আরেক প্রতিথযশা শিল্পী কালাম মাহমুদ। কালাম মাহমুদও যুক্ত ছিলেন প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে। তিনি কাজ করেছেন প্রথমে সন্ধানী এবং পরে দৈনিক বাংলা (পূর্বে  দৈনিক পাকিস্তান) ও বিচিত্রায়। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৭৫ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কর্তৃক সেরা প্রচ্ছদশিল্পীর পুরস্কার পেলে গ্রন্থকেন্দ্র তাঁর সম্মানে যে সংবর্ধনার আয়োজন করে, শিল্পী কালাম মাহমুদ সেই সংবর্ধনা সভায় লেখাটি পাঠ করেছিলেন। এই লেখা পড়েই বোঝা যায়, কাইয়ুম চৌধুরী শিল্পী-জীবনের শুরু থেকেই তাঁর নান্দনিক কাজগুলি নিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে তিনি সবচেয়ে বেশি বার জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। এখন পর্য়ন্ত তার এই কীর্তিকে স্পর্শ করতে পারেননি। শিল্পী কালাম মাহমুদের এই লেখাতেও আছে তাঁর অনন্য কীর্তির কথা। এতদিন  লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এই ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি তীরন্দাজ-এ প্রকাশিত হল। সেই সঙ্গে কাইয়ুম চৌধুরী যে কবিতা লিখতেন, তাঁর এরকম তিনটি অগ্রন্থিত দুর্লভ কবিতা এই লেখার নিচেই সংযুক্ত করা হলো।]

ঢাকায় নতুন একটি বই বেরিয়েছে। ‘সাত সাঁতার’, লেখক জহুরুল হক, প্রচ্ছদ শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। প্রচ্ছদ দেখে জনৈক পাঠকের সখেদ উক্তি – ‘কেন যে ঢাকার প্রকাশনা কলকাতা থেকে প্রচ্ছদ করিয়ে আনান।’

কাইয়ুম চৌধুরী একজন একনিষ্ঠ চিত্রকর এবং গ্রাফিক আর্টের এমন একজন শিল্পী যিনি নিজের দেশে নিজস্ব একটি ধারা প্রতিষ্ঠিত হতে দেখেছেন। লাল সালুর ওপর সোনালি টাইপে ছাপা বইয়ের মলাটের যুগে তিনি শিল্পমণ্ডিত প্রচ্ছদ অঙ্কনে উদ্যোগী হন। সেকালে মুদ্রণের পাহাড় প্রমাণ যান্ত্রিক অসুবিধা, ব্লকের সরঞ্জামের অভাব ইত্যাদি তো ছিলই, উপরন্তু অধিকাংশ প্রকাশক ভালো ডিজাইনের মর্ম বুঝতেনই না। তাঁদের রুচি আদৌ গড়ে ওঠেনি। অথচ প্রথম থেকেই তাঁর কাজ আশ্চর্য় জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। রীতিমত আধুনিক মেজাজের কাজ এত অল্প সময়ে পাঠকমহলে সমাদৃত করে তোলা নিঃসন্দেহে আশ্চর্য় ঘটনা। আজ আমরা সবাই উপলব্ধি করি সঠিক বইয়ের জন্য সঠিক ডিজাইন প্রয়োজন। এই প্রয়োজনকে প্রয়োজনীয় করে তুলেছে কাইয়ুম চৌধুরীর সুদীর্ঘ পঁচিশ বছরের নিরলস সাধনা। অনেক দিন আগের একটি ঘটনা। ঢাকায় নতুন একটি বই বেরিয়েছে। ‘সাত সাঁতার’, লেখক জহুরুল হক, প্রচ্ছদ শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। প্রচ্ছদ দেখে জনৈক পাঠকের সখেদ উক্তি – ‘কেন যে ঢাকার প্রকাশনা কলকাতা থেকে প্রচ্ছদ করিয়ে আনান।’ তখন কলকাতার বই বাজার আলো করে আছে – ঢাকা থেকে ঝকঝকে প্রচ্ছদ নিয়ে বই বেরুতে পারে এ যেন ভাবাই যায় না। কাইয়ুম চৌধুরী অঙ্কিত কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদগুলো তাঁর অসামান্য শিল্পসৃষ্টি – যেন পেইন্টিংয়ের অংশ বিশেষ। তিনি মূলত পেইন্টার, তিনি নিজেই বলেছেন, কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকায় তিনি সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাভ করেন। আধুনিক কবিতা ও আধুনিক চিত্রকলায় তফাত নেই – তাই চিন্তার যোগসূত্র অপূর্ব সৃষ্টি এই প্রচ্ছদগুচ্ছ।

রং, ডিজাইন, টাইপোগ্রাফির আধুনিকতম ব্যবহার বিষয়ে তাঁর কৌতূহল অপরিসীম, ব্যাপারটা বোঝেন তিনি ভালো। আর্টের সবক্ষেত্রে তাঁর অগাধ পড়াশোনা, সাহিত্যের তিনি অনুরাগী পাঠক।

তাঁর ডিজাইন, তাঁর রং, তাঁর আঁকা ছোট্ট এতটুকু স্বপ্নিল পাখি আমাকে ভিন্নভাবে দোলা দেয়। আমার সুযোগ হয়েছিল তাঁর সাথে বসে দিনের পর দিন এমনকি রাতে পর রাত কাজ করার। আমি বুঝি কতটুকু যত্ন নিয়ে, একাগ্রতা নিয়ে তিনি কাজ করেন। রং, ডিজাইন, টাইপোগ্রাফির আধুনিকতম ব্যবহার বিষয়ে তাঁর কৌতূহল অপরিসীম, ব্যাপারটা বোঝেন তিনি ভালো। আর্টের সবক্ষেত্রে তাঁর অগাধ পড়াশোনা, সাহিত্যের তিনি অনুরাগী পাঠক। একজন সৃজনশীল প্রচ্ছদশিল্পীকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয় আমরা অনেকেই তা জনি না।
প্রকাশনা শিল্পে ‘ন্যূনতম আন্তর্জাতিক মুদ্রণমান’ বলে একটা কথা রয়েছে। আমাদের মতো একটি দরিদ্র ও সমস্যা-জর্জরিত দেশের প্রকাশনায় অর্থ ব্যয় সীমিত। উন্নত মুদ্রণ পদ্ধতির সাহায্য নেয়াও সম্ভব হয়ে ওঠে না প্রায় প্রতিটি প্রকাশনার ক্ষেত্রে। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জায় শোভিত একটি কবিতার বই শিল্পকর্মের জন্যে আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে তা এমন একটি দেশের পক্ষে গর্বের কথা। কিছুদিন হয় জনৈক বিদেশি প্রকাশনা বিশারদ যিনি ইউনেস্কোর হয়ে এ দেশে প্রকাশনার তথ্যানুসন্ধানে এসেছিলেন তাঁর সাথে আলাপ হচ্ছিল। তিনি আমাদের বইয়ের মুদ্রণমান দেখে হতাশ হয়েছেন, কিন্তু শিল্পকর্ম দেখে আশ্চর্য় হয়েছেন এবং অবাক হয়েছেন প্রকাশনা শিল্পকর্মে লিপ্ত কোনো শিল্পীরই বিদেশের উচ্চশিক্ষা নেই জেনে।

 

তাঁকে আজ, বছরের এই প্রথম দিনে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করার জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এই মনোরম অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এ সম্মান কেবল মাত্র কাইয়ুম চৌধুরীকেই দেয়া হচ্ছে না, এ দেশের পঁচিশ বছরের গ্রাফিক আর্ট আন্দোলনকেই মূলত সম্মানিত করা হল।
কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদ বহুবার সেরা প্রচ্ছদ হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে। কাইয়ুম চৌধুরী লেখক ও পাঠকমহলে একটি সমাদৃত নাম। ঈর্ষাযোগ্য তাঁর জনপ্রিয়তা। তাঁকে আজ, বছরের এই প্রথম দিনে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করার জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এই মনোরম অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এ সম্মান কেবল মাত্র কাইয়ুম চৌধুরীকেই দেয়া হচ্ছে না, এ দেশের পঁচিশ বছরের গ্রাফিক আর্ট আন্দোলনকেই মূলত সম্মানিত করা হল। যে শিল্পমাধ্যম প্রতিনিয়ত জ্ঞান-সম্ভারের মলাট হয়ে অসংখ্য মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে তাকে মানুষ স্বীকৃতি দিয়েছে অনেক আগে, কিন্তু জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে আজ নিজেদের দায়িত্ব পালন করল। আশা করি অন্যান্য জাতীয় প্রতিষ্ঠান এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে।
শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর জন্যে রইলো আমার শুভেচ্ছা।
এই প্রবন্ধটি ১৯৭৫ সালের ১৫ এপ্রিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কর্তৃক শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পঠিত

কাইয়ুম চৌধুরী >> তিনটি প্রেমের কবিতা

এক

তোমার হাতে
রোজ আমি পাই
নতুন ফুলের গন্ধ,
ভেবে ভেবে
হলাম সারা
কপাল আমার মন্দ।

তাই শুধালাম
কোথায় পেলে
মাতাল করা ফুল,
মধুর হেসে জড়িয়ে দু’হাত
ভাঙিয়ে দিলে ভুল।

দুই

আলতা তুমি দাওনা পায়ে
হলুদ বাটা দাওনা গায়ে
তবুও তোমার অঙ্গে
আলতা হলুদ রঙে
ঢেউ খেলে যায়
সোনার রোদে

শিশির কণার সঙ্গে
দাওনা হাতে রঙিন চুড়ি
রঙিন ডুরে দাওনা মুড়ি
তবু তোমার অঙ্গে
আলতা হলুদ রঙে
ঢেউ খেলে যায়
সোনার রোদে
শিশির কণার সঙ্গে

তিন

বকুল তলার
সবুজ ঘাসে
শিশির মাখা
বকুল ফুলে,
দু’হাত ভরে
নিতাম তুলে
পরিয়ে দিতাম
তোমার চুলে।

দু’হাত ভরি
সেই বকুলে
সেই শিশিরে
সবুজ ঘাসে,
বকুল গন্ধ
আজো ভাসে
তুমি তো নেই
আমার পাশে।

১৯৭৫