খালেদ হোসাইন > কবিতাগুচ্ছ >> জন্মদিনের পাঠ

0
185
[ সম্পাদকীয় নোট : আজ কবি খালেদ হোসাইনের জন্মদিন। গত শতকের আশির দশকের এই কবি শুধু কবিতায় নয়, ছড়া ও প্রবন্ধ সাহিত্যে স্বচিহ্নিত একজন উল্লেখয়োগ্য সাহিত্য-ব্যক্তিত্ত্ব। খালেদের জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর দুটি নতুন কবিতাসহ প্রকাশিত হল একগুচ্ছ কবিতা। তীরন্দাজের পক্ষ থেকে খালেদের প্রতি শুভেচ্ছা। জ্ঞাপন করছি।]

কবিতাগুচ্ছ

মহাঢেউ
তোমার প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখার গল্পটি শুনেছি
প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতটি শুনিনি।
আকাশে যে চাঁদ, তা অনেকটা মাথার উপর উঠে এসেছে।
আমি মাইক্রোবাসের পেছনের সিটে শুয়ে পাহারা দিচ্ছি তাকে।
পাতলাবান সীমান্ত থেকে তাকে ধরে এনেছি
আরেকটু দেরি হলেই সে লুকিয়ে পড়তো মেঘালয়ের পাহাড়ে।
আমি যে ধুলো ভালোবাসি, তা তো তুমি জানোই।
ধুলো যে আমাকে ভালোবাসে, সঙ্গে থাকলে
তুমি বুঝতে পারতে। পৃথিবী আজ ভালোবাসায় ভালোবাসায়
ভরে গিয়েছে।
একজন প্রাং, উদ্ভাবন করেছে আচিক লিপি।
তার স্বপ্ন— একদিন মুদ্রিত নোটে ছাপা হবে গারোদের এই ভাষা।
একজন অনন্যা— তার কাছে লিপি শিখতে এসে,
ভালোবেসে ফেলেছে তাকে। এখন তারা কারখানা থেকে ফিরে
নতুন হরফে নতুন কবিতা লিখে চলেছে
রাতের পর রাত।
বিরান প্রান্তরে গারো শিশু-কিশোর আর যুবতীরা এসেছিলো
তাদের চুলে ধুলো— যেন পুষ্পরেণু।
তাদের পা খালি, কিন্ত চোখগুলো চকচক করছিলো ভালোবাসার
আবেগে।
অপুষ্ট শরীর— চারপাশে তবু মৌ মৌ করছিলো হৃদয়ের সৌরভ।
তারা নাচলো, তারা গাইলো, তোমরা আসবে, আমরা বিশ্বাস করিনি
কিন্তু আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম, তোমরা আসবে।
তারা ছড়িয়ে দিলো বুনো ফুল আমাদের মাথার ওপর।
তারপর পরিয়ে দিলো পাখির পালক-গাঁথা মুকুট।
আমরা জানি, এসবের উপযুক্ত নই আমরা কেউ।
কিন্তু যারা ভালোবাসে তারা কোনো যুক্তি মানে না।
আমরা শিখলাম, কীভাবে ভালোবাসতে হয়।
আর বললাম, সেই ভালোবাসারই কথা।
যদিও জানি, এই ভালোবাসা দুই বেলা নুন-ভাতের কোনো
নিশ্চয়তা দেবে না তাদের, ছেঁড়া জামার বদলে গায়ে উঠবে না
নতুন পিরান, খালি পায়ে জুতো—পরিশ্রম ছাড়া পাবে না অন্য পরিত্রাণ।
আমরা নষ্ট মানুষদেরই প্রতিনিধি— যারা সব অসঙ্গতি রচনা করে।
তবু আমাদের বুক হুহু করে, চোখের পাপড়িতে বাষ্প জমা হয়।
আমরা ওদের বুকে জড়িয়ে ধরি, বলি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।
বালুর সমুদ্রের যেখানে শেষ, সেখান থেকে পাহাড়ের সূচনা।
ওটা মেঘালয়— আমার দেশ না।
আমি মেঘের সঙ্গে মিশে থাকা দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি
ওখানে থাকে প্রাঙের বাবা, কিছু দূরে কয়লাখনিতে।
জীবিত না মৃত, সে জানে না। কেউ জানে না।
এ এমন এক উপত্যকা— যেখানে জীবন ও মৃত্যু
স্বতন্ত্র কোনো অর্থ বহন করে না।
সন্ধ্যা নামে। সূর্য নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে— অস্ত যাওয়ার আগেই
পুবের আকাশে উঠে আসে চাঁদ। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা
ঝরনা— আমাদের নদী— মহাঢেউ। নামটা যেন নির্মম পরিহাস।
অস্পষ্ট আলোয় আমরা নদীর জলে হাত রাখি— বুক রাখি, মুখ রাখি।
তখনই বুঝতে পারি, অনেক জল আর উঁচু প্রবাহ হলেই নদী মহৎ
হয়ে ওঠে না— ভালোবাসতেও জানতে হয়।
আমরা ভালোবাসায় আর্দ্র হয়ে উঠে আসি তার পাড়ে—
ধু-ধু মরুভূম—এক শস্যহীন প্রান্তর।
চাঁদের আবছা আলোয় আমরা তৃষ্ণা নিবারণ করলাম।
এই সেই চাঁদ— হয়তো তুমি এখন এর দিকেই তাকিয়ে আছ।
আর গুনগুন করে গাইছ শৈশবে শেখা প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত।
ভালোবাসার টানে আমরা এসেছিলাম, ভালোবাসার টানে
আমরা ফিরে যাচ্ছি। দৃশ্যগুলো খুব মসৃণভাবে
পিছলে যাচ্ছে পেছনের দিকে— পিছলে যাচ্ছে
পাহাড়ি সব মুখ, অন্তরঙ্গ চু আর ওদের চোখভরা স্বপ্ন।
এমন এক পূর্ণিমার রাতে, মনে পড়ে, লুম্বিনি গ্রাম।
আমরা তবু ঘরে ফিরে যাচ্ছি।
এমন এক পূর্ণিমার রাত— কোনো এক পূর্ণিমার রাতে
সব জড়তা ভেঙে তুমি হয়তো আমাকে শুনিয়ে দেবে
তোমার শেখা প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত। আর আমার মনে পড়বে
পূর্বজন্মের স্মৃতি—
ঘাম-মাখা কিছু মুখ, ধুলোর মতো মিহি স্বপ্নচূর্ণ
জোছনার মতো দিগন্ত-প্লাবিত ভালোবাসা
আর
পাহাড়ের পদতলে মহাঢেউ নদী
বয়ে যাচ্ছে
বয়ে যাচ্ছে
বয়ে যাচ্ছে
অনন্ত কালের সীমানায়।

 

সবই তো সুবর্ণরেখা
পরিবর্তিত পরিস্থিতি—শুনলে তুমি আঁতকে ওঠো
কাঁপতে থাকে চোখের পাতা, নাকের ডগা এবং ঠোঁটও।
কেমন আছ?’ ‘ভালো আছি।’ যেন তুমি দুধের মাছি।
অথচ তোমার চারপাশে আজ দ্বিধার প্রাচীর।
দ্বিধা থেকে মুক্ত হয়ে নতুন কোনো দ্বিধায় এসো
নিজেকে আর না ঠকিয়ে নতুন নদীর জলে ভেসো
এসব দেখা উচিত ছিল কিন্তু তোমার হয়নি দেখা
দেখবে তোমার দশ দিগন্ত সবই তো সুবর্ণরেখা।
যা ছিল তা থাকবে সবই, আনন্দময় নতুন জীবন
তোমার মনে আলো ছড়ায় দেখবে কেমন মাধবীবন।
অন্তরালে বদলে গেছ, এই কথাটা বুঝতে শেখো
যতো দূরেই যাও না তুমি, এই মাটিতে তোমার শেকড়।
জলজ পাথর
অরণ্য সুস্থির হয়ে বসে আছে পুষ্প গন্ধ নিয়ে
পায়ের তলায় জল মাথার উপরে মহাকাশ
পাখি ও পতঙ্গ ওরে কাছে দূরে শিরার ভিতর
আর আমি ছিন্নমস্তা এত কাজ এত অপরাধ
অজস্র স্বাক্ষর শেষে মৃত্যুকে যথার্থ মনে হয়
গ্লাস বোতলের পাশে ছাইদানি, একার মোমবাতি
উৎসব শেষ হলে সবকিছু ক্লান্তিকর লাগে
জলের ও আকাশ আছে পাতালের অযুক্তি আবেগ।
জ্যোৎস্নাময় মধ্যরাত পৃথিবীতে মাঝেমধ্যে আসে
সে-ও যেন মিহিজল, সে-ও যেন মগ্নচেতনার;
তোমাকে ছুঁয়েছি বলে হয়ে গেছি মর্মরপাথর,
মাছের চোখের মত নিদ্রাহীন অনন্ত ইশারা।
দুপুরের মৃদু রোদে দেহকোষে জমে কালাজ্বর
এসে যারা চলে যায় তারা সব জলজ পাথর।
প্রকৃতপক্ষেই চক্ষুষ্মান
তুমি যখন দুঃখ হাতে আয়না থেকে টিপ খুলে দুই ভুরুর মাঝখানে পড়ে নাও, কাঁচা ঝালের গন্ধে চারপাশ ম ম করতে থাকে, তখন আমার গোধূলিবিশ্বেও সূর্যোদয় হয়, মোরগ জুটির মতো পুরনো সূর্যই ফের আসে, কোটি কোটি মানুষের পৃথিবীতে কজন কবিতা পড়ে এর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে আমি হাসতে থাক কোটি কোটি মানুষের পৃথিবীতে কজন কবিতা পড়ে এর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে আমি হাসতে থাকি, কথাবৃষ্টি যথা তথা, অমৃতসমান নবজাতকের দিন আর রাত স্বামী নাকি দেহরক্ষী, দস্যু নাকি ক্রীতদাস কেউ ভেবে দেখে না। স্কুলঘরের জংধরা চালায় কাক ডাকে, প্রেক্ষাপটে ভ্যান গঘের আকাশ, আশেপাশে ডালপালা ছড়ানো গাছগাছালি, কাকগুলো সেখানে যায় না। যাবে না, কেন যাবে? একদঙ্গল কুকুর আকাশে তাকিয়ে চিৎকার করতে থাকে, সত্যিই কি আকাশের অন্য পাড়ে নৃত্য করে কিন্নর-কিন্নরী? কতদিন মহুয়া উৎসব নেই এই পোড়া দেশে, খালপাড়ে বেতের জঙ্গল, অজস্র পতঙ্গের ওড়াউড়ি আর স্পর্শস্বাদবঞ্চিত হাড়ের পুরনো চিরুনি—যেন কোন গুপ্তধন। সকালের হৃদপিণ্ড ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে পড়ে অপরাহ্ণের নিস্পৃহতা আর আলপথ লাল হয়ে ওঠে, যারা প্রকৃতপক্ষেই চক্ষুষ্মান, তারাই কেবল তা অনুভব করতে পারে।
সাপের জিভের মতো
আমি পাঠ করি আলো আমি পাঠ করি অন্ধকার
আলিঙ্গন ছিন্ন করি—তবু পাই জীবনের আঁচ
আবছায়া চুমু-স্মৃতি মুছে যায় প্রতিধ্বনিহীন
পানাপুকুরের জলে বেঁচে থাকে চিরন্তন মাছ।
অলৌকিক অরণ্য বিন্দুবৃষ্টি কানামাছি খেলে
ধ্বংসস্তুপ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে জ্যোৎস্নাময়তায়
নৈঃশব্দ্যের জলরঙ মেঘে মিশে জন্মতিথি আনে
বাঁচা-মরার দেশে সূর্য ডাঙা ফিরে পেতে চায়।
বৃক্ষময় জলছায়া, সে-ও জানে স্বর্গের দরোজা
স্টক-এক্সচেঞ্জের গল্প যদিও ক্রমশ বর্ধমান
এবং আমাকে যারা কথা স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছে
তারা কি অশোক আজ ফাঁকা পেয়ে অনন্ত ময়দান?
সাপের জিভের মতো দ্বিধান্বিত হলে সমভূমি
মহাশূন্য জয় করা তবুও কঠিন ভাব তুমি?
পুরনো কাঠের কান্না
কঞ্চুলিকা শব্দে বলো কাকে মনে পড়ে?
লালাভ টালির ঘরে কে বসত করে?
সবুজ রঙের মাটি হয়েছে পাথর
ছাড়ো রয়েছে দোষ—কামনাকাতর।
বৃক্ষসারি ঘরবাড়ি পার হয়ে যায়
যতটুকু শক্তি তার শরীরে-মেধায়;
সাম্রাজ্যের অধিকর্তা আর কর্মচারী
সত্য যদি সত্য হয় সকলে বর্বর।
শূন্যে ঝুলেথাকা মন লবণাক্ত ঠোঁটে
পাখির ছানার মতো খুদকুঁড়ো খোঁটে
নালিশপ্রবণ রাত উষ্ণতায় গলে
পুরনো কাঠের কান্না—বেহালার ছড়।
সকলেই অশ্রুস্বচ্ছ পাপে-পুনর্পাপে
মধ্যরাতে কুয়াশার জানালায় কাঁপে
ব্যতিব্যস্ত বাতিঘরে কামিনীর ঘ্রাণ
সৃষ্টি হয়, মিশে যায় জলের ভিতর।
বীতশ্রদ্ধ
অনেক আলোকবর্ষ বন্দি হয়ে গৃহবাসে আছি
অপরাজাতির নীলে ফুটিয়েছি আকাশের মেঘ
প্রতিকূল বাস্তবতা মেনে নিয়ে বাড়ে সমঝোতা
গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় তবু বুকে জাগে নতুন আবেগ।
ধনিয়া, নাগরমুথা উপসম দিতে চেয়েছিল
স্বরভঙ্গ হয়েছিল শয্যাসুখে যেদিন আমার
অদৃশ্য প্রাচীর কেউ ডিঙাতে পারে না তুমি জান
ভৌতিক আঙুল এসে করেছিল উপসংহার।
সে আঙুলে ঝুলে আছি অতিশয় শান্তিপ্রিয় জীব
পর্বতের কাছে তাই ছুটে আসে সমুদ্রের জল
দরজার শব্দ জানে চিবুক-ছায়ার জটিলতা
বাসক পাতার মতো চোখ কেন মেলে করতাল;
তাই দূরে যেতে চাই শব্দগন্ধ রক্তজ্ঞান ভুলে
জলঘাস ছায়াগলি পার হয়ে অনন্তের মূলে।