গুলজার > কবিতাগুচ্ছ ও ভাবনা >> ভূমিকা ও ভাষান্তর সৈয়দ তারিক >>> উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
347

গুলজারের কবিতা ও ভাবনা

গুলজারের কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে ভীষণ লজ্জা পেলাম মনে মনে। অন্যদের কবিতা যেভাবে অনুবাদ করি সেভাবেই পড়তে গিয়ে ভালো লাগা চমৎকার দুটো কবিতার রূপান্তর করলাম। তখনই মনে হলো, প্রিয় সখি সাবেরা তাবাসসুম যে গুলজারের কবিতা অনুবাদ করে গ্রন্থিত করেছে, ওই বই উল্টে-পাল্টে দেখেছি বটে কিন্তু ভালো করে পড়া তো হয় নি। যে দুটো অনুবাদ করলাম সেও কি তা করেছে? বই খুলে ঘেঁটে দেখি, করেছে তো বটেই, বড় চমৎকারভাবে করেছে। আমি করেছি কবিতার ইংরেজি অনুবাদ হতে, সে করেছে সরাসরি মূল হিন্দি থেকে। উপরন্তু এই অনুবাদকর্ম ছিল তার সাধনা; করেছে সে গভীর প্রেমবোধ থেকে। সে তুলনায় আমারগুলো… থাক সেই কথা। সুতরাং ওগুলো ব-য়ে আকার দ – বাদ। গুলজারের অন্য কয়েকটা কবিতা রূপান্তর করবার আগে সাবেরার গ্রন্থখানা আগাগোড়া ঘেঁটে দেখেছি – এটা ও করেছে কি না। যেটা ও করেছে সেটায় আমি আর হাত দিই নি। এই কবিতাগুলো পড়তে ও অনুবাদ করতে গিয়ে বুঝলাম কেন সাবেরা এত উতলা হয়ে পড়েছিল গুলজার সাহাবের প্রেমে। কারণ আমিও একটু উতলা হয়ে পড়েছি। আগ্রহী পাঠকেরা অবশ্যই সাবেরা তাবাসসুম-এর অনুবাদ গ্রন্থ ‘গুলজারের কবিতা’ পড়বেন। বইটির প্রকাশক জার্নিম্যান বুকস।

তার আসল নাম সম্পূরণ সিং কালরা। তবে এই নামে কেউ ডাকলে তিনি বিরক্ত হন। সবাই তাকে তার কলমি নাম গুলজার ডাকলেই তিনি খুশি থাকেন। জন্ম ১৯৩৪ সালের ১৮ আগস্ট। ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণ করেন তিনি (ওই অঞ্চল এখন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত)। বাল্যকালে বিদ্যালয়ে অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ পড়ে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত হন। দেশবিভাগের পর পড়াশুনা বন্ধ করে জীবিকার সন্ধানে বোম্বে (মুম্বাই) চলে আসেন, যেন পরিবারকে সহায়তা করতে পারেন। সেখানে তিনি এটা-ওটা নানা পেশায় কাজ করেন। তারই ফাঁকে ফাঁকে কলেজে ভর্তি, বই পড়া, লেখালেখি ও প্রগতি লেখক সংঘে যোগদানের ঘটনা ঘটে তার। লেখক নাম হিসাবে গুলজার-কে এসময়েই বেছে নেন তিনি। ক্রমে তিনি কবি, গীতিকার, লেখক, চিত্রনাট্য রচয়িতা ও চিত্রপরিচালক হিসাবে আপন কৃতিত্ব প্রকাশ করেন। গীতিকার হিসাবে কাজ শুরু করেন এস ডি বর্মনের সাথে ১৯৬৩ থেকে। এরপর আরও অনেক বিখ্যাত সুরকারের জন্য গান লেখেন তিনি। সিনেমার কাজে তিনি সাহিত্যিক পরিবেশ পান। বিমল রায়, শৈলেন্দ্র প্রমুখকে নিয়ে একটি অন্তরঙ্গ সৃষ্টিশীল পরিবেশ ছিল। যেমন গীতিকার হিসাবে তেমনি কবি হিসাবেও গুলজারের বিশিষ্টতা রয়েছে।
পদ্মভূষণ, সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার, দাদা ভাই ফালকে পুরস্কার, গ্র্যামি পুরস্কারসহ অনেকগুলো পুরস্কার তিনি লাভ করেন। তিনি এখনও সৃজনশীল আছেন।

কবিতাগুচ্ছ

প্রিয় তাঁতি

তাঁতি ভাই, তোমার কৌশলটা শেখাও আমাকে,
প্রায়ই দেখেছি তোমাকে বুনে যেতে,
যখনই কোনো সুতা ছিঁড়েছে বা শেষ হয়েছে
তুমি একে গিঁট দিয়েছ,
তুমি একে জুড়ে দিয়েছ আরেক মাথার সাথে;
বুননের কাজ এগিয়ে চলেছে
কিন্তু তোমার টানার মধ্যে
একটিও গিঁটের চিহ্ন
দেখতে পায় না কেউ।
আমি একটিই সম্পর্ক বুনেছিলাম একবার
কিন্তু এর সবগুলো গিঁট
খুব স্পষ্টই দৃশ্যমান, প্রিয় তাঁতি।

অনুপস্থিতি

কাচের দরজার বাইরে
গাছের মোটা ডালগুলোর মাঝে
বসন্তকালে
বৃষ্টি পড়ে শান্তভাবে। ওখানে রয়েছে
কোলাহল।
ওখানে রয়েছে লোকজন;
তারা কথাবার্তা বলছে।

তাদের কথাবার্তার কোলাহলের বাইরে
আমার ভিতরে কোনোখানে
অন্য একটি তলে
ঝরে পড়ছে তোমার অনুপস্থিতি – নিঃশব্দে,
একদম নিঃশব্দে।

একটি কবিতা

একটি কবিতা
আমার বুকের মধ্যে পেঁচিয়ে রয়েছে,
পঙ্ক্তিগুলো
আমার দুই ঠোঁটের উপরে বাঁধা আছে,
শব্দগুলো
প্রজাপতির মতো
কাগজের উপর স্থির হয়ে বসবে না।
আমি বসে আছি
অনেকক্ষণ ধরে
এই সাদা কাগজের উপরে।
তোমার নাম,
শুধু তোমার নামটাই রয়েছে;
হতে পারত কি
এর চেয়ে ভালো কোনো কবিতা?

এ কেমন অভ্যাস, দম টানা দম ছাড়া!
এ কেমন রীতি, বেঁচে থাকা!
সামান্য একটুও নড়াচড়া নাই শরীরে কোনোখানে
ছায়া নাই কোনো চোখে,
পা দুটো স্থবির, চলছে তারা
যাত্রা আছে, সেটি বয়ে চলেছে
কত বছর ধরে, কত শতাব্দী ধরে
বেঁচে থাকো, বেঁচে থাকো

অভ্যাস এমনই আজব ব্যাপার…

যাকে তুমি পর্যটন বলো, মানসী,
আমি তাকে বলি আরও জানবার সন্ধান।
একে অন্যকে আরও জেনে নেওয়া।
এই পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি অনেক শতাব্দী ধরে।
সময়ের গ্রন্থী হতে একটি হারানো মুহূর্ত যেমন।
আমার জাতিকে পেলাম, তারপর আমার রাস্তা খুঁজতে লাগলাম,
বছরের পর বছর রাস্তায় ঘরের চিহ্ন খুঁজতে থাকলাম।
এখন আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি তোমার আত্মায়, তোমার শরীরে।
যদি আমি তোমার শরীর হতে জন্ম নিই, তবে হয়তো আশ্রয় খুঁজে পাব।

একটি সাদা বিছানায়
একটি শরীর পড়ে আছে
মৃত
পরিত্যক্ত
ফেলে-যাওয়া একটি শরীর
যাকে ওরা কবর দিতে ভুলে গেছে।
তারা চলে গেছে
যেন মৃত্যু তাদের
কাজের বিষয় নয়।

আশা করি ফিরে আসবে তারা
তাকাবে
চিনতে পারবে;

আমাকে কবর দেবে
যেন আমি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারি।

জ্বলন্ত অঙ্গার

সারা রাত ঠান্ডা বাতাস বইছিল,
সারারাত আমরা আগুন পোহায়েছি।

অতীতের কিছু ডাল আমি ভেঙেছি,
আমাদের অতীতের কিছু পাতা তুমি ঝরিয়ে ফেলেছ,
পকেট থেকে কিছু মৃত কবিতা আমি মুচড়ে বের করলাম,
তোমার আঙুলে খুললে কিছু বিবর্ণ চিঠি,
এই চোখ দিয়ে আমি ওইসব পুরানো সূত্র ছিঁড়ে ফেললাম,
হাতের তালু থেকে কিছু অবশিষ্ট রেখা আমি ফেলে দিলাম,
শুকিয়ে গুঁড়ো হওয়া কিছু কান্না তুমি ঝেড়ে ফেললে।

সারা রাত ধরে যা কিছুই আমাদের দুজনার মধ্যে অঙ্কুরিত হচ্ছিল,
আমরা চেঁছে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলছিলাম আগুনে।

সারা রাত আমরা প্রতিটি মিটমিটে শিখাকে হাওয়া দিচ্ছিলাম,
জ্বালানি ছিল আমাদের মাংস।
সারারাত আমরা নিজেদের উষ্ণ করছিলাম
মৃত্যুন্মুখ প্রেমের ছাইয়ে।

গজল : ও খাট কে পুরজে উড়া রাহা থা

আমার চিঠিগুলো ছিঁড়ে হওয়ায় উড়িয়ে
সে আমাকে বাতাসের গতিপথ দেখাতে লাগল।

অন্য কিছুও স্পষ্ট হতে লাগল,
কারণ দেখলাম, আমি আগে যা লিখেছিলাম তা মুছে ফেলছি।

তারই ইমান এখন বদলে গেছে
একদা যে আমার ঈশ্বরপ্রতিম ছিল।

সে একদিন এক আগন্তুককে
আমার কাহিনি বলতে লাগল।

সে বয়স কমিয়ে চলল,
আমি বছর বাড়াতে থাকলাম।

(ও খাট কে পুরজে উড়া রাহা থা – এই গজলটি জগজিৎ সিং গেয়েছেন।)

গজল : নয়না ঠাগ লেঙ্গে

চোখকে বিশ্বাস করো না,
চোখের কথা শুনো না,
চোখ তোমাকে বোকা বানাবে।

জেগে থাকলে জাদু করবে,
ঘুমের সময় ফাঁকা রাখবে,
চোখ তোমাকে বোকা বানাবে।

ভালো-মন্দ দেখবে না – বহিরাগত নাকি নিজস্ব,
ওরা তো দংশন করায় আসক্ত হয়ে পড়েছে,
চোখের বিষ বড়ই নেশাকর।

রঙধনু দেখাবে ওরা মেঘে,
ভোর পর্যন্ত ঝরাবে বৃষ্টি,
পাগল বানিয়ে দেবে তোমাকে,
চোখ তোমাকে বোকা বানাবে।

চোখ তোমাকে নিয়ে যাবে স্বর্গলোকে,
মেঘমল্লার বুনে দেবে তোমার স্বপ্নে,
যা কিছু দেখবে তাকেই খাঁটি মনে হবে।

চোখের কথায় ভরসা রেখো না,
এসবের কোনো রকম লিখিত দলিল নাই,
যা কিছু বলে তারা সব নিছক হাওয়া।

মেঘ ছাড়াই বৃষ্টি ঝরাবে ওরা,
পাগল বানাবে তোমাকে,
চোখ তোমাকে বোকা বানাবে।

(ওংকার সিনেমায় রাহাত ফতেহ আলি খান গানটি গেয়েছেন)

গজল : জাগে হ্যাঁয় দের তক

অনেকক্ষণ তো জেগেই ছিলাম
আরও কিছু তবে ঘুমানো যাক,
ছোট রাত্রি তো কেটেই গিয়েছে
সুবেহসাদিক এসেই যাক।

স্বপ্নেরা আধা বাস্তবায়িত,
পায়নি পুরোটা সত্যতাও;
আরও একবার ঘুমের ভিতরে
স্বপ্নকে ফের বুনতে দাও।

দ্বিপদীগুচ্ছ

কালকের ঘটনা ছিল তোমার
আজকের কাহিনি আমার।

হাতে যদি না-ও থাকে হাত, তবু সম্পর্ক ভেঙো না,
সময়ের ডাল থেকে মুহূর্ত ভেঙো না।

যেখানেই চোখে কোনো অশ্রু রয়েছে
মনে হয়, লোকেরা ডুবছে।

সে এখন বদলেছে বিশ্বাস তার
একদিন ঈশ্বর যে ছিল আমার।

নীরবতা ভীষণ চেঁচায়
যেন কেউ ডাকছে আমায়।

রাত্রির কণা দিয়ে ভর্তি দুচোখ
যখনই আলোক আসে পিটপিট করি দুই চোখ।

বন্ধুদের মাহফিলে আমি নিঃসঙ্গ অনুভব করি,
আর নিঃসঙ্গতা নিজেই ভোজের শামিল।

সব সময়েই কোনো পথনির্দেশক পথ দেখায়
যখনই আমি আমার নিজের পথে ভ্রমণের চেষ্টা করি।

বেদনা ও আরামের মধ্যে আজব সম্পর্ক আছে,
কড়া রৌদ্রেই তুমি ছায়া পেতে পার।

গুলজারের কতিপয় উক্তি

আত্মহত্যা মোটেই তত সহজ কাজ নয়… এ তো জীবন দিয়ে দেবার ব্যাপার। কেমন যন্ত্রণা মানুষকে এটা করতে বাধ্য করে? আমি জানি না এর জন্য ঠিক কোন শব্দ ব্যবহার করা যায়… এটা আতঙ্কের বিষয় যে মানুষ এমন অবস্থায় পড়তে পারে।

তুমি সবসময়েই তোমার ধুনে থাকতে পার না।

যখন লোকে আমার সাথে দেখা করে আর আমার আসল নাম ধরে ডাকে তখন আমি এটা পছন্দ করি না। আমার মনে হয় যেন তারা যে আমার আসল নাম জানে এটা নিয়ে গর্ব করছে।

আমি বিশ্বাস করি, শব্দগুলো হয় অবাক করবে নয় আনন্দিত। কেবল তখনই শ্রোতারা গানের অর্থ বুঝতে চাইবেন।

সুর। এটাই মনে থাকে। সুর যখন লাফিয়ে আগাতে থাকে, তখন একে ধরে রাখার জন্য বল্গা দরকার হয়। শব্দ সেখানে কাজে লাগে। ওরাই সেই বল্গা যা আপনাকে ঘোড়ার পিঠে চড়বার সুযোগ দেয়।

ওরা বলে, তিনি আকাশের ওপার থেকে আমাদেরকে দেখছেন। এই কবিতায় তাকে আমি বলেছি যে তিনি যদি ডাকের জবাব না দেন, আমি আকাশের পর্দাটা টেনে দিয়ে তাকে ভুলে যাব। এটা আসলে যখন আমি অসহায় বোধ করেছি তখনকার যন্ত্রণার প্রকাশ।

বড় বড় বিমূর্ত চিন্তার চাইতে দৈনন্দিন জীবন আমার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। আমার কবিতার মধ্য দিয়ে আমি আমাদের সময়কালকে প্রতিফলিত করি। আমি পুরানো দিনগুলোয় বসবাস করতে চাই না, যদিও এটা এমন একটা কাল যার কথা আমি প্রায়ই উল্লেখ করি।

একমাত্র যা আমি চেয়েছি তা হলো একা থাকার জন্য একটুখানি সময়, যখন আমি বসে কাঁদতে পারি।

তুমি এগিয়ে যেতে পারবে না, যদি কেবল সমালোচনা গ্রহণই নয়, সমালোচনাকে আহ্বান করতে না পার।

দৈর্ঘ্য যাই হোক, কবিতা নিজে অন্তর্গতভাবে সম্পূর্ণ।

আমি চাই তিনি এসে জবাব দিন। তিনি তো আছেন, তাই না? যদি ঈশ্বর সবকিছুর দায়দায়িত্ব নেন, কেন তিনি আসছেন না, দেখছেন না এসব? আর কেন তিনি এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না যে পেশোয়ারে ১৫০ জন শিশুর হত্যাকাণ্ড কিভাবে তার ইচ্ছা হতে পারে? অথচ ওরা এটাই বলেছে যে এটি ঈশ্বরের ইচ্ছা।

আমি সাধারণত সুরের মাত্রার উপর শব্দ লিখি। আমি উল্টোভাবেও করতে পারতাম, তাহলে সুরকার আমার শব্দ ও ছন্দের উপর ভিত্তি করে সুর রচনা করতেন।

কবিতার খ্যাতি একটা প্রশ্নযোগ্য বিষয়। আমি জানতে চাই, লোকে আমাকে মাল্যভূষিত করার সময় আমার মধ্যে কী দেখে?

আমি অতটা কেতাদুরস্ত নই।

কবিতা সব সময়েই আমার মনে জমে উঠতে থাকে, আমি কেবল ওগুলো লিখে ফেলি। লেখার জন্য বিশেষ কোনো পরিবেশ-পরিস্থিতির দরকার হয় না আমার। যে-কোনো জায়গাতেই লিখতে পারি আমি; কারণ জীবন যেমন সারাক্ষণই বহমান, কবিতার এই ভাবনা ও লেখাও তেমনি তার পাশাপাশি চলে।

আমি সব সময়ে বলে আসছি, ছাপার অক্ষরে কবিতার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য জায়গা দরকার।

আমার মনে হয়, কবি হিসাবে আমি বুদ্ধমত্তার সাথে লিখি, কিন্তু আমি বুদ্ধিজীবী নই।