জয় গোস্বামী > চিত্রকরের কবিতা >> কবিতাকথন ও কবিতাগুচ্ছ

0
249

“যোগেন চৌধুরীর লেখায় প্রকৃত কবিদৃষ্টি আবিষ্কার করে চমকিত হবেন পাঠক। খুব ছোট আকারের কয়েকটি কবিতা লিখেছেন তিনি, যা অবাক করার মতো।”

সারা পৃথিবীতেই যোগেন চৌধুরীর ছবির যাতায়াত। শিল্পীর নিজেরও ধারাবাহিক ভ্রমণসূচি চলমান বিশ্বের নানা দেশে, বিভিন্ন আমন্ত্রণে। বাংলাদেশেও তিনি প্রায়ই আমন্ত্রিত হয়ে যান। সেই বিখ্যাত চিত্রী, ছবি আঁকার অন্তরালে কবিতা লেখেন। চিত্রশিল্পে এমন প্রবল প্রতিষ্ঠালাভের পরেও তাঁকে কবিতা লিখতে হলো কেন? শিল্পীর নিজের কথাই শোনা যাক এই বিষয়ে-
আমি শিল্পী। ছবি আঁকছি দীর্ঘকাল। ছবি আঁকতে আঁকতে কখনো মনে হয়েছে অন্য কিছু করি। এমন অবস্থা থেকে লেখা হয়েছে। পঞ্চাশের দশক থেকে আমি লিখি। কবিতা লিখেছি তখন। অনেক পরে গদ্য লিখেছি শিল্প বিষয়ে নিজের ভাবনা নিয়ে। এভাবে আমার কিছু লেখা দাঁড়িয়েছে। আমি লেখক নই। কিন্তু লিখতে চাই, ইচ্ছেও করে। তবে ছবি আঁকতে গিয়ে বিস্তর সময় ও শ্রম দিতে হয়েছে, ফলে অনেক সময় লেখার ইচ্ছাকে দূরে রাখতে হয়। আমি ছবিতে যা আঁকতে চেয়েছি বা বলতে চাচ্ছি তা হয়তো কোন কোন সময় হচ্ছে না। কবিতা আমার মনের সেই ভাবটিকে ফুটিয়ে তুলতে চাইছে যখন, তখন লিখেছি কিছু কবিতা। সবকিছু ছবিতে আসে না এমনকি প্রবন্ধেও না, তাই কবিতার কাছে আশ্রয় নিতে হয়।
যোগেন চৌধুরীর লেখায় প্রকৃত কবিদৃষ্টি আবিষ্কার করে চমকিত হবেন পাঠক। খুব ছোট আকারের কয়েকটি কবিতা লিখেছেন তিনি, যা অবাক করার মতো। শব্দের সংযম যেমন তাঁর আয়ত্তে একথা আমরা বুঝতে পারি- তেমনই, “তুমি আজ নিশ্চিত শত্রু হয়ে প্রতিহত করেছ কলকাতার বিশাল পতাকার / উত্তোলন”, অথবা “আমার কণ্ঠনালীতে ঝড়ো হাওয়ার মতো / কালো অন্ধকার আমি ক্রমাগত পান করি”- এইরকম সব অত্যাশ্চর্য লাইন আমাদের বোঝায়, যে, চিত্রকলা এক প্রতিভাবান চিত্রীকে উপহার দিয়ে একজন শক্তিমান কবিকে কেড়ে নিতে উদ্যত হয়েছিল। কিন্তু শিল্পী সেই থাবা এড়িয়ে নিজের সন্তর্পণ অগ্রসরমানতা জারি রেখেছেন। এই আমাদের লাভ।
পড়ুন যোগেন চৌধুরীর কয়েকটি কবিতা :
এক্ষণ
বার বার অন্ধকার নেমে আসে ঘুরে ফিরে
ঝাপটা মেরে অলিন্দে কানাগলিতে-
আমার কণ্ঠনালীতে ঝড়ো হাওয়ার মতো
কালো অন্ধকার আমি ক্রমাগত পান করি।
আপাদমস্তক শিরস্ত্রাণতক আমি নেশাগ্রস্ত হই
হাতে আমার খরস্রোতা তলোয়ার
তোমার হৃদয় কেটে-কুটে রক্তাক্ত করে
কালিমালিপ্ত হয়- অলিন্দে কানাগলিতে
দ্রুত প্রবাহিত হয়- খরস্রোতা রক্ত ও অন্ধকার
২০০৭ শান্তিনিকেতন
নামহীন
আপাদমস্তক কাদা ও নরকঙ্কাল
যেখানেই খুড়ি, নগ্ন করোটি জঙ্ঘা।
২০১১ শান্তিনিকেতন
সামনে যেতেই
এক-পা দুই-পা করে সামনে যেতেই
কে আমায় ধাক্কা মারে।
একস্রোত রক্ত আমার পায়ের গোড়ালিতে
আঘাত করছে।
আমি কোনদিকে যাব!
আমার কল্পনায় যে বিশ্ব
তা টুকরো টুকরো হয়ে
ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে মহাজাগতিক ব্লাকহোলের গহ্বরে।
একস্রোত রক্ত আমার হৃদয়ে
আমি কোন দিকে যাব বলো?
২০০৯
তুমি
ইস্পাত হয়ে ওঠে ছবি
জল হয়ে ওঠে কল্লোলিত বাসনা
ফুল যেন ভালোবাসা ভালোবাসা
মেঘ নিয়ে আসে বৃষ্টি
তুমি বহন করো সমস্ত শ্রম
সবুজ ধানক্ষেত এবং ছোট্ট শিশুর জন্য এক মুঠো নবান্ন।
ছবি
অনেকটা আমাদেরই জীবন যাপনের চিত্র রচনা মতো
আমরা তীর্যক ভঙ্গিমা নিয়ে দৃঢ় কাঠামো তৈরি করি
সমস্ত শক্তি ও হাতুড়ির ঘা দিয়ে ইস্পাত হয়ে উঠতে চাই
হয়ে উঠতে চাই অলৌকিক চিত্রপ্রতিমা-
যেমনভাবে সাদা কাগজে তৈরি হয় একটা ছবি
ত্রিকোণ ভঙ্গি কিছু পরিসর সাদা কালো ছায়ার কাঠামো- টানাপোড়েন
এবং অপরূপ এক উদ্ভাস।
১৯৯৩
চিঠি
একটি চিঠি
দীর্ঘ
দুটি পাখা মেলে
ঝড় ও বজ্রাঘাতে
১৯৮৪
তুমি
তুমি আজ নিশ্চিত শত্রু হয়ে প্রতিহত করেছো কলকাতার বিশাল পতাকার
উত্তোলন
তুমি যে শত্রুর ছুরিকা হেনেছো শহরের রক্তে,
রক্তে, লাল কলুষতা ছিটিয়েছো, চতুর্দিকে-
কি মোহাচ্ছন্ন স্বপ্নের ছুরিকা শান দাও,
ব্রিজের ইস্পাত ভেঙে গড়ে তোল, এ শহর উৎপাটনের শাবল।
বিশাল সক্ষম হাতের পিছনে কাজ করে বিস্ফোরক বারুদ,
উপচে পড়ে রক্তের ফেনা-
তুমি যে প্রতিদিন ট্রাম ও বাসের কক্ষগুলি গুঞ্জরিত কর
হীনতার প্রতিধ্বনি ওগরাও
ভাঙা শহরের ওপর দিয়ে ট্রাম যায়-
তুমি প্রতিরাত্রে মদ খেয়ে বমন উদ্বেগের ভঙ্গিতে নুয়ে পড়
বাস্টার্ড!
নিশীথে, অধঃপতনের শেষ সীমানায়
তোমার লাশ পড়ে থাকে!
এক, দুই
খড়িমাটি দিয়ে
ক্রমাগত দাগ কাটতে কাটতে
শূন্যতায় স্পর্শ করি।
স্পর্শ করি কড়িকাঠ-
ঘর ভাঙি,
মাটি খুঁড়ে অধর খুঁজে বেড়াই
দাঁত দিয়ে ঠোঁট কাটি,
স্বপ্ন ভাঙি।
রাত জুড়ে আঁধার মাড়িয়ে চলি
ধূর্ত শহরের অলিগলি গোরস্থান কেটে
নালী দিয়ে রক্তের খননকাজ
দ্রুততর করি।
২০০৭ শান্তিনিকেতন
গোধূলি
একটি মানুষ বসে আছে
পিঠ থেকে ঝরে শেফালি বকুল।
ধূসর গোধূলি ফেটে খানখান
লাফ দিয়ে ডোবে সোনালি আগুন।
এখন রাত।