জাহানারা পারভীন > মেরি হাসকেল : কহলীল জিবরানের জীবনের জীয়নকাঠি >> উৎসব সংখ্যা ২০১৯

0
696
জাহানারা পারভীন > মেরি হাসকেল : কহলীল জিবরানের জীবনের জীয়নকাঠি >> উৎসব সংখ্যা ২০১৯
প্রথম পর্ব

 

মেরিকে ভালোবেসে ডানার আড়ালে লুকানো তলোয়ারের আঘাত সয়েছেন জিবরান। মেরি প্রেমিকের জন্য বুকে তুলে রেখেছেন নীরব প্রার্থনা। দুই ঠোটে প্রেমময় গান। জিবরানের প্রতিটি চিঠি শেষ হয়েছে প্রেমিকার মঙ্গল প্রার্থনায়।
পরস্পরকে ভালোবাসো,
প্রেমের বন্ধন তৈরি করো না;
তোমাদের আত্মার মাঝে
ভালোবাসা হয়ে উঠুক অতল সমুদ্র
ভালোবাসায় কিছুটা দূরত্বের পরামর্শ এসেছে প্রফেটে। জিবরান নিজেও মেনেছেন এই সূত্র। দূরত্বের প্রবক্তা মেরি হাসকেল। মেরি তার বন্ধু, পরামর্শক, পৃষ্ঠপোষক। তার কাছে শিখেছেন রহস্যে ডুবে থাকা প্রেমের আবিষ্কার। একে অন্যের ছায়া না মারিয়ে চলার কৌশল। থেকেছেন মন্দিরের খুটির মতো পাশাপাশি; স্বতন্ত্র, মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কে। এই সম্পর্ক নৈকট্যের মাঝেও দূরত্বের। দূরত্বেও নৈকট্যের। তাদের সম্পর্ক অনেকটা মেরি মেগডোলিনে এবং জেসাসের প্রেমের মতো। জেসাস, দি সন অফ মেন-এর দুই চরিত্রে নিজেদের সম্পর্কের ছায়া ফেলেছেন জিবরান। জেসাস তাই প্রেমিকাকে বলতে পারেন, অন্য পুরুষেরা তোমার নৈকট্যে এসে মূলত নিজেদেরই ভালোবাসে। আমি তোমায় কাছে এসে তোমাকেই ভালোবাসি।
নারীর মাঝে খুঁজেছেন মমতা, শুদ্ধতা, সাহস, বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। একমাত্র মেরির মধ্যেই দেখেছেন এসব গুণের সমন্বয়। তাই মেরি হাসকেল একমাত্র নারী যাকে স্ত্রী হিসেবে চেয়েছেন। আদর্শ নারীকে কল্পনা করেছেন বিয়াত্রিচ ও মেসেলিনের সমন্বয়ে। বিয়াত্রিচ ডিভাইন কমেডিতে দান্তের ভালোবোসা। রোমান সাম্রাজ্যের রানী মেসেলিন পরিচিত রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, যৌনতার জন্য। জিবরানের কাছে নারী শুধু যৌনসঙ্গী নয়। নারী তার কাছে জীবনের উৎস, সৌন্দর্যের প্রতীক। রহস্যময় ধাঁধা। এই ধাঁধার উত্তর পাননি বলেই মনে হয়েছে।
প্রতিটি মানুষ দুজন নারীকে ভালোবাসে। একজনকে সৃষ্টি করে তার কল্পনা। অন্যজনের এখনও জন্মই হয়নি।
প্রিয় নারীর মাঝে খুঁজেছেন মায়ের ছায়া। নিজের আঁকা নারীর ছবিতে, কুমারী মেরির মাঝেও মায়ের মুখের ছাপ। মেরির ভালোবাসায় যোগ হয়েছে উদ্বিগ্ন মায়ের মমতা। মেরির সান্নিধ্যে পুনর্জন্মের অনুভূতি হয়েছে তাঁর। প্রথম তারুণ্যে বিদেশের মাটিতে অভিভাবকহীন জীবনে, ভয়াবহ একাকীত্বে, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় অন্ধকার সূরঙ্গের ওপাড়ে থাকা আলো হয়ে হাজির হয়েছেন মেরি। আলাপে, আড্ডায়, চিঠিতে এসেছে সেই স্বীকারোক্তি…
অন্যকে বুঝতে পারার এক অদ্ভূত ক্ষমতা আছে তোমার। তুমি আমাকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছ মেরি। তুমি এক মহান অনুপ্রেরণা। পাশে থেকে সব বেদনার ভাগই নিচ্ছ না, বরং নতুন করে যোগ করছ জীবন। তোমাকে জানা আমার দিন ও রাতের শ্রেষ্ঠ বিষয়। তোমার সঙ্গে পরিচয় এক অলৌকিক ঘটনা। তুমি আমাকে বোঝ, এটা আমার জীবনের সবচে শন্তিপূর্ণ স্বাধীনতা। আমাদের শেষ সাক্ষাতের আয়ু ছিল মাত্র দুই ঘণ্টা। তখন তুমি আমার হৃদয় হাতের মুঠোয় রেখেছ। সেখানে একটা কালো দাগ ছিল। তুমি দেখার পর দাগটা হঠাৎ গায়েব হয়ে যায়। পুরোপুরি পরিস্কার হয়ে ওঠে হৃদয়।
জিবরান বলেছেন, মেরি তাঁর চোখের দরোজা খুলে দিয়েছেন। নির্মাণ করেছেন জীবনের সূত্র। একুশ বছর বয়সী তরুণ সংকটে, খরকুটো হয়ে স্রোতে-ভাসা দিনে আঁকড়ে ধরেছেন তাকে। মেরি সেই বটবৃক্ষ, যার ছায়া তাকে বাঁচিয়েছে ঝড়, জল, রোদ থেকে। মেরিকে লেখা ৩২৫টি চিঠি সেই কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসার দলিল।
তোমার উছিলায় ঈশ্বর আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন, প্রিয় মেরি। তুমি যেন ঈশ্বরের হাত। এটা হয়ে ওঠা খুব আশির্বাদের। কত সৌভাগ্য আমার, সেই হাত ছুঁতে পারছি। এই হাত থেকে গ্রহণ করতে পারছি ঈশ্বরের দান। মহান নদীর তীরে একটা উইলো গাছ হয়ে পড়ে থাকাও অনেক আনন্দের।
এসব চিঠির ভাঁজে ভাঁজে শব্দের মূর্ছনা। প্রেমিকার হৃদয় বিছানো পথে হেঁটে যেতে যেতে প্রেমিকের বন্ধনা। এসব চিঠিতে জীবন সম্পর্কে নানা উপলব্ধি, যা থেকে স্পষ্ট হয়েছে তার চিন্তা, দর্শন। দুজনের ৬১৫টি চিঠির মধ্য থেকে ৫১৫টি চিঠি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বিলাভেড প্রফেট, দা লাভ লেটার্স অব কহলীল জিবরান অ্যান্ড মেরি হাসকেল। এর মধ্যে মেরিকে লেখা জিবরানের চিঠি ৩২৫টি। মেরির চিঠি ২৯০টি। এছাড়া যোগ হয়েছে মেরির ২৭টি নোটবুক, ৪৭ দিনের ডায়েরি যা মেরির জার্নাল নামে পরিচিত। এসব লেখা বলছে, তাঁদের সম্পর্ক ছিল মুক্ত, স্বাধীন। জন কিটস, আলবার্ট আইনস্টাইন, ফ্রানজ কাফকা, জেমস জয়েস, ফ্রিদা কাহলোর সঙ্গে তুলনা করা চলে এমন আবেগের।
তাঁরা ছিলেন প্রফেটের প্রত্যাশিত প্রেমিক-প্রেমিকার মতো। একে অন্যের মুঠোয় তুলে দেননি। একা হতে দিয়েছেন পরস্পরকে। মেরিকে ভালোবেসে ডানার আড়ালে লুকানো তলোয়ারের আঘাত সয়েছেন জিবরান। মেরি প্রেমিকের জন্য বুকে তুলে রেখেছেন নীরব প্রার্থনা। দুই ঠোটে প্রেমময় গান। জিবরানের প্রতিটি চিঠি শেষ হয়েছে প্রেমিকার মঙ্গল প্রার্থনায়। জিবরানের জীবনে যে কজন নারী এসেছেন : সুলতানা, জোসেফিন, মিশেলিন, মে জিয়াদে, কৌরি; এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর ছিল মেরি হাসকেলের সঙ্গে সম্পর্ক। সাতাশ বছর স্থায়ী এই প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈষয়িক যোগাযোগ। জিবরানকে প্যারিতে পাঠানো থেকে শুরু করে তাঁকে সবরকম আর্থিক মানসিক সমর্থন দিয়ে গেছেন এই নারী। শিল্পীসত্তা বিকাশের জন্য নিউ ইয়র্কে পাঠানো, সেখানে বাড়ি খোঁজা, ভাড়া মেটানো, পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করা, ইংরেজি শিখতে সাহায্য করা; ছবির প্রদর্শনীর আয়োজন করা; এভাবে বন্ধুর ভবিষ্যৎ নির্মাণে পাশে থেকেছেন মেরি। লেখার খরায় আক্রান্ত কবির মনোবল অটুট রাখার চেষ্টাও করেছেন। মজবুত রাখতে চেয়েছেন নিঃসঙ্গ, লাজুক, কবির আত্মবিশ্বাস। লিখতে না পারা হতাশ বন্ধুর কাছে নিউ ইয়র্কে হাজির হয়েছে সান্ত্বনার অনবদ্য ভাষা :
তোমার কাজ শুধু তোমার লেখা বা আঁকা নয়, কহলীল। এগুলো একটা অংশ মাত্র। তোমার কাজ হচ্ছে তুমি। তোমার চেয়ে কম নয়। তোমার অংশও নয়। যেসব দিনে তুমি লিখতে বা আঁকতে পার না; বা কোনও কাজও করতে পার না, সেই দিনগুলোও লেখা বা আঁকার দিনগুলোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কোনও বিভেদ নেই। সবকিছু মিলিয়েই তুমি। এসব কিছু নিয়েই তোমার জীবন। একদিন লেখার সঙ্গে তোমার নীরবতাও পাঠ্য হবে। আলোর অংশ হয়ে উঠবে সব অন্ধকার।
প্রেম, অর্থ, সময়, সাহস দিয়ে পাশে দাঁড়ানো মেরিকে জিবরান ভেবেছেন ঈশ্বরের দূত, সেরা আশির্বাদ। মেরি তার প্রথম পাঠক, দীর্ঘশ্বাসের প্রধান স্রোতা। আরবিভাষী জিবরান যখন মেরির কাছে ইংরেজির তামিল নিচ্ছেন, মেরিও তখন আরবি শেখার চেষ্টা করেছেন। এ এক বিরল যৌথতার দৃষ্টান্ত। সবকিছুর জন্য সারাজীবন মেরির কাছে কৃতজ্ঞ থেকেছেন জিবরান।
যখন আমার মন খারাপ হয় প্রিয় মেরি, বেদনার কুয়াশায় ডুবে যাই; তোমার চিঠিতে আশ্রয় খুঁজি। এসব চিঠি আমাকে প্রকৃত সত্তার কথা মনে করিয়ে দেয়। অসুন্দরকে এড়িয়ে চলতে শেখায়। আমাদের প্রত্যেকেরই অবশ্যই কোথাও না কোথাও একটা আশ্রয় থাকা দরকার। আমার আশ্রয় হচ্ছে একটা সুন্দর কুঞ্জ বা উপবন, যেখানে তোমাকে নিয়ে আমার সব জ্ঞান বাস করে।
জিবরানকেও মেরি ভালোবেসেছেন নিজের সবটুকু দিয়ে। জিবরানকে লিখেছেন :
তোমাকে ভালোবাসতে ঈশ্বর আমাকে তাঁর হৃদয় ধার দিয়েছেন। যখন আমি টের পাই আমার হৃদয় খুব ছোট; তখন আমি তাঁর হৃদয় চেয়ে নেই। আমার মনের ভেতর রেখেছি তোমাকে, যেখানে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছ তুমি। তোমার কাছে নিজের জন্য কিছু চাই না। তুমি তোমার জন্য যা চাও সেটাই আমার চাওয়া। ভবিষ্যেতে তুমি যাই হও না কেন, আমি হতাশ হব না। তোমাকে নিয়ে আমার কোন পূর্ব-পরিকল্পনা নেই যে তোমাকে এই হতে হবে, বা ওই হতে হবে। ভবিষৎ নিয়ে তোমাকে চাপ দিতে চাই না। শুধু চাই তোমাকে আবিষ্কার করতে।
দুজনের সম্পর্ককে জিবরানের মনে হয়েছে নিয়তিতাড়িত। বলেছেন, মেরিকে নিয়ে তাঁর অসহায়ত্ব ও আনন্দ দুটোর কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তাঁর মনে হয়েছে এই সম্পর্ক জন্ম-জন্মান্তরের। যদিও আগের জন্মে এর রূপ ছিল ভিন্ন।
আগের জন্মে আমরা কোথায় ছিলাম? কে ছিলাম? তুমি কি আমার মা ছিলে? আমি তোমার সন্তান? অথবা তুমি আমার বোন ছিলে? আমি তোমার ভাই? কিংবা তুমি নারী নবী, আর আমি নবী?
হতাশায়, অন্ধকারে প্রদীপ হয়ে জ্বলে ওঠা এই নারী আমৃত্যু ছিলেন প্রধান নির্ভরতা। এই নির্ভরতা আত্মিক, কাব্যিক। পরিচয়ের পর থেকেই মেরি হয়ে উঠেছেন সেরা বন্ধু, স্বজন, শুভার্থী। বিয়ে-বহির্ভুত একটা সম্পর্ক এত কার্যকর হয়ে ওঠার পেছনে কাজ করেছে পরস্পরের প্রতি আস্থা। ব্যতিক্রমধর্মী এই সম্পর্কের সূত্রে মেরি হাসকল আমৃত্যু ছিলেন কবির প্রধান বন্ধু। হাজার মাইলের দূরত্বেও মেরির উপস্থিতি টের পেতেন, বোস্টনে থাকা মেরিকে নিউ ইয়র্ক থেকে বলতে পারেন।
সবচেয়ে চমৎকার বিষয় কি জান? এই যে তুমি-আমি একসঙ্গে হাঁটছি, সুন্দর পৃথিবীতে। মানুষের কাছ থেকে দূরত্বে থেকেই। দুজনেই জীবনের কাছে একহাত পেতে রেখেছি। জীবন সুন্দর।
হাতের রেখায় কখনও দূরত্বের সংকট, কখনও নৈকট্যের ভাঁজ, বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি বয়সের দূরত্ব। সম্পর্কের ধরন যাই হোক, সবটুকু সামর্থ দিয়ে জিবরানের পাশে দাঁড়িয়েছেন মেরি। জার্নালে পাওয়া যায় পরিচয়ের স্মৃতিচারণ :
১৯০৩ সালের বসন্তে কহলিলের সঙ্গে প্রথম দেখা। লায়নেল মার্কস একদিন বলল, মেরি, মিস্টার ডের স্টুডিওতে একটা প্রদর্শনী চলছে। দেখে আসতে পার। ছবিগুলো ভালো লাগবে। প্রিন্সিপাল হিসেবে স্কুলে সেটা প্রথম বছর। নানা কাজের ব্যস্ততা। পরের সপ্তাহে মার্কস জানতে চায় প্রদর্শনীতে গিয়েছি কীনা। আমি সময়ের সংকটের কথা বলি। এক সপ্তাহ পরে সে বলে- কাল শেষ দিন। আমার অবশ্যই যাওয়া উচিত। শেষ দিনে যাই ডে-র স্টুডিওতে। খুব ভালো লাগে ছবিগুলো। একটা লাল পেনসিলে আঁকা ড্রইংয়ে চোখ আটকে যায়। একজন বাদামি রঙেন তরুণ নম্রভাবে জানতে চায় ছবিটি ভালো লেগেছে কীনা। হ্যাঁ বলতেই সে ছবিগুলো নিয়ে কথা বলতে শুরু করে।
এরপর বোস্টন বালিকা বিদ্যালয়ে প্রদর্শনী চলে। যেন এক উঠতি শিল্পীর ছবির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায় ছাত্রীরা। দুই সপ্তাহ মেরির স্কুলে ছবি থাকার সূত্রে সেখানে গেছেন জিবরান। ছাত্রীদের ছবির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পরও যোগাযোগ থাকে। বছরে দু-একবার মেরির বাড়িতে ডিনারে আমন্ত্রণ পেয়েছেন। এই ক বছরে বিনা আমন্ত্রণে কখনও দেখা করার চেষ্টা করেননি। মেরির দাওয়াতে না আসার অজুহাতও দেননি। প্রথম দেখার সময় মেরির পোশাকের রঙ, কোমল আচরণ, সৌজন্যতার কথাও ভোলেননি। সেদিনই মনে হয়েছিল, এই দেখা নিয়তির বিধান। একসঙ্গে আছেন, থাকবেন। কিছুই তাদের আলাদা করতে পারবে না।
মেরির বয়স তখন ২৭। জিবরানের ১৭। পরিচয়ের পর থেকেই তরুণ শিল্পীর প্রতিভাকে চিনতে পারেন। মেরি তখন বোস্টনের কেমব্রিজ বালিকা বিদ্যালয়ের পরিচালক। এক বছর আগে বোনের প্রতিষ্ঠিত এই স্কুল কিনে নেন। এই স্কুলই তাঁর সবকিছু। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নেও অনেক কিছু করেছেন। এছাড়া নানা সময়ে সহযোগিতা করেছেন অসচ্ছল মেধাবীদের। এর আগেও দুজন গ্রীক বালককে পড়ার খরচ দিয়েছেন। একজনকে বোর্ডিং স্কুলে রেখে পড়িয়েছেন, অন্যজনকে পাঠিয়েছেন হার্ভার্ডে। জিবরানের মাঝে দেখতে পান ভবিষ্যতের এক বড় শিল্পীকে। বুঝতে পারেন পরিচর্যা পেলে প্রতিভার বিকাশ ঘটবে তাঁর। এ বিষয়ে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না জিবরানের।
হাতেকলমে শিল্পকলা শিখতে, সহজাত প্রতিভায় শান দিতে তাঁকে শিল্পের শহর প্যারিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন মেরি। খরচ বাবদ প্রতিমাসে ৭৫ ডলার পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। বোস্টনের সিরীয় অভিবাসীদের সংকীর্ণ গণ্ডিতে খাপ খাওয়াতে না পারার অস্বস্তিতে থাকা তরুণের জন্য এ এক অভাবনীয় সুযোগ। বদ্ধ ঘর ছেড়ে খোলা আকাশে ওড়ার আমন্ত্রণ। প্যারি যাত্রার আগে এক বন্ধুকে জানান এক স্বর্গের দেবী এই যাত্রার ব্যাবস্থা করেছেন। লেবাননের পর্বত ঘেরা অরণ্যের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামে জন্ম তাঁর। মায়াময় পরিবেশে শৈশব কাটানো বালকের কাছে প্রথম থেকেই নিরস ঠেকেছে বোস্টনের দরিদ্র পাড়ার উদ্বাস্তু জীবন। মা, ভাই-বোনের মৃতুর পর বোন মারিয়ানাকে নিয়ে নিরানন্দের সংসার। শিল্পী ইউসেপ হাওয়ালকে জিবরান লিখেছেন :
এই শহরে অনেক বন্ধু, পরিচিতজন থাকলেও আমি যেন দূরের কোনও দ্বীপে নির্বাসিত। যেখানে জীবন রক্ষণশীল। ছাইয়ের মতো ধূসর। স্ফিংসের মতো নীরব।
এই ধূসর নির্বাসন থেকে পালানোর সুযোগ এলো এবার। ঘোলাটে জীবনের বিপরীতে সৌন্দর্যের পৃথিবী, আধুনিক সভ্যতার রাজধানী। যেখানে শিল্পের পরিধি বাড়ানো সম্ভাবনা আছে। এ যেন এক নতুন জীবনের ইঙ্গিত। ভাই-বোনদের মধ্যে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়া একমাত্র সদস্য জিবরান। ভাগ্যের অন্বেষণে কামিলে সন্তানদের নিয়ে বোস্টনে এসে পড়েন নতুন সংগ্রামে। অন্য অভিবাসীদের মতো পথে-পথে ফেরি করেছেন হকার হয়ে। বড় ছেলেকে বসিয়েছেন মুদি দোকানে, সেলাইয়ের কাজ করেছে মেয়েরা। ছোট ছেলেকে ভর্তি করেছেন স্কুলে। মায়ের ইচ্ছে- অন্তত ছোট ছেলে পড়াশোনা করুক। অচেনা দেশে জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত মা সেদিন তাঁকেও উপার্জনের পথে পাঠালে হয়তো বদলে যেত জিবরানের জীবনের গতিপথ। পুত্রের সৃষ্টিশীলতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন নিরক্ষর মা। মায়ের বাৎসল্যের সঙ্গে যোগ হয় মেরির পৃষ্ঠপোষকতা। ১৯০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছোটবেলার বন্ধু আমেনকে জানান বিদেশ যাত্রার খবর।
বসন্তের শেষে শিল্পকলার রাজধানী প্যারি যাব। এক বছর থাকব সেখানে। এক বছরের প্যারিবাস হবে গুরুত্বপূর্ণ সময়। ঈশ্বরের করুণায় আলোর শহরে যে কদিন থাকব, আমার জীবনে তা যোগ করবে নতুন অধ্যায়। প্যারির মহান শিল্পীদের সঙ্গে থেকে তাদের নির্দেশনায় কাজ করব। অনেক কিছু শিখব। আমার শিল্পচর্চার উন্মেষ ঘটবে। প্যারি থেকে আমেরিকা ফেরার পর আরো গুরুত্ব পাবে আমার ছবি। ধনীরা চোখ বন্ধ করে কিনবে সেসব। শৈল্পিক কারণের চেয়ে ছবিগুলো এজন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে যে, এসব ছবি একজন প্যারি-ফেরত শিল্পীর আঁকা। পুরো এক বছর কাটিয়ে আসবো প্যারিতে। এভাবে সমুদ্রযাত্রার সুযোগ আসবে, স্বপ্নেও ভাবিনি। খরচের কথা ভেবেই এমন উদ্যোগ সাধ্যের বাইরে বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু একজন প্রিয় মানুষ, ঐশ্বরিক শক্তি সবকিছুর বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। আমি কিছুই জানি না অথচ প্যারি যাওয়ার সুযোগ এসেছে। এখানে আছি এক স্বর্গের দেবীর ছায়ায়। যিনি আমার জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করে দিচ্ছেন। যার সঙ্গে আর্থিক উন্নতির সম্পর্ক।
তখনও মেরি স্বর্গের দেবী, ঐশ্বরিক শক্তি, ঈশ্বরের মুখপাত্র। তখনও আলাপে সমীহ। মেরি তখনও উঠতি শিল্পীর পাশে দাঁড়ানো কল্যাণীয়েষু।
প্যারিতে এসে মুগ্ধ জিবরান। প্যারিকে মনে হয় সিটি অব জয়। আনন্দের শহর থেকে একের পর এক চিঠি লিখতে থাকেন মেরিকে। ১৯০৮ সালের ২ অক্টোবর প্যারি থেকে লেখা প্রথম চিঠিতে জানান, এখানে আসার পর যে-কটি ছবি এঁকেছেন, যে-কটি ড্রইং করেছেন, তাঁর মৃত্যুর পর স্টুডিওতে যত ছবি পাওয়া যাবে, সবগুলোর মালিক হবে মেরি। বলেন, এমন একদিন আসবে যেদিন সবাইকে বলতে পারবেন মেরির জন্যই তিনি শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন। ফিরতি চিঠিতে মেরি তাঁকে আরও উৎসাহ দেন। আঁকার সব কলাকৌশল শিখে নেওয়ার পরামর্শ দেন। প্রেরণার বার্তা নিয়ে আসা চিঠি পড়ে আপ্লুত জিবরান। কৃতজ্ঞতাবোধ পরিণত হয় মুগ্ধতায়। মুগ্ধতা থেকে প্রেম। নিঃসঙ্গতা নেভাতে আলোর ফোয়ারা হয়ে আসা চিঠিতে খুঁজে পান অন্তর্লীন রহস্যের সূত্র।
যদি তোমাকে বোঝাতে পারতাম মেরি! আমার কাছে তোমার চিঠির গুরুত্ব। আমার আত্মার ভেতর আরেকটি আত্মা তৈরি করে এসব চিঠি। এগুলোকে জীবনের কাছ থেকে আসা বার্তা হিসেবেই নিয়েছি। যখন এদের সবচেয়ে বেশি দরকার, কীভাবে যেন তখনই তারা আমার কাছে আসে। এমন সব উপকরণ নিয়ে আসে, নতুন জীবনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। যখনই আমার হৃদয় শূন্য হয়ে ওঠে, তখন একজনকে খুব তীব্রভাবে প্রয়োজন হয়। যে আমাকে বলবে যে আরও একটি আগামীকাল আছে সব শূন্যতা পুরণের জন্য। তুমি এই কাজটি করছো।
জিবরানের প্যারিবাস তাঁর আত্মআবিস্কারের পর্ব। রদ্যাঁর সাহচর্য, গগাঁ, পিকাসোসহ শিল্পীদের ছবি; পানশালা, যাদুঘর, গ্যালারি : নিরন্তর আনন্দযাপন। সবকিছু ছাপিয়ে দিনশেষে মেরির চিঠিই বড় আশ্রয়। ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন প্রেমে পড়েছেন মেরির। সমীহ বদলে গেছে মুগ্ধতায়। এই মুগ্ধতাকে স্বীকার করলেন। অনুসরণ করলেন হৃদয়ের সংকেত। পাঠকদের জন্যও রেখেছেন একই পরামর্শ।
ভালোবাসার সংকেত এলে অনুসরণ করো তাকে
যদিও পথ খুব কঠিন, অনেক চড়াই উৎরাই…
ততদিনে সম্পর্ক চুকেবুকে গেছে মিশেলিনের সঙ্গে। জিবরানের নারীবন্ধুদের প্রায় সবাই বয়সে বড়, ধনাঢ্য পরিবারের সদস্য। সবাই তাঁকে উৎসাহ যুগিয়েছেন লেখা ও আঁকায়। প্যারিতে হঠাৎ দেখা মিশেলিনের সঙ্গে। সে নতুন শহরে বাড়ি খুঁজে দিয়েছে, চিনিয়েছে পথঘাট। সঙ্গে করে নিয়ে গেছে যাদুঘর, গ্যালারিতে। তবে সাবেক প্রেমিকার সাহচর্য সইল না বেশিদিন। দূরত্ব বাড়ে, যোগাযোগ নিভে যায়। যেন এই শহরে এসেই পুরোপুরি হারিয়ে গেল মিশেলিন। প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না। মিশেলিনের শূন্য আসনে বসালেন মেরিকে। স্থাপিত হল নতুন যোগাযোগ।
দুই বছর পর ১৯১০ সালের অক্টোবরে নিউইয়র্কগামী জাহাজে ওঠেন জিবরান। মেরিকে জানান, বোস্টনে ফিরে প্রথমে দেখতে চান তাঁকেই। ৩১ অক্টোবর নিউইয়র্কের বন্দরে ভেড়ে জাহাজ। নিউইয়র্ক হয়ে ডিসেম্বরে ফেরেন বোস্টনে। এ এক নতুন জিবরান। প্রাণোচ্ছল, জীবনের প্রতি পূর্ণ আস্থা। ইংরেজিতে আগের চেয়ে সাবলীল, নির্ভুল। দীর্ঘ অদর্শন কেটে যায় আলাপে, আড্ডায়। ডিসেম্বর জুড়ে দুজনকে দেখা যায় একসঙ্গে। সিনেমা, প্রদর্শনী, থিয়েটারে। আলাপে আড্ডায় ঘন হয় কথার গভীরতা। পরিচয়ের ছয় বছর পর পারিবারিক গল্প বলতে শুরু করেন। পরিবার, শৈশব, শেকড় এইসব নিয়ে। আগে মেরি জানার চেষ্টা করলেও এড়িয়ে গেছেন। এবার নিজেই স্মৃতির সিন্দুক খুলে দেন। বলেন মা, মাতামহের কথা। গীর্জার দরিদ্র বিশপ থেকে তার যাজক হওয়ার কাহিনি। বাবার পরিবার নিয়ে বলতে গিয়ে থেকে যান বাস্তবতার বাইরে। অনেক ধনসম্পদের ফিরিস্তি দেন। সম্পদশালী পরিবারের সদস্য হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। ৭ ডিসেম্বর মেরিকে পূর্বপুরুষ সম্পর্কে অযৌক্তিক তথ্য দেন। পরচিয়ের পর থেকে যেভাবে মেরির সাহায্য নিয়েছেন; হয়ত সেই গ্লানি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা; হবু প্রেমিকার কাছে ভাবমূর্তি বাড়ানোর উদ্যোগ। আর এরই তিন দিন পর মেরিকে বিয়ের প্রস্তাব দেবেন। এ যেন তারই পূর্বপ্রস্তুতি। প্রত্যাখ্যাত হবার ভয় তাড়াতেই আগাম সতর্কতা। কঠিন দারিদ্র্যে বড় হওয়া জিবরান বলেন : তার দাদা ছিলেন ধনী, অভিজাত ব্যক্তি। শখের বশে বাড়িতে সিংহ পুষতেন। তিনি নাকি তুর্কি শাসকদের দম্ভের সঙ্গে এই বার্তা পাঠিয়েছেন যে সিরিয়া তুর্কি সাম্রাজ্যের সেরা প্রদেশ। আর বিসারররি লেবাননের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম। জিবরান পরিবার এই গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবার। তিনি হচ্ছেন এই পরিবারের প্রধান। পরবর্তী দশ বছর ধরে বাবা ও দাদা সম্পর্কে মেরিকে বানোয়াট তথ্য দিয়ে গেছেন এভাবেই। মেরি বুদ্ধিমতি, সংবদেনশীল নারী। অতীত নিয়ে জিবরানের অনিশ্চয়তার মনোভাব সম্পর্কে সচেতন। তাই এমন কোনো প্রশ্ন করননি যাতে বিব্রত হন জিবরান। ধৈর্য নিয়ে সব শুনে যান। বিশ্বাস করেছেন কীনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জার্নালে এ নিয়ে মেরির কোনো মন্তব্য নেই।
দশ ডিসেম্বর মেরিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভালোবাসার কথা জানান জিবরান। বলেন, বিয়ে করতে চান। সেদিনের স্মৃতিচারণে মেরি লিখেছেন :
সেদিন শনিবার। সন্ধ্যাটা কাটিয়েছি বোস্টনের ফাইন আর্টস সেন্টারে। সেখানে দেখেছি মিলেট, রদ্যাঁ, করট, রেমব্রাঁ, টার্নারের ছবি। এরপর গান শুনতে যাই সিম্ফনি চত্ত্বরে। সেদিন সেখানে কোনও কনসার্ট ছিল না। এরপর মালবরো সড়কে ফিরে আসি। রাত বারোটা পর্যন্ত সেখানেই থাকি। কহলীল বলে সে আমাকে ভালোবাসে। বিয়ে করতে চায়। আমি বলি, বয়সের কারণেই বিয়েটা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। সে বলে, যখনই তোমার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করি, তুমি দূরে সরে যাও। ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়েই চলি। তাঁকে বলি, এই বন্ধুত্বকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চাই। ভয় হচ্ছে, একটা দুর্বল বিয়ের জন্য ভালো বন্ধুত্ব না নষ্ট হয়ে যায়।
ভালোবাসা এভাবে বুঝতে দেবে
তোমাকে, হৃদয়ের সব সারল্য
সেই অর্জিত জ্ঞানে,
একসময় তুমি হয়ে উঠবে জীবনের অংশ