জাহানারা পারভীন > মেরি হাসকেল : কহ্‌লীল জিবরানের জীবনের জিয়নকাঠি [পর্ব ২] >> প্রবন্ধ

0
500
পর্ব ২

সে তোমাকে ছুঁড়ে দেবে পবিত্র আগুনে

“মৃত্যুর আগে জিবরান নিজের সব ছবি, ড্রইং উইল করে দিয়ে গেছেন মেরির নামে। রেখেছেন ২২ বছর আগের প্রতিশ্রুতির মর্যাদা। উইলে বলে গেছেন মৃত্যুর আগে তিনি পাগল হয়ে গেলেও এসব মেরির সম্পত্তি বলে বিবেচিত হবে। পাশাপাশি উইল করে গেছেন নিজের হৃদয়।”

ভালোবাসা অধিকার করে না কিছুই;
না তাকে অধিকার করা যায়
দীর্ঘ দূরত্বের পর এই নৈকট্য, হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো দিন, মুহূর্তেই মাটি হয়ে যায়; অনাহুত সিদ্ধান্তে। তরুণ কবির অহমে এক তীব্র আঘাত। অথচ বহু প্রতীক্ষার পর এই দিন। চিঠিপত্রে যত মুগ্ধতাই হোক, সামনে দাঁড়িয়ে স্বীকারোক্তি দিতে, প্যারি থেকে অনেক প্রস্তুতি নিয়ে ফেরা জিবরান বলেন,
অনেক স্বপ্ন নিয়ে প্যারি গিয়েছি। সেখানে গিয়ে তোমাকে ভালোবেসেছি। এত সহজ সারল্যে, সততায় প্রেমে পড়েছি তোমার। আমি তো এক বালক ছিলাম, যে তোমার হাত থেকে শুধু নিয়ে গেছি। তোমার হাতেই সমর্পন করতে চাই নিজেকে। তুমি আমার সঙ্গে কথা বলেছ উষ্ণতা নিয়ে। প্যারির পুরো সময়টা তোমার কথার উষ্ণতা অনুভব করেছি। বোস্টনে ফিরেও দেখি তুমি তেমনই মিষ্টি, দয়ালু, আত্মিক রয়ে গেছ।অথচ এতদিন পর বিয়ের কথা বলামাত্র আঘাত দিতে শুরু করেছ।
বিয়ে নিয়ে অনমনীয় অবস্থানে মেরি। জীবনের পুরোটা জুড়ে স্কুল, ছাত্রীরা। একবছর আগেও একজনের বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। ৩৪ বছরের মেরির সামনে ২৪ বছরের বিব্রত জিবরান। এই প্রত্যাখ্যান বড় বেশি শূন্যতা তৈরি করে। পরদিন জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বদলে যায় সিদ্ধান্ত। অপ্রস্তুত বন্ধুকে আকস্মিকভাবে হাঁ বলেন মেরি। আহত তরুণের মনে শুশ্রূষা এনে দেয় এই ঘোষণা। এরপর মাসের পর মাস আলোচনা, বৈঠক। কথার দীর্ঘসূত্রিতার পরে স্থির হয়; যতদিন জিবরানের মনে না হবে যে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন; ততদিন পর্যন্ত স্থগিত থাকবে বিয়ে। এমন দিন কখনও আসেনি। বয়সের অজুহাত সরিয়ে বিয়ের সম্মতির পর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবেছেন। ভাবনায় প্রাধান্য পেয়েছে জিবরানের ভবিষ্যৎ। শেষ পর্যন্ত মনে হয় যৌথ জীবনে হারিয়ে যাবে সম্পর্কের সৌন্দর্য। দুর্বল বিয়ের জন্য ভালো বন্ধুত্বের বিসর্জন থেকে সরে আসেন। মন থেকে ঝেড়ে ফেলেন জিবরানের স্ত্রী হওয়ার ভাবনা।
অথচ ডিসেম্বর থেকে বিয়ের কথা ভেবেছেন। সবকিছু মনে হয়েছে অস্পষ্ট, কঠিন। জিবরানের জন্য তার আবেগ ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে। মার্চে এসে মনে হয় বিয়ে টিকিয়ে রাখতে স্বামী বা প্রেমিকের বড় ধরনের শারীরিক সামর্থের প্রয়োজন। পরে অবশ্য সরে এসেছেন এই ধারণা থেকে। মনে হয় অসম বিয়ের শেষে শুধুই শূন্যতা, বৈপরীত্যের ফাঁদ। একসময় দেখা যাবে পর্বতের চুড়ায় দাঁড়িয়ে আছে জিবরান, মেরি নীচের সমতলে। মেরির মনে হয়, বিয়ে না করার সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছে জিবরান। জিবরানের মনে হয় মেরির দ্বিধা বিয়ের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছে।

“বয়স নিয়ে কহলীলের মাথাব্যাথা নেই। সে বলে- আমার কাছে ব্যতিক্রম ভালোবাসার খোঁজ পেয়েছে। আমি জানি নিজের সেরা কাজগুলো সে করতে পারবে। খুব দ্রুত নতুন আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠবে তার জীবন। আমার বিশ্বাস, কোথাও বেড়ে উঠছে তার ভালোবাসার মানুষ।”

আমি সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছি এজন্য যে তুমি আমাকে দেখতে পাওনি। বিশ্বাস করতে পারনি। তোমার সব আগ্রহ, মনোযোগ আমার কাজ নিয়ে। কিন্তু একজন মানুষের কাজই সেই মানুষটি নয়। প্রতিটি মানুষের আলাদা স্বাতন্ত্র্য আছে, যা তার বাস্তবতা। প্রকৃত আমির কাছ থেকে অনেকটা দূরে, দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থেকেছ তুমি। অথচ আমার কাছে আসার পথে তোমার জন্য কোনও দেয়াল তুলে রাখিনি।
শেষ পর্যন্ত মেনে নেন বাস্তবতা। মেরি তাকে বলেন, পুরো জীবন সামনে পড়ে আছে। কোথাও না কোথাও বেড়ে উঠছে তার ভালোবাসার মানুষ। যে হবে তার নিজের নারী। মেরিকে বিয়ে করলে কখনও তার দেখা পাবে না। মেরির চোখের জল মুছে দিয়ে জিবরান বলেন, তাকে নতুন এক হৃদয় উপহার দিয়েছে সে। ধীরে ধীরে বিয়ে নিয়ে দ্বিধার সংকট কাটিয়ে ওঠেন মেরি।
কহলীলকে নিজের করে পেতে চাই না। এ নিয়ে সৃষ্টিকর্তার ইঙ্গিত পেয়েছি। মনস্থিরও করেছি। একসময় ওর স্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাকে স্বীকার করেছি। মানসিক প্রস্তুতিও নিয়েছি। যদিও মনের ভেতরে কান্না গুমরে উঠেছে। এই কান্না ভবিষ্যতের আনন্দের জন্য। আমার বয়স বিয়ে ভণ্ডুল করার জন্য যথেষ্ট। বয়স নিয়ে কহলীলের মাথাব্যাথা নেই। সে বলে- আমার কাছে ব্যতিক্রম ভালোবাসার খোঁজ পেয়েছে। আমি জানি নিজের সেরা কাজগুলো সে করতে পারবে। খুব দ্রুত নতুন আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠবে তার জীবন। আমার বিশ্বাস, কোথাও বেড়ে উঠছে তার ভালোবাসার মানুষ।
এই প্রত্যাখ্যান পাল্টে দেয় অনেক কিছু। মেরির সিদ্ধান্ত নীরবে মেনে নিলেও অভিমান থেকে যায় মনে। বিয়ের প্রতি তৈরি হয় অনীহা। আজীবন থেকে গেছেন অবিবাহিত। অভিমানে সেদিনের পর দেখা করা কমিয়ে দেন। মনে হয়, মেরি এমন কিছু বলে বসতে পারে, যার ফলে অর্ধমৃত মনে হবে নিজেকে। মাসে এক বা দুবার দেখা হয়। নিজেকে মনে হয় অর্বাচীন। যেন এই শহরে তার কোনও ভবিষৎ নেই। বোস্টনের একঘেয়ে জীবনে ক্লান্ত জিবরান। তার অপছন্দ শহরের মানুষের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব। চেনা বলয়ের অভিবাসীরা তার চেয়ে তার প্রাচ্যনীতি নিয়ে আগ্রহী। তাদের এড়িয়ে চলতে চেয়েছেন জিবরান। পরিচিতি সিরীয়দের ওমর খৈয়ামের সংস্কৃতি-প্রীতিকেও তার মনে হয়েছে ফাঁদ। তারা তার গায়ে সিরীয় মেধাবীর যে লেবেল সেঁটে দিয়েছে তাতেও সে বিরক্ত। বহুজাতিক মানুষের শহর নিউ ইয়র্কে গিয়ে বোস্টনের বন্ধ্যাত্ব থেকে বাঁচতে চেয়েছেন। এ শহরে মেরিই প্রধান আশ্রয়। তার সঙ্গে দূরত্ব বোস্টনে থাকা অর্থহীন করো তোলে। মেরির কাছ থেকে আসা আকস্মিক হোঁচট সামলে নিতে মনকে বোঝান :
যদি আমি সূর্যের আলো, তার উষ্ণতাকে গ্রহণ করি, তাহলে অবশ্যই ঝড় ও বজ্রপাতকেও মেনে নিতে হবে।
মেরির সহৃদয়তা, উদারতার সঙ্গে অভ্যস্ত জিবরান চেষ্টা করেন তার কাঠিন্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে। এক পর্যায়ে মনে হয় এই নারীর সঙ্গে প্রেম অসম্ভব। মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে টের পান নিজের ভেতর কিছু একটা মরে যাচ্ছে। এই মৃত্যু ঠেকাতে মেরির কাছ থেকে, তার শহরের কাছ থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
কাজের দিক থেকে সেটা ছিল একটা মৃত বছর। তাই বোস্টন ছেড়ে নিউ ইয়র্কে চলে আসি।
বোস্টন ছেড়ে যাওয়ার সময় কানে আসে বোন মারিয়ানার কান্নার স্বর। চোখে কান্নার দৃশ্য। মনে মেরির ভালোবাসা, আশীর্বাদ। পকেটে মেরির দেওয়া টাকা। সু্টক্যেসে নতুন লেখা আরবি উপন্যাস ‘ব্রোকেন উইংস’-এর পাণ্ডুলিপি। আরও একটি বই। ফ্রেডরিখ নীৎসের ‘দাস স্পেক জারাথ্রাস্টারে’র ইংরেজি অনুবাদ।
শহর ছাড়ার সিদ্ধান্তকেও সমর্থন করেছেন মেরি। নিউ ইয়র্কে বাড়ি খোঁজা, সেখানে থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছেন। নিউ ইয়র্ক গিয়ে প্রথমে উঠেছেন মেরির বন্ধু শার্লটের গ্রিনিচ ভিলেজ এপার্টমেন্টে। শার্লট তখন শহরের বাইরে। শার্লট ফিরলে কাছাকাছি এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছেন। অনেকদিন সকালের নাশতা করেছেন শার্লটের বাসায়। প্রথম দিকে মাসে মাসে টাকা পাঠালেও কয়েক মাস পর এককালীন পাঁচ হাজার ডলার পাঠিয়েছেন যেন অনেক দিন চলে। তবে কখনও কখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন। জিবরান তাকে কতটা মন থেকে অনুভব করে তা নিয়ে দ্বিধান্বিত। একবার মনে হয় টাকার কারণেই টিকে আছে এই সম্পর্ক। এমন মনোভাবে আহত জিবরান জানান :
আমাকে টাকা দেওয়ার সময় তোমার মনে কি কাজ করেছে? আমার জানা দরকার নিজের অবস্থান। আমাকে বলো যেন ভুল না করি। শুরু থেকে তোমার দেওয়া টাকা কি উপহার ছিল? নাকি ধার? নাকি যোগাযোগের মাধ্যম? আমি অনিশ্চয়তায় থাকতে চাই না। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। তুমি বিপরীত কথা বলছ। সত্যি মানে বুঝতে পারছি না। অনেকদিন ধরে এই সমস্যায় ভুগছি।

“আমার হৃদয় আজ পরিপূর্ণ। একটা বিস্মিত শান্ত, ঊষ্ণ সুখ। গতরাতে যিশুকে স্বপ্ন দেখেছি। ধূসর বাদামি পোশাক। বড় কালো শান্ত চোখ জ্বলজ্বল করছে। সেই একই বার্ধক্যের দীপ্তি। ও মেরি! মেরি! কেন তাকে রোজ রাতে স্বপ্ন দেখি না!”

মেরি জানান, প্রাথমিকভাবে টাকাটা উপহারই ছিল। কিন্তু যেহেতু জিবরানের আত্মসম্মানে আঘাত আসবে তাই তিনি ছবির বিনিময়ে টাকা পরিশোধ করতে পারেন। টাকার প্রসঙ্গ তোলার জন্য ক্ষমা চান। বলেন, তাদের মাঝে টাকার প্রসঙ্গ আসা ঠিক হয়নি। বিয়ে সংক্রান্ত সিদ্ধান্তহীনতায় যে মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়েছে তাও জানান। জিবরান বলেন, আরবিতে লেখা সাহিত্য আর ছবিগুলো হবে মেরির জন্য উপহার। আপাতত এভাবেই মিটমাট হয় কলহের। যখনই সময় পেয়েছেন নিউ ইয়র্কে এসেছেন মেরি। যোগাযোগ হয়েছে চিঠিতে। এসব চিঠিতে মমতা, মুগ্ধতা, যাপিত জীবনের নানা প্রসঙ্গ। জীবনের খুটিনাটি ভাগ করে নিয়েছেন।
আমার হৃদয় আজ পরিপূর্ণ। একটা বিস্মিত শান্ত, ঊষ্ণ সুখ। গতরাতে যিশুকে স্বপ্ন দেখেছি। ধূসর বাদামি পোশাক। বড় কালো শান্ত চোখ জ্বলজ্বল করছে। সেই একই বার্ধক্যের দীপ্তি। ও মেরি! মেরি! কেন তাকে রোজ রাতে স্বপ্ন দেখি না! তার মতো শান্তভাবে কেন জীবনকে নিতে পারি না? এই পৃথিবীর আর কাউকে তার মতো এত প্রিয়, এত সাধারণ, উষ্ণ মনে হয় না।
মেরিও বরাবরের মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। অসুস্থতায় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেছেন, হাওয়া বদল করতে ঘুরতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ভালো কোনও বই প্রকাশিত হলে পাঠিয়েছেন। এই প্রেমই বদলে দিয়েছে জীবনের গতিপথ :
মনে করো না তুমি ঠিক করে নেবে প্রেমের গতিপথ
কারণ উপযুক্ত মনে করে যদি,
তোমাকেই পথ দেখাবে প্রেম।
জিবরানের জীবনে মেরির প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে রবিন ওয়াটারফিল্ড তার ‘প্রফেট দি লাইফ অ্যান্ড টাইমস অব কহলীল জিরবান’ গ্রন্থে লিখেছেন :
প্রথম দিকে জিবরানের মনে শুধুই মেরির উপস্থিতি। মেরির পরামর্শ, সাহায্য, অনুপ্রেরণায় আপ্লুত কবি। মেরির অনুপস্থিতিতেও তার কথা ভেবেছেন। জিবরানের দাবি তাদের যোগাযোগ টেলিপেথিক। তার ইংরেজির মানোন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন মেরি। ইংরেজিতে লিখতে উৎসাহ দিয়েছেন। এই ভূমিকা পরেও অব্যাহত থাকে। মেরি হয়ে ওঠেন তার ইংরেজি লেখার সম্পাদক। মেরির মনঃপুত না হলে, কোনও লেখা পত্রিকায় পাঠতেন না। বইও করতেন না। কখনও কখনও জিবরান বলেছেন আর মেরি ইরেজিতে লিখে গেছেন। পাণ্ডুলিপি কপি করে দিয়েছেন। মেরি নিউ ইয়র্কে এলে তাকে লেখা পড়ে শোনাতেন জিবরান। ভালোভাবে পড়ার জন্য সেসব লেখা সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন মেরি। সম্পাদনা করে মন্তব্যসহ ডাকে ফেরত পাঠাতেন। বিয়ের পরও সম্পাদনা চালিয়ে গেছেন। তবে লুকিয়ে। স্ত্রীর সঙ্গে সাবেক প্রেমিকের যোগাযোগে অসন্তুষ্ট ফ্লোরেন্স মিনিস।
সবকিছুর পরও কিন্তু রয়ে গেছে এই সম্পর্ক, যে প্রেম ছিল নিষ্কাম। পুরোপুরি আত্মিক। প্রফেট প্রকাশের পর আসে প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি। নিউ ইয়র্কের আরবিভাষী ও ইংরেজি সাহিত্যের আসরে সমাদর বাড়ে। তখনও মেরির ওপর নির্ভরতা কমেনি। প্রথম থেকে শুরু করে শেষ চিঠি পর্যন্ত মেরির প্রতি যে ভালোবাসা, পারস্পরিক সংযোগের দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে তা এক বিরল উদাহরণ হয়ে আছে।
দুজনেই চেষ্টা করছেন নিজেদের অস্তিত্বের সীমাকে স্পর্শ করতে। অতীতের মহৎ কবিরা সব সময় জীবনের কাছে আত্মসমর্পন করেছেন। তারা কোনও কিছু প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেননি। কোনও কিছুর জট খোলা বা গোপনীয়তা ভাঙতে চাননি। নিজের আত্মাকে আবেগের কাছে সমর্পিত হতে দিয়েছেন। মানুষ সবসময় নিরাপত্তা চায়। কখনও কখনও পেয়েও যায়। কিন্তু নিরাপত্তারও একটা সীমা আছে। জীবনের কোনও সীমা পরিসীমা নেই। আমার কাছে তোমার চিঠি জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি। যারা কবিতা লেখে শুধু তারাই কবি নয়। কবি হচ্ছে তারা, যাদের মন ভালোবাসার বিশুদ্ধতায় পরিপূর্ণ।

“জিবরানের কথা বলার ধরনে জলে ভরে ওঠে মেরির চোখ। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, সবার সামনে তাদের সম্পর্ক নিয়ে পরিচিত হওয়ার অধিকার তার রয়েছে। তিনি চান এই সম্পর্কের স্বীকৃতি, লোকে জানুক জিবরান তাকে ভালোবাসে।”

দুজনের কথোপকথন, মেরির ডায়েরিতে এই সম্পর্কের বিস্তারিত রয়েছে। তাদের মৃত্যুর পর এসব প্রকাশিত না হলে অজানা থেকে যেত এই যৌথতার প্রকৃত রসায়ন। মেরি লিখেছেন, সারাজীবন তিনি চেয়েছেন জিবরানের প্রেমিকার স্বীকৃতি। চেয়েছেন অন্তত কাছের মানুষেরা জানুক মেরিই তার জীবনের নারী। তবে এ নিয়ে সংকোচ দ্বিধায় ভুগেছেন জিবরান। মেরিকে প্রেমিকা হিসেবে কারো সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেননি। এ নিয়ে মেরির আক্ষেপ অজানা ছিল না তার। কোনও এক দুর্বল মুহূর্তে মেরি বলেন, মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ নিয়ে লেবাননে যাবেন। জিবরানের নিজের মানুষ হিসেবে। জিবরান ক্ষেপে গিয়ে বলেন খুব শিগগীরই মারা যাচ্ছেন না। বলেন আমার মৃত্যুর পর দেহ নিয়ে কেন মাথা ঘামাচ্ছ? কেন? জিবরানের কথা বলার ধরনে জলে ভরে ওঠে মেরির চোখ। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, সবার সামনে তাদের সম্পর্ক নিয়ে পরিচিত হওয়ার অধিকার তার রয়েছে। তিনি চান এই সম্পর্কের স্বীকৃতি, লোকে জানুক জিবরান তাকে ভালোবাসে। কারণ এটা খুব সম্মানের। জিবরান বলেন, এই বন্ধুত্ব গোপন করার ইচ্ছে তার নেই। কিন্তু তিনি চান না লোকে একে কত্রী আর তার প্রেমিকের ভালোবাসা হিসেবে জানুক। অনেকের ধারণা এক বয়স্ক নারী তাকে টাকা দিয়ে নিজের জন্য রেখেছেন। পুরুষ যেমন রক্ষিতা রাখে, তেমনটা তিনি মেরির কাছে হতে চান না। মেরি কাঁদতেই থাকেন। মনে হয় এই বন্ধুত্ব টাকায় কেনা। সেদিনের পর আরও কিছুদিন কাটে ভুল বোঝাবুঝির ফাঁদে। জার্নালে মেরি লেখেন :
আহা বিয়ে! এটা একটা বিস্ময় যে আমরা এখনও বন্ধু।
জিবরান জানান, মেরি তাকে যত আঘাত দিয়েছে এত আঘাত আর কেউ করেনি। এসব তিক্ততার পর সম্পর্কে কিছুটা পরিবর্তন আসে। বিশ্বস্ত পরামর্শক থেকে মেরি হয়ে ওঠেন লেখার সম্পাদক, সাহায্যকারী। এই প্রথম জিবরান ইংরেজি লেখা মেরিকে পাঠাতে শুরু করেন। তবে জীবদ্দশায় কাছের মানুষেরা জানতেই পারেননি এই সম্পর্কের কথা। এমনকি শেষ ছয় বছর কাছাকাছি থাকা, সেক্রটারি বারবারা ইয়ংকেও কখনও মেরির কথা বলেননি। জিবরানের মৃত্যুর পর মেরিকে দেখে বিস্মিত বারবারা। হাসপাতালে ও বাসায় তার উপস্থিতিতে বিরক্ত বারবারা মেরিকে জিবরানের কাছের মানুষ হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত জিবরানকে নিয়ে লেখা‌ ‌‘দি মেন ফ্রম লেবানন’ গ্রন্থে তিনি মেরিকে জিবরানের জীবনের এক অনাহুত ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেন। মেরির নাম উল্লেখ না করে জিবরানের মৃতদেহের সঙ্গে তার নিউ ইয়র্ক থেকে লেবানন যাওয়া নিয়ে বিরক্ত বারবারা লিখেছেন :
সেসব মেয়ের বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত যারা হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসে। বিখ্যাত মহান মানুষের মৃতু্র পর বলে- সেই মানুষটা তার নিজের মানুষ ছিল।
এই ধাঁধা জিবরানের তৈরি। মেরি ও জিবরান সম্পর্কে অন্ধকারে ছিলেন বারবারা। এমনকি জিবরানের স্টুডিওতে মেরির চিঠি আবিষ্কৃত হওয়ার পর সে এগুলো পুড়িয়ে ফেলার পরামর্শ দেন। বারবারার পরামর্শ শুনলে ধ্বংস হয়ে যেত এই সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। মেরি এসব চিঠি ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কেরোলিনা লাইব্রেরিতে জমা রাখেন। তার মৃত্যুর পর ‘বিলাভেড প্রফেট; লাভ লেটার্স অব কহলীল জিবরান অ্যান্ড মেরি হাসকেল’ প্রকাশিত হলে আবিষ্কৃত হয় আড়ালের সত্য।

“জিবরানের মৃত্যু, লেখালেখিসহ অন্য সব বিষয়ের বর্ণনায় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে মিখাইল যতটা স্পষ্ট, প্রেম নিয়ে ততটাই ছিলেন অন্ধকারে। জিবরান নিজেই এই অন্ধকারের নির্মাতা।”

কবিবন্ধু মিখাইল নাইমিও ধরতে পারেননি এই সম্পর্কের ধারাপাত। অথচ তিনি জিবরানের আত্মার সঙ্গী, ভাই। মিখাইল ধরেই নিয়েছেন বন্ধুর সব গোপন সত্য তার জানা। জিবরানের মৃত্যুর পর মনে হয় এসব সত্যসহ সমাহিত হয়েছে সে, তিনি যার একমাত্র সাক্ষী। শেষ যোল বছর কাছাকাছি থাকা এই স্বদেশী বন্ধুকেও পুরোপুরি ধারণা দেননি মেরি সম্পর্কে। জিরবানের জীবনীতে এই প্রেম সম্পর্কে মিখাইল যা লেখেন তা আংশিক, খণ্ডিত, বিদ্বেষপ্রসূত। তার কাছে মেরি প্রধানত পৃষ্ঠপোষক। বন্ধুর জীবনের অপরিহার্য এই নারীর অবদানকে স্বীকার করলেও দুজনের আত্মিক সম্পর্কের আভাস নেই। ক্ষুব্ধ নাইমি বলেছেন বিয়ে পাল্টে দিতে পারত বন্ধুর জীবন। মেরির প্রতি বন্ধুর নির্ভরতা, তাদের নৈকট্যের গভীরতার কোনও উল্লেখ নেই লেখা গ্রন্থে। অথচ এই বই হতে পারত দুজনের সম্পর্কের নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র। কারণ নানা প্রসঙ্গে তার সঙ্গে মন খুলে কথা বলেছেন জিবরান। রাতের পর রাত জিবরানের স্টুডিওতে কাটিয়েছেন : গল্পে, আড্ডায়, স্মৃতিচারণে।
জিবরানের মৃত্যু, লেখালেখিসহ অন্য সব বিষয়ের বর্ণনায় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে মিখাইল যতটা স্পষ্ট, প্রেম নিয়ে ততটাই ছিলেন অন্ধকারে। জিবরান নিজেই এই অন্ধকারের নির্মাতা।
মিখাইলের গ্রন্থে রয়েছে মিশেলিনের সঙ্গে প্যারিতে হঠাৎ দেখা হওয়ার অধ্যায়, তাদের কথোপকথন। সেখানে জিবরান মিশেলিনকে বলেছেন আত্মীয়-স্বজনদের খরচে প্যারিতে আছেন। তাকেও জানতে দেননি প্যারিবাসের আর্থিক সূত্র। মিখাইল নাইমির লেখা জীবনী প্রকাশিত হয় জিবরানের মৃত্যুর তিন বছর পর, ১৯৩৪ সালে। তাদের চিঠিপত্র প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে। সব তথ্য উপাত্ত পেলেও ৯৯ বছর বেঁচে থাকা মিখাইল পরের সংস্করণে কোনও কিছু যোগ করেননি। এমনকি আরবি থেকে ইংরেজি অনুবাদের সময়ও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে সব। মিখাইল মারা গেছেন ১৯৮৮ সালে। অদ্ভুত এই নীরবতা।
যার সঙ্গে পরিচয়কে নিয়তি বলে মেনেছেন, যাকে মনে করেছেন আত্মার সঙ্গী, সেরা আশীর্বাদ, তাকে নিয়ে নীরবতা বিস্ময়কর। সমালোচনার ভয়ে প্রকাশ্যে প্রেমের স্বীকারোক্তি দেননি। হীনন্মন্যতায় ভুগেছেন। এই সম্পর্ক নিয়ে লিখতে গিয়ে জীবনীকাররা উদ্ধৃত করেছেন মেরির লেখা থেকে। এই সম্পর্কে রহস্য দেখেছেন কেউ কেউ। মেরির প্রতি জিবরানের মনোভাব নিয়ে দ্বিধান্বিত কোনও কোনও গবেষক। কারো মতে জিবরান গভীরভাবে ভালোবেসেছেন মেরিকে। খুব অল্প মানুষই এর মর্ম বুঝতে সক্ষম। দুজনের মাঝে ছিল গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক, যেখানে যৌনতা অনুপস্থিত। জিবরান বলেছেন, দৈহিক আকর্ষণ একসময় ফুরিয়ে যায়, কিন্তু মেরির প্রতি আকর্ষণ কখনও ফুরাবে না। পরিণত বয়সে জিবরান এই সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন এই যৌথতা যৌনসম্পর্কের চেয়েও গভীর। বিয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। জিবরানের মতে তাদের পুরো সম্পর্কটাই চলমান যৌনতা। মেরিও কথা বলেছেন একই সূরে।

“জিবরান মনে করতেন সৌন্দর্য মানে শুধু চেহারা নয়, সৌন্দর্য হলো আত্মার আলো। একরাতে জিবরান মেরিকে বলেন, অনেকটা শুকিয়ে গেছে সে। স্বাস্থ্যের স্বাভাবিকতা প্রমাণের জন্য পোশাক খুলে নগ্ন হয়ে সামনে দাঁড়ান মেরি। মেরির বুকে চুমু খান জিবরান। ব্যস। এই পর্যন্তই।”

কহলীল আমার এত কাছাকাছি এসেছে! যৌনতার সম্পর্ক ছাড়াই সে প্রত্যাশিত আদর, ভালোবাসার আনন্দ দিয়েছে। এ এক নতুন পরিপূর্ণতার স্পর্শ। সে এমনভাবে আমাকে চুমু খেয়েছে যেন এক স্বপ্নের সজীবতা। যেন ঈশ্বর কোনও শিশুর হাতে চুমু খাচ্ছেন।
জিবরান মনে করতেন সৌন্দর্য মানে শুধু চেহারা নয়, সৌন্দর্য হলো আত্মার আলো। একরাতে জিবরান মেরিকে বলেন, অনেকটা শুকিয়ে গেছে সে। স্বাস্থ্যের স্বাভাবিকতা প্রমাণের জন্য পোশাক খুলে নগ্ন হয়ে সামনে দাঁড়ান মেরি। মেরির বুকে চুমু খান জিবরান। ব্যস। এই পর্যন্তই। মেরি আবার পোশাক পরে নেন। মেনে নেন দূরত্বের স্থিতি। মেরির ডায়েরি থেকে এই অংশটুকু উদ্ধৃত করে রবিন ওয়াটারফিল্ড আফসোস করে ‘বেচারি’ বলে মেরির জন্য সহানূভূতি জানান। জিবরানকে তিনি বলেছেন স্বার্থপর। রবিন ওয়াটারফিল্ডের দাবি, জোসেফিনের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন জিবরান প্রথম তারুণ্যের দিনে, মিশেলের সঙ্গে যখন পরিচয়; বোদলেয়ারের ‘ফ্লর দু মল’ পড়ে প্রভাবিত তখন। সমালোচকদের চোখে এসব অশ্লীল প্রেমের কবিতা আর মিশেলিনের অবস্থান একবিন্দুতে।
একবার মেরি জিবরানকে জিজ্ঞেস করেন, একজন পুরুষ বা নারী একসঙ্গে সাতজনের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক রাখতে পারে কিনা। জিবরান বলেন, সম্মতি থাকলে সাতজনের সঙ্গেই যৌনসম্পর্ক হতে পারে। এমন মনোভাবকে বহুগামিতার সংকেত বলে ধরে নিয়েছেন সমালোচকরা। মিখাইল নাইমি জিবরানের জীবনী ছাড়াও প্রফেট নিয়ে লিখেছেন ‌‘আ স্ট্রেঞ্জ লিটল বুক’। নাইমির স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, মেরির সঙ্গে বন্ধুতার আগে ও পরে অনেক নারী এসেছে তার জীবনে। মেরিও তা জানতেন। জিবরান তাকে বলেছেন এসব সম্পর্ক যৌনতার নয়। যেমন মিশরীয় কবি, সাংবাদিক মে জিয়াদে তাদেরই একজন। ১৯১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া তাদের পত্রালাপ পরিণত হয় প্রেমে। দু-দেশে থাকায় কখনও দেখা হয়নি। জিবরানের মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত থাকে যোগাযোগ। শুরুতে এই সম্পর্কের কথাও মেরিকে জানতে দেননি। অনেক বছর পর বলেছেন মে তার বন্ধু, কবিতার অনুরাগী।
বিয়ের সিদ্ধান্তে প্রত্যাখ্যাত হয়ে; বহু বছর আগে যেভাবে অভিমানে মেরির শহর থেকে দূরে সরে গেছেন জিবরান, মেরিও অসম বিয়ের ভার কাঁধে নিয়ে চলে যান শশুরবাড়িতে, দূরশহর সাভানায়। মেরির বিয়ে জিবরানের কাছ থেকে বাহ্যিক দূরত্ব সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। এ এক ধরনের প্রতিশোধ, নিজের প্রতি। একবার নিউ ইয়র্কে স্টুডিওতে এসে দেখেন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত জিবরান। ঘণ্টা পরিয়ে গেলেও টেরই পাননি অপেক্ষমান মেরির উপস্থিতি। সেদিন মনে হয় জিবরানের জীবনে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এর মাঝে দূর সম্পর্কের আত্মীয় বিপত্নীক জেকব ফ্লোরেন্সমিনিসের কাছ থেকে মেরির কাছে আসে বিয়ের প্রস্তাব। জিবরানের কাছে পরামর্শ চাইলে মনের কথা শুনতে বলেন। পারিবারিক ওঠা-বসার সুবাদে মিনিস জানতে চান মেরি তাকে ভালোবাসে কিনা। জিবরানের কানে একথা তুললে বলেন, পৃথিবীর সব ভালোবাসাই সুন্দর। ১৯২৬ সালে মিনিসকে বিয়ে করেন মেরি।

“শুধু টাকার কথা বলছি না। বরং যেভাবে তুমি তা দিয়েছ, সঙ্গে ভালোবাসা, বিশ্বাস, প্রজ্ঞা। বারবার মনে হয়েছে কেউ একজন আছে যে আমার পরিচর্যা করে। মাঝে মাঝে ভাবি, পৃথিবীর ইতিহাসে আর কেউ অন্য কারো জন্য এতটা করেছে কিনা, যতটা আমার জন্য তুমি করেছ।”

যে মেরি ৩৭ বছর বয়সকে বিয়ের জন্য অনুপযুক্ত ভেবেছেন, বয়স বেশি বলে পছন্দের পুরুষকে বিয়েতে দ্বিধা করেছেন, সেই মেরি ৪৯ বছর বয়সে ৭৬ বছরের বৃদ্ধ মিনিসকে বিয়ে করতে রাজি হন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গ ধনী ব্যবসায়ীর সঙ্গীর প্রয়োজন হয়। সারাজীবন অবিবাহিত থাকা মেরি পিতার বয়সী পুরুষের দ্বিতীয় স্ত্রী হতে মনকে প্রস্তুত করেন। নিঃসন্দেহে এ এক বেদনাহত সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তে তাকে প্ররোচিত করেন জিবরান। অথচ মাননিকভাবে থাকতে চেয়েছেন তার সঙ্গেই। সারা জীবন একলা কাটানো জিবরান এখন এসব চিন্তার ঊর্ধ্বে। লেখা ও আঁকা ছাড়া অন্য কোনও জগতে প্রবেশ তার পক্ষে অসম্ভব। শিল্প ছাড়া আর কোনও বন্ধন নেই। বাইশ বছর বয়সে যে আবেগ থেকে মেরির স্বামী হতে চেয়েছেন, তা এখন অনুপস্থিত। জীবন এখন অনেকটাই স্থিতিশীল। তবে এখনও মেরির অবদানকে স্বীকার করেন জিবরান।
আক্ষরিক অর্থেই তুমি আমাকে নতুন জীবন দান করেছ। তুমি আমাকে জীবিত না রাখলে বেঁচে থাকা অসম্ভব হতো। মানুষ প্রকৃতপক্ষেই এসবের অভাবে মারা যায়। তোমার মতো মানুষের অভাবে। শুধু টাকার কথা বলছি না। বরং যেভাবে তুমি তা দিয়েছ, সঙ্গে ভালোবাসা, বিশ্বাস, প্রজ্ঞা। বারবার মনে হয়েছে কেউ একজন আছে যে আমার পরিচর্যা করে। মাঝে মাঝে ভাবি, পৃথিবীর ইতিহাসে আর কেউ অন্য কারো জন্য এতটা করেছে কিনা, যতটা আমার জন্য তুমি করেছ।
তবে এখন বিয়ের বিপক্ষে তার অবস্থান। বিবাহিত দম্পতিদেরও দূরত্বের পরামর্শ তার। তার মতে, এভাবেই অটুক থাকবে সম্পর্কের সৌন্দর্য। মেরির সঙ্গে সম্পর্কের স্থিতি দিয়েই বিচার করেছেন নারী পুরুষের সম্পর্ক। এই নৈকট্য, দূরত্বের ছায়া পড়েছে প্রফেটে বিয়ে ও প্রেম নিয়ে লেখায় :
হৃদয় সমর্পন কর
পরস্পরের মুঠোয় বন্দি থেকো না
শুধুমাত্র জীবনের হাত ধরে থাক
দুজনে পাশাপাশি দাঁড়াও; তবে খুব কাছাকাছি নয়
একবার মেরিকে বলেন, অবিবাহিত মেয়েরাই আকর্ষণীয়। মেরি কারণ জানতে চাইলে বলেন, পরিপূর্ণ জীবন নিয়ে বেড়ে ওঠা একটা মেয়ে পঁচিশ বছরে এসে একটা ছেলেকে বিয়ে করে। যে প্রাণোচ্ছল ও আকর্ষণীয়। পাঁচ বছর পর দেখা যাবে মেয়েটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। শারীরিরীকভাবে নয়, মানসিকভাবে। তখন তার মধ্যে প্রাণের ঘাটতি দেখা দেয় কেন? এর জন্য বিয়েই দায়ী।
১৯২৩ সালের ২৭ মার্চ লেখা চিঠিতে মেরিকে বলেন :
বিয়ে একজনের ওপর অন্যজনের কোনও অধিকার তৈরি করে না। যদি না তা একজন অন্যজনকে দেয়। এমনকি বিয়ে স্বাধীনতাও দেয় না; যদি না তা একজন তা অন্যজনকে দেয়। বুদ্ধিমান মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র হল বন্ধুত্ব। এর মাধ্যমে পরস্পরের চিন্তা, স্বপ্ন, ধারণাকে বুঝে নেওয়া যায়। প্রকৃত কাজের জায়গা ভাগাভাগি করার ক্ষেত্রে বন্ধুত্বই বিয়ের চেয়ে কার্যকর সম্পর্ক।
তবে এখনও মেরি জিবরানের জীবনের সুখ-দুঃখের ভাগিদার। আগের মতোই উদ্বিগ্ন ভালো-মন্দে। এখনও লেখায় মেরির পরামর্শ চাই। মিনিস ঘুমিয়ে পড়ার পর রাত জেগে মেরি পড়েন জিবরানের পাণ্ডুলিপি। মিনিস যেন আহত না হয় সেজন্য চিঠিতে অনেক সংযত, কৌশলী জিবরান। আগে ‘বিলাভেড মেরি’ বলে চিঠি শুরু করতেন। কিন্তু মেরির বিয়ের পর সম্বোধন পাল্টে ফেলেন। এখন শুরুতে লেখেন ‘প্রিয় মেরি’। জিবরানের কাছে মেরি এখনও প্রিয় মানুষ। তার দাবি, বিয়ের কারণে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটেনি।
তুমিই আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। এই সম্পর্ক, এই যৌথতা আত্মিক। তুমি যদি সাতবার, সাতজনকেও বিয়ে কর, তাহলেও তোমার প্রতি এই অনুভূতি বদলে যাবে না।
মেরির অনুভুতিও থেকে গেছে অপরিবর্তিত। যেভাবে পাশে থেকেছেন জীবিত জিবরানের, মৃত বন্ধুর ইচ্ছে পুরণেও এগিয়ে এসেছেন। মৃত্যুর খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাভানা থেকে ছুটে এসেছেন নিউ ইয়র্কে। আটশ মাইলের দূরত্ব যেন আট হাজার মাইলের মতো দীর্ঘ। চৌদ্দ ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে বিধ্বস্ত মেরি দেখেন জিবরানের মুখ। নিষ্প্রাণ। নিথর। হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ নিয়ে গেছেন বোস্টনে। শেষ যাত্রায়ও সঙ্গী হয়েছেন। বোস্টন থেকে লেবানন পর্যন্ত দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় প্রেমিকের মৃতদেহ নিয়ে বসে থাকা, শবযাত্রায় সঙ্গী হওয়া, তার নামে যাদুঘর প্রতিষ্ঠা করার প্রসঙ্গে কিছুই লিখে রাখেননি। জার্নাল শেষ হয়েছে জিবরানের মৃত্যুর খবরে। মৃত্যুর আগে জিবরান নিজের সব ছবি, ড্রইং উইল করে দিয়ে গেছেন মেরির নামে। রেখেছেন ২২ বছর আগের প্রতিশ্রুতির মর্যাদা। উইলে বলে গেছেন মৃত্যুর আগে তিনি পাগল হয়ে গেলেও এসব মেরির সম্পত্তি বলে বিবেচিত হবে। পাশাপাশি উইল করে গেছেন নিজের হৃদয়।
আমার মৃত্যুর সময় মেরি হাসকেল জীবিত থাকলে আমার হৃদয় দেহ থেকে তুলে যেন তার হাতে তুলে দেওয়া হয়। মৃতদেহ যেন পাঠিয়ে দেওয়া হয় জন্মগ্রাম বিসরিতে। সেখানে মার সেন্ট মিসায় সমাহিত হতে চাই আমি। মেরি যদি ততদিন জীবিত না থাকে তাহলে দেহ থেকে আমার হৃদয় তোলার দরকার নেই।

পূর্ববর্তী পর্ব ১

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%AD%E0%A7%80%E0%A6%A8-%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%BF-%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B8/