জাহিদ হায়দার >> কবিতাগুচ্ছ >> উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
277

কবিতাগুচ্ছ

কথা-পরিধির স্বপ্ন

শান্তিপাঠে কণ্ঠ ভেঙে যায়।

যদি সকাল না থাকে চেতনায়
সূর্যোদয়ে খুঁজেও পাবে না তাকে।

ভেঙেছি যুগল ছায়া উজান-গ্রহণে,
আমরা শুনিনি প্রকৃতির তিরস্কার।

আত্মতুষ্টে কতটা রৌদ্র তুমি আজ?
কবে যেন রাত্রি ধুয়েছিলে?

কথা-পরিধির স্বপ্ন তোতলায়।

১০.১০.২০১৯

নিঃসঙ্গ

কাঁদিবার সঙ্গী নাই, হাসিবারও।

প্রাচীন বাড়ির ছাদ। আসিল শ্রাবণ।

আনন্দ-অসুখে ভিজে
নিঃশ্বাস খুঁজিল কথা।

মান্য জটিলতা,
আমরা আঠারো তখন।

ধানখেত থেকে
দ্বিধাহীন সাফল্যে উড়ে
একদল সামাজিক চড়ুই
রাস্তা পার হতে গিয়ে
গতির চাকাতে ধাক্কা,
তিনজন সঙ্গীর হৃদয়
পালক রক্তমাংসকাদা।
ঠোঁটে শস্য লাল।

ছিল উড়ন্ত।
পেছনে তাকায় দু’একজন।
থাকে উড়ন্ত।

আমরা ছিলাম কারণে দাঁড়ানো,
চোখ কাঁদেনি তখন।

১০.০৬.২০২০

প্রশ্নমুখর, স্বপ্নবিধুর

কবিতা না পড়া মানুষরা কেন ভালো থাকে বেশি ?
যারা প্রশ্নপত্র ছাপায় তারা কী রকম স্বপ্ন দ্যাখে ?
একদল ভিখারির সাথে সুশীলসমাজ কি নিয়ে কথা বলছে ?
একজন যৌনকর্মীর কাছেই পড়া যেতে পারে মানুষের শ্রম-ইতিহাস।
পাখি বিক্রেতার সাথে ট্রাফিক হাসছে কেন ?
জেলরক্ষীর গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে ফাঁসীর কয়েদী
বলেছিল : ‘ আমি বাঁচতে চাই।’
দেবদূত ও শয়তান একই মঞ্চে গাইছে গান,
দুজনই দেবীর রাখাল।
জানি, বসন্তকাল বাগান থেকে শহরে আসতে পায় না ঋতুর ট্রেন।
আমরা সবাই প্রশ্নমুখর, স্বপ্নবিধুর, রাত্রিজাগা।

০৩.০৪.২০২০

আমার ছিন্নপত্র : ১

পদ্মার ঢেউগুলি হিতব্রত।
আঙুলের চিরুনিতে তরুণী নাড়ছে।
মুখের রূপছায়ারেখা পানির সহজ সারল্যে হাস্যময়।

দুই পা ডোবানো।
পায়ের নূপুর
স্রোতের আনন্দের সাথে কথা বলেই যাচ্ছে।

ঝুঁকে পড়া চুল ঢেউয়ে নৃত্যমান। সাঁতরাতে চায়।
বিকালের বিকাল হারানো চলাফেরা
আঁচ না-লাগা উপভোগের রৌদ্রে
আরও কিছুক্ষণ এই দিকে থাকবে।

ঢেউয়ের বুক থেকে উৎসারিত আলোর নৃত্য
মেয়েটির মুখে অপরূপের শিল্পকিরণ।

ছিপ ফেলে পাড়ের কিনারে এক বুড়ো
একশ বছরের ধৈর্য নিয়ে
ফাতনার ডুবে যাবার মুহূর্ত মাপছে।
অদূরে পানিকে থাপড়াতে থাপড়াতে
যাচ্ছে নৌকার ইঞ্জিন।
আরো দূরে একটি ব্রিজ পাবার জন্যে
রাত্রিদিন শত শত মানুষ
কর্মযজ্ঞের চুলোয় রান্না করছে স্বপ্ন।
কচুরিপানার উপর বসে নিঃসঙ্গ বক
যাচ্ছে সন্ধ্যার দার্শনিকতার দিকে।

ঘাটের উপরে একটি যুবক
হতে পারে মেয়েটির প্রেমিক।
জিন্সের ট্রাউজার পরা।
গায়ে লাল টি-শার্ট। পায়ে কেড্স।
ঠোঁটে মৃদু হাসি পড়ন্ত রৌদ্র নৃত্যমান।
স্মার্টফোনে মেয়েটির ছবি তুলছে।
ছবিতে
চুল। গ্রীবা। শ্যামলা পিঠ। লাল ওড়না।
নদীর দিকে নেমে যাওয়া ঘাট।
ওই পাড়। চরে গরুর পাল।
উড়ন্ত বালি। বেশ দূরে ধূসর গ্রাম।

দুজনের মাঝখানে
ঘাটের উপর ধাবমান ছায়া ফেলে
বাড়ি ফিরছে কয়টি শালিক।

২৬.১০.২০১৯

আমার ছিন্নপত্র : ২

সকালে পদ্মার চর জীবন্ত।
আগাছার পাতায় রৌদ্র দুলছে।
বইছে হালকা ঠান্ডা বাতাস।
বালির ধূসরতা নেই। সোনা রং।

রাখাল পালের ভেতর একটি মহিষের পিঠে চড়ে
নাকি কালো মেঘের দুলন্ত পিঠে চড়ে
মোবাইলে গান শুনছে।
আরামের বাতাসে দুলছে লালহলুদের চেক গামছা।
গায়ে নীল গেঞ্জি।
বুকের উপর ইংরেজিতে লেখা : আই লাভ ইউ।
বুধবারের হাট থেকে কেনা।
তার পরনে কালো গ্যাবাডিনের ট্রাউজার।

দড়মার বেড়া দেওয়া এনজিও’র স্কুলে
কিস্তি তোলার দিন।
লাল মোটরসাইকেলে
বালিতে চাকার আক্রোশি দাগ তুলে
যাচ্ছে একটি ব্যাংকের অফিসার।
খুব জরুরি মিটিং।
চারদিন হামিদ মাঝির খোঁজ নেই।
তার অনেক ঋণ।
তার কালো ছাগল নিয়ে গেল ব্যাংক।

চেনা মুখ, চেনা ঘর, চেনা ঘাস
হারাবার আর্তনাদে কাঁপছে বাতাস।
ব্যাংকের সমিতি আহত।
হামিদের ছোট মেয়ে
ছাগলটার পেছনে পেছনে
নদী পর্যন্ত দৌড়ায় আর কাঁদে।
##
তুমি এখানে আসলে চরের বালিতে হাঁটা যেত।
কাল পূর্ণিমা। নৌকায় ভ্রমণ হতো।
শাদাটে বালিতে শায়িত জোস্নার সমারোহে
ঢেউয়ের উপর চাঁদের ভাঙনে-গড়নে
তোমার চোখ বিস্ময়ে নতুন চেতনার আনন্দ পেত
অথবা আমাদের দূরত্বের কষ্ট।

২৮.১০.২০১৯