জিনি লকারবি >> কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে : জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা [পর্ব ৪] >> তর্জমা : আলম খোরশেদ

0
137

পর্ব ৪

পুনর্মিলন ও পূর্বাভাস

”হ্যাঁ, এটাই উপযুক্ত সময় তোমাদের দুজনের এখানে ফিরে আসার।” গত মাসগুলোতে আমি কতবার এসে দেখেছি তোমরা বাড়িতে নেই।”
রিড আমাদের বাড়ির চাবিহাতে মালুমঘাট থেকে ফিরে এসেছেন।
আমরা আমাদের বন্ধুদের ও গির্জার লোকজনের খোঁজখবরের জন্য তাঁকে চেপে ধরি। তিনি আমাদের অগুনতি প্রশ্নের জবাব দেন এবং নিজেও কিছু অভিজ্ঞতার গল্প করেন।
কোনো একবার ওষুধপত্র ও খাবারদাবার নিয়ে হাসপাতালে যাবার পথে রিড একটি সেনাদলকে অনুসরণ করেছিলেন। তিনি যখন পটিয়া শহরে ঢোকেন, তখন দেখেন সৈন্যরা রাস্তার দুধারের দোকানগুলোতে গুলি ছুঁড়ছে। একজন মেজর তাকে একটি ভীতিপ্রদ অগ্নিকুণ্ডের ঠিক উল্টোদিকে থামতে ইঙ্গিত করেন। আগুনের তীব্রতা দেখে এবং তার প্রচণ্ড উত্তাপ অনুভব করে, তিনি তাঁর গাড়ির পেট্রোল ট্যাংকের কিংবা আগুনলাগা দোকানের ভেতর থেকে বিস্ফোরণের ভয় পাচ্ছিলেন, তাই একটু সামনে এগিয়ে আগুনের হলকা থেকে গা বাঁচিয়ে দূরে দাঁড়ান।
অফিসার চিৎকার করতে করতে তাঁর দিকে ছুটে আসেন, ”আমি যখন তোমাকে থামতে বলি, তখন সঙ্গে সঙ্গে তুমি থামবে। আমি যেখানে আছি, সেটা অবশ্যই নিরাপদ।”
তারপর অনেক মাস পরে রিড নিচের ঘটনাটির বর্ণনা দেন।
”চট্টগ্রামে অত্যাচারের পরিমাণ বেড়েই যাচ্ছিল। সেই সন্ধ্যাটার কথা মনে আছে, যখন মার্শাল ল’র ঘোষণাটি আমার কানে আসে যে, কার্ফ্যু শুরুর সময় রাত আটটা থেকে নয়টা করা হয়েছে। সাড়ে সাতটায় আমাদের এক কিশোর-সদস্য এসে বলে, ”তারা আমার বাবাকে এইমাত্র ধরে নিয়ে গেছে।”
”আমি যদি কার্ফ্যুর সময় বদলানোর ঘোষণাটা না শুনতাম,” রিড ব্যাখ্যা করে বলেন, ”তাহলে কিছুই করতে পারতাম না সে-রাতে।”
আমি মিউনিসিপ্যাল অফিসে গিয়েছিলাম। দারোয়ান খুব একটা সহযোগিতা করছিল না। ছেলেটির বাবা একটা ভিন্ন নাম দিয়েছিল, যেন তাকে হিন্দু বলে (সকল অপরাধের সেরা অপরাধ) সন্দেহ করা না হয়। পাঁচজন সৈন্য হেঁটে আসে। তারা স্বীকার করতে চাইছিল না যে, মানুষটি তাদের জিম্মায় আছে, এবং তারা আমাকে খুঁজে দেখতেও দিচ্ছিল না। ’এঁর ওপর যেন কোনোভাবেই অত্যাচার করা না হয়। তিনি একজন খ্রিষ্টান।’ এই কথা বলে আবার সকালে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়ে আমি বিদায় নিই।”
(অনেক ক্ষেত্রেই ’খ্রিষ্টান’ অর্থ ছিল দায়মুক্তি। এর কারণ সম্ভবত, পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা খ্রিষ্টানের সঙ্গে আমেরিকাকে মিলিয়ে ফেলত, অথবা ঈশ্বর সত্যি পৃথিবীকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে, তিনি তাঁর সন্তানদের দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখেন, তাই খ্রিষ্টানদেরকে তেমন অপমান বা অত্যাচারের শিকার হতে হয়নি।)
সকাল বেলায় আমি জন সরকারকে (আমাদের ভাষাবিভাগের দারুণ দেশি কর্মীটি) নিয়ে গ্রেফতারকৃত লোকটার বাড়িতে যাই। আমার জানা দরকার, তার বাবার গায়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির কলঙ্ক লেগে আছে কিনা, তিনি যদি রাজনৈতিকভাবে তার সঙ্গে যুক্ত না হয়ে থাকেন, তাহলে মিলিটারির তাকে আটকে রাখার কোনো কারণ থাকতে পারে না। তার পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আমি এই মর্মে স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করি। (আমি এটা স্থানীয় ক্যাথলিক পাদ্রির কাছ থেকে শিখেছিলাম, যিনি নিজে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন।) লোকটাকে অসংগতভাবে আটকে রাখা হচ্ছে, এই নিশ্চয়তা পেয়ে আমি তার পক্ষে একটা বিবৃতি তৈরি করি এবং মিউনিসিপ্যাল অফিসে ফেরত যাই। প্রথমে তারা আমাকে ঢুকতে দেয়নি। এরপর আমি একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করি, যিনি নিশ্চিত করেন যে, লোকটা সেখানে আছে। আমি ওপরতলায় উঠে তাকে মেঝেতে উবু হয়ে বসে থাকতে দেখি। তার হাতজোড়া পেছনে বাঁধা, তাকে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। তার শার্টে রক্তের দাগ। আমি তখন কিছু না করে অলসভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি।
”আমি অ্যাংলিকান ক্রাইস্ট চার্চের মিনিস্টার রেভারেন্ড ডেভিড ড্যাভিকে তুলে নিয়ে, দু’জনে একসঙ্গে সার্কিট হাউসে অবস্থিত মিলিটারি সদর দফতরের মেজর বুখারির সঙ্গে দেখা করতে যাই। দরজার প্রহরীরা আমাদের বাধা দেয় না, ফলে আমরা সোজা মেজরের টেবিলের কাছে হেঁটে যাই।
”মেজর চেঁচিয়ে উঠলেন এই বলে যে, ’আপনারা পিয়ন ভেতরে ঢোকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতেন।’ এরপর তিনি ডেভিডের ওপর হম্বিতম্বি করতে লাগলেন, তখন আমি আর চুপ করে থাকতে পারিনি। ’আমাদের একজন খ্রিষ্টান সদস্যকে ধরে আনা হয়েছে।’ আমি এই কথা বলে, প্রস্তুত করে আনা বিবৃতিটা তাঁকে দেখাই। তখন তিনি রাগে একেবারে ফেটে পড়লেন। তাঁর মুখ ক্রোধে গনগন করে, তিনি চিৎকার করে বললেন, ’আপনারা যা করেছেন তা পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে! একমাত্র আমাদের সৈন্যরাই কোনো ঘটনা নিয়ে তদন্ত করতে পারে। আপনাদেরকে বন্দি করা হলো!’
”’আমি কি আমাদের কনস্যুলেটকে ফোন করতে পারি?’ আমি জানতে চাই।
”’অবশ্যই নয়। বসুন আপনারা!’
”এটা পরিষ্কার ছিল, আমি ও ডেভিড, দুজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। মেজর তাঁর বকাঝকা চালিয়ে যেতে থাকেন : ’আপনারা উর্দুভাষীদের সাহায্য করেন না কেন? তারপর তিনি আমাদেরকে কিছু মায়াকান্নার গল্প শোনালেন, এক বিধবার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ইত্যাদি।
”ততক্ষণে আমি ভাবতে থাকি, আমার কাছে গুর্গানুসের ফোক্সওয়াগন গাড়ি ও সব আসবাবপত্র রয়েছে; মেয়েদুটোর বাড়ি এবং অফিসের জিনিসপত্রেরও দায়িত্বও আমার ওপর। আমাকে যদি দেশ ছেড়ে যাবার জন্য চব্বিশ ঘণ্টার নোটিশ দেওয়া হয় তাহলে কী হবে? আর আমি যদি না যাই তাহলেই বা কী হতে পারে? আমি তখন বুঝতে পারি পরিত্রাণের জন্য প্রার্থনার অর্থ কী। একমাত্র ঈশ্বরই এই অবস্থার সামাল দিতে পারেন।
”আমাদেরকে প্রহরী দিয়ে বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি গাছতলায় বসিয়ে রাখা হয়। কিছুক্ষণ পর সেই বদমেজাজি মেজরের আগমন ঘটে। তিনি ব্রিগেডিয়ারের কাছে গিয়েছিলেন।
”’আপনারা যেতে পারেন’, মেজর বুখারি আমাদের শাস্তি বাতিলের ঘোষণা দেন, ’কিন্তু আমরা আপনাদেরকে আর এখানে দেখতে চাই না। আমরা আপনাদের যেতে দিচ্ছি কারণ আমরা কোনো আন্তর্জাতিক খবর হই তা চাই না।’
”আমি ঈশ্বরের এই আশীর্বাদকে আরও বেশি মূল্য দিচ্ছিলাম এইজন্য যে, অজস্র ক্ষেত্রে বহু লোকের অহেতুক মৃত্যু ঘটেছিল স্রেফ উত্তেজিত সৈন্যদের হাতে। আমি উপলব্ধি করি, এই মেজর এরকম একটা হুকুম দিতে কী ভালোই না বাসতেন, ’একে গুলি করো।’ ঈশ্বরের কৃপা এবং আমার আমেরিকান সনদ আমাকে রক্ষা করে।
”আমি বন্দি লোকটার বাড়ি যাই এই কথাটা বলতে যে, আমি আর তার জন্য বেশি কিছু করতে পারব না। তারপর, হঠাৎ করে, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এবং আমার প্রথমবার যাওয়ার পর তাকে নাকি আর মারধরও করা হয়নি।
”’তুমি ভাগ্যবান,’ তারা তাকে বলে। একজন বিদেশি তোমার খোঁজে এসেছিল।’”
চট্টগ্রামে আমাদের সেই প্রথম দিনে রিড আমাদেরকে পরামর্শ দেন, একটু আড়ালে আবডালে থাকতে যাতে করে এটা বোঝা না যায় যে, আমরা ফেরত এসেছি। লোকেরা তাঁকে এদিক সেদিক দেখে অভ্যস্ত, এটা অনেক লোককে সাহসও দিয়েছিল যে, এখনও শহরে কিছু বিদেশি রয়েছে। সত্যি বলতে কি, রিড যখনই বাইরে গেছেন একটি শার্ট – তাঁর সেই বিখ্যাত সোনালিরঙা শার্টখানি পরেই গেছেন, যেন সবাই তাঁকে দেখা মাত্র চিনে ফেলতে পারে। আমরা এটিকে তাঁর ’সাহসী’ শার্ট বলে ডাকতে শুরু করি।
আমাদের ফেরার প্রথম কয়েকদিন আমরা কোথাওই যেতে পারিনি। মার্চ মাসে আমরা যে-রক্তের দাগ, ধুলোবালি ও আবর্জনা ফেলে গিয়েছিলাম সেগুলো পরিষ্কার করতেই এতটা দিন লেগে গিয়েছিল আমাদের।
আমরা যখন বন্ধুদের কাছে যাওয়া শুরু করেছিলাম তখন একটা বেবিট্যাক্সি ঠিক আমাদের বাসার দরজা পর্যন্ত আসত। আমরা ঝটপট উঠে পড়তাম, যেখানে যাওয়ার যেতাম, সেখানে কিছুক্ষণ থেকেই, আবার বাড়ি ফিরে আসতাম। আমরা কখনও রাস্তায় দাঁড়াতাম না এবং খুব কমই কেনাকাটা করতাম।
আমরা অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে গুটিকয় বাড়ি-বেড়ানোর মধ্যেই বুঝতে পারতাম চারপাশের পরিবেশের পরিবর্তনটুকু। আপনি যেখানেই যান সেখানেই সৈন্যেরা বন্দুকহাতে টহল দিচ্ছে, নয় ট্রাকের পেছন থেকে আপনার দিকে জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে রয়েছে, দুমদাম দোকানে ঢুকে তাদের যা যা দরকার নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটা একটি দেশের দুই অংশ ছিল না মোটেও, যারা তাদের পাথর্ক্য ও বিরোধগুলো মিটিয়ে ফেলতে চাইছে। এটি শক্তিধর রাষ্ট্রক্ষমতা কর্তৃক প্রতিরোধহীন একটি অঞ্চলের দখলদারিত্ব ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রতিটি মুখে ভয়ের চিহ্ন। বাচ্চারা গান গেয়ে উঠলেই মায়েরা তাদের মুখ চাপা দিত, পাছে তারা সেই জনপ্রিয় ’জয়বাংলা’ বলে ওঠে। রাস্তার ধারে যারা মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিত, সেইসব জটলা অদৃশ্য হয়ে গেছে। রাত নামলে কদাচিৎ কোনো গলার শব্দ কিংবা চলাফেরার আওয়াজ পাওয়া যেত বাইরে। একবার এক বন্ধুর বাড়ি থেকে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময়, রাত সাড়ে নয়টায় একপাল বুনো শেয়ালকে সদর রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করতে দেখেছিলেন রিড।
এমনকি দিনের বেলাতেও সবকিছু বেশ শান্ত ছিল। একসময় আমি অভিযোগ করে বলেছিলাম যে, ”আমি একটি বাজারের মধ্যে বাস করি, ”কেননা আমি আমার বারান্দা থেকে না নেমেই জুতা, বিছানার চাদর, জ্যান্ত মাছ, হাঁড়িপাতিল, তাজা ফল ও সব্জি, বাসনপত্র, ডিম, কাপড়চোপড়, দরজার পাপোষ, ঝাড়ু, আইসক্রিম, চকলেট, গরম চিকেন প্যাটিস, ওষুধপত্র কিনতে পারতাম। আমি আমার কাঁচি ধার দেওয়াতে এবং জুতা সেলাইও করাতে পারতাম। আমি পুরনো পত্রিকা ও শিশিবোতল বিক্রি করতে পারতাম। এখন এমনকি এই হকারেরাও সব রাস্তাঘাট ছেড়ে চলে গেছে।
দরজার গায়ে বাতাসের একটু জোর আঘাত, গাড়ির টায়ার ফাটা কিংবা ইঞ্জিনের অস্বাভাবিক শব্দে নিরীহ পথচারীরা ধারেকাছের দেয়াল টপকে আড়ালে গিয়ে লুকাত। তবে প্রায়শই এর কোনো কোনোটা হতো সত্যিকারের বুলেট কিংবা বোমার শব্দ।
আমাদেরকে মাঝেমধ্যে বাজারে যেতেই হত। চট্টগ্রামের কেন্দ্রে একটি চারতলা বাজার রয়েছে, নিউ মার্কেট নামে। একদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় আমরা একটা দোকানে কাপড় কিনছিলাম। হঠাৎ করে আমাদের চারপাশের লোকজন ছোটাছুটি শুরু করে দিল।
”মিলিটারি আসছে! মিলিটারি আসছে!” বিপণীবিতানের সিমেন্টের দেয়ালে ও ছাদে এই চিৎকারের প্রতিধ্বনি হচ্ছিল। বুড়ো মালিক দ্রুত আমাদেরকে ভেতরে টেনে নিয়ে দরজার শাটার নামিয়ে দিলেন।
”ভয় পাবেন না! ভয় পাবেন না,” তিনি বারবার বলতে থাকেন, যদিও সেটা তিনি নিজেকে নাকি আমাদেরকে বলছিলেন, আমরা বুঝতে পারিনি। গুলির শব্দ শোনা যায়, তবে বিল্ডিংয়ের ভেতরে নয়। এটা একটা বেঠিক বিপদসংকেত ছিল। আসলে আমাদের অবস্থান থেকে পৌনে এক মাইল দূরে অবস্থিত রেলওয়ে স্টেশনে আক্রমণ চালানো হয়েছিল।
লিন ও আমি, আমাদের বন্ধুদের দেখতে ও তাদের অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চেয়েছিলাম। খুব সাবধানে আমরা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাই, তাদের গল্প শুনি, অভিজ্ঞতা বিনিময় করি, প্রার্থনা করি এবং ঈশ্বর তাদের বিপদমুক্ত রেখেছেন বলে উল্লাস করি। প্রথমদিকেই আমরা গিয়েছিলাম আমাদের রবিবারের স্কুলের কিশোরী ছাত্রীদের বাড়িতে। ঈশ্বর আমাদের যাওয়ার এই সময়টাকে একেবারে নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রথম-বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা দেখি, একটি ছাত্রীর মা গুরুতরভাবে অসুস্থ। তাঁর রক্তচাপ ও শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে আমরা একটা জটিল গর্ভধারণের আলামত হিসাবে সন্দেহ করি। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার দরকার তক্ষুনি। তাঁর সাত বাচ্চার প্রত্যেকেই বাড়িতে জন্মেছে, তাই পরিবারটি তাঁকে কোনো অবস্থাতেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেনি, আর যদি তারা তা ভাবতোও, সেটা করার সংগতি তাদের ছিল না। আমরা দ্রুত তার ব্যবস্থা করি এবং তাঁকে চন্দ্রঘোনায় ব্রিটিশ ব্যাপ্টিস্ট হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিই।
হাসপাতালে যাবার পথে, সেই মা আমাদেরকে বলেন, তিনি এই গোলযোগের সময়ে তাঁর বড় মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে খুবই চিন্তিত। আমরা তাঁকে নিশ্চয়তা দিই যে, ঈশ্বর তাঁর মেয়েদের রক্ষা করবেন। তারপর ঈশ্বর আমাদেরকে নির্বাচন করেন এবং মনে করিয়ে দেন যে, তিনি তাঁর ইচ্ছা চরিতার্থ করার নিমিত্তে মানুষকেই বাহন করার কথা ঠিক করেছেন। একটি ফুটফুটে বাচ্চা ছেলে নিয়ে মা চন্দ্রঘোনা থেকে ফেরার একটু পরেই ষোলো বছরের লুসি আমাদের সঙ্গে থাকতে আসে।
আরেক বিকালে আমরা যখন একঘরের একটি বাড়িতে, রাস্তার দিকে মুখ করা বিছানায় বসে ছিলাম তখন উর্দি পরা দুজন লোককে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখি। তাদের একজন খুবই বাচাল প্রকৃতির ছিল এবং আমাদের দিকে অশোভনভাবে তাকাচ্ছিল।
”তোমরা কী?”
”তোমরা বাঙালি?”
”তোমরা সাহেব?”
তার সহযোগীকে মনে হয় সংলাপ দ্রুত শেষ করে সামনে এগুতে ইচ্ছুক, কিন্তু মুখপাত্র বলেই চলে, ”তোমরা কী কর?”
আমরা আমাদের ব্যাখ্যায় কোথাও এগুতে না পারায়, একজন বৃদ্ধা তার সঙ্গে উর্দুতে কথা বলতে শুরু করেন।” এটা একটা খ্রিষ্টান পাড়া। এরা আমাদের সঙ্গে প্রার্থনা করতে এসেছেন।”
”ওহ।” আলো দেখা দিলে, সে উত্তরে জানায়, ”তোমরা তাহলে দেবী!”
নৈরাজ্যপূর্ণ চট্টগ্রামে ক্যাথলিক হিসাবে আমরা প্রতিদিনই ঈশ্বরের উপস্থিতি ও তাঁর নির্দেশনা সম্পর্কে সচেতন হতাম, কিন্তু আমরা এ-ও বিশ্বাস করি যে, পিতা আসলে প্রতিটি দেশী বিশ্বাসীর চোখেই একটা শক্তি হিসাবে প্রতিভাত করছিলেন নিজেকে।
এখানে একজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পুরুষ ও তাঁর স্ত্রী, তাঁদের পরিত্রাণের এমন এক ঘটনা বর্ণনা করেন, যাকে কেবল অলৌকিকতা দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়। নিচের লেখাগুলো ছিল মি. জিমি রজার্স ও তাঁর পত্নীর নিজের হাতে লেখা সত্যি ঘটনার বিবরণ।
”জুলফিকার আলি ভুট্টো ১৯৭১ সালের তেসরা মার্চে ডাকা জাতীয় সংসদ অধিবেশনকে বানচাল না করে দিলে আমার এই গল্পটা বলা হত না।
”ছয় বছর বয়সে অনাথ হয়ে, হিমালয়ের পাদদেশে প্রয়াত ডা. জে এ গ্রাহাম কর্তৃক স্থাপিত বিখ্যাত অনাথাশ্রমে ভর্তি হই আমি। আমাদের গোটা জীবনটাই রাজকীয় কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিনিয়ত বদলে-যাওয়া মুখাবয়ব দ্বারা আচ্ছন্ন থাকত। অনাথাশ্রমটি ছিল একটি খ্রিষ্টান প্রতিষ্ঠান, যেখানে আমি কেবল খুব ভালো শিক্ষাই কেবল পাই না, স্বয়ং খ্রিষ্টকে আমার ত্রাতা হিসাবেও পাই, এবং বাইবেল পাঠ ও প্রার্থনার অভ্যাস গড়ে তুলি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নৌবাহিনীতে ঢুকে আমার প্রথম জীবনের সেইসব অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যাই। যুদ্ধ একজনকে ঈশ্বর কিংবা শয়তানের নিকটবর্তী করে তুলতে পারে, বিশ্বাসের গভীরতা ও বন্ধুসঙ্গের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। বিশ্বাস থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি আমার ক্ষেত্রে একটু ধীর ছিল; প্রথমে মদ্যপান, তারপর জুয়া খেলা, তারও পর যিশু থেকে ক্রমে দূর থেকে দূরে ছিটকে পড়া; খুন ছাড়া, আইনের চোখে এমন কোনো অপরাধ ছিল না যা আমি করিনি।
”শেষ পর্যন্ত নিজের ধ্বংসের কাছে এসে এবং নিজেকে একটি ডাকাতির অভিযোগে মিথ্যেভাবে অভিযুক্ত হতে দেখে আমি ঈশ্বরের শরণাপন্ন হই। এক মুহূর্তে আমার জীবন ছিল অন্ধকার ও অবসাদে আচ্ছন্ন, আর পরের মুহূর্তেই আলো, শক্তি ও আশ্বাস। অনেক বছর পেরিয়ে যায়– নিয়মিত চাকরি, পদোন্নতি সবই ঘটে। আমাদের যেহেতু কোনো সন্তান ছিল না, আমার স্ত্রী ও আমি দুটো বাঙালি মেয়েকে দত্তক নিই।
”আমাদের আরামদায়ক জীবন ছিল এবং মোটামুটি স্বচ্ছলই ছিলাম আমরা। তারপর হঠাৎ করেই আকাশ ভেঙে পড়ে। আমি চাকরি হারাই এবং বিভিন্ন খুচরো কাজ করি তার পরের ছয় মাস। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমি ঢাকায় কাজ করছিলাম। আমার স্ত্রী ও দুই কন্যা, তখন বয়স তিন ও চার, ১৭৫ মাইল দক্ষিণে চট্টগ্রাম শহরে থাকত। আমাদের বাসাটি বিহারি অধ্যুষিত এলাকা থেকে মাত্র আধমাইল দূরে একটি মিলিশিয়া ক্যাম্পের পাশেই ছিল। সেটা খুব নির্জন এলাকা, যার কাছাকাছি মাত্র আর একটা বাড়িই ছিল।
”ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে আমি যখন ক্রিসমাসের জন্য বাড়ি এসেছিলাম, তখন আমার মনে একটা জোর বিশ্বাস জেগেছিল যে, আমি হয়তো আমার বাড়িটা আর দেখব না। এই অনুভূতিটা এমন জোরালোভাবে আমার মনে গেঁথে থাকে যে, আমি আমার এক মিশনারি বন্ধু জিন গুর্গানুসকে চট্টগ্রামে চিঠি লিখে সেই ভয়ের কথা খুলে বলি এবং আমার পরিবারের দেখভাল করার অনুরোধ করি।
”মার্চের ১ তারিখ শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানিরা জাতীয় সংসদ অধিবেশন বানচাল করার জন্য যেসব বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করছিল তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য বাঙালিদের ডাক দেন। গোটা পূর্ব বাংলা তাঁর ডাকে জেগে ওঠে। মার্চের ১ তারিখ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত অবস্থা খুব উৎকণ্ঠাময় ছিল এবং নানা দাঙ্গাহাঙ্গামাও হচ্ছিল। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি মিলিটারি একটা সর্বাত্মক অভিযান শুরু করল বাঙালিদেরকে দমিয়ে দেওয়ার জন্য এবং তাতে তারা কিছুটা সফলও হয়েছিল বলা চলে।
ঢাকাকে রাতারাতি দমন করা গেলেও চট্টগ্রামে যুদ্ধ আরও কুড়ি দিনের মতো চলে। ২৫শে মার্চ রাত দশটায় ঢাকা শহরে গোলাগুলি ও বোমাবাজি শুরু হয়। আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। রাত দুটোর দিকে মিলিটারি সারা শহর ঘুরে লাউডস্পিকারে লোকদের সাবধান করতে থাকে এই বলে যে, আগামীকাল ২৬শে মার্চ সারাদিন র্কাফ্যু থাকবে। বাড়ি থেকে কেউ বার হলেই তাকে গুলি করে মারা হবে।
”বিকালের মধ্যে আমি ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে পারছিলাম না, তাই সাহস করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে খাদ্যের সন্ধান করতে থাকি। আমি একটা ছোট্ট ঘুপচিঘর দেখি যার একটি ছোট্ট জানালার ভেতর দিয়ে চা বিক্রি করা হচ্ছিল। আমি এক বোতল চা ভর্তি করে নিই, কেননা আমার সেই অভিযানে আমি এই একটি মাত্র খাদ্যের খোঁজ পেয়েছিলাম। পরদিন আমি একই দোকান থেকে একটি বাসি রুটি এবং আরও কিছু চায়ের ব্যবস্থা করতে পারি। চারটি বাঙালি পরিবার আমার ঘরে আশ্রয় নেয়। আমি একটি ১০ বাই ১০ ফুট ঘরে থাকতাম, ফলে আপনারা বুঝতেই পারছেন কী অসুবিধাই না হচ্ছিল সবার।
”মার্চের ২৮ তারিখ আমি চট্টগ্রামে আমার পরিবারের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমি দুবার ক্যান্টনমেন্টে যাই একটা বিমানের টিকিটের অনুমতির জন্য, কিন্তু তারা আমাকে মুখের ওপর না করে দেয়। এপ্রিলের ৩ তারিখ আমি আমাকে সাহায্য করার জন্য একজন বন্ধুকে যোগাড় করি, যে কিনা উর্দু বলতে পারে। সে আমাকে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু নিজেকে বিশাল বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে। সে তখন আমাকে অনুরোধ করে, তার সঙ্গে সেই মিলিটারি অফিসারের কাছে যেতে, যে-এই অনুমতিটি প্রদান করছিল। আমি আসার পর আমাকে বলা হয়, আমার বন্ধু আমার নাম ব্যবহার করেছে বিমানের টিকিটের জন্য। তাকে গুলি করার সমূহ ইচ্ছা ছিল তাদের, কিন্তু আমি আমার বন্ধুকে কোনোমতে সেই দুর্দশা থেকে উদ্ধার করে আনতে পারি। সে বলে যে, তাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল গুলি করার জন্য, কিন্তু সে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে। সে যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভাষা উর্দু বলতে পারত, সেহেতু তাকে এই সুযোগ দেওয়া হয় যেন আমি এসে তার কথার সত্যতা প্রমাণ করি। অবশ্যই আমি সেদিন কোনো বিমানযাত্রার অনুমতি পাইনি। বাকি সারা সপ্তাহ আমি লাইনে দাঁড়িয়ে সেই চেষ্টা করে যাই কিন্তু আমাকে প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করা হয়, কারণ আমি যে পাকিস্তানি তার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারছিলাম না। পাঁচটি ব্যর্থ চেষ্টার পর অবশেষে ৬ই মে’র একটি উড়ানের অনুমতি দেওয়া হয় আমাকে।
”আমার বিমানযাত্রার আগের রাতে, আমি একটা টেলিগ্রাম পাই যে, আমার স্ত্রী ও কন্যারা নিরাপদে আছে এবং তারা বাইবেল ইনফরমেশন সেন্টারে আছে। এটা আমাকে রীতিমতো বিস্মিত করে। আমি তখনই বুঝতে পারি, আমার বাড়ির কিছু একটা হয়েছে, তা নাহলে আমার স্ত্রী কিছুতেই বাড়ি ত্যাগ করত না। কিন্তু আমি সেই টেলিগ্রাম আসার সময়টাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? আমি এর আগে বিমানযাত্রার অনুমতি পেলে, সরাসরি বাড়ি চলে গিয়ে বাড়ির এই হাল দেখে ধরে নিতাম যে, আমার স্ত্রী কন্যাদের হত্যা করা হয়েছে। অই সময়ে টেলিগ্রামটা পাওয়াতে আমি সেই মুহূর্তের আতঙ্ক ও বুকের যন্ত্রণা, বেদনা থেকে অব্যাহতি পাই। এই খবর পেয়ে আমি সরাসরি বাইবেল ইনফরমেশন সেন্টারে যাই এবং আমার পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হই। দিন গড়িয়ে যায় এবং আমি আমার স্ত্রীর অভিজ্ঞতার কথা জানতে পারি। আমি তাকেই সেসব বর্ণনা করতে বলব।

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের (পর্ব ৩) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%b2%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%aa%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6-3/