জিনি লকারবি >> কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে : জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা [পর্ব ৫] >> তর্জমা : আলম খোরশেদ

0
117

পর্ব ৫

পুনর্মিলন ও পূর্বাভাস (২)

আমাদের বাড়ির পাশে দাঙ্গাহাঙ্গামা শুরু হয় মার্চের ৩ তারিখ, কিন্তু সেটাকে, অন্তত বাহ্যত হলেও, নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়। ২৫শে মার্চ একটা স্বাভাবিক দিনের মতোই ছিল। সন্ধ্যায় আমি আমার প্রতিবেশীর বাড়িতে যাই; ১৮ জনের একটি পরিবার। আমি তাদের কাছে জানতে চাই, তাদের চলে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে আছে কিনা, কিন্তু তারা আমাকে বিশ্বাস করায় যে, এই বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে আমরা ভালোই আছি। আমি বাড়ি ফিরি, রাতে ভালো ঘুম হয় আমার, এবং পরদিন সকালে জেগে উঠি এর পর কী ঘটতে যাচ্ছে সে-বিষয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করা ছাড়াই।
”দশটার কিছু পরে, সেই মিলিশিয়া বাহিনীর এক সদস্য এসে আমাকে আমার প্রতিবেশীদের একটু খোঁজ করতে বলে, কেননা তাদের বাড়ি থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। আমি গিয়ে দেখি শূন্য বাড়ি এবং বাইরে থেকে দরজায় তালা দেওয়া। আমি তারা এতটা ছোটো মনের হতে পারে দেখে বিরক্ত ও বিক্ষুব্ধ হয়েছিলাম; আমাকে নিরাপত্তার পুরো নিশ্চয়তা দিয়ে, তারা বিন্দুবিসর্গ না জানিয়ে নিঃশব্দে কেটে পড়ল! আমি এই পরিবারটির বিষয়ে এমন দ্রুত উপসংহারে আসার জন্য পরে অনুতপ্ত হয়েছিলাম, কেননা সেই রাত্রে, পরে আমি জেনেছিলাম, আঠারোজনের সবাইকেই হত্যা করা হয়েছিল।
”২৭শে মার্চ আমি বাচ্চাদের খাইয়ে দিয়ে যখন বাড়ির সব কাজ সারছিলাম তখন আমাদের ধোপা আসে। বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে আমার কোনো খবর ছিল না, ফলে আমি তাকে প্রশ্ন করে জ্বালিয়ে মারি। সে আমাকে জানায়, শহরে প্রবল যুদ্ধ চলছে, যা আমাদের বাড়ি থেকে মাইল দুয়েক দূরে ছিল। আমরা তখনও কথাই বলছিলাম যখন নেভির জাহাজ থেকে ছোড়া কামানের গোলা আমাদের আশেপাশেই এসে পড়ছিল, গোটা এলাকাকে ভারী ধুলোর আস্তরণে ঢেকে দিয়ে।
”আমার স্বামী প্রায়ই আমাকে তার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অভিজ্ঞতার গল্প করত। সে বলত, সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হচ্ছে টেবিল কিংবা বিছানার নিচে আশ্রয় নেওয়া। আমরা সিদ্ধান্ত নিই এখনই সময় এই কৌশলকে পরীক্ষা করে দেখার, ফলে আমরা সবাই, এমনকি ধোপাও খাটের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ি। আমরা সেটা করতে না করতেই একটা রকেট আমাদের ছাদে আঘাত করে ছাদশুদ্ধ এসে পড়ে আমাদের ঘরের ভেতরে আমরা যেখানে ছিলাম সেখানে। খাটটি আমাদের মাথার ওপরেই ভেঙে পড়ে। ধোপা বেচারা রকেটের ছররায় পায়ে ও ঊরুতে আঘাত পায়। বত্রিশ ফুট দূরে ফ্রিজের গায়েও সেগুলো গিয়ে আঘাত করে। ভয় পেয়ে আমরা খাটের তলা থেকে বেরিয়ে এসে আতঙ্কে বাড়ির দরজা খোলা রেখেই সবাই পালিয়ে যাই। যেদিক থেকে রকেটগুলো আসছিল আমরা সেদিকেই পালাতে থাকি, প্রতিবার একটা রকেট ছুটে আসতো আর আমরা মাথা নিচু করে মাটিতে শুয়ে পড়তাম। এই ঘটনার কথা মনে পড়লে একে একটা হাস্যরসাত্মক দৃশ্য বলেই মনে হত আমার, কেননা আমরা কাদা আর ধুলা থেকে উঠছিলাম আর পড়ছিলাম, আমাদের চেহারাগুলোকে কেমন দেখাচ্ছে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই।
”আমরা এভাবেই দৌড়াতে থাকি, যতক্ষণ না একটা হিন্দু গ্রামে এসে হাজির হই। হিন্দুরা আমাদেরকে অনুনয় করে তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে, তা নাহলে হয়তো তাদেরকেও আক্রমণ করা হবে বলে তারা ভয় পাচ্ছিল। আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম করি। তারপর ধোপা আমাদেরকে তার গ্রামে নিয়ে যায়। সে তারপর সিদ্ধান্ত নেয় মিলিটারি ক্যাম্পে গিয়ে তার আঘাতের জন্য চিকিৎসা নেবে। আমরা তাকে মিনতি করি না যেতে, কিন্তু সে আমাদের অনুনয় উপেক্ষা করেই যায়, যায় তার মৃত্যুর অভিমুখে।
”পরদিন ভোরের আগেই ধোপার গাঁয়ের লোকেরা আমাদের চলে যেতে বলে, খুব কাছেই যুদ্ধ চলছিল এবং আমার উপস্থিতি তাদেরকে আরও বিপদাপন্ন করতে পারে। আরও একবার আমি আমার দুই মেয়েকে নিয়ে পথে নামি। তিনশ গজ সামনেই ছুরি তলোয়ার রামদা হাতে কিছু কঠোরমুখো মানুষজন দেখি। আর কোনো উপায় না দেখে, ঠোঁটে প্রার্থনার বাণী নিয়ে, আমি সোজা তাদের মধ্যে গিয়ে পড়ি। একজন আমার বরের নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি তার বউ কিনা। আমি যখন তাকে নিশ্চয়তা দিই যে আমিই সে, সে তখন দলের বাকিদের বলে, আমি তার আশ্রয়ে আছি এবং তারা যেন আমার কোনো ক্ষতি না করে। তারপর সে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে পথ দেখিয়ে বন্দর এলাকায় এক রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান পরিবারে নিয়ে যায়। তিনি আমার নাম জিজ্ঞাসা করেন।
”রাজকুমারী,“ আমি জবাব দিই।
”এটা কোনো খ্রিষ্টান নাম নয়,” তিনি উত্তরে বলেন। ”এটা একটা হিন্দু নাম, আমি আপনাকে আশ্রয় দিতে পারব না।”
”আমি আমার রক্ষাকর্তা ও পথপ্রদর্শককে বলি, এখানে আমার একজন মুসলিম বন্ধু আছে, কিন্তু আমি তার বাড়ির সঠিক ঠিকানা জানি না। কিছু জিজ্ঞাসাবাদের পর আমরা তাকে খুঁজে বার করতে পারি। তিনি আমাদেরকে ঘরে নিয়ে যান, খেতে দেন, পথের ধুলোবালি ধুতে দেন, এমনকি তার বাচ্চাদের কাপড় এনে দেন আমার মেয়েদের পরার জন্য, কেননা সেগুলো ততক্ষণে সব ছিঁড়েখুঁড়ে গিয়েছিল। আমরা যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলাম তখন তিনি খোঁজ নিয়ে জানেন যে, আমাদের বাড়ির পুরো এলাকাটি মিলিটারি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। তিনি আমাদেরকে অনুরোধ করেন বাড়ির সব জিনিসিপত্র লুট হয়ে যাবার আগেই সেখানে ফিরে যেতে। ভয়ে ভয়ে আমি বাচ্চাদের নিয়ে আবার ফেরার পথ ধরি, তবে এবার সচেতনভাবে যিশুকে আমার পক্ষে নিয়ে।
আমার ফেরার পথে আমি যে-ধোপার গ্রামটাতে থেমেছিলাম এর আগে, সেটাকে এবং হিন্দু গ্রামটাকেও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে দেখি। এটা দেখে, আমি সরাসরি বাড়ি যাবার বদলে একটু ঘুরপথে আরেক এলাকায় চলে যাই যেখানে আমার কিছু বন্ধু ছিল। তাদের পাঁচজন আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। ছাদের সরাসরি রকেটের আঘাত ছাড়াও আরও শত শত বুলেটের চিহ্ন ছিল দেয়ালে, ভেতরে ও বাইরে, অর্থাৎ অইসব ঘরগুলোতেও রীতিমতো যুদ্ধ চলেছিল। জানালার সবগুলো কাচই প্রায় ভাঙা ছিল। আমার রেডিও, গয়না ও টাকাপয়সা সব উধাও হয়ে গিয়েছিল। আমার বন্ধুর জিপে যতটা আঁটে ততটা মালামাল আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। আমার সাহায্যকারীরা দ্বিতীয় দফায় ফেরত যেতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি এত ক্লান্ত ছিলাম যে, কেবল ঘুমাতে চাইছিলাম। আমরা পরের দিন আবার গিয়েছিলাম বটে, তবে লুটেরারা আমাদের আগেই পৌঁছে গিয়েছিল সেখানে। শক্তভাবে লাগানো তালা ভাঙতে না পেরে তারা জানালার লোহার গ্রিল খুলে জানালা দিয়ে বার করা সম্ভব এমন সব কিছুই নিয়ে চলে গিয়েছিল।
”সেই সপ্তাহে, ব্যাপ্টিস্ট্স এসাসিয়েশনের রিড মিনিখ আমার খোঁজে এসেছিলেন। তিনি তালাবদ্ধ বাড়িতে ঢোকার সরকারি অনুমতি নিয়ে এসেছিলেন ৫টার কার্ফ্যুর ভয় মাথায় নিয়ে, এবং যতটা সম্ভব আসবাবপত্র বার করে নিয়ে এসেছিলেন আমার জন্য ওই সময়ের মধ্যেই। তারপর তিনি আমাদেরকে বাইবেল ইনফরমেশন সেন্টারে নিয়ে যান অপরাপর খ্রিষ্টান পরিবারের সঙ্গে থাকার জন্য। আমার স্বামী ঢাকা থেকে ফেরেন ৬ই মে এবং আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। তিনিই আমাদের বাকি গল্প বলে যাবেন আপনাদের।
”আমি যখন পরিবারের সঙ্গে মিলিত হলাম, আমার কাছে মনে হল, আমার স্ত্রী তখনও তার দুঃসহ অভিজ্ঞতার আঘাতটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আমার মাত্র ছয় দিনের ছুটি ছিল, তাই ঢাকা ফিরে যেতে হয়েছিল। সেখানে ফেরার পর আমাকে বলা হয় আমি নাকি সেই প্রতিষ্ঠানে আর মানাচ্ছি না এবং আমাকে তাদের আর প্রয়োজন নেই। আমি চট্টগ্রাম ফিরে আসি চাকরিহীন, অর্থহীন এবং গৃহহীন।
”আমরা সেই সেন্টারে বেশ কয়েকমাস থাকি, যতদিন না আমি পাটকলে একটা চাকরি পাই এবং একটা বাসা ভাড়া করতে পারি। আমি ভেবেছিলাম মেঘ বুঝি সরে যাচ্ছে এবং সূর্যের আলো দেখা দেবে আমাদের জীবনে। কিন্তু সেটা হবার ছিল না।
”ডিসেম্বরের ১৭ তারিখ পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করে এবং আমরা আমাদের বাঙালি বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ উল্লাসে মাতি। পরদিন বন্ধুদের বাড়ি বেড়িয়ে নিজ বাসায় ফেরার পথে আমাদের রিকশার চাকা ফেটে যায় এবং আমরা সবাই অল্পস্বল্প আহত হই। ডিসেম্বরের ২৩ তারিখ আমার স্ত্রী ও কন্যারা যে-রিকশায় চড়ছিল সেটাকে একটা গাড়ি আঘাত করে। আমার স্ত্রী গুরুতরভাবে আহত হয়, ছোট বাচ্চাটা মুখে ও মাথায় আঘাত পায়। আমাদের বাসাটা একটা ছোটোখাটো হাসপাতাল হয়ে ওঠে এবং আমি তাদের সবারই সেবা করি।
”তারপর ক্রিসমাসের দিনে আমি নিজে অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার কফের সঙ্গে যখন রক্ত বেরুতে থাকে তখন আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় এবং আমার ডাক্তার আমি যা সন্দেহ করছিলাম, টিবি, সেটা না নির্ণয় করে একে একধরনের নিরাময়যোগ্য নিউমুনিয়া বলে চিহ্নিত করেন। এই রোগের কারণে আমার যেদিন কাজে যোগ দেওয়ার কথা আমি সেদিন তা করতে পারিনি। যখন যোগ দিতে সক্ষম হই, তখন আমাকে বলা হয় আমার আর দরকার নেই তাদের; আমি দ্বিতীয়বারের মতো চাকরিহারা হই।
”এর আগে ডিসেম্বরে আমি আমাদের বাড়িতে যাই, কিছু মেরামতের কাজ শুরু করার জন্য। কিন্তু কী এক দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছিলাম আমি! বাড়িটার পুরোটাই একেবারে ন্যাংটো করে ফেলা হয়েছে এবং সেটা একটা ধ্বংস্তূপের মতো পড়ে আছে। শুধু শূন্য দেয়ালগুলো বাকি ছিল। প্রতিটা আসবাবপত্র, একেবারে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাঠের টুকরোটা পর্যন্ত লুট করে নিয়ে গিয়েছিল। এমনকি দরজার চৌকাঠসহ, বাথরুমের জিনিসপত্র এবং বিদ্যুতের তারগুলো পর্যন্ত খুলে নেওয়া হয়েছিল।
”কিন্তু আমাদের বর্তমান দুর্দশার অবস্থা দেখেও তার পেছনে আমি ঈশ্বরের আশীর্বাদের হাত টের পেতাম। আমি আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত পেয়েছিলাম, তবু ঈশ্বর আমাকে আমার পরিবার থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি যদি থাকতাম তাহলে কখনোই বাড়ি ছেড়ে যেতাম না। এবং যুদ্ধটা যেহেতু একেবারে আমাদের বাড়ির ভেতর দিয়ে গেছে সেহেতু আমরা সবাই মারা পড়তাম সেদিন।
”আমাদের একমাত্র প্রতিবেশীরাও মারা গিয়েছিল। আমার স্ত্রী একা ছিল বলে হয়তো বেঁচে গিয়েছিল, কিন্তু প্রশ্ন হলো, ”এই পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল কার?”
”কে আমার স্ত্রীকে ঠিক সময়ে খাটের নিচে আশ্রয় নেবার জন্য বুদ্ধি দিয়েছিল?
”কে তাকে সকল কাণ্ডজ্ঞানের বিপরীতে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে প্ররোচিত করেছিল?
”কে তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল রকেটের গোলা যেদিক থেকে আসছিল সেদিকেই দৌড়াতে? সে যদি একমাত্র যে-পথটা খোলা রয়েছিল সেটাই ধরতো, তাহলে নির্ঘাৎ বিহারি কলোনির সেই হাতাহাতি যুদ্ধের মাঝখানে গিয়ে পড়ত।
”কার নির্দেশে তাকে ধোপা ও হিন্দুদের গ্রাম ছেড়ে যেতে হয়েছিল?
”কে সেইসব দয়ালু ও সাহায্যকারী মানুষদের হাজির করেছিল, যখন তাদের সাহায্যের খুব দরকার ছিল?
”হ্যাঁ, ঈশ্বরই ছিলেন সেই পরিস্থিতির সম্পূর্ণ ও সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণে?”
এইসব গল্প আমাদেরকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল যতটা-সম্ভব সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে। আমাদের বাঙালি বন্ধুদের কী প্রয়োজনই না ছিল সেই শক্তি ও সাহসের, যা সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে আসা! যুদ্ধের কুকুরদের আবারও লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।

আমাদের মুক্তিবাহিনী

সামরিক উন্মত্ততার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছিল মুসলিম ও খ্রিষ্টানেরা, কিন্তু চাবুকের আঘাতের আসল লক্ষ্য ছিল হিন্দুরা। পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের এক কোটি হিন্দুদেরকে দোষী করেছিল শেখ মুজিবের প্রধান সমর্থক হিসাবে। হিন্দুরা অবশ্যই তাঁকে সমর্থন দিয়েছিল, ঠিক যেমনটি করেছিল আরও ছয় কোটি অন্য ধর্মের নাগরিকও, তা নইলে তিনি অমন বিপুল বিজয় পান কী করে! লন্ডনের দ্য উইক্লি ইকনোমিস্ট-এর ২৯শে মে ১৯৭১ সংখ্যাটি, হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভারতমুখী জোয়ার বিষয়ক একটি প্রতিবেদনে লিখেছিল :
প্রপাগান্ডা কীরকম স্বীয় স্বার্থরক্ষাকারী হতে পারে, হিন্দুদের এই দেশত্যাগ তার একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ ছিল। মার্চের আগ্রাসনের পরপরই পশ্চিম পাকিস্তানি সংবাদপত্রসমূহ ভারতের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের জন্য হিন্দুদেরকে অভিযুক্ত করতে থাকে। সেনাবাহিনী তারপর হিন্দুদেরকে তাদের প্রতিশোধের বিশেষ লক্ষ্যবস্তু করে তোলে, যা আরও বেশি করে তাদেরকে ভারতমুখী করে তোলে। এটাকেই তখন আবার প্রমাণ হিসাবে ধরা হয় যে, হিন্দুরা বরাবরই ভারতের দালাল ছিল।
প্রত্যেক হিন্দুকেই পাকিস্তানবিরোধী ও ভারতপন্থী হিসাবে সন্দেহ করা হত। আমরা আমাদের বাড়ি থেকে দেখতে পেতাম, সার সার হিন্দুর হাত পেছনে বেঁধে রাস্তা ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাদের অনেকেই আর কখনও ফিরে আসেনি।
এই বৈষম্যই নন্দী পরিবারকে আমাদের কাছাকাছি নিয়ে আসে। আমাদের ফেরার প্রথম সপ্তাহেই একজন লোক আমাদের দরজায় আসে। তাঁকে চেনা লাগছিল, তবে আরও বেশ কয়েকবার আসা যাওয়ার পরই কেবল আমি মনে করতে পারি যে, সেই মার্চে আমরা যখন মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করছিলাম, তখন তিনি তাঁর বউয়ের জন্য ঘুমের অষুধ নিতে এসেছিলেন।
”আপনারা আমাকে একটা সার্টিফিকেট দিতে পারেন এটা বলে যে, আমি খ্রিষ্টান?”
আমরা তাঁকে ব্যাখ্যা করে বলি, এটা এমন কোনো বিষয় নয় যে, মুহূর্তের মধ্যে তার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে; আমরা তাই তাঁর সঙ্গে রিড মিনিখের একটা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করি। সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাঁরা দুজন একত্রে বসে প্রভুবিষয়ে বিশদ আলাপ আলোচনা করেন।
একটু একটু করে নন্দীবাবুর গল্প বেরিয়ে আসতে থাকে। যেদিন আমরা চোদ্দজনে মিলে সেই ল্যান্ডরোভারটা করে আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম, সেদিন তিনি আমাদের সামনের রাস্তায় দাঁড়ানো ছিলেন। তিনি গাড়ির ভেতরে একটি বাচ্চাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমরা কোথায় যাচ্ছি।
”আমাদের হাসপাতালে।” মেয়েটি বলেছিল।
সেইদিন থেকে, যখনই কেউ তাঁর কিশোরী মেয়েদের কথা জিজ্ঞাসা করত, তিনি তাদেরকে রক্ষা করতেন এই বলে যে, তারা আমাদের হাসপাতালে গেছে।
”ভালো কথা,” কয়েক মাস পরে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ”সেই হাসপাতালটা আসলে কোথায়?”
নন্দীবাবু একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী ছিলেন।
হাঙ্গামা শুরু হলে তিনি আদালত থেকে মুসলিম নাম গ্রহণের একটা আদেশ বার করেন, কিন্তু তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, তাঁকে হয়তো জোর করে তাঁর মেয়েদেরকে মুসলিম ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিতে বাধ্য করা হবে। সেটা করার চেয়ে তিনি বরং খ্রিষ্টান হয়ে যাবেন।
মিলিটারি কিংবা রাজাকারেরা নয়-নয়বার নন্দীবাবুর বাড়িতে এসেছিল জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করতে। ”আপনি মুক্তিযোদ্ধাদের কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন?” ”আপনার অস্ত্রশস্ত্রগুলো কোথায়?” ”আমাদেরকে আপনার পুরো পরিবারটি দেখান।”
তাদের পায়ের আওয়াজ পাওয়া মাত্রই তাঁর তিন সুন্দরী কিশোরীকন্যা, তেরো, পনেরো ও আঠারো বছর বয়সী, বাড়ির পেছনে গিয়ে লুকাত। দেয়ালের ধার ঘেঁষে হেঁটে গিয়ে, পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে বাথরুমের দরজার ওপর দিয়ে তারা কোনোমতে ঢালু ছাদের ওপরে আশ্রয় নিত। ইটের খোয়ার আঁচড়ে রক্তাক্ত, আহত তারা ছাদের কিনারঘেঁষে ঝুলে থাকত, যতক্ষণ না পরিস্থিতি নেমে আসার মতো নিরাপদ হত। এর মধ্যে ভেতরে গিয়ে সৈন্যরা ছোটো ভাইবোনদের কাছ থেকে কথা আদায় করতে চেষ্টা করত, তাদের বড় বোনেরা কোথায়।
মিলিটারি তাদের ফোনের সংযোগ কেটে দেয়, যা কার্যত তাঁর বীমা ব্যবসার ইতি টানে। তারা নন্দীবাবুর প্রশিক্ষিত অ্যালসেশিয়ান কুকুরকেও গুলি করে মারে, যেন তারা বিনা বাধায় তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করতে পারে। তারপর তারা আবারও ফিরে আসে। তাঁর আট বছরের ছেলেটি দরজা খুলে তাদেরকে অভ্যর্থনা করে এবং তাকে যেভাবে শেখানো হয়েছিল সেভাবে তাদের সঙ্গে হাত মেলায়।
তারপর যখন সে বুঝতে পারে কী ঘটছে, তখন সে মিনতি করে বলে, ”প্লিজ আমার বাবাকে নিয়ে যাবেন না।”
কিন্তু নিয়ে তারা ঠিকই যায়। তাঁর হাত পেছনে বেঁধে, খালি পায়ে হাঁটিয়ে তাঁকে দু’মাইল দূরের সার্কিট হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়। যাবার পথে তাঁকে বিদ্রূপ করা হয়, লাথি ও থাপ্পড় মারা হয়। সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে তাঁকে ও অপর বন্দিদের একটা মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি দেখেন অন্যদেরকে চাবুক মারা হচ্ছে ও নানারকমভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে।
অফিসারের কাছে এগিয়ে গিয়ে তিনি জানতে চান, ”আমাকে কেন এভাবে অপমান করা হচ্ছে? এই নিন এক টাকা দশ পয়সা, একটা বুলেটের দাম, যান, আমাকে গুলি করুন।”
তাঁর এই সাহসিকতায় ভড়কে গিয়ে তারা তাঁকে ছেড়ে দেয়।
”আমার প্রতিবেশীরা কোথায়, যাদেরকে এখানে আনা হয়েছিল আমার সঙ্গে?” তিনি প্রশ্ন করেন, সঙ্গে আরও যোগ করে, ”আপনারদের প্রতিবেশীকে ভালোবাসার ব্যাপারে পবিত্র কোরান কী বলে?” তারা সেদিন সবাইকেই ছেড়ে দেয়।
পরে মিলিটারি এই লোকটির ব্যাপারে তাদের কৌশল পাল্টায়, যাকে তারা ভাঙতে পারেনি, এবং তাঁকে প্রতিবার পঞ্চাশ টাকা করে দেবার লোভ দেখায়, যদি তিনি মুক্তিবাহিনীর কোনো আক্রমণের খবর দিতে পারেন তাদের। তারা বোকার মতো একটা খোলা বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাঁর কানে কানে এই প্রস্তাব দেয়। নন্দীবাবু সেটা না বোঝার ভান করে তাদেরকে দিয়ে তার পুনরাবৃত্তি করান এবং ক্রমেই আরও জোরালোভাবে।
শেষ পর্যন্ত, হাল ছেড়ে দিয়ে তারা চিৎকার বলে, ”আপনি কালা নাকি?” এবং এই বলে চলে যায় তারা।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ তিনি আমাদের বাড়িতে আসেন গস্পেলের সহজ সরল গল্পগুলো শোনার লোভে। তিনি বাংলা বাইবেল ও তার সহজ ইংরেজি সংস্করণ দুটোই পড়েন। তিনি ও তাঁর কন্যারা বাইবেল স্কুলের করেস্পন্ডেন্স কোর্সগুলো করেন। আমরা যখনই সুযোগ পেয়েছি ও নিরাপদ মনে করেছি, পাশের গলিতে গিয়ে তাঁর কন্যা ও তাদের মায়ের সঙ্গে চুপেচুপে কথা বলেছি। মেয়েগুলো সাংগীতিকভাবেও প্রতিভাবান ছিল: তারা চমৎকার গাইত এবং অর্গানের মতো দেখতে হারমোনিয়াম বাজাত, গিটার ও অন্যান্য তারযন্ত্রও বাজাত, তবে সেইসব দিনে গানবাজনা করা যেত না – অন্তত এমন কিছু নয় যাতে করে মেয়েদের পরিচয় প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে গেলে এবং বাজারে জিনিসপত্রের আক্রা দেখা দিলে গরিবদের খুব অসুবিধা হচ্ছিল, তবে অনেকের জন্যই সেটার অর্থ ছিল, খরচের রাশ টেনে ধরা, যা করতে তারা ভালোই অভ্যস্ত ছিল। তবে উচ্চশ্রেণির যারা তাদের জন্য অপরিহার্য ও বিলাসদ্রব্যের এই অভাবটুকু সহ্য করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কেননা তারা সেসবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। আমরা আমাদের ত্রাণসামগ্রী থেকে তাদের কিছু জিনিসপত্র দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলাম। মিসেস নন্দী, একজন দারুণ সেলাইকারী, এই কাজে যুক্ত হয়েছিলেন কাপড় সেলাইয়ের মাধ্যমে, যেগুলো আমরা ভয়ানক গরিব যারা, তাদের দিতে পেরেছিলাম।
সেপ্টেম্বরের একরাতে আমি যখন চায়ের কাপগুলো পরিষ্কার করছিলাম, তখন মিসেস নন্দী আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ”আমি মনে হয় এখন সেই সার্টিফিকেটটা পেতে পারি। আমি বুঝতে পেরেছি খ্রিষ্টান হওয়া কাকে বলে।”
এই সিদ্ধান্ত মিলিটারিকে তাদের নিয়মিত ’দুষ্কৃতিকারী অনুসন্ধান অভিযান’ থেকে বিরত রাখেনি। এক সন্ধ্যায় চারজন লোক তাদের দরজায় এসে হাজির হয়; দুজন ছিল মুখোশধারী দেশি গুপ্তচর আর দুজন উর্দিপরা সেনা। আট বছরের প্রদীপ দৌড়ে বাড়ির ধারে গিয়ে দুটো চিৎকার করা কুকুরকে ছেড়ে দেয়। (বিদেশিদের রেখে যাওয়া দুটো ডাক্সহুন্ড দিতে পেরেছিলাম আমরা তাদের।) কুকুরদুটো মুখোশধারী লোকগুলোর গায়ের ওপর উঠে বসলে তারা ভয় পেয়ে বেড়া ডিঙিয়ে দৌড়ে পালায়, কিন্তু মিলিটারিরা ঠিকই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। ততক্ষণে প্রদীপও ফিরে আসে। বহুদিন ধরে মৃত ফোনটাই তুলে ধরে একটা নম্বরে ডায়াল করে সে কার সঙ্গে যেন কথা বলতে শুরু করে।
”তুমি কাকে ফোন করছ?” সৈন্যেরা জিজ্ঞাসা করে।
”আমাদের আমেরিকান বন্ধু মি. মিনিখকে।” প্রদীপ জবাব দেয়।
”ওহ, তাই,” লোকগুলো বিড়বিড় করে, ”এখানে নিশ্চয়ই কোনো একটা ভুল হয়ে গেছে।” এবং পরিবারটিকে হেনস্থা করার জন্য প্রবলভাবে ক্ষমা চেয়ে তারা ফিরে চলে যায়।
সাহসী ছেলেটি তার বাবাকে আরও অপমান, এবং সম্ভবত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচায়।
হিন্দুদেরকে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে যেসব অপমানের ভেতর দিয়ে যেতে হত, তার মধ্যে একটা ছিল, তাদেরকে মেঝেতে থুতু ফেলতে বলা এবং সে তা করলে তাকে তখন হুকুম করা, ”যাও এবার নিচু হয়ে মাটি থেকে সেটা চেটে তোলো।” এই শাস্তির সঙ্গে রাইফেলের বাঁটের আঘাতও বাদ যেত না।
এই দেশের সংস্কৃতিতে ছিল মহিলারা নাকে ও কানে মূল্যবান গয়না পরতো এবং হাতে চুড়ি ও গলায় মালা, যা প্রায়শই ছিল পরিবারের সম্পত্তির একটা বড় অংশ। সেই দিনগুলোতে সৈন্যরা গায়ের জোরে তাদের এইসব গয়না ছিনিয়ে নিত, কী পদ্ধতিতে করছে, তার কোনো তোয়াক্কা না করেই। তারা এমনকি ব্যাংক থেকেও টাকা নিয়ে যেত এবং দোকান থেকে জিনিসপত্র, আর ব্যক্তিগত গাড়ির চালককে হুকুম করে গাড়ি বন্দর অব্দি নিয়ে গিয়ে অপেক্ষমাণ জাহাজে তুলে সোজা পশ্চিম পাকিস্তান পাঠিয়ে দিত।
আর এর মধ্যে সারাক্ষণ তারা হিন্দু শিকার করত।
নন্দীরাই একমাত্র হিন্দু ছিলেন না যারা এসে আমাদের কাছে ”একটা কাগজ যা বলবে আমরা খ্রিষ্টান” তা প্রার্থনা করেছিল। আমরা এরকম অসংখ্য অনুরোধ পেতাম। বস্তুত, এইগুলো আমাদেরকে দারুণ সুযোগ করে দিয়েছিল তাদেরকে এই কথা ব্যাখ্যা করে বলার যে, যে-কেউ একটা কাগজে সই করে, কিংবা কোনো সংগঠন কি গির্জার সদস্য হয়ে, এমনকি ব্যাপ্টিজম করলেই খ্রিষ্টান হওয়া যায় না; সত্যিকার খ্রিষ্টানত্ব একধরনের বিশ্বাস, যার মাধ্যমে একজন স্বীকার করে যে, সে তার নিজেকে রক্ষা করতে অক্ষম এবং তাই সে ঈশ্বরের আশ্রয় গ্রহণ করেছে। কেউ কেউ সেটা শুনত, তবে অনেকেরই প্রচণ্ড তাড়া ছিল সেই কাগজখানি তাদের হাতে পাওয়ার।
জীবনের প্রতিটি পর্বের জন্যই সার্টিফিকেটের দরকার ছিল। যে-কাউকে বাইরে চলাফেরা করতে হলে ছবিঅলা, শারীরিক বিবরণ ও কর্মস্থলের নামসহ একটা সার্টিফিকেট সঙ্গে রাখতে হত। লোকেদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলাচলের সাহায্য করার জন্য আমাদেরকে অনেক চিঠি লিখে দিতে হচ্ছিল। তারা যদি কোনো যন্ত্র কিংবা ত্রাণসামগ্রী এমনকি তাদের নিজেদের সম্পদও বহন করত, তাহলে চিঠিতে এই বাড়তি বাক্যটি যোগ করে দিতে হত: এইসব বস্তুর কোনোটা যদি তার হাতে না থাকে তাহলে ব্যাপারটিকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করব। আমরা জানতাম না এই ’গুরুত্ব’র প্রয়োগের ব্যাপারে আমরা কী, কিংবা আদৌ কিছু করতে পারতাম কিনা, তবে এটা সেনাকর্মকর্তাদের অন্তত এটুকু বলত যে, ”কেউ একজন এই ব্যক্তির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন এবং তার সঙ্গে যেন ভালো ব্যবহার করা হয় সে-লক্ষ্যে তারা পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত।”
দ্রুতই এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, তল্লাশি চৌকির অধিকাংশ প্রহরীই সার্টিফিকেট ও চিঠিপত্রের লেখা পড়তে পারত না। লোকেরা তখন তাদের রেশন কার্ড আর স্টুডেন্ট আইডি কার্ড দেখিয়েই পার পেয়ে যেত। এক আমেরিকান একটি মেয়াদোত্তীর্ণ মেরিন মিডল্যান্ড ব্যাংক কার্ড দেখিয়েও বৈতরণী পেরিয়ে গিয়েছিলেন।
স্বাভাবিকভাবেই তল্লাশি চৌকির প্রহরীরা হিন্দুদের খোঁজে ছিল। অনেকেই তাদের প্রাণ বাঁচিয়েছিল এই কথা বলে যে, ”আমি একজন ধোপা, কী নাপিত কী মুচি কী জেলে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বুঝতে পারেনি, এই পদবিগুলো আসলে হিন্দু বর্ণপ্রথারই বিভিন্ন অংশের নাম, যা তাদেরকে বিভিন্ন পেশায় আলাদা করত মাত্র।
যেকোনো জায়গায় ভ্রমণ করাটাই ছিল বিশাল এক বিড়ম্বনা। ব্যাগ খুলে পরীক্ষা করতে দিতে হত। বিমানবন্দরে প্রত্যেকের গায়ে পর্যন্ত তল্লাশি করা হত। মেয়েদেরকে হয় যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করা হত অথবা পর্দাঢাকা কোনো ঘরে ঢুকিয়ে গোপনে তল্লাশি করা হত। পশ্চিমা নারীদের তুলনায় শাড়িপরিহিতা বাঙালি নারীদের তল্লাশী করতে অনেক বেশি সময় লাগত, কেননা তারা চাইলে বারো হাতি শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে একটা ছোটখাটো অস্ত্রাগারও বহন করে নিয়ে যেতে পারত। বিমানের ভেতরে কোনো হাতব্যাগ নেওয়া যেত না। বিমানে ওঠার পর, ”স্বাগতম, আপনাদের সুখকর ভ্রমণ কামনা করি” ইত্যাকার সম্ভাষণ কিংবা এক কাপ চা-ও কপালে জুটত না। বরং একজন সশস্ত্র ব্যক্তি প্রথমে উর্দু ও পরে ইংরেজিতে এই ঘোষণা দিত যে, আপনারা কোনো অবস্থাতেই আসন ছেড়ে উঠতে পারবেন না, যদিও এই দেশের ভাষা ছিল বাংলা।
কিছুদিন সবাইকেই পাকিস্তানি পতাকা ওড়াতে হত, সরকারের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রদর্শনস্বরূপ। সবুজ ও সাদা চাঁদতারার পতাকা স্কুলে, দোকানে, গাড়িতে এমনকি পুরুষদের শার্টের বুকে ও নারীদের শাড়িতে পিন দিয়ে এঁটে রাখার বিষয়টা দৃশ্যমান হয়ে উঠল। তাদের নিজেদের পতাকাকে জোর করে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে এই পতাকা ও প্রতীককে বুকে ধারণ করতে বাঙালিদের প্রাণ ফেটে যাচ্ছিল। আমাদের গাড়ির মিস্ত্রি ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দেয়।
তার বুকপকেটে আটকানো পাকিস্তানি পতাকাটা দেখিয়ে সে বলেছিল, ”প্লিজ এটাকে ক্ষমা করবেন। এটা কেবল বাইরে। আরেকটা পতাকা আছে আমার বুকের ভেতরে।”

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের (পর্ব ৪) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%b2%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%aa%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6-4/