জিনি লকারবি >> কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে : জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা [শেষ পর্ব] >> তর্জমা : আলম খোরশেদ

0
129

শেষ পর্ব

এই গল্পের সঙ্গে আরেকটু যোগ করে ডা. পিটার ম্যাকফিল্ড স্বীকার করেন, ”মনে পড়ে আমি বলেছিলাম আমি কীভাবে এই প্রার্থনা ব্যাপারটি নিয়ে পরীক্ষা করব?” হ্যাঁ, আমি ঠিকই করেছিলাম। এবং আমি শিখি যে, প্রার্থনা হচ্ছে একটা অসাধারণ ব্যাপার:
আমরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলাম আমাদেরকে টাকা পাঠানোর জন্য – এবং তিনি ঠিক আমাদের প্রয়োজনের মুহূর্তেই সেটা পাঠিয়েছিলেন।
আমরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলাম আমাদেরকে প্রাণে বাঁচানোর জন্য – আমরা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ধরা পড়ে মারা যেতে পারতাম। ঈশ্বর আমাদেরকে ঠিকই বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।
আমরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলাম আমাদেরকে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য – বিভিন্ন বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও ঈশ্বর ঠিকই তা করেছিলেন।
”ব্যক্তিগতভাবে আমি এই প্রার্থনার শক্তিকে প্রত্যক্ষ করেছিলাম যখন সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ আমাদের মেয়ে জন্ম নিল। আমরা সেখানে, বাড়ি থেকে অনেক দূরে ছিলাম। আমাদের সঙ্গে যথেষ্ট চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ লোকেরা ছিলেন – তিনজন ডাক্তার, একজন ধাত্রী, রোগীকে বাদ দিয়েই, যে একজন ডাক্তারই ছিল – তবে তেমন কোনো যন্ত্রপাতি ছিল না যা দিয়ে জরুরি কোনো অবস্থার মোকাবিলা করা যাবে। এছাড়া, আমাদের বাচ্চার জন্য কোনো রসদও ছিল না। বার্মার খ্রিষ্টান সম্প্রদায় দয়াপরবশ হয়ে শরণার্থী শিবিরের বাইরে অবস্থান করা আমাদের যা যা প্রয়োজন তা-ই দিয়েছিল: কাপড়চোপড় এবং বাচ্চাকে স্নান করানোর জন্য একটা গামলা। বাচ্চা বেশ মোটাসোটা ও স্বাস্থ্যবান ছিল, এবং আমার স্ত্রীও ছিল বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট সুস্থ ও শক্তিশালী।
”এই সবকিছুতেই ঈশ্বরের দয়া আমার কাছে এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছিল যে, তাঁকে নিয়ে আর কোনো সংশয় ছিল না। আমি আমার জীবনটা তাঁর সেবা করেই কাটাতে চাই।”
একদিন আমি আমাদের লক্ষ্মী লুসিকে জিজ্ঞাসা করি, ”তুমি কি তোমার এই বছরের ভাবনাগুলো লেখা শেষ করতে পেরেছিলে? আমরা মি. মিনিখের বাড়িতে থাকার সময় তুমি যে ডায়রিটা লিখছিলে?”
লাজুকভাবে সে জবাব দেয়, ”হ্যাঁ, শেষ করেছি? আপনি কি সেটা পড়তে চান?”
আমি পড়েছিলাম, এবং আমার ধারণা আপনারাও সেটা পড়তে চাইবেন।
লুসি তার ডায়রির শিরোনাম দিয়েছিল :স্মৃতিরোমন্থন
১৯৭১ এর স্মৃতি ছিল দুঃখের তবে তার প্রাপ্তি ছিল দারুণ!
২৬শে মার্চ আমরা বোমা বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ভয় পেয়ে গিয়ে আমি মাকে ডাকি। তিনিও ভয় পেয়ে বাবাকে ডেকে তোলেন। তিনি আমাদেরকে শান্তিতে ঘুমাতে বলেন। তিনি বলেন, গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তবুও আমাদের চোখগুলো ভয়ে চকচক করে ওঠে, যখন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
২৭শে মার্চ আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম লোকজন ছোট্ট বাক্সোপ্যাঁটরা আর খাবার নিয়ে পায়ে হেঁটে গ্রামের দিকে চলে যাচ্ছে, যেহেতু তারা ভেবেছিল শহরে থাকা আর নিরাপদ নয়। রাতের বেলায় সবকিছুই শান্ত ও শান্তিপূর্ণ মনে হয়েছিল। আমরা কেবল বিছানায় উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ করে মেশিনগানের আওয়াজ শুনতে পাই। আমার বাবা বেরিয়ে আসেন। তিনি আমাদের ছাদের ওপর দিয়ে লাল হলুদ রঙের আলো ছুটে যেতে দেখে ভয় পেয়ে যান। বাবা আমাদের সবাইকে ডেকে পেছনের দেয়াল ও আমার কাজিনের বাড়ির মাঝখানের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলেন।
অবশ্য ২৯শে মার্চের দিনটা আমরা শান্তিতে কাটাই। দুপুর তিনটায় সাতটা ট্রাক আমাদের বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে মালপত্র নিয়ে পাহাড়ের ওপর উঠে গেল। আমার বাবা সেটা দূর থেকে দেখেন। একজন সৈনিক বাড়ির দিকে হেঁটে যাওয়া এক লোককে থামায়। কোনো প্রশ্ন না করেই সে তাকে ডানে বাঁয়ে থাপড়াতে থাকে। আরেকজন সৈনিক আমাদের দেয়ালের ওপর দিয়ে নিচু হয়ে আমার বাবাকে জিজ্ঞাসা করেন, ’আপনি কী?”
আমার বাবা জবাব দেন, ”আমি খ্রিষ্টান।”
”ভেতরে যান।” সৈনিকটি হুকুম দেয়।
আমরা এখানে আরও দুই কি তিনদিন থাকি। এরপর আমার বাবা সিদ্ধান্ত নেন, পেছনের পাহাড়ে অবস্থানরত সৈন্যদের এত কাছে এখানে থাকাটা অসম্ভব, তাই আমরা আরেকটু দূরে সরে যাই। প্রভুর সাহায্যে, সৈন্যদের নাকের ডগা দিয়েই আমরা নিরাপদে আরেকটি দোতলা বাড়িতে চলে যাই, সেখানে আরও দু-তিনটা পরিবারের সঙ্গে আমরা মাস তিনেক থাকি। এই সময়টাতে আমরা যেসব সমস্যার মধ্য দিয়ে যাই সেসব ছিল অসহনীয় : বাতি ছিল না, দোকানপাট বন্ধ, পানিও নাই; আমরা কাছের একটা কুয়ো থেকে পানি টেনে আনতাম, তারপর তা পরিশোধন করে পান করতাম। পানির স্বল্পতার জন্য আমরা বেলা তিনটা কি চারটার দিকে স্নান করতাম। এই সময়টাতে কোনো রেডিওর খবরও শোনা যেত না। আমরা লোকের মুখ থেকে যে-খবরগুলো পেতাম সেগুলো খুবই সত্যি ছিল: তরুণীদের তুলে নিয়ে যাওয়া, লুটপাট, খুন, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এই সবই ঘটছিল তখন। এই সময়টাতে বাঙালিদের জন্য আমার প্রাণ কাঁদছিল। কী হবে আমাদের?
আমি বিজয়ের আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি নিজের কথা ভেবেছিলাম। আমি একটা কিশোরী মেয়ে? কী হবে আমার? এরকম কিছু ঘটার চেয়ে মরে যাওয়াইতো ভালো। তারপর আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি এবং বলি, ”আপনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং আপনিই জানেন কী সবচেয়ে ভালো। আপনিই আমাদের একমাত্র আশ্রয় ও প্রশ্রয়।” এই প্রার্থনা আমাকে অনেক সান্ত্বনা দিয়েছিল।
তারপর দেশের অবস্থা অনেক স্বাভাবিক হয়ে আসে। সরকারি আদেশে স্কুল ও অফিসআদালত খোলে। আমার স্কুলও আবার খুলেছিল, কিন্তু আমি আর যাইনি, কেননা আমার বাবা ভেবেছিলেন, কিশোরী মেয়েদের বাড়ি থেকে বার হওয়া ঠিক হবে না।
দিনে দিনে অবস্থা খারাপ হতে থাকে। আমি জিনি লকারবি ও লিন সিলভারনেইল আন্টিদের সঙ্গে থাকতে যাই। আমি অক্টোবর মাসে স্কুলে যোগ দিই, আমি ভাবি আমার পড়াশোনার আর দেরি করা উচিত না যেহেতু এটাই আমাদের জাতির মেরুদণ্ড।
এই সময়টাতে মুক্তিযোদ্ধারাও শত্রুদেরকে দান ছেড়ে দেয়নি, যদিও তারা তখন অস্ত্র ও গোলাবারুদের দিক থেকে অতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। একদিন স্কুল থেকে আসার পথে একটা মোড় ঘোরার পরই দেখি লোকজন ছোটাছুটি করছে এবং দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। আমরা আন্দাজ করতে চেষ্টা করি ব্যাপারটা কী এবং ড্রাইভারের কাছে তা জানতে চাই। তিনি বলেন, ”একটা বোমা ফুটেছে।” আমরা সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ঘুরিয়ে আরেকটা পথ ধরার সময় আমি দেখতে পাই, একটা তরুণ ছেলে ফুটপাথে শুয়ে আছে এবং তার সারা শরীরে রক্ত।
মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। তারা তাদের কাজে মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করার ব্যাপারে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। এত শাস্তিভোগের পরও আমাদের তরুণ যোদ্ধারা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল।
তারপর ডিসেম্বরের ৪ তারিখ সকাল ৭টার দিকে আমরা প্লেনের আওয়াজ পাই, যাকে প্রথমে বজ্রপাতের আওয়াজ বলে মনে হচ্ছিল। দিনটা যেহেতু মেঘলা ছিল সেহেতু আমি ভেবেছিলাম বজ্রপাতই বুঝি হচ্ছে। জিনি আন্টি বলেন, প্লেনগুলো বন্দরের দিকে বোমা নিক্ষেপ করছে। প্রভুর কাছে প্রার্থনা করা ও নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার ছিল না। কার্ফ্যু জারি করা হয়েছিল, এবং ৯টা নাগাদ বোমাবর্ষণ থামে। প্রকৃতি কাজ করে যাচ্ছিল সুচারুভাবেই : জোরালো পশ্চিমা বাতাস বইছিল এবং সূর্য ওঠার পর মেঘলা ভাবটাও কেটে গেল। শহরটা শান্ত, সুনসান ছিল, শুধু রাস্তায় কিছু সৈন্যের উপস্থিতি ছাড়া। আমি চিন্তায় হারিয়ে যাই; আমি খুব একা ও নিঃসঙ্গ বোধ করি।
দুপুরে কার্ফ্যু তুলে নেওয়া হয়েছিল। মি. মিনিখ আসেন এবং তাঁরা ভাবেন আমাদের এই বাসা ছেড়ে তাঁদের ওখানে চলে যাওয়া উচিত। আরও আটটা মেয়ে ছিল আমাদের সঙ্গে। এই দিনগুলোতে প্রত্যেকদিন বিকাল তিনটায় ঠিক চায়ের সময় বোমা ফেলছিল বিমানগুলো। হয় চায়ের ঠিক আগে অথবা ঠিক পরে প্লেনগুলো আসত। কেউ বাইরে থাকলে, দৌড়ে ঘরে চলে আসত এবং সবাই মেঝেতে শুয়ে পড়তো।
রাতের বোমাবর্ষণ ছিল অনেক লম্বা সময় ধরে, সেটা খুব মারাত্মক ছিল। বাড়িঘর কাঁপতো, আমরা জানালার কাচের ঝনঝন শব্দ শুনতে পেতাম। আতঙ্ক পেয়ে বসে আমাকে। আমার মুখ থেকে আর কিছুই বোরোয় না প্রভুর নাম ছাড়া, ”প্রভু, আমাদেরকে রক্ষা করো।”
আমাদের প্রতিদিনের খাবার ছিল ভাত, তরকারি আর টিনের মাছ। আমরা এটা খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তবে সেটা একেবারে অভুক্ত থাকার চেয়ে ভাল ছিল। যারা এই খাবারগুলো পাঠিয়েছিল তাদেরকে ধন্যবাদ।
১৬ই ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় একজন প্রতিবেশী জিনি আন্টির সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল। সবার মনোযোগ একটা সুঁইয়ের আগায় নিবদ্ধ ছিল, যখন তিনি তার সঙ্গে কথা বলতে গেলেন। তিনি যখন ফিরে আসলেন, তখন আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করি ঘটনা কী। তিনি বলেন, ”পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করেছে।”
আমাদের হৃদয় আনন্দে নেচে ওঠে কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে পারিনি আমরা, কেননা শত্রুসৈন্যরা তখনও চট্টগ্রামে রয়ে গিয়েছিল এবং আমাদের কাছ থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে।
তারপর সন্ধ্যা সাতটায় দুটো রেডিওতে, একটা মিনিখ আঙ্কল ও অন্যটা জিনি আন্টির, আমরা খবরের পর খবর শুনি! ভারত থেকে ইথারে আসা বক্তৃতা। হ্যাঁ, পাকিস্তানি সৈন্যরা সত্যি আত্মসমর্পণ করেছে। মিনিখ আঙ্কল একটা বাংলাদেশের পতাকা যোগাড় করেন এবং সেটা আমাদের ডাইনিং টেবিলে রাখেন। আমার চট্টগ্রামে বিজয়ের প্রথম উদযাপন হয় এই বাড়িতেই।
তারপর ১৭ই ডিসেম্বর ভারতীয় সৈন্যরা চট্টগ্রাম প্রবেশ করে। এটা একটা আগ্নেয়গিরির মতো ছিল যা দীর্ঘদিন সুপ্ত অবস্থায় ছিল ফেটে পড়বার জন্য যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয়ের উদ্দেশে! সব জায়গাতেই বাংলাদেশের পতাকা উড়ছিল আর লোকেরা চিৎকার করে বলছিল, ’জয় বাংলা! – নয় মাসের রক্তাক্ত যুদ্ধের পর এই প্রথমবারের মতো, সাত কোটি মানুষের এক ও অভিন্ন আত্মার ভাষা হয়ে উঠেছিল যেন তা।
এটা দুঃখের সময় ছিল, ছিল আত্মত্যাগের মৌসুম; এটা একটা সত্যিকার সংগ্রামের কালপর্ব ছিল। সোনালি বাংলাদেশ ফকফক করছিল পূর্ণিমা রাতের তারার মতো, নৃশংসতা ও শত্রুতার শেষে ঝড় থেমে যাওয়া শান্তির মতো। সাত কোটি মানুষের জীবন যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল – আর কোনো ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে হবে না তাদেরকে।
আমরা সাহসী ও শক্তিশালী, অগুণিত তরুণ প্রাণের মৃত্যুর জন্য শোক করি, যারা দাসত্বের পরিবর্তে বুলেটকে বেছে নিয়েছিল। গান ও কবিতায় ঘেরা শান্তির ময়দান থেকে বাংলার তরুণদের টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আধুনিক রণাঙ্গনের চৌহদ্দিতে। কিন্তু তারা দ্রুতই সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। সোনালি মাতৃভূমির সেইসব সন্তানের প্রতি আমাদের গভীরতর শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি যারা স্বৈরাচার, অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।
আমরা এখন স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য অপেক্ষারত।

হিসাব মিলেছে সবারই

আর তারপর এল ক্রিসমাস।
আমাদের নবলব্ধ স্বাধীনতা নিয়ে আমরা ঘর থেকে ঘরে গিয়ে আনন্দফূর্তি ও চা-পান করছিলাম, গান গাইছিলাম আর প্রার্থনা করছিলাম। যে-একটি বাড়িতে আমরা বিশেষভাবে স্বাগত ছিলাম সেটি হচ্ছে সেই পরিবারটি, যার প্রধানকে মিলিটারিরা ছেড়ে দিয়েছিল কেননা, ’একজন বিদেশি সাহেব তার খোঁজ করতে গিয়েছিলেন।’
সেই ক্রিসমাসটি উপভোগ করার জন্য, প্রভু তাঁর সেবকদের এই সময়ে এই স্থানে থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন কতজনকে? আমি ভাবি –
আমরা অবশ্য আমাদের ক্রিসমাসকে আরও বেশি করে উপভোগ করতে পেরেছিলাম।
বাড়ি থেকে পাঠানো ভালোবাসাভর্তি উপহারের ডালি নিয়ে কোনো জাহাজ আসেনি, কেননা বন্দরের মুখ আটকে ছিল ডুবিয়ে দেওয়া জাহাজের জঞ্জালে। এমনকি পরের মে মাসের আগ পর্যন্ত কোনো ক্রিসমাস কার্ডও আসেনি।
আমরা যে বেঁচে ছিলাম সেটাই যথেষ্ট ছিল। এবং আমরা সত্যি এটা আনন্দময় ক্রিসমাস পেয়েছিলাম।
ক্রিসমাসের রবিবারে শামিয়ানার নিচে আয়োজিত জমায়েতে উপস্থিত একজনেরও চোখ শুকনো ছিল না সেদিন। সেদিন এতবেশি লোকের সমাগম হয়েছিল যে, অনুষ্ঠানটিকে আমাদের ঘরের ভেতর থেকে বাইরে পেছনের লনে সরিয়ে নিতে হয়েছিল।
জন সরকার তাঁর বক্তৃতা শুরু করেন এভাবে: ”আমরা কখনো ভাবিনি যে, এবছর ক্রিসমাস উদযাপন করতে পারব। আমরা আদৌ বেঁচে থাকব কিনা সেটাই জানতাম না…”
তবে আমরা সবাই সেখানে ছিলাম:
– মালুমঘাট থেকে ফিরে-আসা রিড, লিন ও আমি
– খোকা সেন, তাঁর স্ত্রী ও পরিবারসহ
– নন্দীদের পরিবার, তাঁর সাম্প্রতিক অসুস্থতার কারণে তখনো দুর্বল নন্দীবাবুসহ
– মণীন্দ্রর পরিবার ও তাদের সঙ্গে সেই হিন্দু কজনও যাদের কন্যাদের জীবন বাঁচিয়েছিল সে
– বাইবেল ইনফর্মেশন সেন্টারে মাসের পর মাস বাস-করা সেই একুশজন খ্রিষ্টান
– মিস্টার ও মিসেস রজার্স ও তাদের ছোট দুই মেয়ে
– ডা. পিটার ও রেবা ম্যাকফিল্ড ও ক্ষুদে ’বাবলি’
– যুদ্ধের মাঝখানে জন্ম নেওয়া ভাইটিসহ লুসির পরিবার
– বসুরা সবাই ও প্রিয় দিদিমা
– চন্দ্রঘোনার ব্যাপ্টিস্ট মিশন হাসপাতালের আশেপাশের আদিবাসী পল্লীতে আশ্রয়-নেওয়া নার্সর ও তাদের ভাইয়েরা
– মুক্তিবাহিনীর পোশাক-পরা বাবলা ও স্টিফেন
জনের বাণী ছিল স্বাধীনতাবিষয়ক; তিনি শান্তির বাস্তবতা এবং সেই শান্তির সম্রাটকে জানার আনন্দবিষয়ে বলেন। তিনি আমাদের এমনকিছু বলেন যা তিনি আগে কখনো বলেননি।
”আমরা কী আশীর্বাদধন্যই না ছিলাম যে, ঈশ্বর স্বয়ং তাঁর প্রেমময় হাতে আমাদের সরাসরি পথনির্দেশনা দিয়েছিলেন! বাংলাদেশে যেরকম বর্বরতা সংঘটিত হয়েছিল তার কথা সারা পৃথিবী জেনেছিল। হত্যা, লুট, ধর্ষণ ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। বহু লোক তাঁদের বাড়িঘর ছেড়ে ভারতে কিংবা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল।
”প্রথম দিকে কিছু হিন্দু ও মুসলিম এমনকি খ্রিষ্টানও এখানে এই বাইবেল ইনফর্মেশন সেন্টারে এসেছিল আশ্রয়ের জন্য, তবে পরে প্রথম দলের সদস্যদের অধিকাংশ আরো দুর্গম অঞ্চলে, অধিকতর নিরাপদ জায়গার খোঁজে চলে যায়। কোনো এক মুহূর্তে আমাদের এখানে মোট একান্নজন লোক বাস করেছিল।
”প্রত্যেক রাতে আশ্রয় নেওয়া লোকদের সঙ্গে আমি কিছু সময় কাটাতাম প্রার্থনায়। আমি তাদেরকে বলি যে, আমাদের নিজের করে কোনো শক্তি, ক্ষমতা, জ্ঞান কিংবা প্রজ্ঞা কিছুই নেই। তবে ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে রয়েছেন।
”এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আমরা চতুর্দিক থেকে সারাক্ষণই গোলাগুলির আওয়াজ পেতাম। কলকারখানা সব জ্বলছিল। একদিন, দুপুরবেলায়, দুদিক থেকেই গোলাগুলি শুরু হল। আমাদের পেছনের রাস্তায় ছিল ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যেরা। আর আমাদের সামনের রাস্তার বাড়িগুলোর ভেতরে ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা। আমরা ছিলাম মাঝখানে। সোয়া তিনটা পর্যন্ত টানা যুদ্ধ চলেছিল- একা মিনিটও গুলি ছাড়া অতিবাহিত হয়নি। রাইফেল, মেশিনগান এবং অন্যান্য অস্ত্র থেকেও গুলি ছোড়া হচ্ছিল আকাশে। যখন আমাদের বাড়ির মাত্র পনেরো গজ দূরে এসে একটা মর্টার পড়লো তখন আমি ভাবলাম, আমাদের ছাদটা বুঝি উড়ে গেছে। জায়গাটা এমনভাবে কেঁপে উঠল, বুঝিবা ভূমিকম্প হচ্ছে। এর ফলে সবকটা জানালার কাচের শার্সি ভেঙে পড়ল। আমাদের সাইনবোর্ড ভেদ করে একটা বুলেট বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। সীমানা দেওয়ালে শেলের আঘাতে হাজারটা ছিদ্র হলো, তবে কেউই আহত হয়নি।
”আমরা সবাই মেঝেতে শুয়ে পড়েছিলাম; কয়েকজন নারী ভয়ে মূর্ছা গিয়েছিল। আমিও ভয় পেয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, তারা এখন আসবে আমাদেরকে মেরে ফেলার জন্য।
”পাকিস্তানি সেনারা আশেপাশের সবগুলো দালানের ছাদে উঠে চোখে দূরবিন লাগিয়ে চারদিকে নজরদারি করছিল। আমরা সবক’টা জানালায় পর্দা লাগিয়ে দিয়েছিলাম যেন তারা আমাদেরকে দেখতে না পারে। আমাদের কেউ কেউ পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখছিল। আমরা তাদেরকে দূরবিনটা আমাদের দিকে তাক করতে দেখি। আমরা নিশ্চিত ছিলাম সেই রাতে তারা এসে আমাদেরকে মেরে ফেলবে। পৃথিবীতে এটাই আমার শেষ রাত ভেবে আমি আমার মায়ের কাছে, পরিবারের বাকি সবাইকে, আমার বন্ধুদের এবং গির্জার সদস্যদের কাছে একটা করে চিঠি লিখি। আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি তাহলে তারা যেন আমাকে ক্ষমা করে দেয় এটা লিখি আমি তাদের।
”বাড়ির সবাই এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে, তারা কাঁদতে শুরু করে দেয়। আর তখনই বিশ্বাসের উদয় হয় আমার মনে। আমি সবাইকে ডেকে জিজ্ঞাসা করি, ’তোমরা কি প্রার্থনায় বিশ্বাস কর?’
” ’নিশ্চয়ই,’ তারা জবাব দেয়।
” ’তাহলে আমাকে প্রার্থনা করতে দাও।’
”সেই সন্ধ্যায় আমি কাঁদি আর প্রার্থনা করি। ’হে যিশু আমাদের প্রার্থনা শুনুন এবং আমাদেরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান।’ তারপর আমি আরও বলি, ’প্রভু যিশু, আমি আজ রাতে আমাদের চারপাশে আর কোনো গুলির আওয়াজ শুনতে চাই না।’
”আপনারা জানেন সে-রাতে কী হয়েছিল? সেই দালানে আমাদের কেউ একটা শব্দও শুনতে পায়নি। আপনারা কি মনে করেন আমাদের চারপাশের গোলাগুলি থেমে গিয়েছিল? নিশ্চয়ই নয়; জোর যুদ্ধ চলেছিল সারা রাত ধরে। কিন্তু সকালে আমাদের প্রতেকেই জানায় যে, তারা একটা শান্তিপূর্ণ রাত পার করেছে। কেউ কোনো শব্দই শোনেনি একেবারে!
”সকাল বেলায় আটজন পাকিস্তানি সেনা আসে, মেশিনগান, ওয়্যারলেস সেট ও ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে। তারা যখন পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকছিল সবাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। মেয়েরা ও বাচ্চারা আমার কাছে দৌড়ে এসে বলে, ’আর্মিরা এসেছে।’
”আমি ঠিক করি তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক ভাষায় কথা বলব। আমি উঠে দাঁড়াই, হাতে তিনটা বাইবেল নিয়ে, একটা ইংরেজি, একটা বাংলা আর একটা উর্দু ভাষায় লেখা। (তাদের মাতৃভাষায়, আমার উদ্দেশ্যে ছিল নিজেদেরকে খ্রিষ্টান হিসাবে দেখানো।) আমি বাইরে যাই তাদের সম্ভাষণ জানাতে। ’শুভ সকাল। কেমন আছেন?’ আমি এই কথা বলে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিই।
”দলনেতা আমার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে, ’থামো।’ আমি তাই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকি এবং তিনি আমার বুকের ইঞ্চি খানেক দূরে তার মেশিনগান ধরে রাখেন। অপর দুইজন আমার থেকে দুই গজ দূরে তাদের মেশিনগান তুলে ধরে, একজন ডানে আরেকজন বামে। মৃত্যু সুনিশ্চিত ছিল। সেই মুহূর্তে আমার একমাত্র চিন্তা ছিল, তারা সবাই যদি ট্রিগার চেপে দেয় তাহলে ঠিক কতটা বুলেট আমাকে ভেদ করে যাবে?
”তারপর তারা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে শুরু করে, ’এখানে কি কোনো মুক্তিযোদ্ধা আছে? এখান থেকে কি কোনো গুলি করা হয়েছে? তোমরা কি জানো বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা কোথায় লুকিয়ে আছে? এখানে যারা আছে তারা কারা?’
”আমি জবাব দিই, ’আমি খ্রিষ্টান। এরা আমাদের লোকজন।’
”আমি তাদেরকে বলি তারা আমাদের অফিস তল্লাশি করে দেখতে পারে, কেননা আমি নিশ্চিত ছিলাম সেখানে এমন কিছু নেই, আমরা নির্দোষ। তারা রুম থেকে রুমে যায়। একটা ছোট্ট স্টোররুম ছিল, যেটা তালাবদ্ধ ছিল। তারা হুকুম দিয়ে সেটাকে খোলায়। স্টোররুমে কিছু ফোনোগ্রাফ ছিল। তারা সেগুলোর কিছু নিয়ে যেতে চায়। আমি চাইনি তারা আমাদের যন্ত্রপাতি নষ্ট করুক, কিন্তু আমি ভাবলাম আমি যদি বলি আপনারা সেসব নিতে পারবেন না তাহলে তারা আমাদেরকে মেরে ফেলতে পারে, তাই আমি বললাম, ’ঠিক আছে আপনারা যদি এগুলো নিতে চান আমি কিছু বলব না, কিন্তু এতে করে আপনারাই বিপদে পড়তে পারেন কেননা এগুলো আমেরিকার সম্পত্তি।’ তারা রেকর্ডগুলো পরে আর নেয়নি।
”পাকিস্তানি সেনাদের সবসময় সন্দেহপ্রবণ মন ছিল। তারা যখন অফিস ত্যাগ করছিল, তখন পেছন ফিরে হেঁটে যায়, আমাদের দিকে মেশিনগানগুলো তাক করে, ’আমরা যদি এই বিল্ডিং থেকে কোনো শব্দ পাই তাহলে আর কোনো অনুসন্ধান না করেই আমরা তোমাদের হত্যা করব।’
”ঈশ্বর আমাকে শক্তি দিয়েছিলেন। আমি তাদের সামনে এগিয়ে যাই এবং তাদেরকে চলে যেতে বলি। তারা যদি একটা ধর্মীয় যায়গায় যুদ্ধ করতে চায় তারা তাদের নিজেদের মসজিদে গিয়ে সেটা করতে পারে, কিন্তু তারা কিছুতেই আমাদের গির্জায় সেটা করতে পারে না। আমি তাদেরকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে তাদের পেছনে দরজা বন্ধ করে দিই।
”ঈশ্বরের গৌরবের বিষয়ে আমরা এটুকু বলতে পারি যে, আমরা যত বীভৎসতা দেখেছি এবং যত তাণ্ডবের ভেতর দিয়ে গেছি তার মধ্যেও আমাদের একজন খ্রিষ্টান বাঙালিও নিহত হননি। ঈশ্বর আমাকে এই মন্ত্রটি দিয়েছিলেন, যেটা ছিল আমার শক্তি ও বাঁচার উৎস। ’তোমার পাশেই এক সহস্র পতিত হবে, এবং দশ সহস্র তোমার ডান পাশে কিন্তু তা তোমার নিকটে আসবে না কখনো।’ (স্তোত্র ৯১:৭)”
আমরা উঠে দাঁড়িয়ে একটা জনপ্রিয় বাংলা ক্রিসমাস ক্যারল গাই।
পতাকা তুলে গান গাও, ”যিশুর জয়”
সবাই একসঙ্গে গাও আজ তা।
বেথেলহামের আকাশে সত্যের সূর্য উঠেছে
এই আলোতে জ্ঞানীরা জাগেন।
স্নেহময় পিতা তাঁর পুত্রকে পাঠিয়েছেন
এবং পৃথিবীতে শান্তি ও ভালোবাসা আসবে।
পুত্রের প্রতি প্রশংসা, আমাদের পাপের বিনাশকারী
দুই হাত তুলে গাও, ”যিশুর জয়!”
জয় বাংলা! বাংলার জয় হোক!
জয় যিশু! যিশুর জয় হোক!
[সমাপ্ত]