জিনি লকারবি >> কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে : জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা >> তর্জমা : আলম খোরশেদ

0
216

কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে : জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা 

জিনি লকারবি ১৯৭৩ সালে On Duty in Bangladesh : The Story The Newspapers Didn’t Publish, বইয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অনন্য অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন খ্রিষ্টান মিশনারি, চট্টগ্রামে সেবিকার দায়িত্ব-ব্রত নিয়ে এসেছিলেন আটলান্টিকের ওপার, সুদূর আমেরিকা থেকে। মিশে গিয়েছিলেন এই দেশের মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত দুঃখ-বেদনা-আশার সাথে। তাদের সঙ্গে একজন বিদেশি হয়েও তিনি একইরকমভাবে চেয়েছিলেন পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা। তাঁর নিজের জবানিতে, “আমি তখন জানতাম না যে, একদিন, অর্ধেক পৃথিবী দূরে, একটি গোটা জাতির জন্মদৃশ্যের সাক্ষী হবার সৌভাগ্য হবে আমার।”  তখন কী প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি সেখানে? প্রত্যক্ষ করেছিলেন, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বস্ব-ত্যাগের প্রস্তুতি নিয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা এক জাতিকে। বইটিতে এসেছে ভুখা-নাঙ্গা, প্রতিনিয়ত বঞ্চনার শিকার তবুও বাংলা ভাষাকে নিয়ে গর্ব করা ও লকারবির ভাষায় ‘কবিস্বভাবের’ মানুষগুলোর যাতনার অবসানকল্পে সূর্যের মতো জ্বলে ওঠা এক নেতার নেতৃত্বের কথা—তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন এমন অনেককিছু, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে আরো গভীরভাবে জানতে-বুঝতে সাহায্য করে। সেই সময়ের বাস্তবতাকে তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতায় এমনভাবে ব্যক্ত করেন যে, তা আমাদের বিস্মিত করে। পুরো বইটিতেই তিনি আশ্চর্য এক ক্ষমতায় পক্ষপাতহীনতাকে অবলম্বন করেছেন; সত্যকে তুলে ধরার স্বার্থে। এই লেখা খুলে দেয় অনেক জটপাকানো ইতিবৃত্তের খোলস। আর দৃঢ়ভাবে উন্মোচিত করে এই জাতিসত্তার শেকড়ে লুকোনো প্রকৃত শক্তিকে। তাই এটি হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দলিল। এমনসব ঘটনার বিবরণে এই অসামান্য স্মৃতিচারণাটি ভরে আছে, যা ইতিপূর্বে কোথাও বর্ণিত হয়নি। বইটির বাংলা অনুবাদ, “কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে : জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা” ইতিপূর্বে একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল, কিন্তু সেই প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে তীরন্দাজ-এর পক্ষ থেকে অনুবাদক, শিল্পসংগঠক, সমালোচক আলম খোরশেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ইতিপূর্বে যতটা প্রকাশিত হয়েছিল সেই অংশগুলিসহ পরবর্তী অংশগুলির অনুবাদ তীরন্দাজেই সমাপ্ত করবেন বলে সম্মত হলে আমরা এই অসামান্য গ্রন্থটির অবশিষ্টাংশ প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। প্রিয় পাঠক, প্রথমে  তিন পর্বে ইতিপূর্বে প্রকাশিত অংশগুলি তীরন্দাজে প্রকাশিত হবে, এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে অসমাপ্ত অংশগুলি।

মূলগ্রন্থের ভূমিকা

বই লেখার চেয়ে দূরবর্তী আর কিছু ছিল না আমার মনে। ১৯৭১ এর ঘটনাসমূহ আমার হৃদয়মনে এমন গভীরভাবে দাগ কেটে আছে যে, সেটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো লিখিত বয়ানের দরকার পড়ে না। আমি সেইসব ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করে রাখি, এহেন পরামর্শের প্রতিক্রিয়া ছিল তাই শ্রেফ হেসে উড়িয়ে দেওয়া।

সেই বছরটি আমার মনে যে-স্মৃতি ও অনুভূতির উদ্রেক করে সেগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য দলিলপত্র কোথায় পাব আমি? আর, একটি পাণ্ডুলিপিকে গুছিয়ে তোলার মতো এত সময়ই বা আমার কোথায়? সেই সঙ্গে রয়েছে ইতোমধ্যেই কাজে ঠাসা দিনের ব্যস্ততার মধ্যে আরো কিছু নাছোড় প্রয়োজনের নিরন্তর রক্তচক্ষু প্রদর্শন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ভাবতে এবং প্রার্থনায় বসে আমি টের পাই, আমি আসলে এই প্রস্তাবনাটিকে মনে মনে বিবেচনা করছি। আমরা যারা সেই দিনগুলোতে বেঁচেছিলাম এবং জেনেছিলাম প্রভুর ওপর নতুনভাবে নির্ভর করা বলতে আসলে কী বোঝায়, শুধু আত্মরক্ষার জন্যমাত্র নয়, বরং জরুরি রসদ সরবরাহর জন্যও বটে, তাদের দায়িত্ব রয়েছে এই বাঁচার কৌশলগুলো অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার।

পড়ার টেবিলের ড্রয়ার ঘেঁটে আমি আঁকিবুঁকিকরা কাগজপত্র, পত্রিকার কাটিং এবং একখানা নোটবই, যাকে আমি মজা করে বলতাম ‘আমার জার্নাল’, খুঁজে বার করি। এইসব আরম্ভ থেকেই উৎপত্তি হলো অবশেষে এই আস্ত গ্রন্থটির।

আমরা যারা এই দেশে কাজ করছিলাম তাদের কাছে নাটকীয় এবং বিয়োগান্ত ঘটনাবলি অপরিচিত ছিল না মোটেও। ১৯৬৩ সালে মিশনারিদলে যোগ দেওয়ার পর থেকে আমরা এই এলাকার বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়গুলো দেখেছি, যে-স্থানটিকে বর্ণনা করা হতো “উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড় ডেকে আনা জলবায়ুজনিত শোষণবাটি” বলে; আমরা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের সবচেয়ে মেধাবী ভাষাবিদ বন্ধুটিকে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছি; একসঙ্গে মারাত্মক এক রোগভোগ করেছি, যার কারণে আমাদের হাসপাতাল এবং মিশনের অন্যান্য দপ্তর পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হয়েছিল; এই অঞ্চলে খ্রিষ্টের নামে নিবেদিত গির্জার জন্মপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে গিয়ে হতাশা ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় বেঁকে গিয়েছি।

কিন্তু ১৯৭১ এর ঘটনাসমূহ এর সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়।

এই বইয়ের ভেতর দিয়ে আমার, আমার সহকর্মীদের এবং বাংলাদেশি ভাইবোনদের (খ্রিষ্টান ও অখ্রিষ্টান নির্বিশেষে) যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা বর্ণনার উদ্দেশ্য আমার দ্বিবিধ :

—এই সময়টাতে যে-অসংখ্য ছেলেমেয়ে ও নারীপুরুষ তাদের অব্যর্থ প্রার্থনা ও বস্তুগত সাহায্যের মাধ্যমে আমাদের উপকার করেছেন তাদেরকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যোগানো

—তাদের সেই প্রার্থনারাশিকে, সত্যিকার ‘শেষহীন প্রার্থনা’টুকু এই নবজাত বাংলাদেশ ও তার পুনর্গঠনে লিপ্ত নবীন সরকারের উদ্দেশ্যে ন্যস্ত করা

বহু লোকেরই ধারণা নেই যে, ঈশ্বর তাদের ভালোবাসেন ও তাদের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে তিনি আগ্রহী এবং যিশু তাদের জন্যই প্রাণ দিয়েছেন। প্রার্থনায় সমবেত বিশ্বের সকল খ্রিষ্টধর্মীর প্রচেষ্টায় আমরা বাংলাদেশে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারি, যাতে করে সকল জাতি ও বর্ণের বিশ্বাসীরা এই সুসমাচারটুকু প্রচার করে যেতে পারেন।

জিনি লকারবি

চিটাগাং, বাংলাদেশ 

জয়বাংলার দেশে

এখন মধ্যরাত। জানালাগুলো আটকানো ও অর্গলবদ্ধ। সব দরজায় তালা। সামনের সিঁড়িতে কাঁটাতার বিছানো। বাঁশের আসনে বসা একটা ছোটোখাটো সাদাকালো কুকুর, চোর আসার সামান্যতম ইঙ্গিতেও খেঁকিয়ে ওঠার জন্য উৎকর্ণ। কেননা এটা বাংলাদেশ—একটি ক্ষুধার্ত দেশ!

বাইরে তখনও গুঞ্জরিত হচ্ছিল মানুষজনের আওয়াজ। গাড়িরা দ্রুত ধাবমান। একজন রিকশাচালক তার ঘন্টি বাজায়। বাচ্চারা কাঁদে। ঘুমাতে যাবার আগে বুড়িরা সুপুরি ছেঁচে, দিনের শেষ পানটি মুখে দেবে বলে। পুরুষেরা পায়চারি করে, এবং দিনের এই সময়েও কেউ একজন ঠিকই চিৎকার করে বলে ওঠে, জয় বাংলা! কেননা এটা বাংলাদেশ—একটি সুখী দেশ।

ক্ষুধা এখানে বরাবরই ছিল; আনন্দই বরং নবাগত।

আমি যখন নিউইয়র্কের ব্রুকলিন মেথডিস্ট হাসপাতালের ধাত্রীবিদ্যা স্কুলের ছাত্রী ছিলাম, তখনই জীবনে প্রথম জন্ম নামক অলৌকিক ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করি। আমি তখন জানতাম না যে, একদিন, অর্ধেক পৃথিবী দূরে, একটি গোটা জাতির জন্মদৃশ্যের সাক্ষী হবার সৌভাগ্য হবে আমার।

ঐতিহাসিকেরা সম্ভবত এটা স্বীকার করবেন যে, ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তানের দেশ ভাগাভাগির সময় থেকেই একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে বাংলাদেশের উৎপত্তি অনিবার্য ছিল। তবে, আমরা যারা এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেছি তাদের কাছে এটা ছিল এক নিদারুণ যন্ত্রণাদায়ক জন্ম। একটা স্বাধীন দেশের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূলে ছিল না কিছুই। অবশিষ্ট পাকিস্তান থেকে হাজার মাইলেরও বেশি দূরে অবস্থিত, একটি শত্রুরাষ্ট্র দ্বারা বিচ্ছিন্ন, পূর্ব পাকিস্তান ছিল ব্রাত্য ও সৎবোনতুল্য। তদুপরি, এই দুই অংশের মধ্যে সাদৃশ্যও ছিল খুব কমই। পশ্চিম পাকিস্তানিরা লম্বা, তাগড়া, সামরিক জাতি; বাঙালিরা ছোটোখাটো, কোমল ও কবিস্বভাবের। পশ্চিম পাকিস্তানিরা আকৃতি, প্রকৃতিতে আরবি-সদৃশ ভাষা উর্দুতে কথা বলে, আর বাঙালিরা তাদের সংস্কৃত-দুহিতা বাংলাকে নিয়ে গর্ব করে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা গম, আটাখেকো জাতি আর বাঙালির পাতে ভাত না থাকলে মনে করে তার খাওয়াই হয়নি বুঝি। পশ্চিম পাকিস্তানিরা ব্যবসাবুদ্ধিতে দড়, আর বাঙালিরা ঐতিহাসিকভাবে কৃষিকর্মে সিদ্ধহস্ত।

এমনকি আবহাওয়াও ছিল ঐক্যের বিরোধী। পশ্চিম পাকিস্তানের ভূপ্রকৃতি ছিল চরম ভাবাপন্ন: সুউচ্চ পর্বত আর রুক্ষ মরুভূমি, পাহাড় থেকে নেমে আসা জলধারা আর তপ্ত, শুকনো সমতলভূমি। বাংলা হচ্ছে নদী আর শ্যামলবরণ উর্বর কৃষিজমিতে ছাওয়া, ধানচাষের মৌসুমে যা মহামূল্যবান হিরে-মাণিক্যের মতো চকচক করে ওঠে। বস্তুত, যে-একটিমাত্র বন্ধন এই দুটি বিচ্ছিন্ন অংশকে এক করে রেখেছিল সেটি হচ্ছে ইসলাম ধর্ম। তবে পূর্ব অংশে সংখ্যাগুরু মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিশাল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজনের মেলামেশার কারণে এমনকি এই বন্ধনটিও বুঝি তেমন মজবুত ছিল না।

পাকিস্তানের গঠনপ্রক্রিয়ার একেবারে ভিত্তিমূলে প্রোথিত এইসব প্রকট পার্থক্যের কারণেই যে এই বৈষম্যেরও সূত্রপাত, সেটা বুঝতে তেমন কষ্ট হওয়ার কথা নয়। বহু ক্ষেত্রেই এই বৈষম্য দৃশ্যমান ছিল। সম্ভবত সবচেয়ে প্রকট ছিল এইগুলো :

এক. পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ ও পণ্য, যেমন পাট ও চা, থেকে উপার্জিত অর্থ এবং প্রাপ্ত বিদেশি সাহায্যের সিংহভাগই পূর্বকে বঞ্চিত করে পশ্চিম পাকিস্তানে চালান হয়ে যেতো।

দুই. অর্থনৈতিক নীতিমালার পক্ষপাতও ছিল পশ্চিমাংশের প্রতি: শুল্ককাঠামো ও নীতিমালা, আমদানি অনুমতিপত্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কারণে পশ্চিম থেকে পণ্য কিনতে বাধ্য হতো পূর্ব পাকিস্তান। প্রায়শই সেগুলো হতো অতীব নিম্নমানের, যা সাধারণ বিশ্ববাজার থেকেই অনেক কম দামে কেনা যেতো।

তিন. উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও বিদেশে পড়াশোনার জন্য বৃত্তিসমূহও অশোভনরকম অধিক হারে বরাদ্দ থাকতো পশ্চিম পাকিস্তানি প্রার্থীদের জন্য।

পাকিস্তান সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের হিসাব মতেই ১৯৬৯-১৯৭০ বছরের অর্থবছরে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তান থেকে ৬১ শতাংশ বেশি ছিল।

কিন্তু একজন ঠিকই উঠে দাঁড়িয়েছিলেন এই লাঞ্ছিত, বঞ্চিত বাঙালিদের স্বার্থরক্ষায়। তাঁর নাম? শেখ মুজিবুর রহমান—আদর করে যাকে সবাই ডাকতো ‘মুজিব’ বলে। তিনি বাঙালির কাছে কোনো আগন্তুক ছিলেন না। একটি মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে ১৯২০ সালে জন্মগ্রহণকারী এই মানুষটি মফস্বলের এক মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা শেষে প্রথমে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অধ্যয়ন করেন। সেখানেই তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য ছাত্রদের সংগঠিত করতে থাকেন। তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ গঠন করেন। এই অপরাধের জন্য তাঁকে জেলে প্রেরণ করা হয় এবং পরবর্তী দুই দশক তিনি দেশের বিভিন্ন কারাগারে কেবল আসাযাওয়া করতে থাকেন। তাঁর অপরাধ যে আসলে কী ছিল সেটা কখনোই স্পষ্ট করে বলা হয়নি, কিন্তু পাকিস্তান সরকার তাঁকে শত্রু ও পাকিস্তানের প্রতি হুমকি বলে বিবেচনা করতো। ১৯৬৬ সালে তিনি ছয় দফা প্রণয়ন করেন, যা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসন দাবি তোলে: স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা কিংবা বিচ্ছিন্নতা নয়! মুজিবের এই রাজনৈতিক মঞ্চ পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামাবাদভিত্তিক কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার অবসান দাবি করে কার্যত। কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র দপ্তর থাকবে কেন্দ্রের অধীন আর বাকি সব; শুল্ক, বাণিজ্য ও বিদেশি সাহায্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ ন্যস্ত হবে দুই প্রদেশের ওপর।

বাতাসে বিপদের আভাস পাওয়া যায়।

চট্টগ্রামের জীবন, ঘূর্ণিঝড় আর অন্যবিধ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাঝখানে, কখনোই সেই অর্থে স্বাভাবিক ছিল না (সেটার মানে যা-ই হয়ে থাকুক)। তবে, তার চেয়েও অন্ধকার ও অলক্ষুণে মেঘের ছায়া এই অঞ্চলের নড়বড়ে নিরাপত্তাকে ভয় দেখাচ্ছিল তখন।

রাজনৈতিক সংকট ঘনিয়ে আসছিল।

অশান্ত পূর্ব পাকিস্তানকে, যার জনসংখ্যা ছিল পশ্চিম থেকে কয়েক কোটি বেশি, শান্ত করার জন্য ১৯৭০ সালের কোনো এক সময়ে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

সেই নির্বাচনের সময় অবশ্য পাল্টাতে থাকে, অংশত, সম্ভাব্য তারিখের আগেআগে এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মানবেতিহাসের ভয়ঙ্করতম জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়টির কারণে, যার আঘাতে প্রায় পাঁচ লক্ষ লোকের মৃত্যু এবং কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটে।

ধ্বংসযজ্ঞের প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর সবার চিন্তা আবার নির্বাচনের তারিখের দিকে নিবদ্ধ হয়। দেশের তেইশ বছরের ইতিহাসে সেই প্রথমবারের মতো একটি অবাধ ও উন্মুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল।

কিন্তু যেখানে মাত্র বিশ শতাংশ মানুষ সাক্ষর সেখানে নির্বাচনের প্রচারণা চালানো এবং তা বাস্তবায়িত করা কীভাবে সম্ভব? কেমন করে? অবশ্যই ছবি ব্যবহার করে। রাস্তার প্রতিটি কোনা, প্রতিটি ল্যাম্পপোস্ট, দেয়ালের প্রতিটি শূন্যস্থান কোনো না কোনো দলের প্রতীকচিহ্নে ভরে ওঠে। সেগুলো ছিল সাইকেল, গরুর গাড়ি, হাতি, দাঁড়িপাল্লা, ছাতা ইত্যাকার নিত্যব্যবহার্য বস্তুর ছবি, যা এমনকি নিরক্ষর লোকেরাও চিনতে পারত সহজেই। বিশটিরও বেশি দলের সবারই ছিল একটি নির্দিষ্ট প্রতীক। তবে অগুরুত্বপূর্ণ এইসব জিনিসের ছবিকে ছাপিয়ে গিয়েছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রতীক তথা নৌকার ছবি।

মাইকে করে শহরের বড় মাঠ, পার্ক ও স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় রাজনৈতিক দলের সভাসমাবেশসমূহের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল দিনরাত। কখন কোথায় এইসব সভাগুলো হবে আপনাকে তার হিসাব রাখতে হতো, কেননা তখন শহরের সেইসব অঞ্চল দিয়ে চলাফেরা করাটা ছিল প্রায় অসম্ভব। সেরকমই একটি মিছিলে আটকা পড়ে এক সন্ধ্যায় আমার অফিসের একটা মিটিং হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল—এক ঘণ্টায় আমি রাস্তার মাত্র একটি মোড় অতিক্রম করতে পেরেছিলাম সেদিন। শহরের রাস্তাগুলো ছেয়ে থাকতো যত প্রচার-প্রচারণার বিজ্ঞাপন ও শ্লোগানে আর শান্তি, সমৃদ্ধি, স্বৈরশাসন থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি সম্বলিত পোস্টারসমূহে।

অবশেষে সেই বিখ্যাত দিনটি, ৭ই ডিসেম্বর ১৯৭০, উপস্থিত হলো। লোকজন সব রাস্তায় নেমে এলো, তাদেরও সবারই গন্তব্য স্কুল, অনুষ্ঠানকেন্দ্র, আদালত ভবনে স্থাপিত ভোটকেন্দ্রসমূহ—যেখানে স্বেচ্ছাসেবীরা বসে আছে তাদের ব্যালট সংগ্রহের জন্য। প্রথমবারের মতো নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবাই ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলো। ভোটের পরে একজন দিনমজুর তার মার্কিন মনিবের দপ্তরে গিয়ে হাজির হয়। চোখে পানি নিয়ে সে তার বুড়ো আঙুলখানি বাড়িয়ে দেয়। “আমার আঙুলের দাগটা দেখুন”, সে চিৎকার করে বলে, “এটা দিয়েই আমি আমার ভোট দিয়েছি।”

নির্বাচন বৈধ ও সুষ্ঠু ছিল, কিন্তু তার ফলাফল পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।

সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ধরেই নিয়েছিলেন যে, জাতীয় সংসদের মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৬৯টি আসনের ৬০ শতাংশ বড়জোর জিততে পারে আওয়ামি লিগ। বাকি আসনের ভোটাররা, তিনি ভেবেছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানি প্রার্থীদের সমর্থন দেবে, যাতে করে মুজিব সারাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। কিন্তু বিস্ময়কর এক বিজয়ের ঘটনায় আওয়ামী লীগ ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি আসনেই জয়ী হয়—যা ছিল সংসদের সামগ্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যথেষ্ট। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাধরেরা মুজিবকে চাপ দিচ্ছিলেন তাঁর ছয় দফার দাবিগুলোর ব্যাপারে আপোষরফা করার জন্য। জুলফিকার আলি ভুট্টো, পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস্‌ পার্টির প্রধান, যারা মোট ৮০টি আসনে জয়ী হয়েছিল, দাবি করেছিলেন যেন বাণিজ্য ও বিদেশি সাহায্যের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের হাতে থাকে। মুজিব এতে সম্মত না হলে ভুট্টো ১৯৭১ সালের তেসরা মার্চে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ অধিবেশন বয়কটের ঘোষণা দেন।

ফেব্রুয়ারি মাসে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে তা শেষ হয় অচলাবস্থায়। বাঙালিরা আঁচ করতে পারে যে, নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে না। সংখ্যাগুরু বাঙালি ও অবাঙালি বিহারিদের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের শত্রুতা তখন রক্তাক্ত ধর্মঘট ও দাঙ্গারূপে বিস্ফোরিত হয়। লন্ডন অবজার্ভারের ১৮ই এপ্রিল ১৯৭১ সংখ্যায় বিহারিদের সম্পর্কে বলা হয় :

১৯৪৭ সালে দেশভাগের রক্তারক্তির সময় হিন্দুদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাবার জন্য, ভারতীয় রাজ্য বিহারের এই উর্দুভাষী মুসলমানেরা শরণার্থী হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানে আসে। বিহারিরা, যাদের অধিকাংশই ছিল বণিকশ্রেণির, দ্রুত ভারতে পালিয়ে যাওয়া হিন্দুদের দোকানপাট দখল করে বসে। বাঙালিদের এই আতিথেয়তার বদলা দেয় তারা ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুভাষী সৈন্যদের দালালি ও দেখভালের কাজ করে, যাদের সঙ্গে তারা অধিকতর নৈকট্য অনুভব করতো।

চট্টগ্রাম শহরে রাত্রি নামলে বেসামরিক গাড়িতে করে সেনাবহিনীর গুদামের অস্ত্রশস্ত্র বিতরণ করা হতো অবাঙালিদের ঘরে ঘরে। হঠাৎ করে সেই বাড়িগুলোতে অতিথিদের আগমন বেড়ে গেল—সাদা পোশাকপরা কমান্ডোসেনাদের। এইসব ঘটনার খবর জানাজানি হয়ে গেলে গুজবের ডালপালাও বাড়ে এবং বাঙালিরা তখন বাঙালি ছাড়া আর সবাইকেই অবিশ্বাস করতে শুরু করে।

মার্কিন মিশনারিরাও এই রাজনৈতিক ডামাডোল থেকে মুক্ত ছিল না। আমার তা জানার যথেষ্ট কারণ ছিল।

এটা শুরু হয়েছিল খুব সাদামাটাভাবেই। আমাদের গির্জায় প্রার্থনা করতে আসা এক পরিবারের জনৈক তরুণ সদস্যের যক্ষা হয়েছিল। পরিবারটি যথেষ্ট আর্থিক দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তার ওপর বাড়ির বড়কর্তাও ভুগছিলেন কর্কটরোগে। আমি পুরো পরিবারটিকেই সরকারি যক্ষা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম আর তাদের পরিচালিত স্বাস্থ্যনিবাসের নির্বাহীর সঙ্গেও দেখা করেছিলাম এই আশায়, যদি তরুণটিকে সেখানে বিনা পয়সায় ভর্তি করে দেওয়া যায়। তো, ছেলেটিকে আমি নিজেই গাড়ি চালিয়ে সেখানে রেখে এসেছিলাম এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে, প্রতি সপ্তাহেই আমি তার পরিবারের কাউকে না কাউকে নিয়ে আসব তার কাছে।

আর তারপর আসে ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সাল।

আমি ছেলেটির মা, ঠাকুরমা, দশ বছরের বোন ও উনিশ বছরের ভাইকে নিয়ে তাকে দেখতে যাই। আমাদের খুব সুন্দর সময় কাটে সেখানে। আমি খাবারদাবার ও সেবার মান নিয়ে তার অভিযোগ শুনি এবং এই সিদ্ধান্তে আসি যে, সেখানে সে ভালোই রয়েছে। বাড়ি ফেরার পথে, ছোট মেয়েটি কোনোদিন সমুদ্র দেখেনি বলে, আমরা মূল রাস্তা ছেড়ে কয়েকমিনিটের মতো ভেতরের দিকে এগিয়ে যাই। সেই রাস্তায় প্রচুর নির্মাণসামগ্রী পড়ে ছিল : আলকাতরার ড্রাম, ইটপাথরের স্তূপ ও একটি গাড়ি। আচমকা একটি বাচ্চা মেয়ে রাস্তা পেরুতে শুরু করে। আমি ব্রেকে চাপ দিয়ে হর্ন বাজাতে থাকি।

মেয়েটি রাস্তা না পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় এবং আমাকে দেখিয়ে বলে ওঠে : “দেখো, একটা মেয়ে গাড়ি চালাচ্ছে।”

তারপর সে সরাসরি আমার গাড়ির দিকে এগিয়ে আসে।

আমি কোনোদিনই নিশ্চিত করে বলতে পারব না, এরপর কী হয়েছিল। ব্রেক কাজ করেনি, নাকি মেয়েটাই গাড়ির নিচে গড়িয়ে গিয়েছিল নাকি—আমি জানি না। কিন্তু অই মুহূর্তে আমি তার ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিই!

আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, বলাই বাহুল্য, গাড়ি থামিয়ে গিয়ে দেখা তাকে কোনো সাহায্য করা যায় কিনা। নির্মাণসামগ্রীর জঞ্জালের মধ্যেই এঁকেঁবেঁকে গাড়িটি পার্ক করার একটা জুতসই জায়গা খোঁজার মধ্যেই আমি শুনতে পাই, উনিশ বছরের নির্মল চিৎকার করে বলছে, “দিদি চালিয়ে যান, তাড়াতাড়ি গাড়ি চালান।”

ততক্ষণে প্রচুর মানুষ আমাদেরকে ঘিরে ধরেছে। বিশাল বিশাল ইট ও পাথর ছুঁড়ে মারা হচ্ছিল আমাদের দিকে, আমি স্টিয়ারিং হুইলে মাথা নামিয়ে সেই শিলাবৃষ্টি থেকে বাঁচার চেষ্টা করি। আমি মরে গেছি ভেবে নির্মল গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে পাগলের মতো ঘোরাতে থাকে। আমি সোজা হয়ে বসে, অ্যাক্সিলেটরে জোরে চাপ দিই, কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থাতেই যে-গাড়ির গায়ে তেমন একটা জোর ছিল না, তাকে নিয়ে এই লোহালক্কড়ে-ঢাকা পথে আমি বেশিদূর এগুতে পারি না।

ভিড় করে আসা লোকের দঙ্গল রাস্তায় সদা-উপস্থিত বেবিট্যাক্সি ও সাইকেলগুলো দিয়ে আমাদের রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে শুরু করে।

তারপর শুরু হয় সত্যিকারের সংকট। তারা আমার গাড়ির চাবি নিয়ে নেয়, গাড়িটাকে চিৎ করে ফেলতে চেষ্টা করে, সামনের উইন্ডশিল্ডের জায়গায় সৃষ্ট বিশাল ফুটো দিয়ে তারা নির্মলকে টেনেহিঁচড়ে বার করে নিয়ে বেদম পেটাতে শুরু করে।

ঘটনার পরম্পরা আমার কাছে এখনও একটু অস্পষ্ট, তবে হঠাৎ করে একজন পাকিস্তানি প্রকৌশলীর আগমনের কথা মনে আছে। তিনি ঘটনাটা আন্দাজ করেন, একজন সুদর্শন ব্যক্তিকে গাড়ির কাছে পাঠিয়ে তিনি নিজে যান পুলিশের কাছে। আমাদেরকে পাহারা দেবার জন্য যাকে পাঠানো হয়েছিল তিনি আসলে একজন দোকানদার ছিলেন, যিনি আবার স্থানীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের একজন নির্বাচিত সদস্যও। তিনি জনতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজটা ভালোভাবেই করেন, একই সঙ্গে আমাদের বলতে থাকেন যে, তিনি না এসে পড়লে আমাদের সবাইকে মারা পড়তে হতো, তবে এখন যেহেতু তিনি আছেন, তখন আমাদের আর ভয়ের কিছু নেই! এই হট্টগোলের মধ্যে নির্মল এক ফাঁকে সটকে পড়ে এবং রিকশা করে ছয় মাইল দূরে, চট্টগ্রাম শহরে আমাদের মিশনের সদরদপ্তর তথা বাইবেল ইনফরমেশন সেন্টারে গিয়ে হাজির হয়।

নির্মল যখন সাহায্যের জন্য ছুটছিল, তখন আমি, ছোট মেয়েটি, তার মা ও ঠাকুরমা শত্রুপক্ষে পরিপূর্ণ সমুদ্রের মধ্যে একটি দ্বীপের মতো বসে ছিলাম।

‘বিদেশি!’, ‘আমেরিকান!, ‘খ্রিষ্টান!‘ এই অভিধাগুলো গালির মতো করে বারেবারে ছুঁড়ে মারা হচ্ছিল আমাদের দিকে। আমি আমার স্থান বদল করার সাহস পাই না, কেননা আমি ভাঙা কাচ আর ইটের টুকরো দ্বারা চতুর্দিকে পরিবেষ্টিত হয়ে ছিলাম।

মানুষগুলো যখন গাড়ির ওপর হামলে পড়ছিল তখন ছোট মেয়েটি আতঙ্কে ছটফট করছিল। তার মা আমার কথা বলে জনতার সঙ্গে বোঝাপড়া করার চেষ্টা করছিলেন। “সে একজন নার্স। তাকে সাহায্য করতে দিচ্ছেন না কেন? আপনারা ছোটো বাচ্চাটিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দিচ্ছেন না কেন? আমাদের একটা ভালো হাসপাতাল আছে। মেয়েটি সেখানে ভালো হয়ে যাবে।”

বৃদ্ধাটি পেছনের সিটের এক কোনায় সোজা হয়ে বসে ‘হায় যিশু’, ‘হায় যিশু’ করেই যাচ্ছিলেন।

দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে।  আর সন্ধ্যা সাতটায় দিকে আমাদের মিশনের রেভারেন্ড রেইড মিনিখ আসেন অকুস্থলে। (নির্মলের মুখ থেকে ঘটনার রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা শুনে তিনি এত দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে ততদিনে তিনদফা দায়িত্ব পালন-করা প্রবীণ মিশনারি রেভারেন্ড জিন গুরগানুসকেও বলে আসতে পারেননি, তিনি কোথায় যাচ্ছেন। জিন শুধু অ্যাক্সিডেন্ট শব্দটি শুনতে পান, আর কিছু নয়।) ঠান্ডা, অন্ধকারে সেই দোমড়ানো গাড়ির ভেতরে বসে থাকা আমাদের কাছে রেইডকে তখন হোন্ডায় চেপে আসা, ‘চকচকে বর্মগায়ে একজন সেনাপতির’ মতো মনে হয়েছিল।

তিনি কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন এবং দ্রুতই আমরা একটা পুলিশের গাড়িতে করে বাড়ির দিকে (তিনি ভেবেছিলেন আর কি) যেতে থাকি। পুলিশ চালকের অন্য ভাবনা ছিল মনে। সে আমাদেরকে থানায় নিয়ে যায়, যেখানে আমাকে গণ্য করা হয় একজন ‘অপরাধী’ হিসাবে। আমি উঠে দাঁড়ালে তারা আমাকে বসতে বলে। একসময় তারা নির্মলের পরিবারকে যেতে দেয়, এবং তারা আমার খবর জানাতে সোজা গিয়ে হাজির হয় গুরগানুসের বাড়িতে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জিন এসে উপস্থিত হন। এখন তাদের বন্দি হলো দুজন! আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের একজন বিশুদ্ধ ভদ্রলোক, জিন বুঝেছিলেন ততক্ষণে আমার একটু ‘হালকা হবার’ প্রয়োজন পড়ার কথা। তিনি খুব বিনয়ের সঙ্গে পুলিশ অফিসারের কাছে তাদের বাথরুমের অবস্থান বিষয়ে জানতে চান।

“এখানে সেরকম কিছু নেই,” তার ত্বরিৎ জবাব আসে।

“কী বলছেন আপনি, অবশ্যই কিছু না কিছু একটা ব্যবস্থা থাকবে এখানে,” জিন বলেন।

“আপনারা সেটা ব্যবহার করতে পারবেন না। আপনারা ঘর ছেড়ে কোথাও যেতে পারবেন না।” অফিসার চিৎকার করে বলেন।

“আপনি এরকম একটি অনুরোধে কিছুতেই না করতে পারেন না,” জিন জোর দিয়ে বলেন।

অফিসার তখন হার মানেন। বাইরে তখন অন্ধকার হলেও জিন আর আলো চেয়ে তাঁর ভাগ্যের ওপর বাড়তি কোনো চাপ সৃষ্টি করার ঝুঁকি নেন না, তিনি একটা বাচ্চা ছেলেকে রাস্তার ওপারের দোকান থেকে মোমবাতি কিনে আনতে পাঠান। আমরা তখন বাইরের ঘরের দিকে এগুতে থাকি : মোমবাতি হাতে একটি ছোটো ছেলে, একজন পুলিশ প্রহরী, জিন ও আমি।

রাত সাড়ে নয়টার দিকে মিনিখ সব আইনি ঝামেলার ফয়সালা করে ফেরত আসেন। ‘জনতা’, যার মধ্যে ছিল ছোটো মেয়েটির গ্রামের লোকজন, (তবে মেয়েটির বাবা মায়ের সম্পর্কে খুব কমই জানা গিয়েছিল), চায়নি পুলিশ কোনো মামলা করুক। জনতা একটা জরিমানা নির্ধারণ করে—ছয়শত টাকা। এটাকে নাকি কম করেই ধরা হয়েছে কেননা : এক. ঘটনার শিকার মেয়ে, দুই. তার কোনো শিক্ষাদীক্ষা ছিল না, তিন. সে গরিব ঘরের মেয়ে ছিল। আমার কাছে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় ছিল এটাই যে, তাদের মধ্যে একজনও একটি প্রাণের বিয়োগে কোনোপ্রকার দুঃখপ্রকাশ করেনি। ভাবখানা ছিল এরকম যে, “কী হয়েছে যে সে মারা গেছে! সবাইকেই তো মারা যেতে হয়।” তারা ঘটনাটির পুরোপুরি একটি জাতীয়তাবাদী ও রাজনৈতিক চেহারা দিতে চাইছিল : আমি বিদেশি। আমি একজন বাঙালির ক্ষতি করেছি।

বেশ কয়েক সপ্তাহ পরেই কেবল আমি বুঝতে পারি আমার অবাঙালি হওয়ার বিষয়টা সেদিন কতখানি বিপক্ষে গিয়েছিল আমার।

পরে নির্মল সেই যক্ষা হাসপাতালে তার ভাইকে দেখতে গিয়েছিল আবার। ঝোঁকের মাথায় সে দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই একটি চায়ের দোকানে ঢোকে এবং কৌশলে আলোচনাকে সেদিনের ঘটনার দিকে নিয়ে যায়।

“আপনাদের মনে আছে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নাগাদ এখানে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল?” সে জিজ্ঞাসা করে।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ”, সবাই তার বর্ণনা দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে।

“একজন সাদা মেমসাহেব গাড়িটা চালাচ্ছিলেন,” সবাই একযোগে বলে ওঠে।

“কী ঘটেছিল আসলে?” নির্মল তাদের উস্কে দেয়, আর তারাও তাদের মতো করে খুঁটিনাটির বিবরণ দিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সে জিজ্ঞাসা করে, “মেয়েটি কি মরেই গিয়েছিল?”

“মারা গিয়েছিল? না, সে মারা যায়নি তো! আপনি তাকে দেখতে চান?”

নির্মল ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। আমাদেরকে এই গল্প করতে করতে সে তার রাগ চেপে রাখতে পারছিল না এই কারণে যে, তারা আমাদেরকে বোকা বানিয়ে ‘জনতা’র কথা বলে আসলে স্থানীয় নেতাদের পকেট ভারি করেছিল।

আমার সেটা নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। বাচ্চা মেয়েটা বেঁচে গিয়েছিল সেটাই বড় কথা! তবে, সেদিনের ঘটনাটিকে ঘিরে আমার মনে সারাজীবন এক অদ্ভুত, বর্ণনাতীত অনূভূতি জেগে থাকবে, সন্দেহ নেই।

যে-ঈশ্বর সবই দেখেন  

১৯৭১-এর গোড়ার মাসগুলোতে আমাদের মিশনের কর্মীরা পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের চারটি এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। স্বাভাবিকভাবেই, উত্তেজনা বাড়ার সাথে সাথে আমরা একে অপরের অবস্থা বিষয়ে জানতে উন্মুখ হয়ে পড়ি। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে তিনজন বাচ্চা ও আমরা পাঁচজন বয়স্ক ব্যক্তি ছিলাম। আমাদের অবস্থান থেকে পঁয়ষট্টি মাইল দক্ষিণে মালুমঘাটের মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতালে উনিশজন বয়স্ক ও ছাব্বিশটি বাচ্চা ছিল। ধীরগতির দেশি নৌকায় আর ভাঙ্গাচোরা রাস্তায় আটঘণ্টার দূরত্বে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তে, হেব্রনে আমাদের জঙ্গলবাড়িতে ছিল আরেকটি দম্পতি ও তাদের দুই বাচ্চা। অন্য দিকে, বরিশালের দুর্গম এক শহরে, যেখানে আমাদের প্রাচ্যভাষা ইন্সটিটিউটটি অবস্থিত ছিল, সাতটি বাচ্চা ও আটজন বয়স্ক ব্যক্তি ছিল। আমাদের সবচেয়ে বেশি চিন্তা ছিল এদের নিয়েই, কেননা তারাই আমাদের সবচেয়ে নবীন কর্মীদল। পরে, তারা যখন তাদের অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছিল, তখন আমাদের নতুন করে মনে হয়েছিল, ঈশ্বর সবচেয়ে প্রবীণ মিশনারিটির চেয়েও হাজার গুণে ভালো যত্ন নিতে পারেন তাঁর সেবকদের।

“আমরা সমস্যার প্রথম ইঙ্গিত পাই,” উত্তর মিশিগান থেকে আগত পয়লা মেয়াদের মিশনারি ড. জো ডিকুক বলেন, “যখন ফেব্রুয়ারি মাসে ডাক ধর্মঘট শুরু হয়। এতে বরিশালে যারা ছিল তারা কেবল বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নই হয়ে গেল না, আমাদের মিশনপরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের পথও গেল বন্ধ হয়ে।”

আমরা আমাদের ভাষা শিক্ষকদেরও মধ্যে, বিশেষ করে যারা হিন্দু ছিলেন, তুমুল উৎকণ্ঠা লক্ষ করি। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহের দিকে তাঁরা উত্তেজনা ও অস্থিরতার কারণে পড়াতেই পারছিলেন না আর।

“যেহেতু দেশব্যাপী ডাকধর্মঘট সফল হয়ে গেল, আমাদের মনে হল এরপর শুরু হবে পরিবহণ ধর্মঘট। তাহলে তো আমরা বরিশালেই আটকা পড়ে যাব। মার্চের ৮ তারিখের মিশন ফিল্ড কাউন্সিল মিটিংয়ের জন্য আমরা ৫ তারিখে চিটাগাং যাওয়ার জাহাজের সিটের বুকিংও দিয়ে রেখেছিলাম।”

“তবে মার্চের ১ তারিখেই ইয়াহিয়া খান জাতীয় সংসদ অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করেন এবং সারা দেশ জুড়ে ভয়ানক বিক্ষোভ শুরু হয় তার ফলে। ক্ষমতাসীন সরকার শহরে ও বন্দরে নানারকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বাঙালিরা দপ্তরের কাজ এবং স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে অস্বীকার করার মাধ্যমে এর প্রতিবাদ জানায়।”

“তাতে করে তখনকার মতো স্কুল কর্মকাণ্ডও শেষ হয়ে যায়! ৫ তারিখ সকালে জাহাজ আদৌ ছাড়বে না ভেবে, আমরা বরিশাল পরিত্যাগের অন্য উপায়ের খোঁজখবর নিতে শুরু করি। উত্তরমুখী সড়ক ধরে ঢাকা যাওয়া যায়, কিন্তু পথে চওড়া এক নদী পারাপারের ফেরি পড়বে, কিন্তু যেহেতু সবরকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, সেই ফেরি আদৌ ছাড়বে কিনা তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। স্বাভাবিক অবস্থায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দিকে যে-ট্রেন চলে সেগুলোও চলছে কিনা কে জানে? যে-কোনো অবস্থাতেই হোক ট্রেনস্টেশন পর্যন্ত যেতে হলেও তো আমাদেরকে নৌকা কিংবা স্টিমার ধরতে হবে। তবে এগুলো চালু থাকলেও, পনেরোজনের এত বড় দল ও মালপত্র নিয়ে, আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত একটি দেশের মহাসড়ক ধরে ঢাকার পথে যাত্রা করাটাও বুদ্ধিমানের কাজ হত না। আমরা কোনো ব্যক্তিগত বাহনও পাচ্ছিলাম না, এমনকি দাঁড়টানা কোনো নৌকাও নয়, যেটা আমাদেরকে চট্টগ্রাম নিয়ে যেতে পারে।”

“একটা জাহাজ অবশ্য বরিশাল থেকে ঢাকা যাচ্ছিল মাঝেমধ্যে, আটকেপড়া বিদেশিদের নিয়ে, কিন্তু ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার কোনো উপায় জানা ছিল না আমাদের। আর সেই জাহাজ চড়ে বসা মানে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার জন্য সম্মত হওয়া, যেটা চাচ্ছিলাম না আমরা কেউই। দেশের বাইরে গেলে আমাদের অনেকেরই আবার ফেরত আসার ভিসা ছিল না। মার্চের ৫ তারিখে মাত্র আধা ঘণ্টার নোটিশে ভাষাশিক্ষার জন্য আসা অন্য ছাত্ররাও সব চলে যায়। (আমরা অবশ্য জানতামই না যে তখন ঐ জাহাজটি ছেড়ে যাচ্ছিল, সেটা পরের দিনই কেবল জানতে পারি আমরা।)”

ড. ও মিসেস ডিকুকের একটা ধারণা হয়েছিল, তাঁদের সব জিনিসপত্র ৫৫ গ্যালনের ড্রামে ভরে, যেনবা তাদেরকে পৃথিবীর অপর প্রান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হবে, এমনভাবে মুখ আটকে দেবার সময় এসে গেছে। তাঁদের সেই ‘অনুভূতি’টা প্রায় দৈব বলে প্রমাণিত হয়েছিল। বিলস্‌রা একটা ভাষা কোর্স করতে এসেছিলেন; যারা দ্বিতীয় মেয়াদের মিশনারি, ফলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার অভিজ্ঞতায় প্রবীণ। তাঁরা কীভাবে বুঝবেন যে, তাঁদের অভিজ্ঞতার ভান্ডারে থাকা অন্যান্য সংকটগুলো থেকে এটা একেবারে আলাদা হবে? কিন্তু, মার্জরি বিল্স্, এক ধরনের ভেতরের তাগিদের বশে, তাঁর পড়ার সময় থেকে কয়েক ঘণ্টা চুরি করে, একটা কাজের কাজ করেন, যেটা করার ইচ্ছা ছিল তাঁর অনেকদিনের। তিনি মিশনের শিশুদের, বন্ধুবান্ধব এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মূল্যবান ছবিগুলো ঝাড়াই বাছাই করে একটা অ্যালবামে সেঁটে, এক সপ্তাহের জন্য ফিল্ড কাউন্সিল মিটিংয়ে যাবার জন্য নেওয়া সুটকেসের একেবারে তলায় রেখে দেন!

তাঁর স্বামী, মেল বিল্স্ ও বব আডল্ফ্, আমাদের ল্যাব প্রযুক্তবিদ, মার্চের ৭ তারিখ থেকেই বন্দরে আঠার মতো লেগে থাকেন কোনো জাহাজ আসে কিনা তা দেখার জন্য। হঠাৎ একদিন তাঁরা দূর থেকে একটা হালকা হুইসেলের শব্দ শুনতে পান। তাঁরা তখন সাইকেলে যত জোরে সম্ভব প্যাডেল মেরে অ্যাপার্টমেন্টে এসে আমাদেরকে তক্ষুণি রওনা দিতে বলেন। তাঁরা ভক্সওয়াগন মিনিবাসে মানুষ ও মালপত্র ভরে মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যেই সবাইকে ডকে পৌঁছে দেন। জো ডিকুক আবারও ঘরে ফিরে গিয়ে গাড়িখানাকে গ্যারাজবন্দি করেন, তারপর একটা রিকশা ধরে তার চালককে বাড়তি পয়সার লোভ দেখিয়ে দুইমাইলের পথটুকু দ্রুত পাড়ি দিয়ে ঠিক সময়েই পৌঁছে যান বন্দরে।

ড. ডিকুক তার গল্প এখান থেকেই শুরু করেন।

“সোমবার সন্ধ্যায় আমরা চট্টগ্রাম পৌঁছাই নিরাপদেই। জিন গুর্‌গানস সারা সপ্তাহেই বরিশাল থেকে চাটগাঁয় আসা জাহাজের খোঁজ নিয়ে যাচ্ছিলেন—কিন্তু যেগুলোর আসার কথা সেগুলো কখনোই আসতো না। ফলে আমাদের অনির্ধারিত জাহাজটা যখন এসে পৌঁছালো, তখন আমরাই বাড়ি গিয়ে তাঁকে গিয়ে ডেকে আনি। বন্দর থেকে শহরে যাওয়ার পথে তাঁর গাড়িতে বসে আমরা জানতে পারি, মার্চের ৬ তারিখ, যেদিন আমাদের আসার কথা ছিল, সেদিন সাংঘাতিক যুদ্ধ হয়েছে বন্দরে। তাহলে ঈশ্বরই কি জাহাজটি দেরি করিয়েছিলেন আমাদেরকে বাঁচানোর জন্য?”

“ঈশ্বর আমাদের জন্য আরও বিশেষ কিছু করেছিলেন—আমরা যেসব সম্পর্কে সবখানেই প্রচুর পড়ে থাকি এবং দেশে আমাদের বন্ধুরা সবসময় যে-প্রার্থনাগুলো করে যাচ্ছিলেন আমাদের জন্য। আমরা মালুমঘাটে আমাদের হাসপাতাল প্রাঙ্গণে নিরাপদেই ছিলাম। কিন্তু বরিশালে, সেই তিনটি শূন্য বাসায়, ছিল হাজার হাজার টাকা দামের যন্ত্রপাতি : ক্যামেরা, টেপ রেকর্ডার, রেডিয়ো, তৈজসপত্র, গার্হস্থ্য সামগ্রী, এবং কাপড়চোপড়। মে’র শেষ দিকে মিলিটারি পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে বরিশাল ছিল রীতিমতো চোরডাকাতের অভয়ারণ্য। আইনহীনতা ও বিশৃঙ্খলাই ছিল যেন সাধারণ নিয়ম। আমাদের পাশের বাড়িটিকে নাকি ষোলোজন ডাকাতে মিলে একেবারে খালি করে দিয়েছিল প্রখর দিবালোকেই। তারা জানত তিনটি আমেরিকান পরিবার কোনো একটি বাসায় থাকে সেখানে—এবং তারা কোথায় চলেও গেছে! নৈশপ্রহরী হিসাবে যাকে নিয়োগ করা হয়েছিল, যে কিনা সিঁড়িঘরে ঘুমাত, এবং সামান্য এক প্যাঁচার ডাকেই দৌড়ে পালাতে সিদ্ধহস্ত ছিল।”

মেল বিল্স্ ও আমি জুনের দিকে বরিশালে ফিরি ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে। বাড়িটার দরজা একবার ভাঙা হয়েছিল ঠিকই, একটি ক্যামেরা ও কিছু কাপড়ও খোয়া গেছে, তবে সিংহভাগ জিনিসই অক্ষত ছিল। আমরা বিছানা, চুলা, ফ্রিজ, এবং ড্রামভরা গার্হস্থ্য সামগ্রী বাক্সবন্দি করে পর্বতপ্রমাণ এক বোঝা নিয়ে বন্দরে যাই। প্রতি দশদিনে একটা জাহাজ আসত বরিশালে, তবে আমাদের বলা হয় যে, তারা কেবল সামরিক জিনিসই বহন করে।

ঘাটবাবুর কাছে গেলে আমাদের লটবহর দেখে তিনি বলে ওঠেন ‘এটা অসম্ভব’, তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে কী ভেবে ধীরস্বরে বলেন, “আপনারা তো দেখছি মহা ঝামেলায় আছেন। ঠিক আছে, আমি এগুলোকে চট্টগ্রামে পাঠানোর জন্য যা করা দরকার করব।” এবং তিনি তা করেছিলেন বৈকি! সবই নিরাপদে চট্টগ্রাম পৌঁছায়। তখনকার পরিস্থিতিতে এটা অলৌকিকের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।

“ঈশ্বর আমাদের জন্য সেটা না করলেও পারতেন। কিন্তু সেসব তো ছিল তাঁরই জিনিসপত্র যেগুলোকে তিনি নিরাপদে রাখার যোগ্য ভেবেছিলেন।”

আরো একদিন ঈশ্বর আমাদের প্রতি তাঁর বিশেষ দয়া দেখিয়েছিলেন। আমাদের হাইস্কুলগামী তরুণ দলটি তখন পশ্চিম পাকিস্তানের মারী খ্রিষ্টান স্কুল থেকে শীতকালীন ছুটি কাটাতে বাড়ি এসেছিল। নতুন সেমিস্টার শুরু হব হব করছিল তখন, চারজনের জন্য সেটা ছিল আবার একেবারে স্নাতক হবার আগের চূড়ান্ত সেমিস্টার। স্বাভাবিকভাবেই তাদের অভিভাবকেরা দেশের এই আসন্ন গোলযোগের মুখে চারটি মেয়ে ও তিনটি ছেলেকে সেখানে পাঠাতে দ্বিধা করছিলেন, আবার এই চিন্তাও ছিল তাদের মনে যে, সত্যি যদি গোলমাল শুরুই হয়ে যায় এখানে, তাহলে বাচ্চারা হয়তো স্কুলেই ভালো থাকবে। যে-ছাত্ররা হাসপাতালে থাকত তারা ৯ তারিখে চট্টগ্রাম শহরে আসে ট্রেনে করে ঢাকায় যাবে বলে, তারপর সেখান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে। পরিকল্পনা ছিল তারা পূর্ব পাকিস্তানের অপর মিশনারি বাচ্চাদের সঙ্গে একসাথে ভ্রমণ করবে। সত্যি বলতে কী, আমাদের এই কিশোরবয়সী শিক্ষার্থীরা সবসময় ছোটো বাচ্চাদের অভিভাবক হিসাবেই তাদের দেখভাল করত, বোর্ডিং স্কুলে যাওয়া আসার সময়টাতে। ১০ তারিখ খুব সকালে তারা ট্রেনস্টেশনে গিয়ে জানল যে, কোনো টিকিটই আর অবশিষ্ট নাই। তাতে তখন একটামাত্র পথই খোলা থাকে : ভোক্স ওয়াগন বাসে করে সড়কপথে সারাদিন লাগিয়ে রাত্রিবেলায় ঢাকায় গিয়ে পৌঁছানো।

রেভারেন্ড জে ওয়ালশ, যিনি বাচ্চাদের সঙ্গ দিচ্ছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানে যাবার বিমানে জায়গা পাবার বিষয়ে তাঁর হতাশার কথা এভাবে বলেন।

“মার্চের ১১ তারিখ আমরা জানতে পারি যে, পশ্চিম পাকিস্তানগামী প্লেনের টিকিটের জন্য কাড়াকাড়ির কারণে কর্তৃপক্ষ টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দিয়ে অন্য ব্যবস্থা করেছে। যারা টিকিটের জন্য লাইন ধরেছিল তাদেরকে একটা করে নম্বর দেওয়া হয়েছে। প্রথম নম্বরটি দেওয়া হয়েছিল ৬ তারিখ। ১১ই মার্চ আমাদের স্কুলছাত্রদের দেওয়া হলো ৩৩১৯ থেকে ৩৩২৫ নম্বর!”

“আমাদেরকে ঘনঘন বিমানবন্দরে গিয়ে দেখতে হচ্ছিল সেই নম্বরগুলো কীভাবে এগুচ্ছে। দিনে দুটো কি তিনটেমাত্র ফ্লাইট ছিল, এবং আমরা জানতাম না আমাদের পালা কখন আসবে। ভারত তাদের আকাশসীমার ওপর দিয়ে পাকিস্তানি প্লেন চলাচল নিষিদ্ধ করে দেওয়ার ফলে বিমানভ্রমণের সময়ও বেড়ে গিয়েছিল অনেক। পাকিস্তানি বিমানকে তখন ভারতকে এড়িয়ে কলম্বোর মাটি ছুঁয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যেতে হচ্ছিল।”

“বিমানবন্দর তখন দেশ থেকে পালানো লোকে লোকারণ্য ছিল। আমি একজনকে দেখতে পাই ছোটো একটি বাক্সকে টেনে কাউন্টারের দিকে নিয়ে যেতে—সেটি ছিল সোনায় ভর্তি! (লোকজন তখন তাদের অর্থসম্পত্তি ব্যাংকে রাখার চাইতে নগদে কিংবা সোনার অলঙ্কার করে রাখতো।) বণিক ও ব্যবসায়ী যারা আশ্রয়ের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি জমাচ্ছিল, তারা তাদের সমুদয় সম্পত্তি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছিল।”

করাচি থেকে আসা ফ্লাইটগুলোও পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া বিমানগুলোর মতোই যাত্রীভর্তি ছিল, তফাত শুধু এই যে, সে-যাত্রীরা নতুন কোনো দেশে আসা অভিভাসী ছিল না। সেই বিমানগুলো আসলে ভরা ছিল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত অস্ত্রধারী পাকিস্তানি সৈন্যে।

নাম্বারগুলো ক্রমে এগুতে থাকে এবং অবশেষে মার্চের ১৪ তারিখে দিনের শেষ ফ্লাইটে করাচি যাওয়ার উদ্দেশে বিমানে ওঠে আমাদের তরুণ ছাত্রেরা। সেখান থেকে তারা মারী হিল্স হয়ে তাদের স্কুলে গিয়ে পৌঁছায়।

তখনও কেউ জানত না যে, এই মিশনারি বাচ্চাগুলো আরো বহুদিন পূর্ব পাকিস্তানে ফেলে আসা তাদের বাবামা ও বন্ধুদের কাছ থেকে, কিংবা তাদের সম্পর্কে, কিছুই শুনতে পাবে না।

ঈশ্বর আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জাতীয় সংসদ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার ঘোষণায় যেন বারুদে অগ্নিসংযোগ করা হল। সংঘর্ষ, দাঙ্গাহাঙ্গামা আর আগুন ছড়িয়ে পড়ল সারা শহরে।

এক রাতে আমাদের গির্জার এক পুরোহিত আরেকটি গির্জাপরিবারের জন্য বিছানা, বালিশ, কাঁথা ইত্যাদি চাইতে এল। তিনি আমাদের বলেন যে, বোমা আর মলোটোভ ককটেল বানানোর সময় বিস্ফোরণে তাদের পাহাড়ের পুরো ওপরের অংশটা জ্বলেপুড়ে গিয়েছিল।

পাকিস্তানি সেনারা ’দুর্বৃত্তকারীদের’ (যারাই তাদের বিরোধিতা করত তাদেরকেই তারা দুর্বৃত্ত আখ্যা দিত) কব্জা করার জন্য অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। পাকিস্তানিরা স্বীকার করে যে, হাঙ্গামা থামাতে গিয়ে তারা ১৭২ জন মানুষকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছিল। লন্ডন অবজার্ভার পত্রিকার ঢাকা প্রতিনিধি অবশ্য এই সংখ্যাটিকে কেবল ঢাকা শহরেই ২০০০ বলে উল্লেখ করেন।

এইসব প্ররাচনা সত্ত্বেও আওয়ামি লীগ স্বাধীনতা ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকে। বরং, ৭ই মার্চ, জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন। তিনি জনসাধারণকে আহ্বান করেন কেন্দ্রীয় কোষাগারে কোনো খাজনা কিংবা কর জমা না দিতে এবং কোনোভাবেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা না করতে। তিনি রক্তপাত ও হত্যাযজ্ঞ থামানোরও আদেশ দেন। বাঙালি ও বিহারিদের মধ্যেকার দাঙ্গা ও সংঘর্ষ থামানোর জন্য তিনি এমনকি এটাও ঘোষণা করেন যে, ”বাংলাদেশের অধিবাসী সবাই বাঙালি।’’

দাঙ্গা এক পর্যায়ে থামে। ক্ষমতাসীনদের বিরোধিতায় পুলিশ কাজে যেতে অস্বীকার করলেও, অইনশৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং রাস্তায় যানবাহনের চলাচল অব্যাহত থাকে।

ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চকে জাতীয় সংসদ অধিবেশন বসার তারিখ হিসাবে নির্ধারণ করেন। শেখ মুজিব তাঁর অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা প্রদানে নিম্নোক্ত শর্তাবলি আরোপ করেন :

  • সামরিক শাসন রদ করতে হবে।
  • সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে।
  • দেশের প্রধান শহরগুলোতে সামরিক বাহিনীর হাতে বাঙালি হত্যার তদন্ত করতে হবে।
  • নবনির্বাচিত সাংসদদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

অসহযোগিতা আন্দোলন কার্যত দেশের বেসামরিক শাসনভার শেখ মুজিবের হাতেই অর্পণ করে, যদিও তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তখনও, যা পূর্ব পাকিস্তানে অব্যাহত সেনা মোতায়েন সত্ত্বেও, বিভিন্ন আলাপ-আলোচনায় ও মধ্যস্থতাসভায় তাঁর অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিভাত হচ্ছিল। অবশ্য সার্বিক পরিস্থিতির পর্যালোচনায় এটা প্রতীয়মান ছিল যে, এইসব শান্তিআলোচনা স্রেফ লোকদেখানো ছিল; একটা সর্বাত্মক সামরিক দমনপীড়ন চালানোর জন্য যথেষ্ট সংখ্যক সৈন্য আনতেই আসলে এই অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমাদের বার্ষিক ফিল্ড কাউন্সিল মিটিংয়ের সময় আমরা অনেকটা সময় ব্যয় করি আপৎকালীন সময়ের নানাবিধ পরিকল্পনা করে।

আমাদের মিশনটি দলগত কাজে বিশ্বাস ও তার চর্চাও করে। আমরা যে-কোনো সমস্যা বা পরিস্থিতিতে একটা সম্মিলিত সিদ্ধান্তে না পৌছানো পর্যন্ত তার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকি। তবে এটা ছিল একেবারেই ভিন্ন পরিস্থিতি। অমরা অনুভব করি যে, দেশে থাকা কিংবা দেশত্যাগ করার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তি কিংবা পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত; কাউকেই থাকার জন্য জোর করা হবে না, আবার কেউ চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলে তাকেও পালিয়ে যাবার অপবাদ দেওয়া হবে না।

মালুমঘাট হাসপাতালের বিশাল মিশনারিদল নৌকা করে সাগরে গিয়ে অপেক্ষমাণ উদ্ধারকারী সমুদ্রগামী জাহাজের মাধ্যমে, অথবা প্রতিবেশী দেশ বার্মার ভেতর দিয়ে জরুরি নির্গমনের কথাও ভেবে রাখে।

আমরা যারা চিটাগাংয়ে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকগোষ্ঠীর সদস্য ছিলাম তাদের কাছে এই মর্মে চিঠি আসে, আমরা যদি দেশত্যাগ করতে ইচ্ছুক হই, তাহলে যেন একটি নির্দিষ্ট পাহাড়শীর্ষে অবস্থিত চত্বরে গিয়ে রাজকীয় বিমানবাহিনীর বিমানের জন্য অপেক্ষা করি।

২১শে মার্চ, রবিবার রাতে আমরা চিটাগাংয়ের কর্মীরা একত্রিত হই আমাদের পরিকল্পনা বিষয়ে আলাপ আলোচনা করার জন্য। আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গুর্‌গানস পরিবারের ছুটিতে যাবার কথা ছিল। তাঁরা যুক্তি দেখান যে, এই প্লেনটা ধরাই তাঁদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে। জিন গুর্‌গানস চলে গেলে রিড মিনিখই হবেন মিশনের একমাত্র পুরুষ সদস্য—ফলে তাঁর যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। লিন সিলভারনেইল, যার সঙ্গে আমি শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি বাসা ভাড়া করে থাকতাম, এবং আমি, আমরা কেউই বাক্সপ্যাটরা বেঁধে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেওয়ার তাড়না বোধ করিনি। আমরা তিনজন তাই থাকার পক্ষে ভোট দিই।

২৩শে মার্চ—পাকিস্তান দিবস! সরকারিভাবে এই দিনটি ছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ও অগ্রযাত্রা উদযাপনের জন্য নির্ধারিত, তবে এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ করাটাও। বাংলাদেশের লাল, সবুজ আর সোনালি রঙের জাতীয় পতাকাখানি সেদিন শহরের সব বাড়ি, দোকানপাট ও গাড়িতে গাড়িতে উড়ছিল। কেবল ঢাকা বেতারকেন্দ্র আর সরকারি দপ্তরগুলোতে ছিল চাঁদতারার সমাহার।

পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে অটুট রাখার লক্ষ্যে অই একই দিনে এম ভি সোয়াত নামে একটি পাকিস্তানি জাহাজ প্রাণসংহারী অস্ত্রশস্ত্রে বোঝাই হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করে। অস্ত্রবাহী জাহাজ ভেড়ার খবরটা দ্রুত শহরময় চাওর হয়ে যায়, আর লোকজন ক্ষোভে ফেটে পড়ে। উৎপাটিত বৃক্ষ, আলকাতরার খালি ড্রাম, সিমেন্টের চাঙর, পরিত্যক্ত গাড়ি—হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে তা-ই রাস্তায় ফেলে সৈন্য ও অস্ত্রসমূহ ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়ার পথে ব্যারিকেড দেওয়া হয়। হাজার হাজার বাঙালি লাঠিসোটা নিয়ে বন্দর অভিমুখে যাত্রা করে অস্ত্রখালাস ঠেকানোর উদ্দেশ্যে। এটা বাস্তবিক একটি শোচনীয় দৃশ্য ছিল—এমন বিপুল সাহস পাশাপাশি প্রস্তুতি ও শৃঙ্খলার এমন সামগ্রিক অভাব!

শেখ মুজিবের আদেশে বন্দরশ্রমিকেরা অস্ত্র খালাস করতে অস্বীকার করলে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের এই কাজ করতে বাধ্য করা হয়। ”যে-কোনো মূল্যে এই অস্ত্র খালাস করতেই হবে,” পশ্চিম পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ারেকে এই কথা বলতে শোনা গিয়েছিল। আর সেই মূল্য শোধ করা হয়েছিল বৈকি—বাঙালির রক্তে। সেদিন বন্দরে কত মানুষ মারা গিয়েছিল আর কতজন আহত হয়েছিল তার সংখ্যা কেউ কোনোদিন জানবে না।

জাহাজের ক্যাপ্টেন নিজেই ছিলেন বাঙালি। তিনি তাঁর নিজের মানুষেরই ধ্বংস বয়ে আনছেন তাঁর জাহাজে করে এই ভাবনা তাঁকে নিশ্চয়ই তাড়া করে ফিরছিল সর্বক্ষণ! বন্দরে পৌঁছানোর পর তিনি নিজেকে তাঁর কামরার শৌচাগারে আটকে রাখেন। তিনদিন পর বন্দরে সমাগত জনতার করুণার ওপর নিজেকে ছেড়ে দিয়ে তিনি বলেন, ”আসুন, যদি চান, আমাকে হত্যা করুন আপনারা।’’ বন্ধুরা তাঁকে উদ্ধার করে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদে লুকিয়ে রাখেন।

২৬শে মার্চ সকালে জেগে ওঠে আমরা শুনি চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের প্রসঙ্গে এই দিনটিকে উল্লেখ করা হচ্ছিল, ”সংগ্রামের গৌরবময় পঁচিশতম দিন’’  হিসাবে। আমরা যা জানতাম না, এবং জানিনিও আরও বহু সপ্তাহ ধরে যে, ঢাকায় সেই ’গৌরবময় সংগ্রাম’-এর ইতি হয়েছিল—অন্তত সাময়িকভাবে। টাইম ম্যাগাজিনের ৫ই এপ্রিলের সংখ্যায় ২৫শে মার্চের রাতটিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল :

ঢাকায় ট্যাংক ও ট্রাকভর্তি বেয়নেটধারী সৈন্যরা আল্লাহু আকবর ও পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিতে দিতে বেরিয়ে আসছিল তাদের ঘাঁটি থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হওয়িৎজার ট্যাংক থেকে ছোড়া কামান ও রকেটের গোলায় ঢাকার একাধিক অঞ্চল কেঁপে উঠেছিল। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ঝনঝনানির মধ্যে শোনা যাচ্ছিল গ্রেনেডের শব্দ, আর কালো ধোঁয়ার উঁচু স্তম্ভ শহরের মাথা ছাড়িয়ে উঠছিল ক্রমশ।

পরবর্তী সংস্করণ, ১২ই এপ্রিলের টাইম পত্রিকায় আরও বিশদভাবে লেখা হয়।

ঢাকা শহরের ওপর দিয়ে ট্যাংক গড়িয়ে চলে বাড়িঘর গুড়ো করে দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সৈন্যরা ঘুমন্ত ছাত্রদের হত্যা করে নির্বিচারে। নিউমার্কেটের সামনে উর্দুভাষী সৈন্যেরা বাঙালি নগরবাসীদের আত্মসমর্পণের হুকুম জারি করে এবং তারা তাতে তিলমাত্র দেরি করলে সঙ্গেসঙ্গে গুলি করে মেরে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণকবরে, পুরনো ঢাকায় এবং মিউনিসিপালিটির ময়লার ডিপোতে লাশের স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

কিন্তু আমরা চট্টগ্রামে এসবের কিছুই জানতে পারিনি। সকাল পৌনে নয়টায় ঢাকা বেতারকেন্দ্র থেকে জাতীয় সংগীত বেজে হঠাৎ করেই তা বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে কেবল রেকর্ড করা গান শোনা যাচ্ছিল।

আমাদের বন্ধু মিস্টার ও মিসেস টমাস দাশ সেদিন বেড়াতে এসেছিলেন। প্রাক্তন স্কুলশিক্ষয়িত্রী মিসেস দাশ ছিলেন লিন সিলভারনেইলের দেশি সহকর্মী। লিন, একজন নার্স, যে ভাষাতত্ত্বের প্রাথমিক জ্ঞান আয়ত্ত করেছিল, গত চারবছর ধরে বাইবেল অনুবাদ করছিল। সে মূল গ্রিক থেকে নিউ টেস্টামেন্টের বিভিন্ন পুস্তকের সহজ ইংরেজি সংস্করণ তৈরি করছিল। মিসেস দাশ ছিলেন তার বাঙালি সহযোগী। লিনের ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে তিনি বাংলা নিউ টেস্টামেন্টের প্রথম খসড়া রচনা করছিলেন।

তবে মিসেস দাশ কাজ করতে আসেননি। তিনি এবং তাঁর দেবতুল্য স্বামী আমাদেরকে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সাবধান করতে এসেছিলেন। আমরা একসঙ্গে আলোচনা করি, গান গাই ও প্রার্থনায় যোগ দিই। মিসেস দাশ আমাদেরকে একটি নতুন গান শেখান, চমৎকার এক ভারতীয় সুরে গাঁথা এই গানখানি :

হে যিশু, তুমি আমার;
আমার জীবন বাঁচাও হে যিশু।
পাপী যারা তারা তাঁর কাছে যাবে;
প্রভু আমাকে ত্রাণ দাও।
নদী গভীর, নৌকা ছোটো,
প্রভু পার করো আমায়।
তোমাতেই জয়ী আমি,
এসো প্রভু, আমাকে শক্তি দাও।

আমাদের সবারই প্রভুর দেওয়া শক্তি দরকার, কেননা নদী ছিল গভীর আর নৌকাখানি ছোটো।

বন্ধুরা থাকতে থাকতেই আমরা রেডিয়ো খুলি রাত দশটার খবর শুনব বলে। তার পরিবর্তে আমরা সামরিক শাসনের পনেরোটি নির্দেশনার ঘোষণা শুনি। তার মধ্যে ছিল :

পাঁচজনের বেশি মানুষ একসঙ্গে জমায়েত হতে পারবে না।
কোনো রাজনৈতিক সভা করা যাবে না।
সেনাদপ্তরে সকল অস্ত্র জমা দিতে হবে।
সকল ছাপা কিংবা অনুলিপি করার যন্ত্রও সেনাদপ্তরে জমা দিতে হবে।
সবাইকে দ্রুত কাজে যোগ দিতে হবে। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

এই নির্দেশগুলো যখন আমরা ইংরেজিতে অনুবাদ করছিলাম তখনো বাইরে রাস্তায় বাঙালিদেরকে প্রতিবাদ করতে শুনছিলাম। দাশদম্পতি তাড়াতাড়ি বিদায় নেন নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য। তাঁরা চলে গেলে আমরা গাড়ি রাখার জায়গাটায় তাকিয়ে দেখি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আমলের পুরনো ট্রাকের ওপর লোকেরা জড়ো হচ্ছে। লাঠিসোটা হাতে তরুণে ঠাসা ট্রাকগুলো বেরিয়ে যাবার সময় চারপাশ জয়বাংলা ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সেই চিৎকৃত জয়ধ্বনির জন্ম হয়ে গিয়েছিল নয় মাস আগেই।

রিড তাঁর কোনার বাড়ি থেকে হেঁটে আসেন আমাদের ঘরে। ”তোমরা সবশেষ নির্দেশগুলোর কথা শুনেছ?” তিনি জিজ্ঞেস করেন। ”এসব কিন্তু ভালো মনে হচ্ছে না।’’

‘‘আপনি যদি আমাদের এখানে থাকেন তাহলে আমরা একটু নিরাপদ বোধ করব।’’ আমি কবুল করি।

‘‘ঠিক আছে, আমি কিছুদিনের জন্য থাকব, কিন্তু আমার পক্ষে তো অনির্দিষ্টকাল ধরে থাকা সম্ভব নয়।’’ তিনি জবাব দেন।

সেই শুক্রবার রাতে আটটা বাজার আগে আগে আমরা রেডিয়ো খুলি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জাতির উদ্দেশে ভাষণ শোনার জন্য।

হঠাৎ রাস্তায় আমরা একটা জোরালো গুঞ্জনের শব্দ শুনতে পাই। আমরা ভেবেছিলাম এটা আরও বুঝি নতুন কোনো নির্দেশ প্রচার-করা লাউডস্পিকারের শব্দ। বারান্দা দিয়ে দেখি, যে-বাড়িতেই রেডিয়ো রয়েছে তার সামনে লোকের জটলা। আমরা আমাদের রেডিয়োর ডায়াল ঘোরাই যতক্ষণ না বাইরের রেডিয়োগুলোর শব্দের সঙ্গে আমাদেরটা মিলেমিশে এক হয়ে যায়। তখন আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা শুনতে পাই।

তিনি জনগণের উদ্দেশে বলছিলেন: ”আপনাদের হাতে যাকিছু অস্ত্র আছে তা নিয়েই ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসুন। যে-কোনো মূল্যে শত্রুর মোকাবিলা করুন, এদেশের পবিত্র মাটি থেকে শেষ শত্রুটিও নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত।’’

আমরা জানতাম না যে, এটা ছিল একটা পূর্বে ধারণকৃত টেপ। কারণ এর আগের রাতেই, আলাপ আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর, মধ্যরাতে ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করেন। অনেক পরে আমরা একটা গুজব শুনেছিলাম যে, সেদিন তার মালামালের সঙ্গে একজন রাজনৈতিক বন্দিকেও বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তিনি আর কেউ নন, শেখ মুজিবুর রহমান।

ঠিক সময়েই ইয়াহিয়া তাঁর ভাষণ শুরু করেন। কিছু ভূমিকা সেরে তিনি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু করেন।

’’এই লোকটি ও তার দল পাকিস্তানের শত্রু। এই অপরাধকে আমরা বিনা শাস্তিতে যেতে দেব না। আমরা কিছু ক্ষমতালোলুপ, দেশদ্রোহী গোষ্ঠীকে আমাদের দেশটিকে ধ্বংস করে দিয়ে এর ১২ কোটি লোকের ভাগ্য নিয়ে খেলতে দেব না।’’

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবকে একজন বিশ্বাসঘাতক বলেন। তিনি বলেন যে, তিনি নিজে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে আসতে চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু মুজিব যুক্তির কথা শুনতে সম্মত ছিলেন না। তিনি তখন পুরো আওয়ামি লিগকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। (এটার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, নিক্সন নির্বাচনে জয়ী হওয়াতে তাঁর রিপাবলিকান পার্টিকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা।)

আমি রাত এগারোটার দিকে শোয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম যখন ভয়েস অভ আমেরিকা খবরে বলে, ”শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করেছেন এবং তার নামকরণ করেছেন বাংলাদেশ।”

সাড়ে এগারোটার দিকে বাতি নেভানোর উদ্যোগ নিতেই শুরু হয় গোলাগুলি। প্রথমে এর শব্দটা ছিল অনেকটা পপ-পপ-পপ ধরনের। আমি দেখার চেষ্টা করলাম শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণাকে লোকজন পটকা ফুটিয়ে উদযাপন করছে কিনা। রাস্তাঘাট তখন জনশূন্য ছিল। আমি যখন জানালা দিয়ে বাইরে দেখছিলাম তখন গুলির শব্দ ও পরিমাণ ক্রমে বাড়ছিল। আমি লিনের রুমে দৌড়ে গিয়ে দেখি সে-ও কাঁচা ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে। আমরা সাবধানে এক জানালা থেকে আরেক জানালায় ছোটাছুটি করি। এটা যদি বাজি ফোটানোর শব্দই হয় তাহলে লোকজন সব গেল কোথায়? প্রতিটি বিস্ফোরণের মাঝখানে বাইরে কেবল অন্ধকার আর মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। আমরা আমাদের পর্দাটানা খাবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে শহরকেন্দ্রের দিকে দেখার চেষ্টা করছিলাম। আর ঠিক তখনই আমাদের পেছনের দুটো বাড়ির মাঝখান দিয়ে চারটি বিশাল আগুনের গোলা উড়ে যায় আকাশে। অবশেষে, আমরা অনুধাবন করি যে, ওগুলো স্বাধীনতার ঘোষণা উদযাপনের বাজি ফোটানোর শব্দ নয়।

আমরা তখন আমাদের বিছানাপত্র বাড়ির সবচেয়ে মাঝখানে অবস্থিত বসার ঘরের মেঝেতে পেতে ঘুমাতে চেষ্টা করি। ভোর রাত অব্দি গোলাগুলি অব্যাহত থাকে। পপ পপ শব্দের মাঝখানে মেশিনগানের রা টা টাট শব্দের ফুলঝুরি ফোটে সারারাত।

শনিবার সকালে আবার সবকিছু শান্ত ও স্বাভাবিক মনে হলে, আমরা বছরের মন্দাকালীন ছয়মাসের জন্য সব্জি টিনবন্দি করার বার্ষিক প্রকল্পের কাজে হাত লাগাই। আমরা গাজর, আলু, ঢেড়স, পেঁয়াজ, সিম, টমেটো ইত্যাদি ধুয়ে ও কেটে কুচি কুচি করে বোতলে ভরতে থাকি। বারোটি বয়ম ভরার পর এবং আরও একটি ঝুড়ি ভরা বাকি থাকতে আমরা আবিষ্কার করি যে, প্রেসার কুকারটি কাজ করছে না। অর্থাৎ অল্প কদিনের মধ্যে এই সব সব্জি আমাদের খেয়ে শেষ করতে হবে, তা নাহলে আমাদের সময়, শক্তি ও অর্থ পুরোটাই জলে যাবে।

মধ্যসকালে রিড এই খবর নিয়ে আসেন যে, তিনি তাঁর গাড়িখানি দিয়ে দিয়েছেন। এটা সামান্য ব্যাপার ছিল না; এটাই ছিল আমাদের পালানোর একমাত্র বাহন, যেটাকেও দান করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। তিনি, ঈশ্বরের দূত, আর কোনোদিনই ঈশ্বরের ভালোবাসা প্রচার করতে পারতেন না, যদি তিনি নিজে সেই ভালোবাসাটুকু দেখাতে পারেন। গাড়িটা নেয়ার অনুরোধ নিয়ে যে-এসেছিল সে হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত মণীন্দ্র দাস। ১৯৬৬ সালে সে, তার স্ত্রী ও মাতা একে একে যিশুর ওপর বিশ্বাস আনে। সেই থেকে মণীন্দ্রর শ্বশুড়কুলের সবাই তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করে এবং জনসমক্ষে অপমানিত করে। তারা কাছাকাছি বাস করলেও কেউ কারো বাড়িতে যেত না, খ্রিষ্টানদের সঙ্গে মিশে তার আত্মীয়রা নিজেদের কলুষিত করতে চাইত না। এখন আসন্ন বিধর্মী শুদ্ধি অভিযানে হিন্দুজনগোষ্ঠীর কী অবস্থা হতে পারে তা কল্পনা করে তার শ্বশুড় মণীন্দ্রকে অনুনয় করে তাদের গোটা পরিবারকে কোনো ’খ্রিষ্টান বাড়িতে’ নিয়ে যেতে। রিড কীভাবে তাদেরকে পালানোর জন্য গাড়িটা না দিয়ে থাকতে পারেন?

‘‘তোমরাও কি হাসপাতালেই চলে যেতে চাও?” রিড আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন। ”আমার মনে হয় আমি এখনও চেষ্টা করলে ড্রাইভারকে আটকাতে পারি।”

আবারও আমরা থাকার সিদ্ধান্ত নিই।

রিড দরজার বাইরে বেরুতে না বেরুতেই গুর্‌গানস তাঁর মোটর সাইকেলে চড়ে আমাদের খোঁজখবর করতে আসেন। তিনি জানান নেভাল সদরদপ্তরের পাশ দিয়ে আসার সময় তিনি দেখতে পান রাস্তার বেসামরিক নাগরিকদের দিকে তারা মারণাস্ত্র তাক করে রেখেছে। পরের নিঃশ্বাসেই তিনি জানান যে, তিনি আসলে আমাদেরকে তাঁর বাড়িতে নিতে এসেছেন, তাঁর ও রিডের মোটরসাইকেলে পেছনে বসিয়ে। শহরের সব বিদেশিদের নিয়ে একটি আমেরিকান আবাস তৈরি করা হয়েছে। তার ছাদের ওপর আমেরিকা ও কানাডার পতাকা ওড়ে সবসময়।

আমাদের কী করা উচিত। আমাদের প্রথম দায়িত্ব কি অন্যান্য মিশনারি সদস্য ও আমেরিকান নাগরিকদের সঙ্গে মিলে এক জায়গায় থাকা, যাতে করে নিজেদের মিশনের পুরুষদের আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে না হয়, নাকি আমাদের প্রকৃত দায়িত্ব আসলে আমরা যাদের সেবা করতে এসেছি সেই অসহায় বাঙালিদের প্রতি? আমরা যখন এই দুই সম্ভাবনা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করছিলাম তখন বসু পরিবারের বড় ভাই এসে তার মা ও ছোটো বাচ্চাদের একটা নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য মিনতি করতে থাকে।

প্রভু আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেন। আমরা তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। আমরা তাদেরকে আমাদের সঙ্গে সেই মার্কিন আবাসেও নিয়ে যেতে পারি না। ফলে আমরা থেকে যাই। রিড আমাদের আগেই বলেছিলেন যদি আমরা প্রয়োজন মনে করি তাহলে তিনি আমাদের সঙ্গে থেকে যেতে পারেন- আমরা তেমনটা মনে করেছিলাম বৈকি।

বসুরা কারা? সারা বসু, বয়স ১৮, আর মাত্র তিন সপ্তাহ পরে গুড ফ্রাইডেতে তার বিয়ে হবার কথা। তার বাগদত্ত শহরের যে-অঞ্চলে বাঙালি ও বিহারিদের মধ্যে সহিংস দাঙ্গা লেগে থাকে, সেখানেই থাকত ও কাজ করত। আমরা তার কোনো খবরই পাচ্ছিলাম না, তাই ধরেই নিয়েছিলাম যে, সে নিহত হয়েছে। দশ মাস পরে, সীমান্তের ওপারে আত্মীয় ও শরণার্থীদের সঙ্গে কাটিয়ে একদিন সে উদ্ভ্রান্ত ও বিধ্বস্ত চেহারায় এসে হাজির হয়।

রেবেকা ছিল আরেক হাসিমাখা কিশোরী। যুদ্ধ ছিল তার তালিকায় যুক্ত হবার মতো আরেকটি অ্যাডভেঞ্চার মাত্র। দূরদর্শী যে-খ্রিষ্টান আবাসিক স্কুলটিতে সে পড়ত, সেটি যুদ্ধ শুরু হবার কয়েকদিন আগেই তাদের শিক্ষার্থীদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা তা না করলে, চট্টগ্রাম থেকে একশত মাইল, ও ট্রেন, স্টিমারে দেড়দিনের যাত্রাপথের দূরত্বে আরেকটি শহরে সে আটকা পড়ে যেত।

লাকি ও বিউটি ছিল দুই ভীত বাচ্চা মেয়ে, যারা ঠিক বুঝতে পারছিল না চারদিকে কী ঘটছে, আর স্বপন ছিল চোখের তারা-কাঁপানো আরেকটি বাচ্চা ছেলে, কিছু একটা করার জন্য যে সবসময় উন্মুখ হয়ে থাকত।

স্বপন বরাবরই আমাদের খুব প্রিয় ছিল। কয়েক বছর আগে সে আমাদের আমেরিকানদের খ্রিষ্টবিষয়ক ধারণাকে প্রসারিত করতে সাহায্য করেছিল, যিনি সব ভাষার ব্যবধানই উত্তীর্ণ হয়ে যান। ব্যাপারটা ছিল এরকম।

একজন নতুন মিশনারি, মন্টি (ম্যারিলিন) মালম্স্ট্রম সবে এসেছেন। রবিবারের স্কুলের বাঙালি বাচ্চারা, ভাষা ঠিক বুঝতে না পারলেও, তাঁর মধ্যে একজন দয়ালু মানুষকে ঠিকই চিনে নিতে পারে। এই একজন মানুষ যে বাচ্চাদেরকে পছন্দ করে তারা স্রেফ বাচ্চা বলেই।

লিন বাচ্চাদেরকে শিখিয়েছিল কীভাবে প্রার্থনায় অংশ নিতে হয়, এবং তারাই কোনো নির্দিষ্ট দিনে সিদ্ধান্ত নিত তারা কার সঙ্গে প্রার্থনা করবে।

এটা তেমন অবাক-করা ছিল না যে, ক্লাস চলাকালীন এমন একটা উদগ্রীব অনুরোধ শোনা গেল, ”আমরা মিস মন্টির সঙ্গে প্রার্থনা করতে চাই।’’ গোটা ক্লাস তখন বাংলায় ধুয়ো ধরে, ”আমরা মিস মন্টিকে চাই।’’

‘‘কিন্তু,” লিন প্রতিবাদ করে বলে, ”মন্টিতো বাংলা বলতে পারে না; তাকে তাহলে ইংরেজিতে প্রার্থনা করতে হবে।’’

স্বপনের কালো চোখ প্রশ্নভরা বিস্ময়বোধে ভরে ওঠে, সে জানতে চায়, ”যিশু বুঝি ইংরেজি বোঝেন না?”

বসুপরিবারের মা ছিলেন একজন পরিশ্রমী, ধর্মভীরু নারী যিনি সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রভুকে অনুসরণ করার প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

আর ছিলেন বুড়ি দিদিমা। তিনি বধিরতম খাম্বার চেয়েও বধির ছিলেন। প্রত্যেকবার যখন কেউ গুলিগোলার শব্দে ভয় পেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে লুকানোর উপক্রম করত, তিনি বলে উঠতেন, ”আমি বুঝতে পারি না তোরা কেন এত ভয় পাচ্ছিস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছে এটা তো নস্যি।’’ তখন কিন্তু তিনি ঠিকই শুনতে পাচ্ছিলেন।

বসুপরিবারের সদস্য কেউকেউ নিখোঁজও ছিলেন। সবচেয়ে বড় ভাইটি—পরিবারটিকে একত্র রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত বোঝার ভারে নুইয়ে পড়া এক তরুণ। মেঝ ভাই—সরকারি টিবি হাসপাতালে তখন চিকিৎসাধীন। এই হাসপাতালটি ছিল শহরের ঠিক উপকণ্ঠে, কুমিরায়, যেখানে হামেশাই পাকিস্তানি সেনা ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে লড়াই হত। হাসপাতালভরা বিভিন্ন মাত্রার যক্ষারোগীদের ফেলে রেখে ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীরা সবাই প্রাণের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারা আরও কয়েকদিন টিকে ছিল, চারপাশ দিয়ে গোলাগুলি ছুটে যাওয়ার সময় বিছানার নিচে লুকিয়ে থেকে। খাবারদাবার শেষ হয়ে গেলে, যারা তখনও হাঁটতে পারত, তারা পাহাড় ও জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, শহরঅভিমুখে চারদিনের এক দীর্ঘ যাত্রা শুরু করে আশ্রয়ের আশায়। কিন্তু খুবই অসুস্থ যারা হাঁটতেও পারত না, তাদের কী হয়েছিল?

সবচেয়ে ছোটোটি, নির্মল—সবসময় আমাদের সাহায্য করতে চাইত, কিন্তু তার জন্য যতটা সময় ঘরে থাকার দরকার ততটা সে পারত না। খাবার কিংবা অন্য কিছু সংগ্রহের জন্য সে বাইরে গেলে তার মা ভয়ে কাঁপতে থাকত, তার ছেলেকে বুঝি তিনি আর দেখবেন না।

আরও একজন ছিল নিখোঁজ। মার্চের ২ তারিখে, গাড়িঘোড়া সব বন্ধ করে দেওয়া শহরের প্রথম সর্বাত্মক হরতালের দিন সকালবেলায় আমরা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পাই।

‘‘আপনারা একটু জলদি আসবেন প্লিজ? আমার বাবা খুব অসুস্থ।’’

ভোরের শীতল বাতাস ঠেলে আমাদের বাসা থেকে প্রায় সোয়া মাইল দূরে অবস্থিত বসুদের দুকামরার বাঁশের ঘরে যাই আমরা। বসুর বাবা আমাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর গত সপ্তাহগুলোতে প্রায়শই আমরা ওবাড়িতে গেছি। ডাক্তারেরা তাঁর অপারেশন করেছিলেন এই আশায় যে, তাঁর আলসারটিকে তারা সরিয়ে ফেলতে পারবেন। উল্টো তারা দেখেন তাঁর পেট ক্যান্সারাক্রান্ত টিউমারে ভরা। আমরা তাঁকে কিছু ইঞ্জেকশন আর বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিয়ে কিছুটা আরাম দিতে পেরেছিলাম। আমরা তাঁর ক্ষুধা বাড়ানোর জন্য কিছু পুষ্টিকর খাবারও দিয়েছিলাম। আমরা গিয়ে দেখি সব শেষ! ছয় বাই নয় ফুট ঘরটিতে গাদাগাদি অবস্থায় আমরা একটি ছোট্ট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আদর করছিলাম, আর ঠান্ডা, ভয় আর বেদনায় কাঁপতে থাকা পরিবারটিকে যতটা পারি সান্ত¦না দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তারপরই তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলোর চিন্তা আমাদের আঘাত করে। এই হরতালের দিনে তো কিছুই চলছিল না। আমরা তাহলে ওর বাবাকে সমাহিত করি কীভাবে? শেষকৃত্যই বা করা হবে কীভাবে? পরিবার ও বন্ধুদেরকে খবরই বা পৌঁছানো হবে কী করে? ছেলেরা এই সাতসকালে শহরময় ঘোরাঘুরি করতে ভয়ও পাচ্ছিল, পাছে সন্দেহজনক তৎপরতার অভিযোগে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, ফলে লিন, রিড আর আমিই বেরিয়ে পড়ি।

বসুদের বাড়ির সামনের বড় রাস্তার উল্টোদিকে অবস্থিত চার্চ অভ ইংল্যান্ডে তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠান হয়। মৃত্যুর খবরটি মুখে মুখেই ছড়িয়ে গেলে, লোকজন, এমনকি দুই মাইল দূর থেকেও, শ্রদ্ধা জানাতে আসে। কিন্তু শহর থেকে তিন মাইল দূরের কবরস্থানে আমরা মৃতদেহটি নিয়ে যাই কীভাবে? ঝুঁকি নিয়ে হলেও নিজেদের একটি গাড়ি বার করা ছাড়া আর কোনো সমাধান দেখি না আমরা। এদেশে মৃতদেহকে ঠান্ডাঘরে রাখার সুবিধা না থাকাতে, এবং দিনের তাপমাত্রাও দ্রুত বাড়ার কারণে, হরতাল শেষ হওয়া পর্যন্ত কবর দেওয়ার কাজটুকু স্থগিত রাখতে পারিনি আমরা। রিড মিনিখ তাঁর ল্যান্ডরোভারটিকে রাস্তায় বার করে আনেন (এটিকে চালু করতে সবসময়ই একটা বাড়তি ধাক্কার দরকার হত) এবং প্রার্থনা করতে করতে কোনোমতে গির্জা অব্দি নিয়ে যান। শেষকৃত্য অনুষ্ঠান হয়ে যাওয়ার পরে, কারা কারা সমাধিক্ষেত্রে যাবেন তা নিয়ে লম্বা বাক্য বিনিময় হয়। অবশেষে শবমিছিল বার হয়, পরিবারের ছেলেদের দুই বন্ধু গাড়ির হুডের ওপর চড়ে বসে, আর চারপাশে ও পেছনে যতজন আঁটে উঠে পড়ে, ’লাশের গাড়ি’, ’লাশের গাড়ি’ বলতে বলতে কবরখানার দিকে এগিয়ে চলে।

শেষকৃত্যের চব্বিশদিন পর আজ বসুপরিবারের লোকজন আমাদের বাড়িতে থাকতে আসে। তারা আসার কয়েক মিনিট পরই, জব্বার নামে যে-তরুণটি আমাদের সঙ্গে অনেকদিন যাবৎ কাজ করছিল সে এসে উপস্থিত হয় তার বউ নিয়ে। সে মুখ-ঢাকা কালো বোরখা পরিহিত ছিল, তার কোলে একটি বাচ্চা আর হাতধরা দুই বছরের আরেকটি। তারা মালপত্র যা পারে হাতে করে নিয়ে আসে, বাকিগুলো ফেলে আসে বাড়িতে, চুরি হয়ে যাবার জন্য। আমাদের ’শরণার্থী শিবির’ দ্রুত ভরে ওঠে।

তারা, এবং আরও যারা আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে পরে, তাদের জন্য উদ্বেগ আর ভয়ে ভরা দিনগুলো অপেক্ষা করছিল সামনে।

২৮শে মার্চের ডায়রির লেখা আমার: দিনটিকে অবশ্যই রবিবারের মতো লাগছে না। আমরা সকালের নাস্তার জন্য ডালপুরি তৈরি করি। এরপর রিড তাঁর বাড়ি চলে যান গোসল ও শেভ করার জন্য। আমাদের এখানে খুব অল্পই পানি ছিল। বাঙালিরা আমাদের এলাকার পানির লাইন বন্ধ করে দিয়েছিল, যেন নেভাল হেডকোয়ার্টারে ঘাঁটি করে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যদের একটু শাস্তি হয়। আমাদের কেরোসিনও প্রায় ফুরিয়ে এসেছিল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ তখনও বিদ্যুৎ ছিল, ফলে আমরা বৈদ্যুতিক যন্ত্রে রান্না করতে পারছিলাম।

সারাদিনই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে একটা ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছিল বারবার।

‘‘বিশ্ববাসী। জানা গেছে যে, সাগর ও আকাশপথে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আরও অনেক সৈন্য এসেছে আমাদের দেশে। আমি তাই পৃথিবীর সকল গণতান্ত্রিক দেশকে মুক্তিকামী বাংলাদেশের জনগণের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানচ্ছি।’’

তারপর বাংলা ভাষায় চট্টগ্রামের সকল জনগণকে তাদের অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে একটি নির্দিষ্ট সভাস্থলে যাবার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাদেরকে যোদ্ধাদলে সংগঠিত করা হবে। আমাদের এলাকার লোকেরা এই আহ্বানে সাড়া দেয়। আমরা বাড়ির পুরুষদের দলবেঁধে সেখানে যেতে দেখি। কিন্তু আপনি শিকারের বন্দুক কিংবা কুড়ালকে কীভাবে লুকিয়ে নিয়ে যাবেন? যখন দেখা গেল অস্ত্রশস্ত্র হাতে লোকদের দেখে গুলি করে মারা হচ্ছে, তখন এই ঘোষণা প্রত্যাহার করে নেওয়া হল। পরিবর্তে লোকজনদের যার যার মহল্লায় থাকতে বলা হল। মুক্তিবাহিনীর অধিনায়কেরা নিজেরা গিয়ে তাদেরকে যুদ্ধের কলাকৌশল শিখিয়ে দেবে।

বিদেশি বেতারকেন্দ্রগুলো খবর দেয় যে, ঢাকা থেকে মোট ২৫ জন বিদেশি সংবাদদাতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। লরেন জেন্কিন্স ১২ এপ্রিলের নিউজউইকে ব্যাখ্যা করে লেখেন।

আমরা এতকিছু দেখেছি যা পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গেই মানায় … আমাদেরকে বলা হল বাঁধাছাদা করে আধঘণ্টার মধ্যে চলে যাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে। তার দুই ঘণ্টা পরে আমাদেরকে চারটি আর্মি ট্রাকে গাদাগাদি করে তুলে সেনাপ্রহরায় ঢাকা বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হল, যেখানে আমাদের শরীর তল্লাশি করা হল এবং অধিকাংশ নোট ও ফিল্ম কেড়ে নেওয়া হল। একটা বেসামরিক বিমানে করে আমাদেরকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হল, যেখানে আমাদেরকে আরেকবার তল্লাশি করা হয়। আমার টাইপরাইটার ও রেডিয়ো খুলে ফেলা হয়, এবং রেডিয়োর ব্যাটারির খোপে রাখা দুই রোল ছবি বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হয়। আমাকে তারপর আরেকটি ঘরে নিয়ে উলঙ্গ-তল্লাশি করে অন্তর্বাসের ভেতর লুকিয়ে রাখা আরেকটি ফিল্মের রোলও নিয়ে নেওয়া হয়। ”তোমার এখন স্রেফ স্মৃতিই সম্বল,” এই বলে এক সেনাসদস্য ব্যাঙ্গের হাসি হাসে।

বিকেল সাড়ে চারটায় আমরা রবিবারের প্রার্থনা সারি। রিড বাইবেলের স্তোত্র ৯১ থেকে পাঠ করেন। আমাদেরকে সাহস ও শক্তি যোগানোর পাশাপাশি তিনি বাংলা বাইবেলের একটি শব্দ নিয়ে কিঞ্চিৎ মজাও করেন। শ্লোক ছয় থেকে তিনি পাঠ করেন, ‘‘The pestillence that walketh in darkness’’, এর বাংলা করতে গিয়ে তিনি ’বিহারী’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন—আর আশা করছিলেন আমরা তাতে ভয় পাব না!

রিড বিভিন্নজনকে ডাকতেন প্রার্থনাসভার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। কিশোর স্বপনকে দিয়ে তিনি শুরু করেন। আর সব বাঙালির মতোই ঈশ্বর ও প্রভুর বন্দনায় প্রচুর কবিত্বময় বাক্য প্রয়োগ করে সে অবশেষে আসল কথায় আসে।

‘‘প্রভু, আপনি জানেন আমাদের এখানে পানি নেই, আর পানি ছাড়া চলা খুব কষ্ট। দয়া করে আমাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করুন।’’

অমাদের ঈশ্বর, যিনি ছোটো ছেলেদের বাংলা প্রার্থনাও শোনেন, তিনি স্বপনের আবেদন মঞ্জুর করবেন দ্রুতই।

[চলবে]