জীবন চৌধুরী > গানের সুরে প্রাণের কথা >> আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

0
269
গানের সুরে প্রাণের কথা
রক্ত দিয়ে শুরু হয়েছিল ভাষার যে আন্দোলন সেই আন্দোলনে সঙ্গীত প্রধান হয়ে ওঠে এক সময়। সবই সময়ের ব্যাপার। এমন এক সময় গেছে, যে সময়ে গান করেছে একুশের আন্দোলনে দুর্বার গতি সঞ্চার। এখনো গান ছাড়া একুশ উদযাপিত হবার নয়। এই একটা দিনে সবাই গান করে কারণ এ গানতো সবারই প্রাণের আর্তি। বিশেষ করে এই দিনে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি” গান করেন না এমন কেউ আছেন বলে তো মনে হয় না। শুধু একুশ নয়, গান দিয়েই শুরু হয়েছিল আমাদের মুক্তি সংগ্রামও। “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” রবীন্দ্রনাথের এই গান মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিল, সে গানই স্বাধীনতা উত্তরকালে হলো জাতীয় সংগীত। ঠিক একুশের চেতনাতেও সংগীত। প্রখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী ওয়াহিদুল হক যথার্থই বলেছেন- ‘একুশে মানে গান’। গানের সুরে প্রাণের কথা বলার মতো সহজ অথচ উৎকৃষ্ট পথ আর নাই। ফলে বিশ্বের বহু দেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লব স্বাধীনতা যুদ্ধের মূলে গান ভূমিকা রেখেছে। আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনেও একুশের গান বলুন আর মুক্তিযুদ্ধের গান বলুন না কেন, গান গণজাগরণের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। অস্ত্রের বদলে গানের ভাষায় জবাব দেয়া হয়েছে জনতার প্রাণের কথাগুলো।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিচঢালা পথ যখন রক্তে রঞ্জিত হয়, তখন থেকেই বাঙালি বুঝতে শেখে, “ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য”। ভাবতে শেখে—কেউ অধিকার যেচে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়। বাংলা ভাষার সেই অধিকার আদায়ে সেদিন সঙ্গীত হয়েছে শক্ত হাতিয়ার। জনতা জেগেছে। কৃষক-শ্রমিক ছাত্র অস্তিত্বের অবমাননায় গর্জে ওঠে। কবি-সাহিত্যিকের লেখনীতে একুশ উঠে আসে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলমন্ত্র হয়ে। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি জীবনমুখী কবিতা, গান, শিল্পকর্ম যার মধ্যে বাঙালি নিজেদের সত্তাকে খুঁজে পেয়েছিল। এর সাথে সাথে মিছিল, সভা জনতার হয়েছিল প্রতিবাদের অবলম্বন। ঠিক তেমনি সঙ্গীতও হয়েছে প্রতিবাদের ভাষা। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদ, ডি. এল. রায়, মুকুন্দ দাসের গানে প্রাণের ভাষা খুঁজেছে সবাই। নতুন গানের নবজাগরণেরও উন্মেষ হয়েছে। বরিশালের আবদুল গাফফার চৌধুরী তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। তাঁর লেখনীতে উঠে আসে একুশ “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি”- অমর পঙক্তিমালা হয়ে। এই গানের রচনাকাল সম্ভবত ১৯৫৩ সালের কোনো এক সময়। এতে প্রথম সুরারোপ করেন শিল্পী আবদুল লতিফ যিনি, “ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়” একুশের আরেকটি অবিস্মরণীয় গানের রচয়িতা ও সুরকার। গুলিস্তানের কাছে “বৃটেনিয়া” সিনেমা হলের এক অনুষ্ঠানে আবদুল লতিফ নিজের সুরে গানটি প্রথমবারের মতো গান। ক’মাস তার সুরেই গানটি চলে কিন্তু পরবর্তী কালে আলতাফ মাহমুদ নতুন করে সুর করেন। তাঁর সুরই শেষ পর্যন্ত টিকে যায়। সমসাময়িক কালে খুলনার শামসুদ্দিন আহমেদ রচিত- “রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলি রে বাঙালি, তোরা ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলি” গানও আজকের ইতিহাস।
শুধু কি ঢাকা? ঢাকার বাইরে দেশের মফঃস্বল শহর ছাড়িয়ে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। খুলনার শামসুদ্দিন আহমেদের মতো আরও অনেক কবিপ্রাণ জেগে উঠেছিল সেদিন স্বদেশপ্রেমের মন্ত্রে। স্বৈরাচারী শাসকবর্গের বুলেটের জবাব তাঁরা দিয়েছেন সঙ্গীতে। তাঁর সাথে সাথে ঢাকাকে সেদিন গোটা বাংলাদেশের মানুষ অনুভূতির কেন্দ্রস্থল হিসেবে গণ্য করেছিল। ফলে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার সাবের মিয়া, জসীম উদদীন হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র সায়েদুল ইসলামের গানে একাত্মতার ধ্বনি আমরা শুনতে পেয়েছি- “ছাত্র ভাইয়ের বুকের খুনে ঢাকা শহর রাঙা হল। চল সবাই ঢাকায় চল।” এই সেই ঢাকা—অনেক সংগ্রামের সাক্ষী এই ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। পরে জিন্নাহ সাহেবরা ছিলেন না তবু গুলির গর্জন হয়েছে। রাজপথে রক্ত ঝরেছে। বুলেটবিদ্ধ হয়ে মায়ের বুক খালি হয়ে গেছে। এ কারণেই একুশ আসলে “শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি”কে নতুন করে মনে পড়ে, নতুনভাবে ভাবতে হয়।
স্বাধীন দেশে সবাই তো বাঙালি। বাঙালি হয়ে বাঙালির কাছেই মাতৃভাষা বাংলা সর্বস্তরে চালু করার ফরিয়াদ? গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি? এ কোন খেলা চলছে এখনো? তাহলে কি ভাবতে হবে জিন্নাহ সাহেবদের প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়ায় এখনো–আমাদের এই চারপাশে কিংবা এখনো সেই পুরনো কথা “সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু কর” প্রতিবারই সরকারিভাবে আইন জারি হয়, সব কাজে বাংলা ভাষার বাধ্যতামূলক ব্যবহারের। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে? ভাষার জন্য যাঁরা অকাতরে প্রাণ দিলেন তাঁদের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়নে বাঁধাটা কোথায়? দুঃখের না লজ্জার কথা জানি না একুশের যেসব গান অতীতের সংগ্রামী চেতনার হাতিয়ার সেই সব সংরক্ষণ করা হয়নি বেতার-টিভিতে। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানটির অবশ্য বিশেষ ব্যবস্থায় রেকর্ড নেই তবে ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসে যে রেকর্ডটি আছে সেটি “জীবন থেকে নেয়া” ছায়াছবির গানের। শোনা যায় প্রতিবছর একুশের সেই কালজয়ী কিছু গানের রেকর্ড হলেও, প্রচার হওয়ার পরপর সেসব নাকি মুছে ফেলা হয়েছিল। একি নিছক অভিযোগ না সত্য, তাও তলিয়ে দেখার সময় হয়নি আমাদের। কথার শেষ এখানেই নয়, আরও আছে, একুশের গানের প্যারোডি হয়, ডিসকো সুরে গাওয়ার প্রবণতা চলে। ক’বছর আগে টিভির একুশের অনুষ্ঠানে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” গানটি ডিসকো বানিয়ে গাওয়া হয়েছিল যা অনেকের স্মরণে থাকার কথা।
এসব ধৃষ্টতার বিরুদ্ধে জেগেছে আন্দোলন। টিভি রেডিওর অনুষ্ঠানে অপসংস্কৃতির প্রচারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলে একুশের অনুষ্ঠানে পরে পরিবর্তন এসেছে, সেটা সকলেই লক্ষ করেছেন। এভাবেই একুশ আমাদের প্রতিবছর নতুন সংগ্রামের ও বিজয়ের ইতিহাস রচনা করে চলেছে।
সঙ্গীতে একুশের চেতনা বিষয়ে দেশের স্বনামখ্যাত ৫ জন শিল্পীর স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে আমরা এই বিষয়ে নতুন পথের আশ্বাস খুঁজে পাবো।
শেখ লুৎফর রহমান
“১৯৪৮ সালের ২৬ কি ২৭শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ভাষণ উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানেরও। আমার মনে হয় বাংলা ভাষার উপর সেটাই ছিল প্রত্যক্ষ আঘাত আর তখন থেকেই আমরা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষার কাজে নিয়োজিত হই। ক্রমান্বয়ে বাংলা ভাষার প্রতি অবমাননা আন্দোলনে রূপ নেয় এবং ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রক্তের বিনিময়ে সে আন্দোলনে দুর্বার গতি সঞ্চারিত হয়। সত্যিকার অর্থে তখন থেকেই ভাষার আন্দোলন শুরু। তাই বলে ১৯৪৮ সালের জিন্নাহর ভাষণের পরবর্তী পর্যায়ের বাঙালি মানসের প্রতিক্রিয়া ও ঘটনাবহুল ব্যাপারগুলো যা ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে, তারও বোধকরি মূল্যায়ন করা দরকার। ভাষা আন্দোলনের অগ্রগামী সঙ্গীত শিল্পী শেখ লুৎফর রহমান এক প্রশ্নের জবাবে একথা বলেছেন। প্রশ্ন ছিল এই রকম—বাংলা একাডেমি ’৫২ থেকে “ভাষার গান” শীর্ষক যে ক্যাসেট বের করেছে সে সম্পর্কে তাঁর অভিমত কী? তিনি জানালেন, ’৫২ সালের আগেও এদেশে রচিত হয়েছে বাংলা ভাষাভিত্তিক গান। তিনি এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করলেন। জিন্নাহর ভাষণে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের মনে তীব্র ঘৃণার উদ্রেক হলেও কিছু কিছু তাবেদার শ্রেণির লোক নির্লজ্জভাবে জিন্নাহর উক্তিকে সমর্থন করেছিল। সেদিন গীতিকার আনিসুল হক চৌধুরী ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছিলেন :
“ওরে ভাইরে ভাই, বাংলাদেশে বাঙালি আর নাই।
যারা ভীড় করে এই পথে-ঘাটে
বাঙাল যাদের বল, এদের স্বদেশে
নিজেদের দশা করে টলমল গান।”
বহুবার এই গান গাওয়া হয়েছে এবং এধরনের আরো কিছু গান রচিত হয় সে সময়ে। এগুলো কি ভাষার গান নয়? একুশের গান প্রসঙ্গে তিনি অমর সেই তিনটি গানেরই উল্লেখ করলেন। বললেন, এছাড়া বাংলা ভাষা, বীর শহীদ তথা একুশের চেতনায় বহু গানই লেখা হয়েছে কিন্তু সেগুলো টেকেনি বেশিদিন। ’৫৪ সালে হাসান হাফিজুর রহমান রচিত “মিলিত প্রাণের যৌবন ফুল ফোটে রক্তের অনুভবে” গান প্রসঙ্গে তিনি বললেন, দেখুন বাণীর বিচারে এটিও একটি চমৎকার গান অথচ এ গানও বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। যদ্দুর মনে পড়ে ঐ বছরই একুশ উপলক্ষে এদেশের প্রথম শিল্পী সংস্থা ‘অগ্রণী শিল্পী সংঘে’র উদ্যোগে গানটি দিয়ে প্রভাতফেরী করেছি আমরা।
এ দেশের গণজাগরণের সাক্ষী শেখ লুৎফর রহমান ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন দেখেছেন, দেখেছেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রলয়, মড়ক-মারী, ’৫০-এর মন্বন্তর। তাঁর চেতনায় একুশ ভাস্বর। একুশ ‘আমাদের সবকিছুর উৎস, একুশ আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি, একুশ আমাদের ভাষা-সংস্কৃতির আর ইতিহাসের ইতিহাস—বাঙালি চেতনার প্রথম ফসল ও অস্তিত্বের উৎস।”
এই প্রবীণ সঙ্গীতজ্ঞের একুশের চেতনায় সঙ্গীত পর্যায়ের বক্তব্য হলো—“একুশের গান জনতার দৃপ্ত শপথের প্রতিধ্বনি, তবু দুঃখ এই, রাষ্ট্রভাষা বাংলার যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও আমরা পালন করতে পারছি না। একুশের চেতনায় রচিত আরও কিছু গান—‘অনেক একুশে দেখেছি, দেখেছি তোমায় নাগরিক বেশে’, রক্তে আমার আবার প্রণয় দোলা, ফাগুনে আজ চিত্ত আপন ভোলা’, ‘এই আগুন নিভাইব কে রে, এই আগুন নেভে নেভে নেভে না’ উল্লেখযোগ্য। শেষোক্ত গানের রচয়িতা সত্যেন সেন। শেখ লুৎফর রহমান বললেন, ১৯৫৪ সালে একুশে উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের এক জায়গায় বসে সেদিন গানের সুর করছিলাম। এমন সময় সত্যেন দা এলেন এবং ওই গানটি দিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে বললেন, লুৎফর ভাই, দেখুন তো গানটা ক্যামন হলো, সুর-টুর হবে কিনা কে জানে? গানটা পড়লাম, মুখের চেয়েও অন্তরার কথা আরো সাংঘাতিক—“ঘরে ঘরে জ্বলে আগুন / আগুন জ্বলে মনে মনে / এ যে তুষের জ্বালের আগুন জ্বলে নিভাইবি ক্যামনে? / আইলরে ওই ঝড়ের হাওয়া ছাই চাপা রবে না / আগুন ছাই চাপা রবে নারে।”
ওখানেই গানের সুর হলো, সবারই ভালো লাগল। প্রথমে আমি নিজেই বিভিন্ন জায়গায় গেয়েছি এবং আরো অনেকে গেয়েছেন সেই গান। শিল্পী লুৎফর রহমানের স্মৃতিতে একুশের ঘটনা এখনো উজ্জ্বল, “মায়ের মুখে শুনেছি ছোটকালে আমি নাকি ফুল ভীষণ ভালবাসতাম, ফুলের চারা কুড়িয়ে এনে লাগাতাম, একদিন মা বললেন, ফুলের মাসে জন্ম কিনা তাই ফুল এতো ভালবাসিস। তখন থেকেই জানলাম জন্ম ফুলের মাস ফাগুনে অথচ কী জানেন, এই ফুলই এখন বেদনা। বেদনার কারণ ২১শে ফেব্রুয়ারি বিকালে যথারীতি রেডিও স্টেশনে গেলাম নির্ধারিত অনুষ্ঠান করতে। গেটের কাছাকাছি এসে গেছি, দেখলাম, দু’জন ছাত্র লাঠির মাথায় রক্ত মাখা কাপড়ের টুকরো জড়িয়ে রেল লাইনের উপর দিয়ে ত্রস্তবেগে দৌড়ে আসছে। এসেই বললে, আপনারা কেউ রেডিওর অনুষ্ঠান করবেন না, শুনুন আজ বিকাল তিনটায় মেডিক্যালের সামনে গুলি হয়েছে, মারা গেছে ক’জন। এই যে দেখুন বলে ওরা লাঠিতে জড়ানো রক্তমাখা শার্টের অংশ বিশেষ দেখাল। আর অমনি আমার চোখে ভেসে উঠলো একগুচ্ছ রক্তপলাশ। এখন শহীদ মিনারে ফুল দেখলেই সেই রক্তমাখা জামার কথা মনে হয়।” শিল্পী লুৎফর রহমান এই কথাগুলো বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তাঁকে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে ভরসা পেলাম না। শুধু অনুভব করলাম এমন হৃদয়বান ব্যক্তি সত্যিই বিরল। কিন্তু দুঃখ এই, ভাষা আন্দোলনের সাহসী এই সৈনিক চিকিৎসার অভাবে আজ রোগ-শোকে জর্জরিত।
আবদুল আহাদ
সুরকার আবদুল আহাদ একুশ সম্পর্কে বলেন, একুশই স্বাধীনতার চেতনাকে প্রথম উদ্বুদ্ধ করেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মনে করি একুশ শুধু শোকের স্মৃতি নয়, একুশ বিজয়ের শুভ সূচনা। তাঁর মতে, একুশের গান প্রতিবাদের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হয়েছিল বায়ান্নর পরবর্তী সময়ে। একুশের গান জাতীয় সত্তার আর বাংলা ভাষা রক্ষার মূলমন্ত্র। ১৯৪৭ সালের ২৬শে মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণ ও বাঙালির সামগ্রিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে বলেন, পাকিস্তানের স্বাধীনতা পূর্ব পাকিস্তানীদের কোনো কাজেই আসেনি বরং মাতৃভাষার উপর আঘাত এসেছে যার অনিবার্য পরিণতিতে ভাষা আন্দোলন। ঠিক একইভাবে অস্তিত্বের জাগরণে যে সঙ্গীতের পথযাত্রা তাকেই আমরা ভাষার গান বলছি। আমি বলব ১৯৪৮ সালের পর, বিশেষত ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে রচিত ও তারও আগে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুল প্রসাদ, ডি. এল. রায় প্রমুখের যে গান হয়েছে অস্তিত্বের সংগ্রামের নিত্য সাথী, সেগুলোও একান্ত আমাদেরই সঙ্গীত, বাংলা ভাষার গান। আবদুল আহাদ একুশের বিশেষ তিনটি গানকে বলেছেন ভাষা আন্দোলনের বলিষ্ঠ হাতিয়ার। এই গানগুলোতে বাঙালির প্রাণের কথা যেমন মূর্ত হয়ে উঠেছে তেমনি এগুলো পথচলার হয়েছে পাথেয়। এর পর একুশের উপর তেমন উল্লেখযোগ্য আর গান হয়নি। আমি নিজেও ভাষার গানের সুর করেছি কিন্তু টেকেনি। তবে কবি শামসুর রাহমানের লেখা ‘বীর শহীদের রক্তের ডাক হয় না কভু শেষ। বরকতের বুক আজ বাংলাদেশ’ গানটি সাবিনা ইয়াসমিন ভালই গেয়েছেন। কিন্তু এটিও ভাষার গান হিসেবে তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। তিনি বলেন, একুশকে কেন্দ্র করে এদেশের মাটিতে প্রথম যেদিন রক্তের ফোঁটা পড়ল সেদিন থেকেই শুরু বাঙালি অস্তিত্বের সংগ্রাম আর সেই সংগ্রামী চেতনার অনুপস্থিতির কারণে কিংবা তাঁর প্রতিফলন ঘটানোর অবকাশ নেই বলে একুশের উপর রচিত গান আগের মতো আর আবেদন রাখতে পারছে না। তবু নতুন গান যে হচ্ছে এটাই আশার কথা।
সুরকার আবদুল আহাদ ভাষা আন্দোলনের এক নতুন তথ্য জানালেন। সে হলো ১৯৪৮ সালের মার্চে জিন্নাহ ‘উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ কথাগুলো উচ্চারণ করার সাথে সাথে জনতা নো, নো বলে আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই, রেকর্ডকৃত ভাষণে ‘নো’ এর জায়গায় হাততালি দিয়ে বেতারে প্রচার করা হয়েছিল।
আবদুল লতিফ
“ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়”—গানের গীতিকার ও সুরকার আবদুল লতিফ এমন একজন সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব যিনি এদেশের প্রায় প্রতিটি গণআন্দোলনের প্রত্যক্ষ সংগ্রামী। বাংলা ভাষার আন্দোলনে গানের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের স্মরণীয় দিনগুলোতে গানের ভাষায় গণ-মানুষের প্রাণের কথা বলেছেন। তাঁর মধ্যে “সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা,” “ও আমার বাংলা ভাষা, এ আমার দুখ ভুলানো বুক জুড়ানো লক্ষ মনের লক্ষ আশা,” “আমার দেশের ছাত্র-ছাত্রীর নাই তুলনা নাই” এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রচিত “আমার দেশের মতো এমন দেশ কি কোথাও আছে”- গানগুলো প্রাণ স্পর্শ করে। কথা ও সুরের দিক দিয়েও অপূর্ব। তাঁর লেখা প্রায় সব গানেই গণমুখী চিন্তা চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে। কথা আর সুরে অপূর্ব সমন্বয়। শিল্পী আবদুল লতিফের বহু স্মরণীয় ঘটনার একটি হলো ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি মিছিলের উপর গুলির সংবাদ। সংবাদটি তিনি পেয়েছিলেন বিকেলে। ওই বিকেলে ছিল তাঁর বেতার অনুষ্ঠান। যথাসময়ে তখন নাজিমুদ্দীন রোডের বেতার ভবনে গেলেন এবং সব শিল্পী মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন অনুষ্ঠান বর্জনের আর এর ভেতর দিয়ে শিল্পীদের জনতার সংগ্রামে একাত্মতা ঘোষণার প্রথম বীজ অঙ্কুরিত হলো। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত একুশের অমর সঙ্গীত- “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”র প্রথম সুরকার তিনি। পরবর্তী কালে আলতাফ মাহমুদ ওতে সুর করেন। এবং সে সুরেই গানটি এখন গাওয়া হয়ে থাকে। তিনি দুঃখ করে বললেন যে, স্বাধীন বাংলাদেশেও একুশের কিছু কিছু গান গাইতে গেলে বাঁধা আসে। এই প্রসঙ্গে তিনি জানালেন যে, টিভির মালঞ্চ অনুষ্ঠানে তিনি- “ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়” গানটি গাওয়ার পর লোকমুখে তাঁকে পুলিশের খুঁজে বেড়ানোর খবর পেয়েছিলেন। পুলিশ গিয়েছিল তাঁর বাসায়। ১৯৫৩ সালে, ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত সেই বিখ্যাত গানটি গাওয়ার পর পরই। শিল্পী আবদুল লতিফকে এই গান আর না গাওয়ার জন্যে সতর্ক করেও দেয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি তা গ্রাহ্য করেননি। এর কিছুদিন পর তার বাসা লুট হয়।
বহু বিপ্লবী গান তিনি বারবার লিখেছেন। তিনি গর্ব করে বলেন, ভাষা আন্দোলনের বেশ কিছু গান ইতিহাস হয়েছে কিন্তু সে গানের সঙ্গে জড়িত গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীদের সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে তাঁর আবেদন, একুশের সব গান সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ এবং নির্ভুল স্বরলিপি করে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচারের ব্যবস্থা করা হোক।
কলিম শরাফী
“আমি তখন চট্টগ্রামে। একুশের ঘটনার খবর পেলাম ঘটনার অল্পক্ষণ পরেই। সারা চট্টগ্রাম শহর তখন বিক্ষুব্ধ। ‘প্রান্তিক’ নাট্যগোষ্ঠীর ক’জন তখন আমার বাসায়। আমরা খবর শোনামাত্র রাস্তায় বেরিয়ে গেলাম। একুশের বিকেলেই লালদীঘি ময়দানে বিশাল জনসভা হয়েছিল। জনতার কণ্ঠে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না” শ্লোগান নয় যেন আগুন বেরিয়েছিল।” কলিফ শরাফীর প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়ার সুযোগ না হলেও একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে পরোক্ষভাবে একুশকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে বরাবর সোচ্চার ও সচেষ্ট ছিলেন। কথায় কথায় তিনি বললেন, “১৯৬৪ কি ’৬৫ সাল। আমি তখন টেলিভিশন ঢাকা কেন্দ্রের অনুষ্ঠান পরিচালক। তখন বেতার টেলিভিশনে কোনো ‘রেফারেন্স’ ছাড়াই একুশের অনুষ্ঠান প্রতি বছর প্রচারিত হতো। ফলে বাঙালিদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ। আমি তখন টিভি’র কার্যকরী পরিচালকের সঙ্গে দেখা করে বললাম গুরুত্বহীনভাবে একুশের অনুষ্ঠান করার কোনো মানেই হয় না। এবার আমরা একুশকে ঠিকভাবে তুলে ধরতে চাই। তিনি টিভির বার্তা পরিচালককে নিয়ে তদানিন্তন চীফ সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করতে বললেন। দেখা হলো কিন্তু লাভ হলো না। তবু আমরা সেবার একুশের অনুষ্ঠানে সুকৌশলে একুশের চেতনা ব্যানারে ভাষার গানের উল্লেখের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিলাম।” একুশের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরেকটি ঘটনার কথা বললেন কলিম শরাফী—১৯৬৯ সালে ঢাকা ক্লাবে বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সঙ্গে দেখা হলো। দেখা হলো এমন একজন ঘৃণ্য ব্যক্তির সঙ্গে যে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করতে চাইলো। বললো, আমিই সেই এসপি যে একুশের ভাষা আন্দোলনে গুলি করে একজনকে মেরেছি। কথাটা শোনামাত্র আমার হাত পেছনে আপনি সরে গেল। সেকি ঘৃণায় না উত্তেজনায় জানি না।
“ঘৃণ্য পদাঘাতে সেদিন
কেঁপে ওঠে এদেশের মাটি
ওরা আছে এখনো আমাদেরই চারপাশে
বেশ পরিপাটি।”
ওয়াহিদুল হক
প্রখ্যাত রবীন্দ্র-সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল হকের মতে, একুশে মানে গান। একুশ সঙ্গীতময় তাই গান ছাড়া একুশ পালন করা যায় না। সম্ভবও নয়। বিশেষ করে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি তো আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। এর মধ্যে একুশের চেতনাই শুধু নয়, গোটা বাঙালি আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর মতে, একুশের অন্যান্য সাড়া জাগানো গানগুলো হলো— আবদুল লতিফের ‘ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়’, গাজীউল হকের, ‘ভুলবনা, ভুলবনা একুশে ফেব্রুয়ারি’, মোশররফউদ্দিন আহমেদের, ‘মৃত্যুকে যাঁরা তুচ্ছ করিল’ ও শামসুদ্দিন আহমেদ রচিত ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালি’ প্রভৃতি। এ ছাড়াও বহু গান লেখা হয়েছে একুশের চেতনায় ভাষার উপর ভিত্তি করে এবং গান মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার অভিপ্রায়ে কিন্তু শেষ পর্যন্ত টেকেনি। টেকেনি কেন? প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, “প্রায় গানের সুরেই পাশ্চাত্যের প্রভাব বেশিমাত্রায় পড়েছে এবং দেশীয় ভাবধারার অনুপস্থিতি। এই যে ধরুন, ‘ও আমার দেশের লাগি’, কিংবা ‘মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা’ গানগুলোতে কী মর্মস্পর্শী সুরের মূর্ছনা যার দরুণ এধরনের গান অন্তরের সঙ্গে গেঁথে রয়েছে। প্রাণ-ছোঁয়া গান ছাড়া গণজাগরণ হবার নয়।” ওয়াহিদুল হক জানান, একুশে প্রথমে সঙ্গীত, তারপর আলপনা এবং শেষে চিত্রকলার সমাবেশ ঘটেছে। একুশের গান সংরক্ষণে ব্যর্থতার প্রশ্নে তিনি বলেন— এইচএমভিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি রেকর্ড হয়েছিল, বেতার টিভি তো ইচ্ছে করলে সেখান থেকেই গানটি সংরক্ষণ করতে পারতো। একুশের প্রায় সব গানই আনুষ্ঠানিক হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রাণের তাগিদে কাউকে গাইতে শুনি না, শুধুমাত্র একুশ বা এধরনের কোনো অনুষ্ঠান ছাড়া, কিন্তু কেন? ওয়াহিদুল হকের জবাব— এই যে বললাম সুরে প্রাণের ছোঁয়া কম আর পাশ্চাত্য সুরের প্রভাব। (ঈষৎ পরিবর্তিত)
উৎস
সচিত্র সন্ধানী, ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫, ১২ ফাল্গুন ১৩৯১