জোখা আলহার্থি > বিবাহ >> রাজিয়া সুলতানা অনূদিত ছোটগল্প

0
397

[সম্পাদকীয় নোট : গত মাসে ওমানের কথাসাহিত্যিক জোখা আলহার্থি তাঁর Celestial Bodies উপন্যাসটির জন্য ২০১৯ সালের মর্যাদাপূর্ণ Man Booker International Prize পেয়েছেন। আলহার্থিই আরবি ভাষার প্রথম লেখক যিনি এই পুরস্কারটি পেলেন। এই পুরস্কারটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ইংরেজির বাইরে অন্যভাষা থেকে ইংরেজিতে অনূদিত গ্রন্থকেই পুরস্কার দেয়া হয়। সেই হিসেবে উপন্যাসটির অনুবাদক মেরিলিন বুথের সঙ্গে যৌথভাবে পুরস্কারটি পেয়েছেন আলহার্থি। পশ্চিম এশিয়ার মাত্র ৪৭ লাখের মতো জনসংখ্যা অধ্যুষিত ওমান। ম্যান বুকারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার (নোবেল পুরস্কারের পরেই এই পুরস্কারটিকে ধরা হয়) পেয়ে বিশ্বসাহিত্যে কখনও এভাবে স্থান করে নিতে পারে, এই পুরস্কার ঘোষণার আগে সেটা কেউ ভাবতেই পারেননি। সাহিত্য-ঐতিহ্যের দিক থেকে ভাবলে ইউরো-মার্কিন ও লাতিন আমেরিকার বলয়ের বাইরে প্রান্তিক একটি দেশের লেখক আলহার্থি পুরস্কারটি জয় করে নিলেন। এই জয় বিস্ময়কর হলেও বুঝিয়ে দিল যে, এই ধরনের অনেক দেশেই উল্লেখযোগ্য সাহিত্যচর্চা হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশের সমকালীন পাঠক-লেখকদের অনেকেই ভাবি যে, বিশ্বমানের কথাসাহিত্যচর্চা করছি আমরা। কিন্তু এর বাইরেও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পাওয়ার মতো সাহিত্যচর্চা যে হচ্ছে, সেটা আলহার্থির পুরস্কার পাওয়া থেকেই বোঝা যায়। এটাও বিস্ময়কর নয় যে, আলহার্থি পিএইচডি ডিগ্রিধারী একজন কথাসাহিত্যিক। এই শিক্ষা তার পুরস্কার পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং তার এই পঠনপাঠন পুরস্কারপ্রাপ্তিতে সহায়তা করেছে। আলহার্থির লেখার মূল বিষয়আশয় যে পুরুষতন্ত্রের দ্বারা নিপীড়িত ওমানী নারীর করুণ অধস্তন জীবন, তিনি তার পাঠকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। এখানে প্রকাশিত ‘বিবাহ’ গল্পটিও ঠিক এরকমই একটি গল্প। সে যা-ই হোক, আলহার্থিকে তীরন্দাজের অভিনন্দন। একটাই আক্ষেপ, বাংলাদেশের কোনো লেখক কি এই পুরস্কার কখনও পাবেন না? সেই চেষ্টাটা কি আমরা অনুবাদের মধ্য দিয়ে করতে পারি না?]

বিয়ের অনুষ্ঠানের বিশাল প্যান্ডেল। প্যান্ডেলের ভেতরে কনে বসার আসনটা সাজানো হয়েছে অসংখ্য ফুল, সাদা আর গোলাপি রঙের ঝালর দিয়ে। মেয়েরা টেবিলের চারপাশে গোল হয়ে বসেছে। সালমার মাথা না সামনে নোয়ানো, না পেছনে হেলানো। চেয়ারে বসে পিঠ টান টান করে রেখেছে ও। রূপার আংটি, সোনালি রঙের আংটি, ব্রেসলেট, পুঁতি দিয়ে বানানো চুড়ি-পরা হাত দুটো কোলের ওপর রেখে বসেছে সালমা। পায়ের নূপুর মাটিতে গেঁথে আছে। ঠোঁটে তৃপ্তি আর সুখের মেকি হাসি, যেন সে আশীর্বাদপ্রার্থী। কিন্তু কেমন যেন অবসন্ন দৃষ্টি তার, চোখের পাতা পড়ছে না বললেই চলে। কনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সালমা।
দু’ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলছে বিয়ের অনুষ্ঠান। অথচ সালমা একবারের জন্যও উঠে দাঁড়ায় নি, হাত ওঠায় নি বা শরীরের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়ায় নি। মুখে স্থির হাসি আর নিশ্চল ভঙ্গিতে নিজেকে ধরে রেখেছে সে। যেন এই চেয়ারটাতে বসার জন্যই ওর জন্ম হয়েছে, যেন সে এই প্যান্ডেল ছাড়া এর আগে আর কোথাও ছিল না। তার অস্তিত্বও তাও যেন অক্ষয়, অবিনশ্বর। অনাদিকাল থেকে সে আছে, ছিল এবং থাকবে।
অন্তত দশজন লোকের সঙ্গে দশবার বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে সালমা। কিন্তু কোনো বিয়েই আজকের এই বিয়ের মতো ছিল না। কনের জন্য ঝালরযুক্ত কোনো আসন পায়নি সে। কোনো বরই সবার সামনে এভাবে ওর পাশে বসে হাত দুটো ধরে নি। যতবারই বিয়ে হয়েছে, ততবারই ভারি সবুজ রঙের বোরখা দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত মুড়ে বসতে হয়েছে ওকে। ধনী নাকি দরিদ্র লোকের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করত ওর বোরখার কারুকার্যময় সূচিশিল্পের ধরন। তবে সবসময় এমব্রয়ডারির কাজ থাকত বোরখায়। ধনী হলে সোনার সুতো দিয়ে আর দরিদ্র হলে সাধারণ সবুজ সুতোয় তোলা কাজ করা থাকত। ওর চারপাশে বসে গান গাইত, চিৎকার, হৈচৈ আর ঢলাঢলি করত যে মেয়েগুলো, তাদের ভিড়ের মধ্যে ওর শরীরে চাপ লাগতো, নিষ্পেষণের সেই ব্যাপারটা যেমনই হোক, ওকে সহ্য করতে হতো। নিজের বাড়ি থেকে সরাসরি বরের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ওকে ঘরের এক কোণে মেঝের ওপর রাখা ছোট্ট একটা পাপোশের ওপর ওকে বসিয়ে রাখা হত। বেচারি ভারি সবুজ বোরথার নিচে হাসফাঁস করতো, ঠিক মতো শ্বাস নিতে পারত না। প্রায়ই ওর দম আটকে আসার উপক্রম হতো। সালমার সামনে একটা থালার মধ্যে হালুয়া আর কেটলিতে তেতো স্বাদের কফি রেখে মেয়েরা চারপাশে গোল হয়ে বসতো আর ছেলেদের দল আসামাত্রই মেয়েরা উঠে চলে যেতো। এরপর ওরা বর-কনেকে একা রেখে চলে যেত। বরটি ওর অবসন্ন ঘুম-ঘুম চোখ আর মালা, চুড়ি, তাবিজ, সোনা-রূপা, নানা রঙের প্লাস্টিকের ব্রেসলেটে ঠাসা ওর দিকে তাকিয়ে থাকত। এরকম থাকাটা ওর অভ্যেসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল, ঠায় বসে থাকতে কখনও অসাচ্ছন্দ্য বোধ করেনি।
আজ রাতে সালমার বসার জন্য বিশেষভাবে একটা চেয়ার আগেই তৈরি করা হয়েছিল। সেই চেয়ারটাই সে আলো করে বসে আছে। স্বাভাবিক বা অনিচ্ছাকৃতভাবেই হোক, ওর চোখ দুটো আজ বিষণ্ন দেখাচ্ছে, কনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সে। ওর মাথাঢাকা বোরখার এমব্রয়ডারির নিচে জবজবে তিলের তেল মাখানো চুলের দুটো বেনি দেখা যাচ্ছে। বেনি দুটো আবার সুগন্ধী ফুল-লতাপাতা, গুল্ম, খেজুর, কর্পুর, কস্তুরী ইত্যাদি দিয়ে মোড়ানো। নাকে ফুলের মতো একটা নাকফুল। নাকফুলটাকে মনে হচ্ছে ওর নাকেরই একটা অংশ। আলাদা কিছু বলে মনেই হচ্ছে না। আর ওর আত্মবিশ্বাস, সেকথা না বলাই ভালো! বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে ওকে। কোনো সন্দেহ নেই – ওর নয়টা পোষা মুরগী এখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে। আজ সকালেই সে মুরগীর ঘরটা পরিস্কার করে ডিমগুলো সংগ্রহ করে রেখেছে। দুপুরে নিজের খাবার খাওয়ার পর যে উচ্ছিষ্ট ছিল, সেই উচ্ছিষ্টটুকু মুরগীগুলোকে খেতে দিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে আসার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। এরপর অতিথিদের জন্য নির্ধারিত বাস ধরে মাসকাটের ওমানি উইমেনস সোসাইটির বিয়ের আসরে সরাসরি চলে আসে। ওর মুখে তখন অনিঃশেষ ম্লান ক্ষীণ হাসি, ভাঁজও পড়েছে কিছুটা। না, ওর মুখের সেই হাসিটা বিদ্রুপের হাসি ছিল না। বরং মুখে লেগে ছিল তৃপ্তি আর সুখের হাসি। ও যেন আশীর্বাদধন্য হয়ে বসে আছে। টাটকা ডিম বিক্রি করে সে কিছু টাকা আয় করেছে। আর ও সনাতনি ‘দিশদশা’ নামের যে পোশাকটা পরেছে, তা ওর মেয়ের কাছ থেকে পাওয়া একমাত্র উপহার। মেয়ে ঈদে বছরে একবার মাকে দেখতে আসে। এই মেয়ের বাবা সালমার চতুর্থ স্বামী। আগে এই লোকটা মাসের পর মাস সালমাকে বিয়ে করার জন্য হন্যে হয়ে উঠেছিল। যেখানে সামলা যেত সেখানেই লোকটা ওর পিছু নিত। শহরতলী দিয়ে ও যখন হেঁটে যেত, সালমার সেই হাঁটা দেখে লোকটা মুগ্ধ হয়ে হা করে তাকিয়ে থাকতো। সালমা লোকটাকে বিয়ে করতে রাজি না হওয়া পর্যন্ত সে বস্তি বা ঘিঞ্জি এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় সালমাকে অনুসরণ করত। লোকটা নিজের জায়গা আর স্ত্রীকে ছেড়ে এসে সালোমার সঙ্গে থাকত।

খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। কাটাচামচ, প্লেট, কাটাছুরি টেবিলে সাজিয়ে দেয়া হয়েছে। গ্রিল করা মাংস, কেক, পেস্ট্রি সব টেবিলে রাখা হয়েছে। কিন্তু সালমা সেদিকে একবারও তাকালো না। শুরু থেকে পিঠ সোজা করে বসে কনের হাতে ধরা একটা ফুলের তোড়ার দিকে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে আছে। একেবারে স্থানু সে, কোনো নড়াচড়া নেই। কেউ কনেকে খাবার এনে দিলে কাটাচামচ দিয়ে এমনভাবে খাচ্ছে যেন সারাজীবন সে এই চামচ দিয়ে খেতেই অভ্যস্ত। ওর হাতে টকটকে লাল রঙের ড্রিংকস- ‘শানি’। এই শানি খেলে ঠোঁট রাঙা হয়ে ওঠে। এই ড্রিংসটা কনে পছন্দ করে নিয়েছে। সে হাত নাড়লেই ব্রেসলেট টুংটাং শব্দে বেজে ওঠে। ‘দিশদশা’ পোশাকের নিচে বাহুর উপরের অংশে বাজুবন্ধের মিষ্টি একটা শব্দ সঙ্গীতের ধ্বনিঝংকারের মতো সুর তুলছে। সেই কতকাল থেকে এই বাজুবন্ধের শব্দ পুরুষকে আকৃষ্ট আর বিমোহিত করে রেখেছে।
আমরা এসব দেখে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসছি আর জিজ্ঞেস করছি, ‘এই সালমা, তোমার কন্যার বাবার খবর কী, সে কি তোমাকে ত্যাগ করেছে?” সালমা টান টান করে সোজা হয়ে বসে দুইহাত কোমরে রেখে চোখ মিটমিট করে কিছু বলার আগেই আমরা চিৎকার করে বলে উঠি, ওড়ে “পোড়া কপালি দুর্ভাগ্য তোমার বার বার ফিরে আসে।”
কথাটা শুনে সালমা মজা পেয়ে হেসে ওঠে। নিজের উরুতে হাত বুলিয়ে আমাদের কথাতেই সায় দিয়ে বলে ওঠে – ‘ঠিক বলেছো। সবই আল্লাহ্‌র ইচ্ছা। প্রতিদিন আমি আমার ঘরের দরজার সামনে পুঁতে রাখা চুল, হাড়, কালো সুতো, এইসব পেতাম। আমি তো বুঝতে পারি না ওরা কেন আমাকে কেন এত হিংসে করে? আমি অসুস্থ, নিঃসঙ্গ এক নারী।” কথাগুলো শুনে আমরা সমস্বরে বলে উঠি, ‘না, না, তোমার মতো সুস্থ আর কে আছে। যদিও তোমার বয়স এখন ষাটের ওপরে, তবু তোমার স্পন্দিত আকর্ষণীয় হাঁটার গতি পুরুষকে ঠিকই বিমুগ্ধ করে। ওদের মনে তীব্র কামভাব জেগে ওঠে। সবাই তো এটাই বলাবলি করে। প্রশংসাও করে সবাই। তোমার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে চায়। এই কথাগুলো শুনে সালমার মন খুশিতে রাঙা হয়ে ওঠে। খুশির তীব্র আবেগে সে বলে ফেলে, এখনও কত বিয়ের প্রস্তাব পায় সে। কিন্তু সেইসব পুরুষের বয়স অনেক বেশি। শুধু শুধু এটা-ওটা বাজে কথা শোনায়, কোনো কাজের না।
সালমা একটা রুমাল দিয়ে নিজের মুখ মোছে। ওর আশেপাশের মেয়েরা হ্যান্ডব্যাগ থেকে আয়না বের করে, ভ্রু ব্রাশ করে, ঠোঁটের লিপস্টিক ঠিক করে, মুখে পাউডার লাগায়, বার বার চুলের গুচ্ছ হাত দিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়। দেখায় যে ওরা কত স্মার্ট। সালমার কপালে তখন জাফরানি রঙের গাঢ় হলুদ রঙ লেপ্টে আছে। কোনো হ্যান্ডব্যাগ নেই ওর, হ্যান্ডব্যাগের প্রয়োজনও পড়েনি কখনও। সেজন্য চারপাশের হ্যান্ডব্যাগধারিণীদের দিকে ওর মনোযোগ নেই। শুধু ক্যামেরার সামনে বসা কনের দিকে ওর চোখ স্থির হয়ে আছে।
মেয়েরা গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে নাচছে। গানের কথার সঙ্গে সেই বৃত্তটাও বড় হচ্ছে। সেই গানে কিছু সোয়াহিলি শব্দ আছে। সালমার এক স্বামী এক সোয়হিলি ভাষাটা খুব ভালো পারত, কিন্তু সালমা এই ভাষাটা বোঝে না। সেই স্বামীর সংসারও কয়েক মাসের বেশি টেকে নি ওর। বিকেলের দিকে অন্য বউদের কাছে মজা করে সেই গল্প বলতো সালমা। হঠাৎই মাটিতে শুয়ে পড়ে পায়ের ওপর পা আড়াআড়ি করে রেখে জোরে জোরে স্বামীর মোটা গলার স্বরটা নকল করে বলত – ‘না, সবই আল্লাহ্র ইচ্ছা। আমি জীবনে আর কোনো নারীর সঙ্গে এতটা স্বস্তি পাইনি। তুমি আমার পরম সুখ। তুমিই আমার এক অনন্য উপহার। কোথায় ছিলে হে তুমি এতদিন? আমার সব তুমি নাও- বাক্সপেট্রা, আলমারি, গাধা, তালগাছ, খেজুরগাছ, যা কিছু আছে সব তুমি নাও। তার বদলে শুধু আমার সঙ্গে আমার কাছে থাকো। এতগুলো বছর কোথায় ছিলে তুমি, মেয়ে, বলো তো?” এরপর সালমা উঠে বসে হেসে হেসে বলে –“যে-ই না একটা ছেলে হলো, অমনি সে বাক্সপেট্রা, গাধা, তালগাছ, খেজুরগাছ সব নিয়ে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। এর জন্য দায়ী হচ্ছে ওই কামবাসনা আর আমার দুর্ভাগ্য ফিরে ফিরে আসা, বুঝলে? সেই ব্যাটার কুনজরে পড়েছিলাম আমি। আমার তখনকার স্বামী বাড়ি এলে যদি কোনো কারণে আমোকে না দেখতো, তখন কিছু খতরনাক মহিলা আমাকে নিয়ে ওর কান ভারি করতো। ওই বদ মাইয়াগুলান বলতো – আরে জানো না, তোমার বউ তো এখন অন্য নাগরের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করছে। কিন্তু এইগুলা ছিল ডাহা মিছা কথা। কোনওদিনও আমি এরকম ছিলাম না। ওরা আমাকে কেন যে এত হিংসা করতো, জানি না। আমি তো একা, নিঃসঙ্গ, অসুস্থ নারী।” বলে সালমা চোখ টিপে ঈষৎ হাসলো। আমরা কোনোরকম রাখঠাক না করে বললাম, “তোমার স্বাস্থ্য তো ভালোই, আর তুমি একা নিঃসঙ্গও নও। তোমার ছেলে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। সে এখন বিয়ে-সাদি করবে, ওর সন্তানাদি হবে এবং তুমি ওদের দেখেও যেতে পারবা।” সালমা কী ওর মনের চোখ দিয়ে নাতিপুতিদের দেখতে পাচ্ছে? নাতিপুতিরা ধরো, চোখ ধাঁধানো আলোয় মধ্যে গান গেয়ে আর নেচে চলেছে, এসব কী কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে সালমা? দেখতে পাচ্ছে কি ওদের চেহারা? কেমন হবে ওরা দেখতে? ওর ছেলের মতো, ছেলের বাবার মতো সুদর্শন? ছেলে তো বাবার মতোই সুন্দর হয়েছে দেখতে। নাকি ওর নাতিপুতিরা মায়ের মতো দেখতে হবে? ইন্ডিয়ানদের মতো কি ওরা, যারা কিপটামি করে বিয়ের খরচ বাঁচায়? নিজের বিয়ের সময় সালমা অনেক টাকাপয়সা খরচ করেছে। ছেলের বিয়েতে অত খরচ করার সামর্থ্য ওর নেই। এমনকি খুব সাদামাঠাভাবে একটা বিয়ে দেয়ার আর্থিক সঙ্গতিও এখন নেই ওর। খুব সাধারণভাবে বিয়েশাদি হবে ওর ছেলের। ছেলেপুলেও জন্মাবে। সালমা তাদের দেখার জন্য ততদিন হয়তো বেঁচেও থাকবে। অন্য পুত্রটাও ওর নিজেরই সন্তান। কত বছর হয়ে গেল সেই ছেলেকেও দেখে না সালমা। ছেলেটা হয়তো বেঁচে আছে, হয়তো আল্লাহ্ই ওকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ওর বাবা যেদিন সালমাকে ত্যাগ করে চিরদিনের মতো চলে যায়, সেদিনই ছেলেটাও বাড়ি ছাড়ে। ওর মায়ের সাত নম্বর স্বামী ছিল লোকটি। যে-বছর খরা হয়, সেবছরই লোকটা ওর মাকে বিয়ে করেছিল।
নাচতে নাচতে ক্লান্ত হয়ে মেয়েরা চেয়ারে বসে পড়েছে। নাচার ঠেলায় ওদের টলে পরে যাওয়ার অবস্থা। কনে বারবার অস্থির হয়ে দরজার দিকে তাকাচ্ছে। ধীরে ধীরে গান আর হৈচৈ কমে এলো। অতিথিরা একে একে বিদায় নিচ্ছেন। সালমা নিখুঁতভাবে আরাম করে সেই সুন্দর হাসি আর ভঙ্গিটি ধরে রেখে চেয়ারে বসে আছে। ওর পার্টনার ফিসফিস করে যখন বলল বাস ছেড়ে দিচ্ছে, কেবল তখনই সম্বিৎ ফেরে সালমার। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে, দেখে মনেই হলো না যে ওর পিঠে কোনো ব্যথা আছে। সালমা ধীরে ধীরে কনের আসনের দিকে এগিয়ে গিয়ে কনের মাথায় হাত রাখে। কনে এমনভাবে মাথা নোয়ায়, যেন দামি পার্লারে গিয়ে করানো চুলের সাজটা এতটুকু নষ্ট না হয়। সালমা বিড়বিড় করে সূরা ফাতিহা পাঠ করে। এরপর অতিথিদের ভিড় ঠেলে বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা দেয়। সালমার হাঁটার রমণীয় ভঙ্গি দেখে পুরুষদের ওর দিকে চোখ পড়ে আর কামভাব জেগে ওঠে। এ কারণেই এখন পর্যন্ত ওর দশ-দশবার বিয়ে হয়েছে।