জ্যোতির্ময় জানালা >> এই সময়ের ১২ জন কবির ২৪টি কবিতা >> শুক্রবাসরীয় সংখ্যা

0
483

জ্যোতির্ময় জানালা >> ১২ জন কবি ২৪টি কবিতা >> শুক্রবাসরীয় সংখ্যা

বাঙালি পাঠকমাত্রই জানি, বাংলা কবিতা বাংলাদেশ ছাড়িয়ে প্রসারিত হয়ে আছে সীমান্তের ওপারে। সেই সীমা ছাড়িয়ে মহাদেজেশীয় সীমানায়ও পৌঁছে গেছে বাংলা কবিতা। কিন্তু কেমন লিখছেন সেইসব কবি? এর চেহারাটা খুব স্পষ্ট নয় আমাদের কাছে। কখনো কখনো সীমান্তের ওপারের কিছু কবিতার বই অথবা লিটিল ম্যাগাজিনের সূত্রে আমরা কিছু কবিতা পড়ার সুযোগ পাই, কিন্তু সবার কবিতা আমাদের কাছে পৌঁছায় না। আমরা পড়তে পারি শুধু যেসব কবিতার বই আমাদের এখানে আসে, সেইসব বইয়ের কবিতা। এই কবিরা ‘নামী-দামী-জনপ্রিয়’ বলে খ্যাত। কিন্তু এর বাইরেও যে বাংলা কবিতার সমৃদ্ধ চর্চা চলছে ওখানে, সেই চর্চার সঙ্গে যুক্ত আছেন অনেক তরুণ কবি, সে-খবর আমরা একেবারে জানিই না। সেই অভাব দূর করার জন্যেই এই বিশেষ কবিতাগুচ্ছ। এখানে যাঁদের কবিতা প্রকাশ করা হলো তাঁরা খুবই ভালো কবিতা লেখেন। হ্যাঁ, আমি বেশ গুরুত্ দিয়েই বলছি, সমকালের বাংলা কবিতার কথা বলতে গেলে, এঁদের কবিতার কথা বলতেই হবে। সমকালীন কবিতার শীর্ষে তাঁদের স্থান। বাংলা কবিতার সামগ্রিক মানচিত্রটি পঠন-পাঠনের সূত্রে দীর্ঘদিন ধরে আমি খুব অভিনিবেশ সহকারে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ করে আসছি। সেই প্রেক্ষাপটেই আমার এই কথাগুলি বলা। আরেকটি কারণে এই কথাগুলি বললাম। প্রিয় পাঠক, আপনারা তো সমৃদ্ধ বাংলা কবিতাপাঠের অভিজ্ঞতা আছে, সেই পাঠের পর এই কবিতাগুলিও পড়ুন। আপনাদের ভালো লাগবে নিঃসন্দেহে। কতটা উজ্জ্বল এই কবিদের কবিতা। শেষকথা, কবিতাগুলি কেমন লাগলো, আমাদের জানাতে ভুলবেন না। আনন্দময় হোক আপনাদের কবিতাপাঠ।

এই বিশেষ সংখ্যায় যাঁরা কবিতা লিখেছেন

সুমন ঘোষ
সুদীপ চট্টোপাধ্যায়
অতনু ভট্টাচার্য
দেবাঞ্জন দাস
শানু চৌধুরী
শুভ আঢ্য
নীলাব্জ চক্রবর্তী
জয়শীলা গুহ বাগচী
প্রীতম বসাক
ইন্দ্রনীল ঘোষ
অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়
মনোজ দে

সুমন ঘোষ-এর কবিতা

শোধন

কাজল‌ কাঁপে চোখের বিপত্তিতে
বিনীত ডাক ফিরত মুখে-মুখে
ছিপছিপে রোদ আলিস-লাগা শীতে
দু’চার আনা কুড়োতো সিন্দুকে

দু’চার আনা মাঠের ধারে শীতল
চোখ লুকিয়ে বেড়ায় দূরতর
গয়না বাতিল সোনা-রুপো-পিতল
দু’চার আনা হৃদয় থরো-থরো

কিনতে যেত কাজল কলঙ্কিত
সতর্কতা, সামান্য তার টিপে
চোখের সিঁড়ি একটু অলংকৃত
পদস্খলন ঘটেছে ব-দ্বীপে

ছদ্মদহন, চোখের বিপত্তিতে
ভাঙা কাজল শোধন করে নিতে!

সেচ

যোজনা হাঁস। ফকির ঘনঘটা।
ঘড়ির দিকে তাকাও ডুব-সাঁতার
যে-চুম্বনে হার মেনেছি হঠাৎ
মুকুর জুড়ে যে-চুম্বনে ত্রাতার

কুঞ্জ থেকে কুঞ্জে ফেরা শালিখ
গৃহস্থকে করেছে সাবধানী
রোদনবনে ঘুরেছো বনমালী
ঘুরতে-ঘুরতে করলে যাকে দানী

কাঁচা মানুষ বাঁধা চাবির তোড়ায়
কনিষ্ঠ মন কুঠার খুঁজে চলে
যোজনা হাঁস প্রতিবিম্ব পোড়ায়
মুখশ্রীতে, শ্রীচুম্বনাঞ্চলে

বিফল বিদায় মধুর জলসেচে
আমাকে রোজ রাখছ তুমি কেচে!

পরিচিতি

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় বাতিকার নামে সুদূর একটি প্রান্তিক গ্রামে বেড়ে ওঠা। কবিতাই তার প্রথম ও শেষ প্রেম। পাশাপাশি গদ্যও লিখেছেন। দেশ, কৃত্তিবাস, বারোমাস, কবি-সম্মেলন, রক্তমাংস, এখন শান্তিনিকেতন প্রভৃতি পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে। মিউজ ইণ্ডিয়ায় কবিতা অনূদিত হয়েছে। সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘বারোয়ারি কমিটির থিয়েটার’ নামে কবিতার বই।

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়-এর কবিতা

শ্রুতি

গল্পগুলো নিয়মিত ফিরে আসছে না
তাদের ক্লান্ত পায়ের ভেতর তৈরি হচ্ছে
অন্য কোনও পথ

আমাদের খিদের স্বাদ ক্রমশ বদলে যাচ্ছে
জিভ ততটা জিভ হয়ে উঠতে পারছে না আর

এত এত স্বাদকোরকে ঠোক্কর খেয়ে
গল্পগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে থাকছে রোজ
আর, সূর্য কেমন ঘাম ও রক্ত শুষে নিয়ে
ভোরের ফ্যাকাশে সংবাদ করে দিচ্ছে তাদের

লেখা – আয়নামুখ। শরীর থেকে গড়িয়ে
আধখাওয়া সন্ধের দিকে গেছে
এভাবে শ্বাপদ ফিরে আসে নির্জন জলের কাছে

জল, মূলত আমাদের প্রথম ইতিহাস
তার বর্ণহীন ছদ্মবেশ প্রলুব্ধ করে
চেনায় রঙের ব্যবহার

যখন রক্তের দাগ দেখে আমরা বুঝতে চাই
কতটা একাকীত্ব, কতটা আর্তনাদ
অথবা, কী অনাবিল তামাশা নিয়ে
একটা জীবন কেটে যায়

ঠিক তখনই, লেখা, শরীর ছেড়ে
আধখাওয়া সন্ধের দিকে যায়
নির্জন জলের কাছে ফিরে এসে
সন্তর্পণে আরও একটা ফাঁদ পাতে

পরিচিতি

পশ্চিমবঙ্গ নিবাসী। লেখালেখি শুরু শূন্যদশকে। কাব্যগ্রন্থ সমূহ : যেখানে ভ্রমণরেখা, আলফাটোন, মুজরিমপুর, শমীবৃক্ষের নীচে, আহারলিপি এবং একলামি।

 

অতনু ভট্টাচার্য-র কবিতা

নুড়ি

বক্সার জঙ্গল-বস্তির কাঠের কটেজ
আর ওই রুদ্ধশ্বাস রাত
নুনের লোভে আসা জানোয়ার
ফটোশ্যুট দুপুর জঙ্গলে
এইসব খুব মনে পড়ছে আজ
তোমার কথা মনে পড়ছে
গোপন ততধিক রোমাঞ্চঘন
কামনায় তিরতির কাঁপতে থাকা
ভুটানের পাহাড়ী ঝর্ণার নিচে
ফার্ণ-শ্যাওলা-সুদর্শনকীট
আর তুমি এই বিশীর্ণ নায়কের হৃদয়-শরীর জুড়ে
কি সে এক তুমুল শুশ্রুষা!
আজ অনেক অনেকদিন পর
শেষ বিকেলের গা বেয়ে
চোখের বাইরে স্মৃতির নুড়িটি
কোথায় গড়িয়ে যাচ্ছে

স্বপ্নের পাশে

তৃষ্ণার পাশে লিখি প্রেম
প্রেমের পাশে লিখি স্মৃতি
স্মৃতির পাশে শোক

স্বপ্নকে কার পাশে বসাই ?

স্বপ্ন বলল :
আমি তোমার নির্বাচিত কবিতা বইয়ের এক তিল
কবিতাসমগ্রের কিছুটা
বাকি যা হাওয়ারও অগম্য

স্বপ্নের পাশে রহস্য নয়, অপূর্ণ লিখে রাখি

পরিচিতি

জন্ম ১৯৭৪, কোলকাতায়। লেখালিখির শুরু ২০০২ সাল থেকে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : অক্ষরে বোনা মুদ্রিত বিরহ, নিরাকৃত ভ্রাম্যমাণ তুমি, অভিন্ন হৃদয়েষু ধুলো, নক্ষত্রমালা শিব ও শূন্যতা, পারমিতাকে ডাকছিলাম, এ কোন জন্মে বেঁচে আছি, ফুঃ, অপূর্ণাও যেভাবে বাজান, অন্যমনষ্ক গোধূলিবেলা, ধ্রুবপৃথিবী। প্রকাশিত ছড়ার বই : ছড়ার ছড়ি। পুরস্কার : কল্পবৃক্ষ (২০১৯)।

দেবাঞ্জন দাস-এর কবিতা

 

করোনার দিনগুলোতে

১.

একা হওয়া নিয়ে
আমার চাঁদ রাখাল খেলা
হাঁটতে হাঁটতে জোছনা
চলে গেছে বহুদূর …
আমি তার চিহ্ন খুঁজি ধুলোয়
মাটির কাছে কুঁজো হয়ে দেখি
নেই-চায়ের দোকানে আড্ডা বসেছে
সেখানে সিটি দিল লোকাল ট্রেন
বুঝি গাওয়া হবে দেশরাগ …

আর আলো চেপে দাঁড়িয়ে থাকি আমি
মানুষের চোখ থেকে ফুরনো ছায়া দেখি
নিভে যাওয়া আগুন ঘিরে
ঠাণ্ডা হচ্ছে জল
চাঁদের ছায়া হয় না
এ কথা বুঝে মানুষ ওজু করে
মিশে যায় জলের বহতায় …

২.

খুব কাছ থেকে এত
আলো আলো কর
আগুনের কথা তো বল না

দুঃখকে চিনব বলে
লাট্টু-লাটিম তুতো ঘর-বিছানা
একটা দুঃখের নাম নীলবন
একটা নীলবনের নাম রামা কৈর্বত
তির্যক তাকানোর মতো দীনবন্ধুরা যায় আসে
আর দুঃখের টোটেম হয়ে
নিজেকে ইশারা করি বারবার

এ’ প্রকল্পে দু’ মুঠো ভাত
শান্ত পাড়া
জল-লাগা পাতিহাঁস
নিজেকে জ্বালিয়ে টেরাকোটা করেছে
ঠাণ্ডা করতে বরফ দিয়েছিলাম
আজও সেখানে চোখ লেগে আছে

পরিচিতি

শূন্যদশকের কবি। জন্মসাল ১৯৮০। ‘বৈখরী ভাষ্য’, ‘ইন্ডিয়ারি’-এর মতো পত্রিকা-ওয়েবজিন সম্পাদনার সাথে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে ‘অপরজন’ পত্রিকার কার্যকারী সম্পাদক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের এই প্রাক্তনী কলকাতার দৈনিক সংবাদপত্রে নিয়মিত চলচ্চিত্র বিষয়ক কলাম লিখেছেন, স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র এবং তথ্যচিত্র পরিচালনা করেছেন। চলচ্চিত্র ও কবিতার আন্তর্সম্পর্ক নিয়ে নিয়মিত লিখেছেন পত্রপত্রিকায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ দুটি ‘চেনা আনফ্রেম’ (২০০৯, বৈখরী ভাষ্য প্রকাশনী, কলকাতা), ‘বিল্লিবাদল’ (২০১৪, বৈখরী ভাষ্য প্রকাশনী, কলকাতা)।

শানু চৌধুরীর কবিতা

১.

একটা বিপন্ন মানুষ রাস্তা ভাঙতে ভাঙতে টুকরো পেল। চেরী-রঙ ছেড়ে যাওয়ার আগে তার কোমলে ঠাট লাগলো। এসব দৃশ্য থেকে আকাশমুখো হয়ে যাওয়া পাখি নিজস্ব শেষ চিরতনকে আলেয়া করে নিল। তবু কিছু পথ যা নির্ভীক দপ্তর থেকে ঘুমের পাশ ফেরা হয়ে যায় তাকে কী বলে ডাকা যায়? দ্রাবিড় গড়ন? নাকি নর্ডিক ছায়া? ভালোবাসলে ভালো, না বাসলে অকারণ যন্ত্রণা। এই পাপ ধুয়ে ধুয়ে কালো ভাবলাম আর রঙ মুচড়ে পর্যায় হল সামান্য স্বর!

২.

একটা বিপন্ন মানুষ জুতো খুঁজলো আর হারিয়ে যাওয়া থেকে ছিঁড়ে গেল ফিতের জোড়া আলাপ। তুমি ভাবতে ভাবতে উদ্বাস্তু হচ্ছে তোমার ফিনফিনে পোশাক। আমি শোক করি। যেটাকে কৃতঘ্ন বলা যায়। আমি চামচ ভেঙে ভাত তুলি। ভাত নয়? সমাধিস্থল। যেখানে পোকায় কেটে যায় ইন্দ্রিয়। ও বাক্যস্থল! জন্মনিরোধক কেন মোহকে ফেলে দ্যায়? টাটিয়ে ওঠা শরীরে রাইমা টান মেরে কেন দ্যাখায় সিংহদুয়ার? সতেজ হলে কি তবে রোশনাই হত বেঁকে যাওয়া শারীরিক বাঁশি? তবে জেনো ছোঁয়া হলে ঠোঁট হয় বালির আঙুর, যেখানে আমার নতুন তেমন নতুন হলনা কখনও।

পরিচিতি

শানু চৌধুরীর জন্ম ১৯৯২ সালে। ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতক শানুর লেখালেখি শুরু ২০১৫ সাল নাগাদ। এখনও পর্যন্ত একটি কবিতার বই ‘আলো ও আত্মহত্যা’, প্রকাশিত হয়েছে ২০১৯ সালে।

শুভ আঢ্য-র কবিতা

১২

কাসাহারা একটি রমণীমোহন জায়গা। এখানে বাতাসে অক্সিজেন ভিন্ন, নেশা ঘুরে বেড়ায় এবং নেশার কোনো ফিজিক্যাল স্টেট নেই। কিছু মেয়েও যে ঘুরে বেড়ায় না এখানে, এমন না; আর স্ট্রেট হবার কারণে এখানে হোমোদের কথাবার্তা ভেসে আসে। সেপিয়েন্সরা ডিও ব্যবহার শেখার আগে থেকেই কবিতা লিখতে শিখেছে। সে কবিতায় এককালে ঘ্রাণ ছিল, এখন দুর্গন্ধ। রমণীয় কোনো নারী এখানে নেই, তবু তার ছায়াটুকু আছে। সেপিয়েন্সরা এসবের মাঝে থাকতে থাকতেই গাছের ধারণা সম্বন্ধে জানতে ও বুঝতে পারে। তারা জানতে পারে, গাছ সবসময় অক্সিজেন দেয় না, কিছু বিষাক্ত গাছও আছে। কবিতাও তেমন, একথাও তারা শিখে ফেলে আস্তেধীরে। কাসাহারার টেবিলগুলোর পাশেআশে পাথরকুঁচি গাছ বা ক্যাকটাস লাগানো। রবীন্দ্রনাথ তমাল বা তরু বলে যে উদ্ভিদের কথা বলে গেছেন, এসব, তা থেকে অনেক আলাদা। এখানে কোনো পজিটিভিটি নেই। এমনটা কারোর জীবনে ঘটে থাকলে তারা রবীন্দ্রনাথের সংস্পর্শে যেতেই পারেন, তবে, উনিও দুঃখজনকভাবে, তার নেগেটিভিটি নিয়ে আলোচনা করবেন না বরং তাঁর গান দিয়ে আলো জ্বালতে চাইবেন। কাসাহারাতে এমন রমণীরাও আসে, যারা গান অতিমাত্রায় অপছন্দ করেন। যদিও তাদের ঊরু থেকে গান, স্রাবের মতো গড়িয়ে যায়। এসব জানার আগেই সেপিয়েন্সের মধ্যে যারা মুখ্য, তারা ডিও ও কবিতার ব্যবহারের কথা জেনেছে। জেনেছে ছায়া দেওয়া যায় না, আলোটুকু আড়াল করা ছাড়া গাছেরা আসলে কিছুই করে না।

১৩

দুঃখের দিনে গাধাটি কাসাহারায় বসে না, সে তার পাশে চক্রাকারে ঘাস খায়। পরিস্থিতি ঘোরালো না হলে জল খাবার কথাও সে ভাবে না। তবু, প্রদোষকালীন গাধাটির ছবি দেওয়ালে টাঙানো থাকে, জামায় হ্যাঙারের মতো ভুল করে অনেকে গাধাটিকে গাধা’ই ভাবে, কেউ পাথুরে শয়তানের কথাও ভাবতে পারে। ভাবুকদের ভেতর লিঙ্গবৈষম্য আনার কোনো অর্থ নেই। তবে, কাসাহারায় থাকতে থাকতে মানুষ সেখানে সুরের হদিশ পায়। নর্ম্যাল সা’ থেকে কোমল ও খাদের নিচে যে সা’ থাকে সেকথাও জানতে পারে। বলা বাহুল্য এসব টেবিলের ওপর সাজিয়ে তারা কফি বাগানের দিকে চলে যেতেই চায়। রবীন্দ্রনাথ কফির চাষ করেননি। নীলের চাষও না। কফি তিনি ভালোবাসতেন কি না, সে নিয়ে প্রবন্ধও অপ্রকাশিত৷ উনি কাসাহারা প্রদক্ষিণরত এমন কোনো গাধাকে দেখেননি, যে করুণভাবে গান থেকে সুর বা সুর থেকে গান খুঁটে খাওয়ার চেষ্টায়, রেশটুকু ছাড়া কিছুই পাচ্ছে না আর। গাধাটির ছবিও দেওয়ালে দেখেননি। ভাবুকদের ভেতর ভাবপ্রবণতা অনেকটা ভিক্টোরিয়ান কায়দায় গাঁথার প্রচেষ্টা যখন তিনি করছেন, গাধাটি তখনও জল খাবার জন্য, আগে ঘোরালো পরিস্থিতির কথা ভাবছে।

পরিচিতি

কলকাতায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা। লেখালিখি মূলত প্রিন্টেড ও ওয়েব ম্যাগে। প্রকাশিত বই চারটি : ব্লেড রানার, আওকিগাহারা, জোকিং–আ–পার্ট ও বেড়ালের মকশো। বিষণ্ণতা ছাড়া আর ভালবাসা কিছু নেই।

 

নীলাব্জ চক্রবর্তী-র কবিতা

অপেক্ষা

আয়না এই মান ও চিত্রের বেলা
সেতুসম্ভব যে ক্ষত ছিল
স্রেফ সরস্বতী অবধি
ছুটে যাওয়া এই নগ্ন হরফগুলো মুহূর্তগুলো
ত্বক রঙের দিনে বিদ্ধ হতে হতে
আমি কি শহর ভেবে
আইসক্রিমের গন্ধটাই আইসক্রিম
কার রেশম রেশম একটা নামের কাছে হুহু
বিষাদের যে মুদ্রাটি নীল
তাকে অপেক্ষা করো ক্রমে
আর দেখো
এই শীত আমরা পরিধান করেছি
এঁকেছি
ধাতু দিয়ে গুণ করা গাছ
ছায়া ভেবে ফেলে আসা কলের দুপুর…

শীতলতা

নীল একটা যে আমি
দাঁতে ফের দাঁত চেপে দূর থেকে
খুব কোনও রাবারের বন
ঘষে
ঘষে
তেকোনা সংখ্যাগুলো
এই সেতু পার হয়ে শুক্রবার অবধি
সে
আমারই
ধাতু ও শীতলতা হয়
দ্বিধা হয়
অথচ ভাষার চেয়ে দূরে কিছু তাপ
পড়ে নেয়
দ্রুত এক বোতামের দিন বরাবর
নাতাশা নামের সেই ঝরে যাওয়া জল…

পরিচিতি

জন্ম ১৯৭৭ সালে। প্রকাশিত বই : পীত কোলাজে নীলাব্জ ( ২০১১), গুলমোহর… রিপিট হচ্ছে (ই-বুক) (২০১৩), প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায় (২০১৪), লেখক কর্তৃক প্রকাশিত (২০১৭), আপনার বার্গার আরও মজাদার বানিয়ে তুলুন (২০১৮), কোনও চরিত্রই কাল্পনিক নয় (উপন্যাস, ২০১৯)। ভালোলাগা : গানের পুরনো আর কবিতার নতুন। স্বপ্ন ধ মনের মতো একটা শর্ট ফিল্ম তৈরি করা।

 

জয়শীলা গুহ বাগচী-র কবিতা

কোয়ারান্টাইন

একটি বিছানা, একটি বন্ধ কাচের জানালা, অল্প কিছু রোদ, আসে কী আসে না। বাইরে পড়ে থাকে জগতময় সংসারের আশ্বাস। দেওয়ালে সিঁড়ির আভাস। কিছুটা আছে, কিছুটা নেই। পা রাখলে শূন্য, না রাখলে হালকা ছবি ভেসে বেড়ায়। কিছুটা স্বপ্নের মতো, কিছুটা সম্ভাব্য রূপক। ঠিক যেমন যে কোন একটি চেহারায় তুমি এসে দাঁড়াচ্ছ। আমি তোমার হাত ধরে একটি রূপোলি গাছ হয়ে উঠছি। তারপর দেখছি তুমি ক্রমাগত দরজায় বদলে যাচ্ছ, গাছেদের কী কোন দরজা প্রয়োজন? তুমি তখনি একপাতা ক্যালপল হলে। ডালপালা ছড়াতে গিয়ে দেখি আমি ব্যবহৃত, ব্যবহৃত কাগজের ন্যাপকিন মাত্র। তবু বেঁচে থাকার গন্ধটুকু নাকে আসে। মাংস রান্নার মিথ লেগে থাকে গায়ে, পিঠে। তোমাকে তখন খুব তরল দেখায়। বাইরের রোদ যেন, সামান্য গন্ধ আসে কী আসে না, সামান্য রঙকে বিছানার আমেজ বলে মনে হয়। আমি শুয়ে থাকি, গায়ে পাতা পড়ে, সিঁড়ি দোলে, জানালার গন্ধ আসে, দরজার লক খোলে… আমি শুয়ে থাকি।

ছক

কীভাবে ঢুকবো ভেতরে
ঘরের এপাশে আমি, ওপাশে আমি
ছড়িয়ে যাচ্ছি আরও একোণায়, সে শূন্যে
অথবা কোথাও নয়
নয়… না… এসবের স্তব্ধতায় আমি আকাশিত… কুসুমিত
এই আকাশজনিত হবার কারণে
জামার ঝুলের নাম লাবণ্য
অদৃশ্য ঘড়ির নাম সায়ানাইড
আর ছেঁড়াখোঁড়া দিনরাত মানেই কবিতার খাতা
সুতরাং ‘না’ এইটুকুই বেশ জমে ওঠে
কত ভাবেই না জমে ওঠা যায়
অক্ষর ছিঁড়ে ছিঁড়ে কমলিকা
অথবা আমাদের গভীরতম চকোলেট
এইসব ঘনিয়ে তোলা না-আমি না-তুমি
কোথাও সামান্য যোগচিহ্নের মতো নয়
তাই ভাগাভাগির খেলা শুরু হলে
আমি সবুজ আর নীলে ভাগ হব
গভীর দরজা হব একটু…
তুমি সমাধান দিও
তুমি ভুলও দিও
সপ্তকাণ্ড দিও… তুমিই হে…

পরিচিতি

শূন্যদশকের কবি জয়শীলার জন্ম ও বেড়ে ওঠা জলপাইগুড়িতে। স্কুলজীবন থেকে কবিতার সাথে বসবাস। ২০০৫ সালে প্রথম লিটল ম্যাগে কবিতা প্রকাশ। প্রথম কবিতার বই দেবদারু অপেরা ২০১৩ সালে প্রকাশিত। কৌরব থেকে প্রকাশিত ফুল্লরার কলের গান বইটি সম্প্রতি পুরস্কৃত হয়েছে। জয়শীলার পেশা শিক্ষকতা। তিনি জলপাইগুড়ি দূরদর্শন কেন্দ্রে আংশিক সময়ের সঞ্চালিকা।

প্রীতম বসাক-এর কবিতা

১.

ঈশ্বরের বিড়াল আমি তোমার নির্লিপ্ত ঘুম ধার পেতে চাই

দৃশ্যেরা জন্মাচ্ছে আর নিভে যাচ্ছে অপুষ্টিতে
এবং গাছের গভীর থেকে ঝরে পড়ছে
প্রিয়জনের ঘরে ফেরার সম্ভাবনা

দেখো প্রকৃত মাছের জন্য তুমি কত শূন্য লাফিয়েছো
আর দূরে সরে গেছে বসন্তের ট্রাম

আমার দুঃখ আমি পুকুরের কাছে লুকিয়ে রেখেছিলাম
আমগাছ সেসব জেনে গেল আর অপবিত্র হয়ে গেল বিরহ

দেখো পাঠক করে আসছে চারদিকে, এখুনি মেঘ বসবে
আমি লুকিয়ে ফেলতে চাই কান্না পতনের ধ্বনিতাত্ত্বিক ব্যবহার

২.

মুখে লেগে আছে শিশুর অবিকল শিশু
আমি তার বয়সের সমান চুমু রেখে আসি নক্ষত্রের কাছে

তুমি দিয়ে আসক্ত করি নিজেকে
আর ঘাসের প্রশ্রয়ে কতদিন ঘুমায় নি যে-ঘুম
বলি এবার অসীম ঘাস হয়ে ছড়িয়ে যাও
যেভাবে লাল বটফল নিমগ্ন থাকে জীবনের কাছাকাছি
একদিন খুব দুঃখ বেজেছিল — বেদনার ঘাম নুয়ে ছিল জলের নিকটস্থানে
তবু মাধবীলতার নরম চোখ দিয়ে আমি তাকিয়েছি
মানুষের দিকে

ওই যে উৎপাদন ব্যবস্থা, ওই যে উৎসব সংখ্যা, গাজনের রশি
তার নিচে লিখিত হয় পথ — পাঁচালি — নরখণ্ড

কবি সততই অন্ধ বাদাম ভেঙে ভেঙে খাইয়ে দেয় নিজেকে
আর নম্র আলোয় ভরে যায় জিভের মর্মবেদনা

পরিচিতি

জন্ম ১লা নভেম্বর ১৯৮০, পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায়। পেশা শিক্ষকতা। লেখালেখি : সবার যেমন হয়। পদ্য দিয়ে শুরু। জল পড়ে পাতা নড়ে। মন চাইলে গদ্য লিখি। নিজের সাথে নিজের কথা। নেশা কন্যা সন্তান। বই কেনা। পড়া ততোধিক নয়। দুটি কবিতার বই। তার মধ্যে প্রথমটি পুস্তিকা – উঠোন জুড়ে আক্ষেপ এবং শেষতম পিতা-পুরাণ।

ইন্দ্রনীল ঘোষ-এর কবিতা

মৃত মানুষের ডায়েরি

(১)
নিজেরই মাংসের মধ্যে মাংসের পোকা হয়ে আছি

সনাতন পাখি-বোধ
অনেকটা ভোর
পরিযায়ী রঙ ও তামাশা

নিজেরই রঙের মধ্যে রঙের মিথ্যে হয়ে আছি…

(২)

একখানা হাড় শুঁকি —
ভোর হয়ে আসে
একেকটা হাড় শুঁকি —
বিকেল পেরল

খোঁড়া গন্ধ পা টেনে চলে —
পা খুঁটে বেদানা ছাড়ায়

পরিচিতি

জন্ম ১৯৭৯ সালে। প্রথম বই ‘রাত্রে ডেকো না, প্লিজ’ (২০০৫), পরবর্তী বই ‘জুলাইওয়ালা’। ২০১২ সালে বৈখরী ভাষ্য থেকে প্রকাশিত হয় তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘লোকটা পাখি ওড়া নিয়ে বলছে’। কবিতার পাশাপাশি গদ্য আর গল্পের হাতও ছুঁয়ে যায় অনেক ম্যাগাজিন-ওয়েবজিন-ব্লগজিন। ‘সার্চ করছেন, দেবাঞ্জন’ তার প্রথম উপন্যাস। বৈখরীভাষ্য পত্রিকার সম্পাদনার সাথে বহুদিন ওতপ্রোত। পরে ইণ্ডিয়ারি, এখন অপরজন পত্রিকার অন্যতম প্রাণপুরুষ।

অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কবিতা

বোগেনভেলিয়া ১

কাগজ ফুলের আমাকে দরকার
জীবনের এতটা সময় যে ট্রেনেই কাটালাম
সেতো ফিরতি পথে নয়
এতদূর চলে এসে, আছি
তবু আমাকেই দরকার তার
মার্চ পড়বে, পরীক্ষার মরশুম
পাখী,সূর্যাস্ত আর
ফাঁকা স্টেশনের চাষ হবে দেবব্রতয়
অফিসে আসবে নতুন চায়ের কাপ
সন্ধ্যে নামা শেষ হলে
ট্রামলাইনের রাত
জানলায় হাওয়ার শব্দ থেমে গেলে
তবু আমি…

কাগজ ফুলের আমাকে দরকার

বোগেনভিলিয়া ২

আমি গান ভালবাসি
তুমি জানতে চেয়েছিলে
ফুল ভালবাসি কিনা
নানা রঙ, শিশু
বাসস্টপে তলিয়ে যেতে যেতে
কয়েকটি ভালবাসা মনে পড়ে
তারই একটি দিয়ে তোমার হাত ধরেছিলাম
চুমুর অন্ধকারে কেবলমাত্র একটি সোফাকেই
ভালবেসেছিলাম আমরা
তুমিও জানতে বাগানে আমরা বেড়াতে যাইনি
ছায়া খুঁজে, জলের কাছে বসে
হাওয়ায় এলোমেলো করে দেওয়া কথা ঠুকরে খেতেই
তো গেছি
আমরা গান ভালবাসি,
এলোমেলো রঙ, ফুল আর শিশু

পরিচিতি

ছোটবেলা কেটেছে খড়গপুরে। গত বারোবছর ধরে বেলঘরিয়ার বাসিন্দা। পেশায় দৃশ্য-সাংবাদিক। আদ্যন্ত ‘বৈখরীয়ান’ অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতার প্রথম বই ‘ডিসেম্বর সংহিতা’ জানুয়ারি ২০১৩-তে প্রকাশিত হয়েছে ‘বৈখরী ভাষ্য’ থেকেই। ‘ডিসেম্বর সংহিতা’-র কবির জন্মমাস… হ্যাঁ… ডিসেম্বর। সাল ১৯৮২।

মনোজ দে-র কবিতা

চাঁদ

তখন ছুটি পড়লেই মামাবাড়ি। দামোদরের তীরে ছোট্ট গ্রাম। গোটা চার দালান বাড়ি, দুটো নদীঘাট, একটি পোস্ট অফিস, একটি ক্লাব এবং একজনমাত্র রিক্সওয়ালা – এটুকুই পরিসর। তবুও কেউ ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে বলি, মুসলমানপাড়া পেরিয়ে। লালা, ধর্মে মুসলিম। গ্রামে তার একমাত্র মুদিখানার দোকান। সারাদিনই প্রচণ্ড ভিড়। সেই ভিড় পেরিয়ে একটাকার চানাচুর। ওই স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে। গ্রামে তখনও আলো আসেনি। লালার দোকানে মোমবাতি পাওয়া যায়। সন্ধে হলেই প্রতিটি দুয়ারে জ্বলে উঠত সেই আলো। আর আমরা মালাই খোলাতে মোমবাতি বসিয়ে টর্চ বানাতাম। আলো বানানোর নেশাটুকুই ছিল আমাদের উৎসব। একটু রাত্রি হলেই, দুয়ারের মোমবাতিগুলি নিভিয়ে, তুলে নিয়ে, ছুট। সব শেষে খোলা আকাশের নীচে সমস্ত মোমবাতি মেলে নিয়ে দেখি, আমাদের শৈশবে ঈদ ও দীপাবলি মিশিয়ে ফেলেছি

মেজ

শেষ দেখা, অ্যাম্বুলেন্সে। প্রচণ্ড ব্যথার ভেতর জিপি সিংহ রোডের ডানদিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলে, এখানে নদী ছিল। বলি, শান্ত হও। সমস্ত দোকান-বাড়িঘর হেসে ওঠে আমাদের দেখে। অথচ চোখ উপচে উঠছে জোয়ার। নদী কখনোই বিশ্বাসঘাতক হয় না। তাই ভাটা আসে। অস্থি ভেসে যায়। অভিনয়ের মারাত্মক নেশা ছিল। নাটক করত। নাটকীয় মুহূর্তের কয়েকটা স্টিল ছবি এখনও রয়েছে। তীব্র বর্ষায় জিপি সিংহ রোডে একা হেঁটে যেতে যেতে দেখেছি, দরজা জানালা বন্ধ এক উন্মাদ মঞ্চ। চারিদিকে হাসির অলীক প্রস্তাব। দূরে কোথাও আগুন জ্বলেছিল কেউ। এখানে অপরিমেয় বৃষ্টি। বুঝে উঠতে পারিনি, তোমায়। পারিনি, চরিত্র খুলে, অস্থি ভাসিয়ে দিতে

পরিচিতি

জন্ম ১৯৯২ সালে। ঠিকানা বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ। পেশা অতিথি অধ্যাপক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ আমিও ঈশ্বর ছুঁইনি (২০১৮) শরীরে সংগীত রেখো (২০১৯)।