ড. ফাল্গুনী তানিয়া >>পুরস্কারপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ মুভি : জীবনজয়ের অনন্য চলচ্চিত্র >> চলচ্চিত্র

0
402

পুরস্কারপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ মুভি : জীবনজয়ের অনন্য চলচ্চিত্র

‘ফাগুন হাওয়ায়’ তৌকির আহমেদ পরিচালিত ফরিদুর রেজা সাগর প্রযোজিত এবং সিয়াম আহমেদ ও নুসরাত ইমরোজ তিশা অভিনীত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের উপর নির্মিত একটি ইতিহাস-আশ্রয়ী সিনেমা। ভাষা আন্দোলন যে রাজধানী ঢাকা নির্ভর কোনো আন্দোলন ছিল না এবং সারা দেশে এই আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল সে বিষয়টি অসাধারণ শৈল্পিক নৈপুণ্যে তৌকির আহমেদ ফাগুন হাওয়ায় সিনেমাটিতে তুলে ধরেছেন। ‘ন ডরাই’ তানিম রহমান অংশু পরিচালিত সুনেরা বিনতে কামাল ও শরীফুল রাজ অভিনীত নারী সার্ফারের জীবনভিত্তিক কাহিনিকে উপজীব্য করে নির্মিত। দুটো ছবিরই লোকেশন নোনা পানির। একটি খুলনার চন্দ্রনগর থানা অপরটি কক্সবাজার। ২০১- এর এই পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমা দুটির একটি আশ্চর্য মিল হল দুটি সিনেমাই সত্য কাহিনির সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতীকী সিনেমা। নাসিমা নামক নারী সার্ফারের জীবন কাহিনিকে ‘ন ডরাই’ সিনেমাতে রূপদান করেছেন সুনেরা। আবার ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও আবহকে তিশা দীপ্তি চরিত্রটির মাধ্যমে রূপায়ন করেছে।
ফাগুন হাওয়ায় চলচ্চিত্রে দীপ্তি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও নাসির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমরা জানি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে অসংখ্য নারী ভাষাসংগ্রামী প্রকাশ্যে ভাষাসংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন এবং অনেকেই কারাবরণ করেছিলেন। ফাগুন হাওয়ায় চলচ্চিত্রে খুলনার একটি ছোট্ট থানা শহরে জামশেদ নামক পুলিশ অফিসারের অত্যাচারকে কেন্দ্র করে একটি শহর ভাষা আন্দোলনের মত বিষয়টিতে জড়িয়ে পড়েছে। ছবির প্রথমেই খাঁচাবন্দি পাখিটা যেন নিপীড়িত পূর্বপাকিস্তানের জনগণেরই প্রতিনিধিত্ব করে। খুব ছোট ছোট কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে জামশেদ অত্যাচারী পশ্চিম পাকিস্তানীদেরই প্রতিনিধিত্ব করেছে। যেমন নদীর পাড় থেকে থানা পর্যন্ত দীর্ঘ পথ মালপত্র বহন করিয়েও নিজের পুলিশ অফিসারের পরিচয়ে তাকে যথাযথ মজুরি না দেওয়া, থানার সবাইকে উর্দু ভাষায় কথা বলতে বাধ্য করা ও উর্দু শেখানো, থানার বাইরেও সাধারণ জনগোষ্ঠীকে উর্দু বলানোর চেষ্টা করা, বাউলকে তার গানের জন্য মাথা মুড়িয়ে দেওয়া, দীপ্তির ঠাকুরদাদাকে ডাক্তার হিসেবে যথাযথ সম্মান না দিয়ে অধীনস্থ কর্মচারীর মতো আচরণ করা ইত্যাদি। ভাষা আন্দোলনের মতো একটি ঐতিহাসিক বিষয়কে রূপদান করার জন্য ফাগুন হাওয়ায় চলচ্চিত্রটি যথেষ্ট ভাবগম্ভীর ও একঘেয়ে হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তৌকির আহমেদের পরিচালনার দক্ষতা এবং কাহিনিকারের সাফল্য এখানে যে এই চলচ্চিত্রে যথেষ্ঠ হাস্যরস বা উইট, স্যাটায়ার বা বিদ্রুপ রয়েছে। এবং বিদ্রুপের সঙ্গে তীক্ষ্ম ব্যঙ্গও রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই হাস্যরস সৃষ্টি হয়েছে জামশেদের বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ থেকে। যেমন জামশেদের সাধের মোরগগুলো রাতের অন্ধকারে পুড়িয়ে খাওয়া, তার মদের বোতলে প্রস্রাব ভরে দেওয়া এবং সেটা খাবার পর জামশেদের অভিব্যক্তি, জামশেদ উর্দুর পক্ষে ঢাকাতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে সব চিঠি পাঠায় সেগুলো বাঙালি অফিসার কর্তৃক পুড়িয়ে ফেলা – এরকম নানাবিধ ঘটনা আছে যেগুলো দর্শককে আনন্দ দেয়। রাতের গভীরে পুলিশ অফিসারের বাড়িটা সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘দেশলাইয়ের কাঠি’ কবিতা লিখে বাঙালিরা প্রতিবাদের আরেক উদাহরণ সৃষ্টি করে যা যে কোনো দর্শককে আপ্লুত করবে। তবে ‘দেশলাইয়ের কাঠি’ কবিতাটির আবৃত্তির কোরাসটা আরো ভালো মিললে ভালো লাগত। এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় সফলতা ভাষা-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালির যে আবেগ সেটা পরিচালক পুরোটা সময় ধারণ করে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে উদাহরণ বাঙালিদের মধ্যে যুগে যুগে ছিল এই সিনেমাতেও তা যথেষ্ট প্রোজ্জ্বল। সে কারণে উর্দুকে যখন পাকিস্তানের ভাষা বা পাক ভাষা এবং বাংলাকে হিন্দু ভাষা হিসেবে উল্লেখ করে মুসলিম লীগের একজন কর্মী তখন এর বিরুদ্ধে এই উক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ- ভাষার আবার মুসলমানি করালেন ক্যামনে? ধর্মের চেয়ে ভাষা ও সংস্কৃতি যে আত্মার অবিচ্ছেদ্য উপাদান তা নাসির ও দীপ্তির প্রেমাকাঙ্খার প্রবলতায়ও উপলব্ধি করা সম্ভব। নাসির মুসলমান ও দীপ্তি হিন্দু। ছবির শেষ দৃশ্যে সকল বাধা অতিক্রম করে নাসির ও দীপ্তির হাতে হাত রেখে মিছিল করা মূলত হিন্দু-মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভাষার আন্দোলনে লড়াই করার মাধ্যমেই যে মুক্তি সম্ভব তা নির্দেশ করেছে।
এবার আসি নারীচরিত্র প্রসঙ্গে। সামগ্রিকভাবে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি দুটির আলোচনা নয় বরং নারীচরিত্রের ক্ষেত্রে কয়েকটি মিল আমার মনে খুব দাগ কেটেছে এবং কিছু প্রশ্নের উদ্রেক করেছে – তাই বলতে চাই। প্রথমত, ফাগুন হাওয়ায় ও ন ডরাই দুটি সিনেমাতেই নারীচরিত্রদুটিকে আমার নিম্নবর্গীয় মনে হয়েছে। যতই প্রতীকের মাধ্যমে চিত্রায়িত করা হোক ফাগুন হাওয়ায় চলচ্চিত্রে পুলিশ অফিসার জামশেদ কর্তৃক পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাকপ্রতিবন্ধী মেয়েটিকে ধর্ষণ, আবহে দীনবন্ধু মিত্রের নাটকে ব্রিটিশ সাহেব কর্তৃক নীলচাষীদের স্ত্রীকে ধর্ষণ মূলত ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা। এই ভাষাহীন মেয়েটি যেন বায়ান্নর বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি শোষণ পুরোটা সময়ে নারীরাই সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত, শোষিত ও বঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়েও এই নারীরা অধিকারবঞ্চিত। তাই ন ডরাই সিনেমার আয়েশা ভালো সার্ফার হওয়া সত্ত্বেও নারী হবার কারণে সার্ফিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে না। সার্ফিং করার কারণে তার মা ও ভাইয়ের অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে তাকে। আয়েশাকে বিয়ে দেওয়া হয় একজন বয়স্ক ও বিবাহিত পাত্রের সঙ্গে। প্রতি রাতে সেই পুরুষটির ম্যারিটাল রেপের সম্মুখীন হয়েছে আয়েশা। একসময় সে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। নোনা পানি যাকে অদৃশ্য হাতছানি দিয়ে বারবার ডেকেছে সেই মেয়েকে সংসারের যাবতীয় কাজ করে শ্বাশুড়ির পা টিপে মনের বিরুদ্ধে স্বামীর চাহিদা পূরণ করতে হয়েছে। স্বামীর অকথ্য গালাগালি আর শারীরিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাধ্য হয়েই সে ফুঁসে উঠেছে : ‘আই সাগরেরে ন ডরাই যে মাইয়াপোয়া, তোর মতো হারামজাদারে আই ডরাইয়ুম ন?’ কিন্তু নারীর নিজস্ব ঘরের অনুসন্ধানে নেমে তাকেও রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে ফিরতে হয়েছে। এই দৃশ্যায়নগুলো পরিচালক এত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে নারীর যুদ্ধগুলো দর্শক খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে। ‘থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নম্বর’ চলচ্চিত্রটির কথাও এখানে মনে পড়ে। আয়েশা নিজের বাবার বাড়িতেও অবাঞ্ছিত ঘোষিত হয়েছে। দিপ্তী যেমন নারী হিসেবে নিজেকে তার জন্মভূমিতে অনিরাপদ ভাবতে বাধ্য হয়েছে, তার ঠাকুরদাদা তাকে নিয়ে ইন্ডিয়া চলে যাবার ব্যবস্থা করেছে। শেষ পর্যন্ত দীপ্তি ঠাকুরদাদার কাছ থেকে আন্দোলনে অংশ নেবার ছাড়পত্র পেলেও তার প্রতিবাদ ভাষা আন্দোলনকে ছাড়িয়েও হয়ে যায় তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার লড়াই। নিজের ভাষাকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম মূলত দীপ্তির নিজের আবাসভূমিতে ধমের্র ঊর্ধ্বে, নারীর ঊর্ধ্বে একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে সমুন্নত রাখার সংগ্রাম। এ লড়াই শুধু টিকে থাকার নয় বরং স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার লড়াই। যেই লড়াই আয়েশাও করেছে পরিবারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বামীর ঘরে পুনর্বার ফিরে না গিয়ে। দীপ্তি শিক্ষিত, আধুনিক, রুচিশীল সংস্কৃতিমনা, উচ্চবিত্ত হিন্দু পরিবারের কিন্তু শ্রেণি-অবস্থানে আয়েশা নিম্নবিত্তের, লেখাপড়া জানে কিনা তা সিনেমা দেখে বোঝার উপায় নেই। সার্ফিংয়ের পর বাথরোব পরিহিত আয়েশার যে অস্বস্তি আমাদের চোখে পড়ে তা দেখেই বোঝা যায় নোনাজলে যে মেয়ে অপ্রতিরোধ্য বাবা-মায়ের শাসন আর ভাইয়ের শারীরিক নির্যাতনের কাছে সে কত অসহায়। দীপ্তি আর আয়েশার যুদ্ধজয়ের কাহিনি তাই ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন সময়ে হলেও দুজনেই হার না মানা যোদ্ধা। ন ডরাই সিনেমার থিম সংয়ের সঙ্গে দুটি চরিত্রকেই যুক্ত করা সম্ভব :
তারকাটা সীমানা
আমার জন্য না
পিছনে ফেরা হবে না

না, হার মানব না
দেব না আর কেড়ে নিতে
যা আমার অধিকার

আরেকটি কথা না বললেই নয়। দুটি সিনেমারই সিনেমাটোগ্রাফি অসাধারণ। রূপসজ্জাকর নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। প্রধান চরিত্র ছাড়াও ফাগুন হাওয়ায় চলচ্চিত্রটির প্রতিটি ছোট চরিত্রও প্রশংসার যোগ্য। ন ডরাই সিনেমাতে প্রধান চরিত্র ছাড়া আয়েশার মা ও ভাইয়ের অভিনয় এতটাই বাস্তব মনে হয়েছে যে সকলকে তা মুগ্ধ করবে বলতে পারি। আর ন ডরাই চলচ্চিত্রটির কলাকুশলীদের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা উচ্চারণের দক্ষতা প্রশংসা পাবেই। হালদা চলচ্চিত্রে চট্টগ্রামের ভাষার অনেকটা সরল রূপ পাওয়া যায় সাধারণ দর্শকদের বোঝার সুবিধার্থেই। কিন্তু ন ডরাই সিনেমাটিতে চট্টগ্রামের ভাষার যথাযথ রূপটি উঠে এসেছে। আর এই বিষয়গুলো খুব জরুরিও। একটি ভালো চলচ্চিত্রে একটি দেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতিকে ধারণ করা খুব জরুরি। সে দিক থেকে দুটি চলচ্চিত্রই সার্থক।