ড. মো. আদনান আরিফ সালিম > বিক্ষিপ্ত কথকতার ঘেরাটোপে চলচ্চিত্র কোথায়? >> চলচ্চিত্র

0
188

“কবিতার খাতা একপাশে রেখে তিনি যখন পরিচালনায় নেমেছেন আমাদের সবার উচিত উনাকে উৎসাহ দেয়া। কিন্তু তাঁর প্রতি অনুরোধ থাকবে পরবর্তীকালে আবার যখন তিনি এমনি কোনো সাহসী ভূমিকায় নামবেন, বুকের পাটা দেখানোর পাশাপাশি মগজকেও একটু ব্যস্ত রাখবেন।”

স্বাপ্নিক মনের অলীক ভাবনাগুলোকে কল্পকথায় মালা গাঁথলে কেউ কেউ তাকে সাহিত্য বলেন। আর জীবনধর্মী মননশীল সাহিত্যকে যখন সেলুলয়েডে তুলে আনা হয়, সেটা দেখতে গিয়ে সবাই না হোক অন্তত বেশিরভাগ মানুষ সেখানে নিজেকে খুঁজে ফেরে, সেটা এককথায় চলচ্চিত্র। আমি বলি জীবনকে ঘিরে যে চিত্রগুলো কেবল কল্পনার চোখে আঁকা এবং দেখা সম্ভব সেগুলোকে সেলুলয়েডে আনা গেলে যা দাঁড়ায় সেটাই চলচ্চিত্র। ‘সোনার বাংলা’ এবং ‘রঙ্গভরা বঙ্গদেশ’ প্রপঞ্চ দুটি নিয়ে কেউ কেউ যেমন কটাক্ষ করেন, কেউ আবার আদন্তমূল বিকশিত করে অদ্ভুত একরোখা দৃষ্টি দিয়েই চুপ করে যান। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে কিছু ব্যাপার শুধু এদেশেই সম্ভব। যেমন স্বামীর উচ্চপদের চাকরি, আর্থিক সঙ্গতি কিংবা নিজস্ব মেকআপচর্চিত মুখাবয়ব অনেক নারীর কবি হওয়ার পথ করে দিয়েছে এদেশে। একইভাবে বিশাল অর্থকড়ির মালিকানা অনেক পুরুষকে যেমন কবি-সাহিত্যিক বানিয়েছে, তেমনি লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে ঘণ্টাব্যাপী একক সঙ্গীতানুষ্ঠানের নামে নিজস্ব চ্যানেলে হেঁড়ে গলায় হ্রেসারব করার সুযোগ নিয়েছে কেউ কেউ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের বাইরে নিজস্ব গবেষণাকর্ম, অনুবাদ পড়ালেখায় আর পড়ালেখায় গলদঘর্ম অবস্থা। এসময় ছোট ভাইবোনদের মধ্যে সাহিত্যিক দাবিদার গাঁয়ে-মানে-না আপনি মোড়ল টাইপের কয়েক বান্দা আমাকে একটা লিংক প্রেরণ করলেন। আমি যার পর নাই বিরক্ত হয়ে সেটা সিন করে ফেলে রাখলাম। কিন্তু একজন নিবেদিতপ্রাণ গবেষক এবং সাহিত্য সমালোচক যখন লিংক দিয়ে বললেন মুভিটা দেখা জরুরি, আমি তাঁর উপদেশ অগ্রাহ্য করতে পারিনি। পথে-ঘাটে যানজটের ফয়দা নিয়ে দুই দিনের মধ্যে দেখা শেষ করলাম গৌরচন্দ্রিকায় উল্লেখ্য চলচ্চিত্রটি। প্রহর থেকে প্রহরান্তরে শৃগালকুলের হুক্কাহুয়া রবের সঙ্গে বাঙালি শিল্প-সাহিত্যকর্মীদের সমর্থকমহলের অশ্লীল ধরণের মিল দৃশ্যমান। ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে তাঁরা আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে বসেন কোন চলচ্চিত্র, উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ কিংবা কাব্যগ্রন্থ জনপ্রিয় হবে। এরপর একজন বলে বসেন এটা জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস, চলচ্চিত্র, কিংবা কাব্যগ্রন্থ; যার সূত্র ধরে পৌনঃপুণিক আয়োজন চলতে থাকে, তাকে জনপ্রিয় প্রমাণ করার চেষ্টা। ওই বিশেষ চলচ্চিত্রকার, ঔপন্যাসিক, গল্পকার কিংবা কথিত কবির গণমাধ্যমে কর্মরত ভাই-বোন ও বন্ধুরা এবার ধারাবাহিক প্রচার শুরু করেন জনপ্রিয়তার গল্প। বেলা শেষে এই গোয়েবলসীয় রীতিতে ভুল বোঝে সাধারণ জনগণ, তারা আদতে বুঝতে পারেন জনপ্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত কোন ‘হরিজন’?

 

“বাংলাদেশের বাংলা চলচ্চিত্রগুলোর দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। সেখানেও আর কিছু না হোক, একটা গল্প সামনে রেখে কাহিনিকে এগিয়ে নেয়া হয়। যদিও বাংলাদেশের কোনো মেয়ে পেট বের করা ব্লাউজ আর ছেঁড়া-ফাটা থ্রি-কোয়ার্টার পরে তার কলেজে যায় না, এখানে সেটা দেখানো হয়। তারপরেও কিছু না থাক এর একটা পরিণতি তো থাকে।”

একটা চলচ্চিত্র তখনই সফল বলে ধরা হয় যখন তার পেছনে একটা হৃৎআকর্ষী গল্প থাকে এবং সে গল্পের চিত্রায়ন শেষে পুরো সময়টা মন ছুঁয়ে যায় দর্শকদের। আরেকটু ভাল করে বলতে গেলে সেই গল্পই সার্থক যে গল্পের কোনো অলীক চরিত্র অজান্তেই বাস্তবের থেকে বড় হয়ে মনের জমিনে অনেকটা দখল নিয়ে ফেলে। আর চলচ্চিত্র! এখানে মূল সফলতা নির্ভর করে তখন, যখন দর্শক এর কোনো চরিত্রের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, কোনো চরিত্রের পাশে নিজের কল্পনা করে কিছু সময় ব্যয় করতে চেষ্টা করে। আমরা ‘দীপু নম্বর টু’ দেখেছি, পড়েছি হুমায়ূন আহমেদের ‘হিমু’ কিংবা ‘মিসির আলী’ সিরিজ। মনের অজান্তে প্রত্যেকেই খুঁজে ফিরেছেন নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা হিমুকে। আর আমাদের যুগের কথা ধরা যাক। এবারের বইমেলায় বের হয়েছে সাদাত হোসাইনের উপন্যাস ‘নির্বাসন’। যারা গল্প পড়েছে, ঠিক শেষ করে লেখককে গালাগাল করেছে মনসুরের সঙ্গে এমনটা করা হয়েছে কেন? খেয়াল করলে দেখা যায় মেয়েরা মনে মনে কণা কিংবা জোহরার মাঝে আবিষ্কার করতে চাইছে। ছেলেরা খুঁজে ফিরছে মনসুরের শেষ ঠিকানা।
এবার বলিউডি চলচ্চিত্রের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। খেয়াল করেন, বিখ্যাত ‘থ্রি ইডিয়টস’-এ আমীর খানের রাঞ্ঝোড়দাস চরিত্রটি সব শিক্ষার্থীদের জন্য আরাধ্য ছিল। ‘আশিকী’ চলচ্চিত্রের কথাই ভাবুন, কেউ কেউ নায়ক-নায়িকার মাঝে খুঁজেছে নিজেকে। আর পিকে! এখানে সবাই প্রাণখুলে হাসার পাশাপাশি দেখতে পেয়েছে নিজের চোখে দেখা সমাজের আরেক রূপ। ‘মানুষ কারও পকেট থেকে পড়ে যাওয়া টাকা যেমন নিজের বলে দাবি করে, তেমনি নিজের পকেট থেকে খোয়া যাওয়া কনডম কেউ ফেরত দিতে এলে অস্বীকার করে এটা তার নয়।’ এমনি ঘটনা সবাই জানে। তবুও পিকে এই ঘটনাকেই নতুন করে দেখিয়েছে। বাংলাদেশের বাংলা চলচ্চিত্রগুলোর দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। সেখানেও আর কিছু না হোক, একটা গল্প সামনে রেখে কাহিনিকে এগিয়ে নেয়া হয়। যদিও বাংলাদেশের কোনো মেয়ে পেট বের করা ব্লাউজ আর ছেঁড়া-ফাটা থ্রি-কোয়ার্টার পরে তার কলেজে যায় না, এখানে সেটা দেখানো হয়। তারপরেও কিছু না থাক এর একটা পরিণতি তো থাকে।
সমালোচকদের কেউ কেউ বলতে পারেন সব চলচ্চিত্রের ব্লকবাস্টার হিট হতে গল্প লাগে না। আমি ধরেন তর্কের খাতিরে আপনাদের কথা মেনে নিলাম। নারীবাদ, মানবতাবাদ কিংবা যুক্তিবাদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বলতে পারলাম সেখানে দেখানো হয় চর্বিমুক্ত এবং মেকআপের গুণে ধবধবে ফর্সা করা বহুবছরের ক্লেদাক্ত ডায়েট আর জিমজীবনের কষ্টসাধ্য অর্জন হিসেবে তৈরি কামাতুর নারীদেহ। ক্ষেত্রবিশেষে ফুলানো মাংসপেশীর পুরুষদেহও দেখানোর বিষয় হতে পারে। ‘হাম্মা হাম্মা’ শীর্ষক গানটির কথাই ধরা যাক। এই গানটি যে চলচ্চিত্রের তার নামই কয়জন বলতে পারে। ‘ওকে জানু’ নামটি বলার আগেই দর্শকের চোখে চকচক করতে থাকে ‘সিতাম খুলি খুলি সনম গোরি গোরি’ লিরিকের টানে চকচকে হয়ে ওঠা শ্রদ্ধা কাপুরের মেদমুক্ত ধবল পেট আর কামাতুর নিতম্বের ঠুমকা। বিখ্যাত বলিউডি চলচ্চিত্র ‘ধুমে’র কথাই ধরা যাক। তিনটা আইটেম গান বাদে তিনটি সিক্যুয়েলে দর্শকের মনে দাগ কাটার মতো কিছুই নাই। তবুও লোকে মনের ভুলে নৈঃশব্দ্যেও শুনতে চেষ্টা করে ‘ইশক ইশক মে জিলে মারলে’, ‘ক্রেজি কিয়ারে’ কিংবা ‘কামলি কামলি’ গানগুলো। এগুলোর বাইরে ‘প্রাক্তন’ নামের চলচ্চিত্রের কথা কয়জন জানে, কিন্তু সবাই গুণগুণ করে গাইতে পারে, ‘তুমি যাকে ভালবাসো, স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো।’

“অদ্ভুত ব্যাপার একজন পরিচালক এভাবে নিজের নাম বারংবার ব্যবহার করতে পারেন? স্মার্টফোন আসার আগের যুগে দেখতাম শৈশবের কুসুম-কুসুম প্রেম প্রকাশ করতে অনেকে লিখতো রইসুদ্দিন+নাদিয়া; তারপর এবড়ো-থেবড়ো করে একটা হার্ট চিহ্ন আঁকা। ‘ডিরেক্টর’ শীর্ষক মুভিটিতে বারংবার পরিচালক নিজের নাম উচ্চারণ করিয়ে এমনি একটা শিশুতোষ মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।”

অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে গিয়ে আমি অসমাপ্ত পদ্মাসেতুর উত্থিত স্তম্ভ গলাঃকরণ করেছি। ইউটিউবে শেষ পর্যন্ত পূর্ণ ধৈর্য রেখে দেখে শেষ করেছি ‘দি ডিরেক্টর’ শীর্ষক মুভিটি। আমি মুখ ফসকে ডিরেক্টরের বদলে বারংবার ‘ডিক্টেটর’ শব্দটি উচ্চারণ করতে গেছি। কি আর করা ডিক্টেটর শীর্ষক চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র এডমিরাল জেনালের আলাদিন সবখানেই যেমন… আলাদিন… আলাদিন… আলাদিন… আলাদিন করেছেন। এই চলচ্চিত্রেই শুরু থেকে কামু… কামু… কামু…। অদ্ভুত ব্যাপার একজন পরিচালক এভাবে নিজের নাম বারংবার ব্যবহার করতে পারেন? স্মার্টফোন আসার আগের যুগে দেখতাম শৈশবের কুসুম-কুসুম প্রেম প্রকাশ করতে অনেকে লিখতো রইসুদ্দিন+নাদিয়া; তারপর এবড়ো-থেবড়ো করে একটা হার্ট চিহ্ন আঁকা। ‘ডিরেক্টর’ শীর্ষক মুভিটিতে বারংবার পরিচালক নিজের নাম উচ্চারণ করিয়ে এমনি একটা শিশুতোষ মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

 

“বিক্ষিপ্ত এতসব গল্পের ভিড়ে একটাবারও কামুর পরিচালক হয়ে ওঠা সম্পর্কিত কিছু এখানে স্পষ্ট হয়নি। নাকি আমিই ভুল করলাম! ক্যামেরা হাতে ডিরেকশন দেয়ার চাইতে প্লাস্টিকের বন্দুক হাতে নিয়ে পাড়ার মোড়ের ছ্যাঁচড়াদের মতো ঘোরাঘুরিই ডিরেক্টরের কাজ!”

এতদিন সবাই জানতো নায়িকাকে খুশি করতে নায়ক পুলিশ হয়, বিজ্ঞানী হয়, গুণ্ডা হয় নয়তো শিল্পপতি হয়। কিন্তু গল্পের গরু ইস্পাতের ঘাস খায়, কল্পনার হাতি আকাশে ওড়ে, স্বপ্নে দেখা ঘোড়ারা তিমি মাছের পিঠ চুলকে দেয়, এমন চিন্তাকেও ভড়কে দিয়ে এই সিনেমায় দেখা যায় প্রেমিকাকে খুশি করতে নায়ক ডিরেক্টর হতে চায়। আমি খুব মন দিয়ে দেখলাম নায়কের আর ডিরেক্টর হওয়া হয়ে ওঠেনি। আমার হিসেবে সে তো হয়ে গেছে একটা পাতি গুণ্ডা কিছিমের কিছু একটা। তাকে সন্ত্রাসী না বলে একটা বখাটেও বলা যায়। এর বাইরে ডিরেক্টর হওয়ার আশায় ব্যকুল কামুর বন্ধুদের অনেকের শয্যায় ঠাঁই হচ্ছে উঠতি নায়িকাদের। বিক্ষিপ্ত এতসব গল্পের ভিড়ে একটাবারও কামুর পরিচালক হয়ে ওঠা সম্পর্কিত কিছু এখানে স্পষ্ট হয়নি। নাকি আমিই ভুল করলাম! ক্যামেরা হাতে ডিরেকশন দেয়ার চাইতে প্লাস্টিকের বন্দুক হাতে নিয়ে পাড়ার মোড়ের ছ্যাঁচড়াদের মতো ঘোরাঘুরিই ডিরেক্টরের কাজ!
এই চলচ্চিত্রের পূর্ণিমা চরিত্রের মেয়েটি কি এতিম? মনে হয় না। তারপরেও পুরো কাহিনিতে তার মা-বাবা কোথায়? তারা কি ভাং খেয়ে ঘুমাচ্ছিলেন নাকি কারাগারে ছিলেন তা কেউ বলতে পারবে না। আরেকটা মেয়ে গুলি করে খুলি উড়িয়ে দিল, ডিরেক্টর হতে গিয়ে পাড়ার মোড়ের ছ্যাঁচড়া গুণ্ডা হয়ে ওঠা কামু আর পূর্ণিমার। আমি ধন্য হয়ে গেলাম, এইটাই প্রথমবারে মত কোনো চলচ্চিত্র যেখানে কারণ ছাড়াই কাউকে গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেয়া হলো। একটু অবাক হলাম কিংবদন্তির অভিনেতা মোশাররফ করিমকে তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করতে দেখে। অন্যদিকে তানভিন সুইটিও স্বভাবসিদ্ধ দক্ষতায় জাত চেনাতে পেরেছেন দর্শকদের। উদ্ভট কথাবার্তায় নোংরামির মাত্রা বেশি থাকায় মারজুক রাসেলকে বছর খানেক আগে আনফ্রেন্ড করেছিলাম ফেসবুক থেকে। অনেকদিন পর তার চেহারা দেখার সুযোগ হয়েছে এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। কিন্তু বিক্ষিপ্ত অভিনয় হতাশ করেছে। নারীচরিত্রে সুইটি, পপি, নাফিজা বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। তাঁদের দক্ষতা সত্যি মুগ্ধ করার মতো। আমি বরং অবাক হয়েছি এদের মধ্যে বেমানান এবং অভিনয়ে একেবারেই অর্বাচীন কামুর উদ্ভট আচরণগুলো দেখে। বিশেষ করে সিরিয়াস অভিনয় করার স্থলে কমেডি করে বসার যে অদ্ভুতুড়ে অভিব্যক্তি তা এই চলচ্চিত্রের রেটিং নামাতে নামাতে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের দিকে টান দিয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা কামুকে গ্রেফতার করতে নির্দেশ দিচ্ছেন ‘জীবিত কিংবা মৃত’। আমি অবাক হয়েছি একজন মৃত মানুষকে গ্রেফতার করে কিভাবে?
যাই হোক, ভালো কাহিনি থাক না থাক, অন্তত একটা হৃৎআকর্ষী গানের টানে মানুষ সিনেমা দেখার নামে থিয়েটার, টিভি কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে তাদের মূল্যবান সময় পার করে। নায়কের সঙ্গে নায়িকার ধাক্কা তারপর প্রেম, শৈশবের আল্লাদে গদগদ প্রেম, প্রেমের নামে বুড়োকালের ভীমরতি এগুলো দেখে দেখে দর্শক ক্লান্ত। তবুও পরিচালকরা ভাবেন আহা! প্রেম ছাড়া কি চলচ্চিত্র হয়। তাইতো কাহিনিতে ভর করে দর্শকনন্দিত হয়েছে বলিউডি মুভি ‘পিকে’, ‘থ্রি ইডিয়টস’ আর ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’। একইভাবে কাজল অগ্রওয়াল, রাকুলপ্রীত সিং, ঐশ্বরিয়া রাই, কাজল দেবগন, সামান্থা রুথ প্রভু, তামান্না ভাটিয়া, রাশি খান্না, ইয়েলিনা ডি ক্রুজ, জেনেলিয়া ডি সুজার কমনীয় মুখশ্রী হা করে দেখার জন্যও কেউ কেউ বসে থাকতে পারে চলচ্চিত্র দেখার নাম করে।
“এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়ে পরিচালক যদি এদেশের অন্য সব অ্যাওয়ার্ডলোভী নির্মাতা-পরিচালকদের নিয়ে একটু উপহাস কিংবা কৌতুকের চেষ্টা করে থাকেন, সেটাও সঠিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়ার মতো নয়।”
লাজ শরমের মাথা খেয়ে সত্য বললে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, লারা দত্ত, বিপাশা বসু, মল্লিকা শেরাউয়াত, উর্বশী রাউতেলা, নোরা ফাতেহি, জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজ, নিগার খান, গওহার খান, ক্যাটরিনা কাইফ, নুসরাত ভারুচা, নার্গিস ফখরি, সানি লিওন কিংবা সোফি চৌধুরীদের উন্মাদ যৌনতাও অনেক ক্ষেত্রে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে পারে। আমাদের দেশের কথাই ধরা যাক, কিছু না হোক পোস্টারে কিম্ভুতকিমাকার চশমা আর বিটকেলে পোশাকের সাকিব খানের বাহুলগ্না মাহি, পরী মণি, বুবলি, ববি কিংবা অপু বিশ্বাসের চকচকে উদর-উরু প্রদর্শনীও অনেক কামুক দর্শককে হলের ভেতরে টেনে নিতে পারে। কিন্তু চলচ্চিত্রের নামে এখানে যা দেখলাম তাতে গল্পের অভিমুখ কি সেটাই পরিচালকের আয়ত্বে থাকেনি। অন্যদিকে এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়ে পরিচালক যদি এদেশের অন্য সব অ্যাওয়ার্ডলোভী নির্মাতা-পরিচালকদের নিয়ে একটু উপহাস কিংবা কৌতুকের চেষ্টা করে থাকেন, সেটাও সঠিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়ার মতো নয়।
আমরা সবাই চাই বাংলা চলচ্চিত্র সবার প্রচেষ্টায় ঘুরে দাঁড়াক। অনেক সাহসী মানুষ এগিয়ে আসবেন পরিচালক এবং অভিনেতার গুরুদায়িত্ব নিয়ে। কিন্তু খুব কষ্টের সঙ্গে বলতে হয়, এমন কিছু কেউ প্রত্যাশা করে না যা হলে গিয়ে দেখা দূরে থাক মানুষ ফ্রি-ওয়াইফাই বাদে মেগাবাইট খরচ করে দেখার পর পরিচালককে গালমন্দ করবে। আমি পরিচালকের ভক্তকুল থেকে জেনেছি তিনি একজন গুণী কবি এবং সৃষ্টিশীল মানুষ। কিন্তু সৃষ্টিশীলতার নামান্তরে ঘটে যাওয়া কোনো কাণ্ড এতটা শিশুসুলভ হয়ে যাক, তা কারও প্রত্যাশা নয়। তবে অবশ্যই পরিচালককে ধন্যবাদ এই সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য। কবিতার খাতা একপাশে রেখে তিনি যখন পরিচালনায় নেমেছেন আমাদের সবার উচিত উনাকে উৎসাহ দেয়া। কিন্তু তাঁর প্রতি অনুরোধ থাকবে পরবর্তীকালে আবার যখন তিনি এমনি কোনো সাহসী ভূমিকায় নামবেন, বুকের পাটা দেখানোর পাশাপাশি মগজকেও একটু ব্যস্ত রাখবেন। অন্তত এমন কোনো সাহসী ভূমিকা দর্শক প্রত্যাশা করেনা যা তাদের বিরক্তির কারণ হয়। পাশাপাশি এটাও মনে রাখা উচিত, চলচ্চিত্রের খোলামেলা দৃশ্যে অভিনয় করাই যদি সাহসী দৃশ্য হয়, তাহলে সঙ্গম এবং প্রক্ষালনের সময় বিশ্বের প্রতিটি মানুষ সাহসী চরিত্রে অভিনয় করে। আর শেক্সপিয়র তো বলেই গেছেন, ‘পৃথিবী একটা মঞ্চ, প্রত্যেকেই সেখানকার অভিনেতা’।
লেখক : ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্বের গবেষক ও অনুবাদক, বর্তমানে ইতিহাস বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে।
http://salimaurnab.com/