ড. মো. আদনান আরিফ সালিম > সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার >> ইতিহাসচিন্তা

0
487
[সম্পাদকীয় নোট : প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে এতদিন ধরে পড়া যায়নি এমন একটি লিপি হচ্ছে সিন্ধুলিপি। ফলে, ভারতবর্ষের সভ্যতারও অনেক কিছু থেকে গেছে অজানা। এবার সেই বাধা দূর হতে চলেছে বলে মনে হয়। বাঙালি গবেষক, কলকাতার মেয়ে কবি বহতা অংশুমালী এই লিপিপাঠের সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। অংশুমালী শুধু কবি নন, তিনি একজন সফটওয়ার প্রোগ্রামার। সেই সূত্রেই বলা যায় তিনি সাফল্য পেয়েছেন। এখানে যে লেখাটি প্রকাশিত হচ্ছে তাতে বর্ণনা করা হয়েছে সেই ইতিহাস। আলাদাভাবে তীরন্দাজের আরেকটি পোস্টে পাবেন, কীভাবে এই কাজটি করেছিলেন অংশুমালী তারই ভিডিও-ভাষ্য। এই লেখার শেষে দেয়া হলো ভিডিওর সেই লিংটি। পড়ুন এই লেখাটি আর দেখুন অংশুমালীর সাক্ষাৎকার ইউটিউবে। অংশুমালী ভিডিওভাষ্যেই জানিয়েছেন, তিনি আরও গবেষণা করছেন সিন্ধুলিপি নিয়ে। তার পরবর্তী লক্ষ্য হচ্ছে সিন্ধুটেক্সটের অর্থ-উদ্ধার করে কী আছে ওইসব টেক্সটে তা জনসমক্ষে নিয়ে আসা। তীরন্দাজের পক্ষ থেকে বাঙালি গবেষক বহতাকে এই বিরল সাফল্যের জন্য অভিনন্দিত করি। তিনি আরও সাফল্য অর্জন করুন।]
স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়; প্রতিটি বিদ্যাপীঠের ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব কিংবা নৃবিজ্ঞানের পাঠে এক অপরিহার্য পাঠ্য হিসেবে সিন্ধু সভ্যতার কথা বলা যেতে পারে। নগর পরিকল্পনা, শিল্পকলা, স্থাপত্য আর ইতিহাসের বর্ণনা শেষ করে এই সভ্যতা সম্পর্কিত একটি বিষয় অবশ্যই সবাইকে পড়তে হয়েছে যাকে পরিচয় করানো হয় ‘সিন্ধু লিপি’ নামে। মিসরের হায়ারোগ্লিফিক কিংবা মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধাঁচের এই লিপি নিয়ে তেমন কিছুই জানা যায় না। তাই এই লিপি নিয়ে সব বইয়ের কিংবা অধ্যায়ের শেষ কথাটি হয় অভিন্ন। সেখানে সবাই বলে থাকেন ‘সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি তাই এ সভ্যতা সম্পর্কে অনেক তথ্য অজানা রয়ে গেছে’। সবার এতোদিন গর্ববোধ হয়েছে সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম আবিষ্কারক একজন বাঙালি; যিনি বরেণ্য ইতিহাসবিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘদিনের চেষ্টায় সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার আজ আলোর মুখ দেখেছে, সেখানেও যাঁর নাম আসছে তিনিও বাঙালি এবং একজন নারী।
বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা এবং অনলাইন পোর্টালের কল্যাণে কবি ‘বহতা অংশুমালী’ নামে পরিচিত এই গবেষকের পুরো নাম বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায়। তিনি কর্মক্ষেত্রে একজন প্রোগ্রামার এবং সফটওয়ার নিয়েই তার চলাফেরা। কবিতা লিখে পাঠকমহলে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি আর্চারি এবং টেনিসেও রয়েছে দুর্নিবার আগ্রহ। তবে তাঁর সব অর্জন ছাপিয়ে সম্প্রতি মূখ্য হয়ে উঠেছে খ্যাতনামা নেচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধটি। Interrogating Indus inscriptions to unravel their mechanisms of meaning conveyance শীর্ষক এই নিবন্ধে বহতা বাতলে দিয়েছেন কিভাবে সিন্ধুলিপি পাঠ করা যেতে পারে সেই পদ্ধতি। শৈশব থেকে কৈশোর পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে এসেও যাঁরা এতদিন জেনে এসেছেন সিন্ধুলিপি এখন পর্যন্ত পড়াই যায়নি, তাদের এবার নড়েবড়ে বসার সময় হয়েছে। এই লিপি নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই গবেষণা করে আসছিলেন অনেকে। কিন্তু এই গবেষণায় এমন কোনো সূত্র পাওয়া সম্ভব হয়নি যা দিয়ে এর পাঠোদ্ধার করা যেতে পারে। একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার বহতা অংশুমালীর গভীর পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিনের গবেষণায় যা খুঁজে ফিরছিলেন অনেকে সেই সূত্র আবিষ্কারের পথ করে দিয়েছে।
ফ্রাঁসোয়া শ্যাম্পোলিয়া মিসরের হায়ারোগ্লিফিক পাঠোদ্ধার করেছিলেন তাঁর উন্নত ভাষাজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে। রাজা পঞ্চম টলেমি তাঁর অনুশাসন রচনার ক্ষেত্রে গ্রিক লিপির পাশাপাশি হায়ারোগ্লি ফক ব্যবহার করায় তার এই কাজ সহজ হয়ে যায়। এখানে একটা বন্ধনীর মধ্যে যেভাবে রাজাদের নাম লেখা ছিল তার সঙ্গে মিল ছিল গ্রিক লিপির। ফলে তিনি খুব সহজেই গ্রিক লিপির আলোকে সেগুলো পড়তে পেরেছিলেন। এভাবে মিলিয়ে মিলিয়ে তিনি চিহ্ন থেকে রানী ক্লিওপেট্রার নাম পড়তে পেরেছিলেন। এখানে গ্রিক লিপির সঙ্গে পাশাপাশি লেখা হওয়ায় রোজেটা স্টোনের পাঠোদ্ধার করা গিয়েছিল। কিন্তু সিন্ধুলিপির ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়ায়াটায় অন্যরকম। এই লিপির ক্রমবিকাশ পর্যবেক্ষণ করতে গেলে দেখা যায় একটা পর্যায়ে এসে হঠাৎ করে থেমে গেছে। এদেশীয় কিংবা এর আশেপাশের কোনো লিপির সঙ্গে বিন্দুমাত্র মিল নেই সিন্ধুলিপির। এ কারণে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক গবেষকও মনে করেছেন কোনোদিন হয়তো সিন্ধুলিপি পড়াই সম্ভব হবে না। অন্যদিকে অনেকে নিজেদের জানা দেবদেবীর নাম থেকে শুরু করে প্রাচীন অনেক শব্দকে খেয়াল খুশি পড়ার চেষ্টা করেছেন সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধারের নামে। এই ধরনের অবান্তর চেষ্টার ফলে দিনের পর দিন প্রকৃত গবেষণা আরও কঠিন হয়ে গেছে।
গল্পগাথার প্রকাশ, কল্পকথার অতিকথন আর জল্পনা-কল্পনার বাইরে অনেক প্রাজ্ঞজন রয়েছে যাঁরা প্রকৃত অর্থে সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধারে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ; আর তাদের পথ ধরেই সাফল্যের মুখ দেখেছেন বহতা অংশুমালী। তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন ফিনল্যান্ডের গবেষক আস্কো পার্পোলা এবং ইরাভথম মহাদেবনের কথা। ইন্ডোলজি নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন সেখানে আস্কো যেমন গুরুত্বপূর্ণ এক নাম, তেমনি একজন সরকারি আমলা হয়েও মহাদেবন সেই ১৯৭৭ সালের দিকে করেছেন সিন্ধুলিপির প্রথম ডিজিটাইজড কর্পাস তৈরির কাজ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালীন পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল বিশ্বখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক জোনাথন মার্ক কেনোয়ারের সঙ্গে। তিনি অনলাইনে তাঁর গবেষণাকর্ম সরাসরি প্রকাশ করেন হরপ্পা ডট কমে। পেশায় একজন সফটওয়ার ডেভলপার হয়েও দিনের পর দিন এসব বিজ্ঞ গবেষকের সূত্র থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বহতা অংশুমালী। তার চেষ্টার আংশিক কেবল জানা গেছে নেচার ব্রান্ডের বিশ্বখ্যাত জার্নাল পালগ্রেভ কমিউনিকেশন্স-এর জুলাই ২০১৯ সংখ্যাতে। পুরো গবেষণার ফলাফল এখনও প্রকাশিতব্য থাকলেও যেটুকু জানা গেছে তার আলোকে অদূর ভবিষ্যতে সিন্ধুলিপির পাঠ সম্ভব হবে। তাই এই গবেষণাকর্মটিকে সিন্ধুলিপি পাঠোদ্ধারের পথে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সোপান হিসেবে বিবেচনার বিকল্প নেই।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক এবং ইতিহাসবিদমাত্রই জানেন সিন্ধুলিপির প্রায় প্রতিটি পাঠচেষ্টা কিভাবে নানা দিক থেকে বিতর্কিত এবং সমালোচিত হয়েছে। বিশেষ করে স্টিভ ফার্মার, রিচার্ড স্প্রট এবং মাইকেল উইটজেলের মতো বিদগ্ধ গবেষক যেখানে দাবি করেছেন সিন্ধুলিপির ভাষাগত সত্তা অনুপস্থিত সেখানে অন্যদের বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। অন্যদিকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ব্রায়ান ওয়েলস এবং প্রখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক পারপোলার চিন্তা একটু ভিন্ন। তাঁরা দাবি করেছেন সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধারের মূল জটিলতা হচ্ছে লোগোসিলেবিক হওয়া। এখানে একটি লিপিচিহ্ন বর্ণকে না বুঝিয়ে সরাসরি এক একটি অক্ষরকে বোঝায়। অনেক ক্ষেত্রে একাক্ষরী শব্দকে বোঝাতেও ব্যবহার করা হয়েছে অভিন্ন চিহ্ন। ফলে যে কোনো গবেষকের পক্ষে এর পাঠোদ্ধার প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। তাঁর মতামতের সঙ্গে ধ্রুপদী ধারার গবেষকদের চিন্তা আবার একদমই মেলে না। যেমন, ইরাভথম মহাদেবন দাবি করেছেন সিন্ধুলিপি গাঠনিকভাবে লোগোগ্রাফিক। এখানে উৎকীর্ণ চিহ্ন দিয়ে মূলত একটি পূর্ণ শব্দকেই নির্দেশ করা হয়। ফলে দেখা যাচ্ছে তাঁদের প্রত্যেকের চিন্তায় একটু পার্থক্য বিদ্যমান। পাঠোদ্ধারের পূর্বে গবেষকদের এই বিভক্তিও সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধারের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে। তবে বড় সমস্যা হচ্ছে শব্দ কিংবা অক্ষর যেটা ধরেই পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করা হোক না কেন পূর্ববর্তী গবেষকরা আগে থেকে যেভাবে ধরে নিয়েছেন সেভাবেই সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার করে ছেড়েছেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় বহতা অংশুমালী মূলত এই চেষ্টা থেকে বেরিয়ে এসেই সফলতা পেয়েছেন।
তিনি বিভিন্ন চিহ্নকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা চেষ্টা চালিয়েছেন যেগুলো শব্দের আগে কিংবা পরে বসে ধরে নিয়ে পূর্বতন গবেষকরা নানা জটিলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। এই গবেষণায় সিন্ধুলিপির বর্ণ, অক্ষর কিংবা শব্দকে আগে থেকে নির্ধারিত কোনো ধাঁচে পড়ে নেয়ার চেষ্টা এখানে লক্ষ করা যায়নি। এখানে ধ্বনি ও শব্দরূপ নিয়ে বিশ্লেষণ না করে প্রথমেই লিপিগত অবস্থানের দিকে হয়েছে। পাশাপাশি এখানে প্রেক্ষিতগত তথা কন্টেক্সুয়াল বিশ্লেষণও করা হয়েছে। বিশেষত, একটি লিপি কোন প্রত্নবস্তুর সমাবেশ তথা অ্যাসেমব্লেজ থেকে পাওয়া গেছে সেটাও এখানে দেখা হয়েছে। তার সঙ্গে আকৃতি, খোদাইকরণের বস্তু এবং তার প্রকৃতিও এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রাচীন গ্রিক লিপি নিয়ে অ্যালিস কোবারের কৃত বিশ্লেষণের সঙ্গে এই গবেষণার তুলনা করা যেতে পারে। প্রথম দিকে লিনিয়ার বি লিপির পাঠোদ্ধার করে অনেকে নিজ নিজ মতামত দিয়েছিলেন। অনেকে এই লিপি থেকে হোমারের মহাকাব্য পর্যন্ত প্রাপ্তির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গাঠনিক তথা স্ট্রাকচারাল বিশ্লেষণ করে অ্যালিস কোবার মত দিয়েছিলেন একটু ভিন্নরকম। কোবারের পথ ধরে পরে সেই লিপির পাঠোদ্ধার করেছিলেন একজন স্থপতি মাইকেল ভেন্ট্রিস। ক্ষেত্রবিশেষে একজন  ভাষাবিদ, ইতিহাসবিদ কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক না হয়েও স্থপতি অ্যালিস  যেভাবে গ্রিক লিপি পাঠোদ্ধারের পথ বাতলে দিয়েছিলেন সে পথেই হেঁটেছেন বহতা অংশুমালী। তিনিও নানাবিধ গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত ব্যবচ্ছেদ এবং আন্তঃঅনুষদীয় গবেষণারীতির অনুসরণে বোঝার চেষ্টা করেছেন সিন্ধুলিপির গতি-প্রকৃতি। এই গবেষণায় লিপিচিহ্নের নানাবিধ শ্রেণিকরণ ও লেখচিত্রে উপস্থাপনের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে সিন্ধুলিপি মোটেও ফোনেটিক্যালি খোদাই করা হয়নি। পাশাপাশি তাঁর প্রকাশিতব্য দ্বিতীয় গবেষণাপত্রে স্পষ্টভাবে কিছু লিপির পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে অর্থও তুলে ধরা হয়েছে। সিন্ধুলিপির বিমূর্ত নানা চিহ্নে স্ব স্ব অবয়ব নিয়ে নিশ্চুপ থাকা চিহ্নগুলো এতদিন ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের গবেষণায় কোনো কাজে লাগেনি। বহতা অংশুমালীর সাম্প্রতিক আবিষ্কার ঐ চিহ্নগুলোকেও মূর্ত করে তুলছে যা ভারতবর্ষের তথা হরপ্পা সভ্যতার ইতিহাস বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লেখক : ইতিহাসের শিক্ষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়