তুষার আবদুল্লাহ > অনীকের মোটরসাইকেল বায়না >> ছোটদের মনবাড়ি >>> মনস্তত্ত্ব

0
159

খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অনীককে। রাতে বাড়ি ফেরেনি। পরীক্ষা শেষ হবার পর একটু রাত করেই বাড়ি ফিরতো। তবে রাত দশটার পর কখনোই বাড়ির বাইরে থাকে না। দূরে কোথাও আড্ডা দেয়, এমনও নয়। বাসার কাছের মাঠে সন্ধের পর কেরাম খেলে। যাদের সঙ্গে খেলে, তারা মহল্লারই ছেলে। ইদানীং বাইরের কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে। হবে হয়তো আশপাশের মহল্লার। ওদেরও হয়তো পরীক্ষা শেষ। পরীক্ষা শেষে দলবেঁধে ব্যান্ডমিন্টন বা কেরমা খেলার রেওয়াজ মহল্লাতে চলছে পরম্পরায়। অনীকের বাবা-মা তাই এনিয়ে চিন্তিত হননি। কিন্তু ছেলে যখন রাত এগারটাতেও বাড়ি ফিরছেনা, তখন মা ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন মাঠে। কেরাম খেলা তখনও চলছে। বাতি জ্বালিয়ে দুই বোর্ডে চলছে খেলা। অনীককে কোনো বোর্ডের আশপাশে দেখা গেলো না। যারা খেলছে তারা আড়চোখে অনীকের মা’কে দেখলো। তবে ফিরে তাকালো না বা সরে এসে কথা বললো না। অনীকের মায়ের উদ্বেগ বেড়ে গেল- ছেলে তাহলে গেল কোথায়? বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। কেউ কিছু বলছে না বলে নিজেই একটি বোর্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন- বাবা, অনীককে দেখেছো? কেউ কিছু শুনলো বলে মনে হলো না। অনীকের মা আবার বললেন- দেখেছো অনীককে কেউ? বিরক্ত হয়ে একজন বোর্ড থেকে ঘাড় ফিরিয়ে বলে- এতো রাতে এখানে আসছেন কেন আপনি,  অনীক কোথায় আমরা কী করে জানবো?

এই ব্যবহারে আহত হলেন অনীকের মা। আজকালকার ছেলেমেয়েরা এভাবে কথা বলে, অভিভাবকদের সঙ্গে?  অনীকও কি এমন করেই কথা বলে বাড়ির বাইরে। তিনি সরে আসেন মাঠ থেকে। কোন দিকে কোথায় গিয়ে খোঁজ করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। তিনি বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। এমন সময় অনীকের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ও জানাল অনীক আজ খেলতে আসেনি। বিকেলের পর থেকে আর ওকে দেখা যায়নি মহল্লায়। অনীকের মায়ের উৎকণ্ঠা আরো বেড়ে গেল। তাহলে ছেলে গেল কোথায়? ফিরে এলেন বাড়িতে।

অনীকের বাবা চুপচাপ বসে আছেন। মা’কে ঢুকতে দেখে বললেন- খোঁজ পেলে ছেলের? মাথা নাড়েন মা। বাবা মোবাইল বাড়িয়ে দেন মায়ের হাতে। মা দেখেন ছেলে ম্যাসেজ পাঠিয়েছে- ‘মোটরসাইকেল না কিনে দিলে আমি ভর্তি হবো না’। মা অবাক হয়ে তাকান বাবার দিকে- ও মোটরসাইকেল চেয়েছিল? অনীকের বাবা জানান, ভর্তি পরীক্ষাই দিতে চাইছিল না ও। ফল ভালোই ছিল। এসএসসি’র মতোই এইচএসি’তেও গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে। পরীক্ষার পর থেকেই মোটরসাইকেলের বায়না ছিল, এটা মাও জানতেন। কিন্তু ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা দিতে চায়নি মোটরসাইকেল ছাড়া, এটা জানতেন না। বাবা বলছেন, অনেকটা জোর করে মোটরসাইকেল দেয়া হবে এই লোভ দেখিয়েই একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়াতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন সুযোগও পেয়ে গেছে দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটিতে তো ভর্তি হতেই হবে। একসপ্তাহ পরে ভর্তির তারিখ। এর মধ্যে মটরসাইকেল কিনে না দিলে ছেলে ভর্তি হবে না। মা ছেলেকে খুঁজে না পাওয়ার উৎকণ্ঠা সরিয়ে বাবা’র ওপর রেগে গেলেন- তুমি কি ছেলেকে মোটরসাইকেল কিনে দিতে চাও এখনই? বাবা জানান-একদম না। মা আরো রেগে গিয়ে বললেন- তাহলে ওকে লোভ দেখালে কেন? বাবা চুপ হয়ে আছেন। বাবাকে চুপ থাকতে দেখে মা বলেন- ছেলেকে মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে তুমিই তো এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছো। বাবা কোন কথা না বলে মোবাইলে ছেলেকে ধরার চেষ্টা করলেন। ছেলে মোবাইল ধরলো না। বাবা বললেন- এক কাজ করলে কেমন হয় বলো তো?  মা কপট রাগে তাকালেন বাবার দিকে- মোটরসাইকেল ওকে ঠিকই কিনে দিলাম। তারপর? মা কৌতুহলী হয়ে জানতে চান- তারপর কি হবে? বাবা বলেন- পরে পুলিশ দিয়ে মোটরসাইকেলটা আটকে ফেলবো। ওকে বুঝতে দেবো না। মা এবার ক্ষোভে ফেটে পড়লেন – ছেলের সঙ্গে এই ছলচাতুরি কেন? এখন ওকে মোটরসাইকেল দেয়ার মতো সময় হয়নি, এটা স্পষ্ট করে বলে দিলেই হলো। আর ও যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে, ওই ক্যাম্পাসের ভেতরেই হল। মোটর সাইকেলের প্রয়োজন নেই। আমরা এখানে দুঃশ্চিন্তায় থাকবো। আজকাল মোটরসাইকল দুর্ঘটনা কেমন বাড়ছে। বিষয়গুলো বুঝিয়ে বললেই হয়। বাবা মাথা নেড়ে বলেন- আমি বুঝিয়েছি। ও বুঝতে চাচ্ছেনা। মায়ের কণ্ঠ এখন বেশ শীতল-আমাকে আড়ালে রেখে ছেলের সঙ্গে দরকষাকষি করা ঠিক হয়নি। যখন মোবাইল কিনে দেয়ার বয়স হয়নি, তখন মোবাইল তুলে দিলে হাতে। অনীকের বাবা কোন উত্তর না দিয়ে অন্য ঘরে চলে গেলেন।

ছেলে নিরুদ্দেশ হয়নি, এটা বুঝতে পারছেন মা। শহরেই আছে, হয়তো কোনো বন্ধু বা আত্মীয়ের বাড়িতে। মোটর সাইকেলের জন্য জিদ ধরে বসে আছে। ছেলের সঙ্গে ক্লাস নাইন থেকেই কেমন এক দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে তার। ছেলে বিভিন্ন সময়ে নানা বায়না করে। তিনি সব বায়না মেটাতে রাজি হননা। দেবো, দিচ্ছি, দেয়া হবে, এমন প্রতিশ্রুতিও দেন। যা দেয়ার মতো বলে তিনি মনে করেন, তা ঠিকই সময় মতো দেন। না দেয়ার মতো হলে সরাসরি না বলে দেন। কিন্তু অনীকের বাবা বিপরীত। চাওয়া মাত্র ছেলের সখ, বায়না মিটিয়ে দেন। তাই লেখাপড়ার জন্য দরকারি কিছুও এখন মায়ের কাছে চায়না অনীক। মা নিজে থেকেই প্রয়োজন বুঝে কিনে দেন। মা মনে করেন- বায়না করা এবং পাওয়াতে এখন থেকে সংযমী না করলে ছেলে বেপরোয়া হয়ে যেতে পারে। পরীক্ষার ফলইতো চূড়ান্ত পাওয়া নয়।

নির্ঘুম কেটেছে পুরো রাত। সোফায় বসেই ছিলেন বাবা-মা। নিজেদের মধ্যে কোন কথা হয়নি। বাবা’র মধ্যে একধরনের অপরাধবোধ। মায়ের অভিমান। ছেলেকে নিয়ে সমান উৎকণ্ঠা ছিল দুজনেরই। ভোরে অনীকের কলবেলে ঘুমের ঘোর কাটে। মা উঠে গিয়ে দরজা খোলেন- রাতে কোথায় ছিলে? ছেলে কোন উত্তর না দিয় নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে। মা টোকা দেন দরজায়। কয়েকবার টোকা দেয়ার পর অনীক দরজা খুলে বের হয়ে আসে। মা জানতে চাইলেন- তোমার মোটরসাইকেল লাগবে কেন? অনীক মাথা নিচু করেই উত্তর দেয়- ইউনিভার্সিটি যাচ্ছি। একটা বাইক লাগেনা? মা ছেলের কাঁধে হাত রাখেন- যারা যারা ভর্তি হবে তারা সবাই বাইক কিনছে? অনীক মাথা নাড়ে। মা বলেন- তুমি ওখানে পড়তে যাচ্ছ। তোমার ফ্যাকাল্টি আর হলের দূরত্বও বেশি নয়। ক্যাম্পাসে হেঁটে বেড়ানো বা সাইকেলে ঘুড়ে বেড়ানোর চেয়ে আনন্দের কিছু হতে পারেনা। মোটরসাইকেল বরং ক্যাম্পাসের পরিবেশ নষ্ট করবে। তোমাকে সহপাঠীরা ভুল বুঝবে। ভাববে, তুমি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের প্রভাবে ক্যাম্পাসে বাইক নিয়ে দৌঁড়ে বেড়াচ্ছো। তোমার বাবা মায়ের আয়-রোজগার নিয়েও প্রশ্ন তুলবে অনেকে। সবচেয়ে বড় কথা হলো- সব সহপাঠী তোমাকে বন্ধু ভাববে না। তোমার কাছে ঘেঁষতে সংকোচে বা ভয় করবে।

অনীক বাবা’র পাশে গিয়ে বসে- তুমি কি আমাকে অনেক ভালোবাসো? বাবা তাকান ছেলের দিকে। অনীক বাবাকে বলে- যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে নাও বলা যায় বাবা। ততোক্ষণে মা-ও পাশে এসে দাঁড়ান। দু’জনকে জড়িয়ে নিয়ে অনীক বলে- আমার ভুল হয়েছে। মা ভর্তির দিন তুমিও কিন্তু যাচ্ছ।