তুষার আবদুল্লাহ > অহনার বাবা নেই >> ছোটদের মনবাড়ি

0
219

অহনার বাবা নেই

শহরে বৃষ্টি হচ্ছিল। মধ্য বয়সী রাত। বারান্দায় বসে মেঘের সরোদ বাজনা শুনছি চোখ বুঁজে। দীর্ঘ সময় ধরে চোখ বুঁজে রাখা যাচ্ছেনা। উঠোনে ফুটে থাকা শাদা ঝুমকো জবায় চোখ রাখতেই হচ্ছে। মনে হচ্ছিল চাঁদ যেন নেমে এসেছে উঠোনে। ঠিক এরকম একটা সময়ে ফোনটা বেজে উঠল। পরিচিত নম্বর নয়। ওপ্রান্ত থেকে জানতে চাইল- আপনি কি সাংবাদিক? কণ্ঠস্বরে ভয়, আতঙ্ক। বোঝা যাচ্ছে, কোনো এক কিশোরীর কণ্ঠ।
টেলিফোনের মধ্যেই কেঁদে ফেললো মেয়েটি।
– অ্যাঙ্কেল আমাদের বাসায় পুলিশ পাঠাতে পারবে?
জানতে চাইলাম- কেন? ভাবলাম, কোন সন্ত্রাসী হয়তো ওদের বাসায় হামলা করেছে। মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল- ওই অমানুষটাকে এসে নিয়ে যাক। আমি ভাবলাম, ঠিকই কোন সন্ত্রাসী এসে ওর পরিবারের ওপর হামলা করেছে। ভয় পেয়ে বাবা কিংবা মায়ের মোবাইলে সংরক্ষিত নম্বর থেকে আমাকে ফোন দিয়েছে। তার মানে পরিবারটি হয়তো খুব অচেনা নয় আমার।
মেয়েটির কাছে জানতে চাইলাম- অমানুষটা বাড়ির ভেতর ঢুকলো কী করে, বাসায় এখন কে কে আছেন? বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ছে বাইরে। বজ্রপাতে প্রকম্পিত হচ্ছে শহর।
মেয়েটি জানাল- ওই অমানুষটাতো আমাদের বাড়িতেই থাকে। ভাবনায় পড়ে গেলাম। কে হতে পারে যে ওদের পরিবারের সঙ্গেইে আছে। অনেক পরিবারে নিকট আত্মীয়রা সঙ্গে থাকেন। তাদের সঙ্গে মতবিরোধের ঘটনাও আছে। কিন্তু এই বাচ্চা মেয়েটির সঙ্গে তাদের কী এমন ঝামেলা হতে পারে? হলে তো ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে হবে।
জানতে চাই- উনি কি হন তোমার? ওপ্রান্ত থেকে কোন উত্তর নেই। নীরব। বুঝতে পারছি ও যেখানে আছে সেখানেও বৃষ্টি হচ্ছে। হঠাৎ পুরুষালী কণ্ঠের চিৎকার শুনতে পেলাম।
চিৎকার নাকি হুঙ্কার আলাদা করতে পারছিলাম না। বললাম– কে চিৎকার করছে এমন করে? মেয়েটি জানাল- ওই অমানুষটাইতো। জানতে চাইলাম আবার- উনি কি হন তোমার? এবার মেয়েটি বলল- মা বলেছে ওই অমানুষটা নাকি আমার বাবা হয়।
মেঘেরও আলো থাকে। আলো ছড়ায় বৃষ্টি। উঠোনের জবা ফুল চাঁদ। সব যেন অন্ধকারে ডুবে গেল। নিমজ্জিত হলাম আমিও। কোন কথা নেই। ও-প্রান্তের কণ্ঠটা নিশ্চুপ। চুপ করে আছি আমিও। কতক্ষণ চুপ করে ছিলাম জানি না। ও প্রান্তের মেয়েটি কতক্ষণ আমার উত্তরের অপেক্ষা করেছে বুঝতে পারিনি। শুধু জানি, বারান্দাতেই ভোর হয়েছে। তবে মেঘ কাটেনি।
একসময় ঘোর কাটলো। ফোন তুলে দেখি, মেয়েটির সঙ্গে আমার একঘণ্টা পঁচিশ মিনিট কথা হয়েছে। তার মানে বিশ, বাইশ মিনিট পরের সময়টুকুতেও ও আমার অপেক্ষায় ছিল। চিন্তা হল মেয়েটির জন্য।
রাতে কী যে হলো মেয়েটার। আচ্ছা মেয়েটা কেন তার বাবাকে অমানুষ বলছে? আজকাল কতো খবর আসে। কত গুঞ্জন, কত রকমের ফিসফাস শুনি। বাবার কাছেও যৌন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে মেয়ে। এমন কিছু নয় তো? ফোন করতে গিয়েও থেমে যাই। যদি এখন মেয়েটি ফোন না ধরে। কিংবা ওর মা কিংবা বাবা ধরেন? তখন আমি কী জানতে চাইবো। মোবাইল হাতে তুলেও রেখে দেই কয়েক দফা। নম্বরটিও স্মরণে আনার চেষ্টা করি। এমন অনেক নম্বর আছে, তার ব্যবহারকারীর নামে সংরক্ষণ না করা হলেও, বহুবার কথোপকথনের কারণে নম্বরটি চেনা হয়ে যায়। না, কোনভাবেই নম্বরটির সঙ্গে চেনাজানার হদিস মিললো না।
আচ্ছা আমিতো মেয়েটির কাছে ওর নামটিও জানতে চাইনি। অপরাধী মনে হলো নিজেকে। যদি সত্যি ওর কোন বিপদ হয়ে থাকে রাতে। আমি তো দায়িত্ববোধের পরিচয় দেইনি। আসলে কোন মেয়ে যখন বাবাকে অমানুষ বললো, তখন বাবা হিসেবে নিজেকে কোথাও আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলার সকল যোগ্যতা হারিয়ে বসেছিলাম। জানি, এর সবই অজুহাত মাত্র, নিজেকে প্রবোধ দেবার।
ফোন করেই বসলাম। ও প্রান্ত থেকে যিনি ফোন ধরলেন, ধারণা করলাম, তিনি মেয়েটির মা। বললাম- রাতে এই নম্বর থেকে ফোন এসেছিল। একটি মেয়ে আমাকে ফোন করেছিল। কেমন আছে ও? মেয়েটির মা বললেন- অহনা ঘুমাচ্ছে। ভালো আছে এখন। জানতে চাইলাম- রাতে আপনাদের বাড়িতে কোনো সমস্যা হয়েছিল?
অহনার মা চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর বলেন- হুম, হয়েছিল। জানতে চাই- আমার নম্বরটি আপনার কাছে ছিল? অহনার মা জানালেন- ওর বাবা মাদকাসক্ত দীর্ঘদিন ধরে। কয়েকদিন পরপরই বাড়িতে ভাংচুর করে। অযথাই আমাদের গায়ে হাত দেয়। মেয়েটা বাবাকে প্রচণ্ড ভয় পায়। ঘুমের মধ্যেও আঁতকে ওঠে। ভূতকেও বাচ্চারা এমন ভয় পায় না। আমার এক বন্ধু আপনার নম্বর দিয়ে বলেছিল, কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসলে বা তেমন শঙ্কা দেখলে আপনাকে ফোন দিতে। আমি মেয়েকেও নম্বরটি চিনিয়ে রেখেছিলাম। জানতে চাই- ওদের মধ্যে বাবা-মেয়ের সম্পর্ক কি একদমই নেই।? অহনার মায়ের গলা কাঁপছে- না। স্কুলের বন্ধুদের কাছে বলে ওর বাবা নেই।
কেটে গেল ফোনের লাইনটা, নাকি ভদ্রমহিলা কেটে দিলেন!
ফোনটা রাখতে রাখতে স্বগতোক্তির মতো আমার কণ্ঠ চিরে একটা বাক্যই উচ্চারিত হল- “নেই, কেন নেই?”
আগের পর্বটা পড়তে চাইলে নিচের লিংকে ক্লিক করুন

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b9-%e0%a6%9b%e0%a7%8b%e0%a6%9f%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae/