তুষার আবদুল্লাহ > আত্মীয়দের বাড়ি রূপমের ক্লাস রুম >> ছোটদের মনবাড়ি >>> মনস্তত্ত্ব

0
227

আত্মীয়দের বাড়ি রূপমের ক্লাস রুম

কী যে অস্বস্তিকর। ছোটচাচা’র সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে না রূপমের। কিন্তু মা এই ছোটচাচার সঙ্গেই ঘুরতে পাঠাবে। বাড়ি থেকে বের হয়েই চাচা সিগারেট খেতে শুরু করবেন। সিগারেটের গন্ধ একেবারেই সহ্য করতে পারে না রূপম। কতোবার বলেছে একথা। ছোটচাচা যখন সিগারেট জ্বালায় তখনই কাশি শুরু হয় রূপমের। কাশতে কাশতে বমি করে ফেলে ও। তবুও ওর সামনে সিগারেট ঠোঁটে নেবেই। শুধু কী ছোটচাচা একা খান? বাইরে বের হলেই তার বন্ধুরা এসে যোগ দেন। বন্ধুরা একসঙ্গে সবাই সিগারেট ধরালে দম বন্ধ হয়ে আসে রূপমের। ওর যে কষ্ট হচ্ছে, কারো তাতে খেয়াল থাকেনা। একবার ও চিৎকার করে বলেছিল- আমার কষ্ট হচ্ছে, তোমরা সিগারেট নেভাবে? ছোট চাচার বন্ধুরা তখন বলেছিল- চাচু অভ্যাস করো। কয়দিন পরতো তুমি নিজেই সিগারেট ধরাবে। কথাগুলো পছন্দ হয়নি রূপমের। এধরনের কথা শুনে ওর আরো বেশি বমি বমি লাগছিল।
ছোটচাচার সঙ্গে একা আত্মীয়দের বাড়িতে যেতেও অস্বস্তি হয় রূপমের। আত্মীয়দের বাড়ি ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস তার। শহরে কোন প্রান্তে কোন আত্মীয় আছে, তাদের সবার বাড়ির ঠিকানা ছোটচাচার জানা। প্রতিদিন কোন না কোন আত্মীয়ের বাড়ি যাবেনই। পরীক্ষা, পড়া না থাকলে মা রূপমকে দিয়ে দেন ছোটচাচার সঙ্গে। আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ, চেনাজানা থাকা নাকি ভালো। যে বাড়ি গুলোতে যাওয়া হয় সেখানে ওর বয়সী ছেলে-মেয়ে পাওয়া গেলেও, সবার সঙ্গে খেলা জমেনা। কারো কারো সঙ্গে খেলতে ভালোই লাগে। তবে ভালো লাগে না বেশিরভাগ আত্মীয়ের কথাবার্তা। কোনো কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে মনে হয় ও ক্লাসরুমে চলে এসেছে। কোন ক্লাসে পড়ছে, এদিয়ে শুরু করেন আলাপ। ইংরেজি মাধ্যমে না পড়ে কেন বাংলা মাধ্যমে পড়ছে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে না বলে বড় হয়ে ভালো চাকরি পাবে না। বিদেশে যেতে পারবে না। ওর বাবা-মা বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেননি। কেউ বলেন- আজকালতো অল্প টাকাতেও ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো যায়। সেখানে ভর্তি করলেই হতো। বাবা-মা স্বচ্ছল না, একথা বলে উনারা রূপমকে সেটাই বুঝিয়ে দেন। তারপর চলে নিজেদের সন্তানরা স্কুলে কতো ভালো করছে, তার ফিরিস্তি। রূপম যে কতো খারাপ ছাত্র তা প্রমাণে তারা যেন যুদ্ধে নেমে যান। এরই মধ্যে কেউ একজন এসে জিজ্ঞেস করেন, কোনো এক অজানা দেশের রাজধানী, মুদ্রা বা সেই দেশের রাষ্ট্রপতির নাম। কিংবা কোনো ইংরেজি শব্দের বানান জানতে চান। আজকাল আবার কোনো কোনো আত্মীয়ের বাড়ি গেলে সুরা বা দোয়া মুথস্থ আছে কিনা জানতে চান। মুখস্থ থাকলে তা শোনাতে হয় তাদের । না মুখস্থ থাকলে আর রেহাই নেই।
রূপমের কাছে মনে হয় এই যে ওকে নানারকম প্রশ্ন করা, পড়ার মতো করে দোয়া-সূরা মুখস্থ ধরা, এগুলো বড়দের একরকম বিনোদন। না হলে একটি বাড়ির সবাই মিলে একইরকম আচরণ করেন কীভাবে। এটা তো বড়দের একটা সাংঘাতিক সমস্যা! কিন্তু ছোটচাচা যে তাকে রক্ষা করবেন, তা নয়। উল্টো তাদের উসকে দেন। কোনো বিষয় বা প্রশ্ন হয়তো তারা করেননি, বাদ যাচ্ছে, সেটি ছোটচাচাই তাদের মনে করিয়ে দেন।
কোচিং না করাটাও যেন অপরাধ রূপমের। বাড়িতে মা-বাবা পড়ান। তাতেই এখন পর্যন্ত চলে যাচ্ছে ওর। খুব খারাপ ফল করছে না। মা বলছেন প্রথম হতে হবে, এমন দরকার নেই। বাবাও তাই বলেন- জেনে-শুনে-বুঝে লিখলে পড়লেই হবে। পরীক্ষার বইয়ের চেয়ে বাবা-মায়ের চেষ্টা থাকে রূপমকে সিলেবাসের বাইরের বই বেশি পড়ানোর। রূপমও তাতেই আনন্দ পায়। তাই বলে স্কুলের পড়া দূরে সরিয়ে রাখে না। ওর স্কুল বাংলা মাধ্যমের হলেও, ভাল স্কুল বলে পরিচিত। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধূলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক চর্চায় সুনাম আছে। আত্মীয়-স্বজনরা এতেও বিরক্ত। পড়ালেখার নাকি ক্ষতি হবে। তারা বলেন, নিশ্চিত ভাবে ও জিপিএ-৫ পাচ্ছে না। অতো ভালো রেজাল্ট করতে হলে তো একাধিক টিউটরের কাছে পড়তে হবে, আর সারাক্ষণ বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকতে হবে। তাই, জিজ্ঞেস করা শুরু হয় এভাবে : গণিতে কতো পেয়েছো ? ইংরেজি? ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি? না কোনটিতেই ওর একশতে একশ নেই। মন ভরাতে পারলো না আত্মীয়দের। তাচ্ছিল্যের নোংরা হাসি দেখে রূপমের দম বন্ধ হয়ে আসে। নি:শ্বাস নিতে কষ্ট হয় ওর। অবাক হয়ে ভাবে, মা বলেন আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা ভালো। সবাইকে নিয়ে নাকি পরিবার। তাহলে পরিবারের মানুষগুলো সিগারেটের ধোঁয়ার মতো অস্বস্তিকর কেন? রূপমের জানতে ইচ্ছে করে এদের ছেলেমেয়েরা সবাই কি সেরা, সবকিছুতেই সেরা? হোক না, তাতে ওর কী?

রূপম ওর মতো করেই থাকতে চায়। বাবা-মা খুশি থাকলেই হলো। সবাইকে খুশি করবে কেমন করে ওর মতো ছোট্ট মানুষ? ছোটচাচা একেকটি আত্মীয়ের বাড়ি থেকে বের হয়, আর রূপমকে গালমন্দ করতে শুরু করে। ও নাকি ঠিকঠাক মতো উত্তর দিতে পারেনি। বাবা-মায়ের লাই পেয়ে নাকি ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পড়ালেখা কিছুই হচ্ছে না। ছোটচাচার কথা শুনে অবাক হয় ও। সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর ওপর। যে উত্তর হয়তো ওনাদেরও জানা নেই, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে কেন ওকে? আশ্চর্য! ছোটচাচার কথা শুনে চোখে জল চলে আসে রূপমের। না, আর না। এবারেই শেষ। আর কোনো দিন কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে যাবে না ও, মা’কে বাবাকে ছাড়া। একথা ভেবেই-বা কী হবে। মা ঠিকই ছোটচাচার হাতে ধরিয়ে দেবেন ওকে। আর ছোটচাচা কেন? বাবা-মায়ের সঙ্গে আত্মীয়দের বাড়ি গিয়েও কি খুব একটা নিস্তার পেয়েছে? একদমই নয়। বরং মা-বাবাকেই মন্দ কথা শুনতে হয়। এক আত্মীয়াতো মা’কে বলেই বসেন- তোমার ছেলের মাথা ভালো না। ওকে ভালো মাস্টার দাও। ইংরেজি মাধ্যমে দিলে না, ওতো আমাদের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে মিশতেই পারবে না। মা অবশ্য ওদের এই কথাকে পাত্তা দেন না। সবসময় একই কথা বলেন- আমার রূপম হবে ওর নিজের মতো। কারো মতো হবার ওর দরকার নেই।
ছোটচাচা আবার সিগারেট ধরিয়েছেন। মায়ের ওই কথাটা মনে পড়ায়, এখন আর এই ধোঁয়াতেও কষ্ট হচ্ছেনা। ইচ্ছে করছে দৌঁড়ে গিয়ে মায়ের আচঁলে মুখ লুকাতে। ও জানে, তখন চোখ আর জ্বালা করবেনা। মুছে যাবে নোংরা ধোঁয়া। সেই সঙ্গে এইসব কটু কথাগুলোও। আমি যা হতে পারি, তা-ই হতে চাই। আহা, কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে।