তুষার আবদুল্লাহ > ছোটদের মনবাড়ি >> তুর্যের জন্য স্পর্শ

0
276

ছোট্ট শিশু তুর্য। বাবা বাড়িতে নেই, মা-ও নেই। একা একা কাটে তার দিন। একদণ্ড স্থির থাকে না। বাড়িময় ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু কেন? কী যেন ঘটছে তার জীবনে? কী সেটা? তুর্যর এই রহস্যপূর্ণ আচরণেরই গল্প এটি। কিন্তু আবার গল্পও নয়। 

কলবেল বাজাতেই দরজা খুলে দিলেন তিনি। এক মুহূর্ত তাকিয়ে দৌঁড়ে চলে গেলেন ভেতরের ঘরে। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই তিনটি সাইকেল পড়ে আছে স্তূপ হয়ে। হলুদ দুই চাকার নিচে নীল-সাদা স্কুটি, তার নিচে লাল প্লাস্টিকের আরেকটি সাইকেল। কোনটির চাকা আছে কোনটির নেই। হলুদ সাইকেলের সিট আছে, বাকি দুটোর সিট ভাঙা। পাশে পরিত্যাক্ত ল্যান্ড-টেলিফোন। টেলিভিশন থেকে ভয়ঙ্কর শব্দ ভেসে আসছে। কার্টুন চলছে ছোটদের টেলিভিশনে। ভেতর থেকে দৌঁড়ে এলেন তিনি। তাকে দেখে সোফায় বসলাম। আমার দিকে তিনি ফিরিয়েও তাকালেন না। রিমোট হাতে নিয়ে শব্দ বাড়িয়ে দিলেন। তারপর শুয়ে পড়লেন বিছানায়। একের পর এক চ্যানেল বদলে যাচ্ছেন। তারপর টেলিভিশনের পর্দায় ঝিরঝির চলে এলে দেয়ালের দিকে ফিরে শুলেন।
আমি তাকে বললাম- কি নাম আপনার? তিনি আমার কথার কোন উত্তর দিলেন না, ফিরেও তাকালেন না। এবার বালিশে উপুর হয়ে শুলেন। উঠে গিয়ে কাছে বসি- বাসায় নেই কেউ? উপুর হওয়া অবস্থাতেই বললেন- জানিনাতো। জানতে চাইলাম – কি নাম আপনার? বললেন- গাজর। অবাক হয়ে বললাম- বাহ, খুব সুন্দর নামতো আপনার। এবার তাকালেন আমার দিকে- তোমার নাম হলো, বেগুন। আমি ওর হাত ধরে বলি খুব সুন্দর নাম দিয়েছো তো। জানতে চাই আবার- বাবা, মা কোথায়? উঠে বসে সাইকেলগুলো ওঠাতে থাকে একের পর এক। তারপর বলেন- জানি না। লাল প্লাস্টিকের সাইকেলটা তুলে দেয়ালের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। সাদা, নীল স্কুটি দাঁড় করানোর পর দেখলাম, যন্ত্রপাতি খুলে কঙ্কাল করে রেখেছে। লাথি দিয়ে স্কুটি দূরে সরিয়ে দিলেন। হলুদ সাইকেলে উঠে বসলেন, তারপর নিজেই গড়িয়ে ছিটকে পড়লেন। চিৎকার দিয়ে বললেন- ‘অ্যাকসিডেন্ট’। আমি গিয়ে ওনাকে ওঠানোর চেষ্টা করি। রেগে গেলেন-তুমি আমাকে ধরছো কেন? ছাড়ো, বোকা কোথাকার। বললাম- চলো, তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। আরো রেগে গেলেন তিনি – আমাকে ধরছো কেনো তুমি? বললাম- ভালোবাসি তোমাকে। উঠে পড়লেন তিনি। জানালা বেয়ে উঠে বললেন- দেখো স্পাইডারম্যান। ধ্বংস তুমি। বলেই ঝাঁপ দিয়ে পড়লেন বিছানায়।
ভেতরের ঘর থেকে তার নানু এলেন- তুর্য আসো ভাত খাইয়ে দেই। নানু আমাকে দেখে অবাক- কখন এলে? জানালাম অনেকক্ষণ হয়েছে। নানু’র সঙ্গে ভাত খেতে গেলেন না তিনি। মেঝেতে ডিগবাজি খেতে লাগলেন। নানু বললেন- ভাত খাওয়াতে দুই বেলা শেষ। বললাম- বাবা-মা ফেরেন কখন? নানু জানান- সময়ের ঠিক-ঠিকানা নেই। একেকদিন একক সময়। জানতে চাই- সারাদিনের সঙ্গী আপনি? তুর্জ ডিগবাজি দেয়া শেষ করে এখন মেঝেতেই চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। নানু বললেন- আমি আর কতোটুকু সঙ্গ দিতে পারি? সংসারও সামলাতে হয় আমাকে। বললাম- মা-বাবাকে কতোটুকু পায়? নানু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন- কোন কোন দিন ওরা যখন ফেরে, তখন তূর্য থাকে ঘুমে। তুর্য উঠে এসে আমার কপালের সঙ্গে কপাল ঘষে- তোমার বুদ্ধি নেই। একটু দিয়ে দিলাম। আমি জড়িয়ে ধরি ওকে।… ছাড়ো বলে দৌঁড়ে চলে যায়। নানু বলেন – কতো বলি স্কুলে কি করো বলো। কিছুই বলে না।
তুর্য পরিত্যাক্ত ল্যান্ডফোন তুলে নম্বর ঘোরাতে থাকে। তারপর বিরক্ত হয়ে বলে- ধরছেই না-তো। জানতে চাই- কে ধরছে না? তুর্য বিরক্তি নিয়ে বলে- বাবা। ধরেই-না ফোন। নানু আমার জন্য চা নিয়ে এলেন- ফোনে ফোনে খোঁজ খবর চলে। ক্যামেরায় কথা হয়। কিন্তু তুর্য ভিডিওকলেও কথা বলতে চায় না। তুর্যকে বললাম- বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলবে, ফোন দেবো? তুর্য যেন কথা কানে তুললো না। উল্টো আমার কাছেই জানতে চাইলো-অফিসে তুমি কি করো? ওকে বলি- কাজ করি। তুর্য জানতে চায়- বাবার চেয়ে কম কাজ? মায়ের চেয়েও কম? কোন উত্তর দিতে পারি না আমি। তুর্য আবার ল্যান্ডফোনে ডায়াল করতে থাকে, ওপ্রান্তে বুঝি কেউ ফোন ধরলেন- হ্যালো মা? কখন আসবে তুমি, রাস্তায় অনেক জ্যাম? কই আমি দেখতে পাচ্ছিনা-তো।“ধুর খালি মিথ্যে কথা বলে…।” তুর্য ফোন রেখে দেয়। ওর মুখে ‘মিথ্যে কথা বলে’, কথাটি শুনে আমি অবাক। নানু বুঝি লজ্জা পেলেন। উনি বললেন- বাবা-মায়ের স্পর্শ কি নানু-দিদু দিতে পারে বাবা?
তুর্য আশপাশে নেই। আমি খাবার ঘরে উঁকি দিলাম। নেই তুর্য। শোবার ঘরে গিয়ে দেখি মেঝে, বিছানায় ছবি আঁকার খাতা পেন্সিল ছড়ানো-ছিটানো। একটি ছবির খাতা তুলে নিলাম। পাতায় পাতায় নীল রঙের ছোপ। কোনটাতে জলরঙ, কোনটাতে মোমের পেন্সিলের দাগ। কোন ছবির কোন অবয়ব নেই। নীল রঙ কি তুর্যের প্রিয় রঙ? তুর্যকে খুঁজতে বারান্দায় গিয়েও ওকে পাওয়া গেলো না। নানু বাথরুমে খোঁজ করলেন। তুর্য নাকি কখনও কখনও বাথরুমে গিয়ে কমোডে খামোখাই বসে থাকে, কল ছেড়ে দিয়ে। হর্ঠাৎ শোবার ঘরের পর্দার আড়ালে দুটো পা দেখতে পেলাম। কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দেখি জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে ও। রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছ তুর্য। পেছন থেকে বললাম – কি দেখছো? তুর্য কথা বলে না। আবার বলি- কি দেখছো? তুর্য রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলে- বোকা নাকি? জানতে চাইলাম- কেন? তুর্য ফিরে তাকায়- মা। বললাম – কেন? তুর্য জানালার কাছ সরে এসে রঙের খাতা নিয়ে বসে পড়ে- নীলরঙ পেন্সিল নিয়ে কী যেন আঁকতে থাকে। বললাম- কি আঁকছো? তুর্য রঙের খাতার ওপর শুয়ে পড়লো- বোকা নাকি? আমি এখন ঘুমাবো।