তুষার আবদুল্লাহ > জেরিনকে কেন সন্দেহ করবে? >> ছোটদের মনবাড়ি

0
164
আমরা অভিভাবকরা কি ছোটদের মনটাকে বুঝতে পারি? কী ঘটে তাদের জীবনে, কী আমাদের করা উচিত- সংকটের মুহূর্তে? তুষার আবদুল্লাহ তীরন্দাজ-এ সেই গল্পগুলোই বলছেন যে গল্পগুলি ছোটদের জীবনে ঘটছে, কিন্তু জানা দরকার বড়দের। নিয়মিতভাবে বেরুচ্ছে ছোটদের জীবনের নানান সংকটের গল্প, পড়ুন তীরন্দাজ-এ আর ভাবতে চেষ্টা করুন, অভিভাবক হিসেবে কী আপনাদের করণীয়। আজকে পড়ুন জেরিনের জীবনের বিশেষ এক সংকট-মুহূর্তের গল্প।

জেরিনকে কেন সন্দেহ করবে? >> শিশুমনস্তত্ত্ব

জেরিন ভেবেছিল বাবা, মা ওর ব্যাপারটা বুঝতে পারবে। কিন্তু দুজনের কেউই ওর কথা শুনতে চাইছেনা। তারা ধারণা নিয়ে বসে আছে জেরিনও মাদকাসক্ত। বাবা, মা ওকে বুঝতে চাইছে না বলে পাপিয়ার পাশে দাঁড়ানোর সম্ভব হচ্ছে না ওর পক্ষে। এই সময়টায় পাপিয়ার পাশে বন্ধুদের থাকা প্রয়োজন। যতো দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এমনটাই তো বলছিল নুসরাত সেদিন। নুসরাতের বোন ডাক্তার। ওনার সঙ্গে পরামর্শ করে নুসরাত জানিয়েছে জেরিনকে।পাপিয়াদের বাসায় ওদের বন্ধুদের যাতায়াত প্রায় নিয়মিত। ঈদ, জন্মদিন ছাড়াও খালাম্মা বিশেষ কিছু রান্না করলেই পাপিয়ার বন্ধুদের দাওয়াত করেন। বলা যায় সকাল-সন্ধ্যা সেদিন কাটিয়ে দেয় ওরা পাপিয়াদের বাসায়। ওদের বাসায় সারাদিন সময় কাটাতে গিয়ে একদিনের জন্যও মনে হয়নি পাপিয়া মাদক নেয়। ছেলে বন্ধুদের এক দুইজন লুকিয়ে বারান্দায় গিয়ে সিগারেট ধরাতে চাইলেও, পাপিয়াই কড়াভাবে তাদের শাসন করেছে। সিগারেট কেড়ে নিয়ে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলেছে। সেই মেয়েটিই কিনা জড়িয়ে পড়েছে নেশার সঙ্গে? ভাবতেই পারছিল না প্রথমে খবরটা জেনে।
স্কুলে বেশ কিছুদিন পাপিয়াকে দেখে ক্লান্ত মনে হতো। চোখের নিচে কালো দাগ। চেহারাটা একদম ভেঙেচুরে যাচ্ছিলো। ওরা ভেবেছিল রাত জেগে পড়ে পাপিয়া। ডায়েট করতে গিয়ে হয়তো শরীরের এমন হাল করেছে। খালাম্মাও বলছিল একদিন – তোমার বান্ধবী রাত জেগে পড়ে, আবার খাওয়া দাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে। এভাবে চললে পরীক্ষার কি হবে? সত্যিতো পরীক্ষা কাছাকাছি চলে এলো পাপিয়া অসুস্থই হয়ে পড়তে পারে। জেরিন বেশ কয়েকদিন ওকে না করেছে বেশি রাত করে না পড়তে। খাওয়া-দাওয়াও যেন করে ঠিক মতো। এসব কথায় পাপিয়া শুধু শুকনো করে হেসেছে। খালাম্মা একদিন ফোন করে বললেন – বাড়িতে যতক্ষণ থাকে ও দরজা বন্ধ করে থাকে। কারো সঙ্গে কথা বলে না। কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে। জেরিন অন্য বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টা নিয়ে। বন্ধুদের অনেকের সঙ্গেই ও যোগাযোগ, কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে জানা গেল। রাইয়ান শুধু জানাল, কোচিংয়ের পর একটি অপরিচিত ছেলের সঙ্গে জেরিনকে কখনও রিকশায়, কখনও মোটর সাইকেলে দেখা যায়। জেরিন, নুসরাত আর তন্ময় ঠিক করে আগে ওই ছেলেটির পরিচয় জানতে হবে। কারণ ওদের স্কুলের ছেলে ও নয়। এমনকি ওকে কোচিং করতেও দেখা যায় না। তন্ময় কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে পাপিয়া আর ওই ছেলেটির পিছু নিয়েছিল। দেখা গেছে একটি অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ওরা ঢুকে পড়ে। বেশ অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট। ওর ওই অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে ছেলেটির নাম জাফর। আর কোন তথ্য দিতে চায়নি তারা। নিরুপায় বন্ধুরা শুধু জেরিনকে দূর থেকে অনুসরণ করে যায়।
একদিন ভোরের দিকে খালাম্মা ফোন করলে ভয় পেয়ে যায় জেরিন। খালাম্মা জানান পাপিয়া কেমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে।  খিঁচুনি দিয়ে  উঠছে পুরো শরীর। খালাম্মা ভয় পাচ্ছেন। জেরিন ফোন দিয়ে নুসরাতকে ঘটনাটা জানায়। নুসরাত ওর বোনের মাধ্যমে জেরিনকে হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করে। হাসপাতালে ডাক্তার প্রথম দেখাতেই জানায় পাপিয়া মাদকাসক্ত। বজ্রপাতের মতো শোনালো কথাটা। পাপিয়ার পুরো পরিবার স্তম্ভিত। লজ্জায়, অপমানে যেন তাদের মুখ লুকানোর জায়গা নেই। কী জানি মুখ লুকানোর জায়গা খুঁজতেই তারা উধাও হয়ে গেল কিনা। কারণ ওই ভোরের পর থেকে তাদের কেউ আর হাসপাতালে পাপিয়াকে দেখতে আসেনি। নুসরাতের বোন আর পাপিয়ার বন্ধুরাই আছে ওর পাশে। যতদূর ওর কাছ থেকে জানা গেছে, জাফরের সঙ্গে পাপিয়ার পরিচয় ফেইসবুকের একটি গ্রুপে। এটা যে একটি মাদকাসক্তদের গ্রুপ এটা পাপিয়ার জানা ছিল না। জাফরের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার পর ও বুঝতে পারে ব্যাপারটা। ততদিনে ও নিজেও মাদকের নীল নেশায় ডুবে যেতে শুরু করেছে। বাড়ির সবচেয়ে উচ্ছ্বল মেয়েটি ধীরে ধীরে একলা হয়ে যেতে থাকে। স্কুলের পড়ালেখা, কোচিং কিছুতেই যেন নেই ও। পাপিয়া এখন বলে – কেউ যদি আমাকে বলতো এসে থামো। কেউ বলেনি। আমি দূরে সরে যাচ্ছিলাম যখন, তখন বাবা, মা পরিবারের সবাই যেন একইরকমভাবে দূরে সরে যেতে থাকে। আমার বন্ধুরাও কেউ কাছে এসে বললো না – পাপিয়া এটা ঠিক হচ্ছে না। জাফরের বাড়ির সবাই জানতো ও নেশা করে। কই আমাকে তো একবারও ওই বাড়িতে ঢুকতে বাধা দিলো না। জেরিনরা বুঝতে পারে পাপিয়া প্রচণ্ড অবসাদ, বিষন্নতা থেকে কথাগুলো বলছে। জীবনের একটি কঠিন ও কষ্টকর জায়গায় পৌঁছে হয়তো ভুল বুঝতে পারছে। কিন্তু সেই ভুলের দায় নিজের ওপর নেবার  মতো মানসিক শক্তি ওর নেই। তাই আশপাশের মানুষদেরকেই দায়ী করে যাচ্ছে। একদম ভুলও হয়তো করছে না ও। কারণ মেয়ের এমন বিপর্যস্ত সময়ে মা-বাবা কেমন করে দূরে থাকে?
জেরিন নিজের কথাও ভাবে। ও নিজেও কি খুব ভালো আছে?  পাপিয়ার কথা শোনার পর থেকে ওর পরিবারও জেরিনকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। ভাবছে পাপিয়ার যাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, জেরিনেরও সখ্য ছিল ওদের সঙ্গে। হয়তো কখনো নেশার স্বাদ জেরিনও নিয়েছে। এই সন্দেহ থেকেই ওর বই খাতা, ঘর সব তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালানো হলো। ঘরে নেশার কিছু লুকানো আছে কিনা। কোন ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কিনা। জেরিনকে একপ্রকার গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। আপাতত স্কুল, কোচিং বন্ধ। বন্ধুদের কোন ফোনও ওকে দেয়া হচ্ছে না। জেরিন জানে না পাপিয়ার সর্বশেষ কি অবস্থা। তারচেয়েও জেরিনের অভিমান ও লজ্জা বাবা, মায়ের প্রতি। তারা নিজের মেয়ের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেললো কেন। জেরিনকে বাবা মা বিশ্বাস করছে না, এটা ওর জন্য অপমানের। জেরিন বাবা-মাকে বারবার বোঝাতে চেয়েছে তোমরা পাপিয়ার অভিভাবকদের মতো করো না। পাপিয়া বিপদে আছে, চলো আমার সঙ্গে তোমরাও ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াও। ওর অনুরোধে সাড়া দেয়নি বাবা-মা। জেরিন ভাবে – কষ্টের সময়ে, ভুলের সময়ে বাবা-মা পাশে না থাকলে, আমাদের বাঁচাবে কে,  ওরা কি চায় আমরা অন্ধকারে তলিয়ে যাই?