তুষার আবদুল্লাহ > ঝংকারদের কি দেয়া যায় না  স্বাভাবিক জীবন? >> ছোটদের মনবাড়ি

0
196

ঝংকারদের কি দেয়া যায় না  স্বাভাবিক জীবন?

বড় আপা,

আমি বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। অঙ্কুর থেকেই এই বিদ্যালয়ে পড়ছি। আমার ছোট ভাই ঝংকার মায়ের সঙ্গে আসে আমাকে নামিয়ে দিতে এবং নিয়ে যেতে। বিদ্যালয়ের খোলামেলা পরিবেশ। বড় বড় জানালা। চওড়া সিঁড়ি ওরও খুব পছন্দ। আমরা যখন দলবেঁধে ব্রতচারী গান গাই, তখন ও আমাদের সঙ্গে ঠোঁট মিলাতে চায়। মেঝেতে বসে আমরা টুলে বইখাতা রেখে যেভাবে পড়ি, বাড়িতে গিয়ে ও সেইভাবে বই নিয়ে পড়তে বসে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে চায়। কোথাও গানের শব্দ শুনলে দাঁড়িয়ে নেচে ওঠে। আমি যখন স্কুলের জন্য তৈরি হতে থাকি, তখন ও নিজের জামা কাপড় বের করতে থাকে। মাকে ইশারায় বলে, আমার সঙ্গে স্কুলে আসবে। আমার ছুটির সময়টাও বুঝতে পারে ও। মায়ের আগে তৈরি হয়ে যায়। তাড়া দেয় বের হওয়ার জন্য। দরজার কাছে ওকে আটকে রাখা যায় না। ভেতরে আসবেই ও। বড় আপা, তুমি বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, আমাদের ছবি আঁকা প্রদর্শনীতে যেদিন প্রথম ওকে বিদ্যালয়ের ভেতরে নিয়ে আসি, ঐ দিন থেকেই ওর বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাই আমরা। বাসায় কারো কথা বা ইশারায় ও খুব একটা সাড়া দিত না। জেদ ধরে থাকতো নানা বিষয়ে। খেতে চাইতো না। ঘুমাতেও সময় নিত। এখন ও সবার কথায় সাড়া দেয়। জেদ করে না আগের, মতো। মুখ হাসি থাকে। তবে যদি বিদ্যালয়ে কোনদিন ওকে রেখে চলে আসি, সেদিন ওর জেদ বেড়ে যায়। বড় আপা, ঝংকারকে এখন স্কুলে দেয়ার সময় হয়েছে। কয়েকটি স্কুলে ওকে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেছে মা-বাবা। কিন্তু ওকে নিতে চাচ্ছে না। আমি মনে করি, যদি আমাদের বিদ্যালয়ে ওকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে আমার ভাই সুস্থ হয়ে উঠবে ধীরে ধীরে। আনন্দে থাকবে। একই বিদ্যালয়ে পড়াতে ভাইর দেখাশোনাও করতে পারবো আমি। বড় আপু, আমাদের বিদ্যালয়তো অন্য সব স্কুলের চেয়ে আলাদা। এই সুযোগটুকু কি আমরা ঝংকারকে দিতে পারি না?’
রোদেলা এমন একটা চিঠি বড়আপাকে লিখেছিল। ঝংকারকে নিয়ে ওর চিন্তার শেষ নেই। বাবা-মায়ের চেয়েও হয়তো একটু বেশিই ভাবে ভাইকে নিয়ে। ঝংকার যখন ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল, তখনই ওরা বুঝতে পারে ঝংকারের বিকাশ স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে না। মা মুষড়ে পড়েন। বাবাও তাই। প্রতিবেশী, আত্মীয়রা এসে মা-বাবাকে মানসিক শক্তি দেয়ার চেয়ে, এই ছেলেকে নিয়ে ভবিষ্যতে আর কী কী বিপদ হতে পারে, সেই ফিরিস্তি ধরিয়ে দিয়ে যান। ঝংকার যে বিশেষ শিশু, এটা যেন কেউ বুঝতে না পারে সেই টিপস দিয়ে যেতে থাকে। কেউ কোন দাওয়াত দিলে, আগেই ইশারা ইঙ্গিতে বলে রাখে ঝংকারকে যেন নিয়ে না যাওয়া হয়। ওদের বাড়িতে যারা বেড়াতে আসে, তাদের বেশিরভাগই ছেলে-মেয়ে সঙ্গে নিয়ে আসে না। বাবু হবে যাদের, তারা তো এবাড়িতে ভয়ে আসেই না। ঝংকারকে নিয়ে একরকম লুকিয়েই আছে ওরা। ঝংকারের দিকে তাকিয়ে মা, বাবা প্রায়ই কাঁদে। রোদেলা যতোক্ষণ বাড়িতে থাকে, নিজের পড়ালেখার বাইরের সময়টুকু ভাইয়ের জন্যই রাখে। স্কুলে যাওয়ার বয়স হবার পর থেকে, বাবা-মা ঝংকারের জন্য বিশেষ শিশুদের স্কুলই খোঁজ করছে। বাসার কাছাকাছি এমন স্কুল খুব একটা নেই। দূরে বা একটু কাছের যে স্কুলগুলো পাওয়া যাচ্ছে, তার খরচও বেশি। বাবা-মায়ের ওপর চাপ বাড়বে। শুধু স্কুলের খরচতো আর না, ঝংকারের চিকিৎসাসহ অন্য খরচও আছে। বাড়িতে যখন ঝংকারকে স্কুলে দেয়া নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছে, দুঃশ্চিন্তা বাড়ছে সুবিধামতো স্কুল না পেয়ে। তখনই রোদেলাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আঁকা ছবির প্রদর্শনী হয়। সুযোগ ছিল অভিভাবকসহ পরিবারের লোকজনদের দেখার। সেখানেই নিয়ে আসা হয় ঝংকারকে। এবং মূহূর্তেই বদলে যেতে থাকে ঝংকার।
তখন থেকেই রোদেলার ভাবনায় আসে বিশেষ শিশুদের বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের চেয়ে সাধারণ স্কুলে দেয়া ভালো। বিশেষ স্কুলের সব কিছুতেতো বুঝিয়ে দেয়া হয়, ওরা সবার চেয়ে আলাদা। তাই ওদের অন্যভাবে বেড়ে উঠতে হবে। কিন্তু সাধারণ স্কুলে দিলে, ওরা আর নিজেদের আলাদা বা বিচ্ছিন্ন ভাববে না। রোদেলার মতে, যারা ওর ভাইয়ের দিকে এখন করুণার চোখে তাকায়, সাধারণ স্কুলে পড়লে এই তাকানোটাও বদলে যাবে। পত্রিকা, অনলাইনে ভাইয়ের চিকিৎসা, ওকে কীভাবে স্বাভাবিক রাখা যায় এ নিয়ে পড়াশোনা করছে। টিভি থেকেও অনেক তথ্য জানছে। এই জানাশোনা ওকে আরো বিশ্বাস করিয়েছে, সাধারণ স্কুলে সবার সঙ্গে পড়তে পারলে ঝংকার আরো ভালো থাকবে। বিশেষ শিশুদের যত্ন ও পড়ালেখার বিষয়ে এক-দুইজন শিক্ষাকর্মী থাকলেই হলো। রোদেলা চায় ঝংকার একা নয়, ও ভর্তি হতে পারলে ওর মতো আরো শিশু ওদের স্কুলে ভর্তি হতে পারবে।
রোদেলাদের বিদ্যালয় অন্য স্কুলের চেয়ে আলাদা বলেই, বিশ্বাস ছিল বড় আপা ওর চিঠিতে সাড়া দেবেন। অপেক্ষা করতে থাকে ও। প্রতিদিনই বড় আপার অফিস ঘরের সামনে দিয়ে ঘুরে আসে। বড় আপা ওদের একটা ক্লাসও নেন। রোদেলাকে দেখেও কিছু বলেন না। বড় আপা কী ভুলে গেলেন? এদিকে বিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিও শেষ হয়ে আসছে। রোদেলা মা–বাবাকে ভরসা দিয়েছে, বড় আপা ওর কথা রাখবেই। ওদের বিদ্যালয়ে যদি ঝংকাররা ভর্তির সুযোগ না পায়, তাহলে অন্য কোন সাধারণ স্কুলে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বড় আপা কিছু বলছেন না দেখে রোদেলা নিজেই গেল জানতে। বড়আপা ওকে দেখে প্রথমে মনে করতে পারলেন না কিছু। পরে ফাইল ঘেঁটে বের করলেন রোদেলার সেই চিঠি। বড় আপার মুখে হাসি দেখে রোদেলা আশ্বস্ত হয়। বড় আপা বুঝি ওর দাবি মেনেই নিচ্ছে। না, বড় আপা হাসিমুখেই জানালেন- ঝংকার অন্য শিক্ষার্থীদের যন্ত্রণা দেবে। ওকে দেখে কেউ কেউ ভয় পেতে পারে। অন্য অভিভাবকরা মেনে নেবেন না। তাই ঝংকারকে ভর্তি করা যাচ্ছে না। বড় আপা, রোদেলাকে বললেন, ঝংকারকে ভর্তি করতে যে রাজি হলো না এই বিদ্যালয়, একথা যেন কাউকে না জানায় ও।
বড় আপার কথা রাখা গেলো না। ক্লাসে ফিরে ঠিকই বন্ধুদের জানাল। রোদেলা এও জানাল, ঝংকার যদি এই বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারে, তবে সেও এই বিদ্যালয় ছাড়বে। যে-বিদ্যালয় সমাজের সব শিশুর জন্য না, সব শিশুকে ভালোবাসতে, শিক্ষা দিতে তৈরি নয়, ঐ বিদ্যালয়ে রোদেলা পড়বেনা। বন্ধুরা ওকে বলে, বিদ্যালয় ছেড়ে গেলে চলেই গেলি। বিদ্যালয়ও বেঁচে গেল। ওরা সবাই বসে গেল কাগজ আর রঙ নিয়ে। লিখে ফেললো- বিদ্যালয়ে ঝংকারকে চাই। ঝংকাররাও হোক আমাদের সহপাঠী। বড় আপার অফিস ঘরের সামনে গিয়ে ওরা এই পোস্টার নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। বড় আপা ওদের দেখে
দরজা বন্ধ করে চলে যান । ওরা ঠিক করে প্রতিদিন টিফিনের সময় আঁকা ছবি নিয়ে ওরা বড় আপার ঘরের সামনে দাঁড়াবে, যতদিন ঝংকারকে ভর্তি করা হবে না ততদিন প্রতিবাদ চলবেই।