তুষার আবদুল্লাহ > রশ্নি, অন্যের মেয়ে >> মনস্তত্ত্ব

0
196

মনবাড়ি

সামনের বাসার রান্না ঘরের ঘুলঘুলিতে বসে আছে কবুতর। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়েছে তাই কবুতরের শরীর ভেজা। ছাইরঙা শরীরে বৃষ্টির ফোঁটা জ্বলজ্বল করছে আলোতে।  মাগরিবের আজান পড়তেই ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে আলো জ্বলে উঠেছে। এই সময়টায় প্রতিদিন রশ্নি বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। কবুতরও এই সময়টায় ঘরে ফেরে। কোন কোন দিন উড়ে এসে  বসে এদিকের বারান্দার মাধবীলতার ডালে। ইচ্ছে হয় কবুতরটাকে ধরতে। হাত বাড়িয়েও গুটিয়ে নেয়। কী জানি কে কোথাও থেকে দেখে ফেলে নাকি। দেখলে আবার বকা শুনতে হবে। মাধবীলতা তুলে নিয়ে নাকফুল বানাতে ইচ্ছে হয়। একই ভয়, যদি কেউ দেখে ফেলে। মচকে দেয় হাতটা।  আরো আধঘণ্টা এভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ওকে। ভেতর থেকে ডাক আসবে। তারপর গিয়ে পড়তে বসবে খাবার ঘরের মেঝেতে। এই বাড়িতে পড়তে ইচ্ছে করে না ওর। যতোক্ষণ থাকে ততোক্ষণ বই খুলে বসে থাকে। বইয়ের পাতায় চোখ রাখে না। কিছু করার নেই। মাকে চাকরিটা করতে হচ্ছে। বাবা-মা দুজনেই অফিস থেকে ফেরেন রাত দশটার দিকে। এসে ওকে বাসায় নিয়ে যাবে। কোনদিন মা এসে নিয়ে যায়, কোন দিন বাবা। স্কুল থেকে এই বাসাতেই ফেরে রশ্নি। ওর বন্ধু রাফিয়াদের বাসা। রশ্নি বাসায় একা থাকবে,  গৃহকর্মীদের কাছে একা থাকা ঠিক নয়, এমন কথা বলেই রাফিয়ার আম্মু  রশ্নি’র বাবা-মা না ফেরা পর্যন্ত এ-বাসাতেই থাকার প্রস্তাব দেন। রশ্নি’র মা–বাবা যেন  এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন, প্রথম প্রস্তাবেই রাজি হয়ে গেলেন।

প্রথম যেদিন রাফিয়ার সঙ্গে স্কুল থেকে এ-বাসায় এলো, সেদিন সন্ধ্যের সময়ই মনখারাপের মতো ঘটনা ঘটলো। খাবার ঘরের চেয়ারে বসা ছিল রশ্নি। ওকে বলা হলো মেঝেতে বসে পড়তে। ও অবাক হয়ে রাফিয়ার আম্মুর দিকে তাকিয়ে  ছিল।  তার চোখে কঠোরতা। রশ্নি চেয়ার থেকে মেঝেতে নেমে আসে। সন্ধ্যায় রাফিয়া আর ওর ভাইকে কমলার জুস করে  দেয়া হলো, সঙ্গে স্যান্ডুইচ। রশ্নি স্বাভাবিক ভাবেই ধরে নিয়েছিল বন্ধুর মতো ওকেও একই খাবার দেয়া হবে। কিন্তু না, দেয়া হলো না। ওকে আর এই বাসার গৃহকর্মীকে দেয়া হলো মুড়ি চানাচুর। রাফিয়ারও ব্যাপারটা ভালো লাগেনি মনে হয়। ও খাবার টেবিল থেকে উঠে ভেতরে চলে যায়। পরদিন স্কুলেও রাফিয়া কথা বলেনি রশ্নির সঙ্গে। রশ্নির কাছ থেকে দূরে সরে থেকেছে। স্কুল থেকে ফেরার সময়ও চুপচাপ ছিল। রাফিয়ার মা প্রতিদিনই স্কুল থেকে ওদের  নিয়ে আসার সময় মেয়েকে কিছু না কিছু কিনে দেন। কোনদিন রশ্নির হাতে কিছুই তুলে দেন না । রশ্নি বুঝে রাফিয়ার পছন্দ হয় না ব্যাপারটা। সন্ধে বেলায় প্রতিদিনই রাফিয়া আর ওর ভাইকে নাস্তা দেয়া হয়। জুস-হরলিকস, স্যান্ডুইচ , পাস্তা, পিজ্জা। এসব খাবার রশ্নির জন্য নয়। হোটেল থেকে আনা পুরি বা মুড়িমাখা ওর জন্য বরাদ্দ। রশ্নি দেখে  মায়ের এই আচরণে ওর চেয়েও বেশি কষ্ট পায় রাফিয়া। তাই সন্ধে হলে রশ্নি চলে আসে বারান্দায়। কিছু খায়ও না এখন। একবার না করলে রাফিয়ার আম্মু আর সাধাসাধি করেন না। দুপুরের ভাত খাওয়ার মতোই। ডাল আর সবজি দিয়ে খাবার সেরে নেয় ও। অন্যদের পাতে মাছ, মাংস ওঠে। রাফিয়ার মা কেন এমনটা করেন বুঝতে পারেনা রশ্নি।

রশ্নি জানে, ঘড়ি কাঁটা আটটা পেরোতে না পেরোতেই রাফিয়ার আম্মু পাল্টে যেতে থাকবেন। ওকে চেয়ারে উঠে বসতে বলবেন। ওর সামনে চলে আসবে থালা ভরতি বিস্কুট। কখনো ফল। রশ্নির বাবা কিংবা মা এসে এমনটাই দেখবেন।  রাফিয়ার মায়ের মুখে প্রায় একই অভিযোগ- আপনার মেয়ে কিছুই খেতে চায়না। এতো লাজুক কেন ও? কোন রকম ভাতটা খাওয়াতে পারি একটু। রোজকার মতো রাফিয়ার আম্মুর প্রতি বাবা-মায়ের কৃতজ্ঞতা দেখে ভেতরটা কেঁদে ওঠে রশ্নির। কখনও কখনও তাচ্ছিল্যের হাসি চলে আসে। কিন্তু ও জানে পরদিনই আবার স্কুল থেকে এ-বাসাতেই ফিরতে হবে। মা মাঝে মাঝে নিজের মতো করেই বলেন- রাফিয়ার আম্মু তোমাকে অনেক আদর করে। একদম নিজের মেয়ের মতো করে রাখে। এ-কথাটা তিনি গর্ব করে, সরল মনে প্রতিবেশী, আত্মীয় পরিজনদের কাছেও বলেন। কৃতজ্ঞতায় বাবা-মা প্রায়ই রাফিয়া আর ওর ভাইয়ের জন্য খেলনা বা খাবার নিয়ে আসেন। এবার ঈদে যেমন রাফিয়ার মাকে উপহার দেয়া হলো সুন্দর একটা শাড়ি। রশ্নির কোন কোন দিন বলতে ইচ্ছে করে, মা, তোমরা ভুল করছো। বাবা, তোমরা মিথ্যে জানো। বলা হয় না। ইচ্ছে হয় না বিশ্বাস ভেঙে দিতে। রাফিয়ার মায়ের ভরসাতেই না মা চাকরি করতে পারছেন। না হলে চাকরি ছেড়ে মাকে বাসায় বসে থাকতে হবে। হয়তো এখন যে বাসাতে আছে, সেই বাসা ছেড়ে দিতে হবে। মা চাকরি নেয়ার পরই না ওরা তিন-ঘরের বাসায় উঠে আসতে পেরেছে। নামকরা স্কুলে ভর্তির সাহসটাও মা চাকরি নেবার পরই। ছুটির দিনে ঘুরতে যাওয়া, বাইরে খাওয়া সবই বেড়েছে মায়ের চাকরির পর। এই আনন্দের বেলুন ফুটো করে দিতে চায়না ও।

কবুতর ঘুলঘুলির ভেতরে চলে গেছে। বিশ্রাম নেবে হয়তো। ওর আজ ক্লান্ত লাগছে। পরীক্ষা শেষ করে আসতে আসতে ঘুম পেয়েছিল। দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমিয়েই পড়েছিল। রাফিয়ার আম্মু ভাত খাওয়ার জন্য ধাক্কা দিয়ে তুলে দেন। ঘুমের ঘোর কাটেনি এখনো। কালকে শেষ পরীক্ষা। ফিজিক্স বইতে চোখ রাখতেই ইচ্ছে করছে না। ঘুমে ঢলে পড়বে হয়তো। মা-বাবা যে কখন নিতে আসে। খাবার ঘরে এসে টেবিলে পাশে বসে পড়লো দেয়ালে হেলান দিয়ে। রাফিয়া আর ওর ভাই পড়ে ভেতরে শোবার ঘরে। ফ্ল্যাক্স থেকে পানি খেয়ে নিলো ও। তারপর হাঁটুতে মাথা দিয়ে চোখ বোঁজে। ভেতর থেকে ভাই-বোনের পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। রাফিয়া শব্দ করে পড়ে। রশ্নিরও একই অভ্যাস। তবে সেটা নিজ বাড়িতে। এখানে শব্দ করে পড়তে বারণ। ঘুমে ঢলে পড়ছিল প্রায়। এ-সময় কানে আসে রাফিয়া ওর মাকে বলছে- আচ্ছা আম্মু, রশ্নির সঙ্গে এমন করো কেন? রাফিয়ার আম্মু জানতে চান– কেমন করি? রাফিয়া বলে- আজকেই তো আমরা খেলাম ডোনাট। আর ওকে দিলে টোস্ট বিস্কুট। কোকও দিলে না। রাফিয়ার আম্মা মেয়েকে ধমক দিয়ে বলেন- ঠিকই আছে। রাফিয়া বলে- আমার খারাপ লাগে আম্মু। স্কুল থেকে ফেরার সময় আমি আইসক্রিম খেলাম, ওকে দিলেনা তুমি। রাফিয়ার  আম্মু মেয়েকে বলেন- মন খারাপের কি আছে। তুমি তো আমার মেয়ে। ওকি আমার মেয়ে?  এতক্ষণ বাসায় রাখি এটাই তো বেশি। রশ্নি ফ্যাল ফ্যাল করে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে।