দূরের জানালা >> অনূদিত বিশ্বকবিতাগুচ্ছ >> আন্দ্রেই ভজনেজেন্‌স্কি / হেলমুট জেনকের / হেনরিক নরড্ব্রানট্

0
45

দূরের জানালা >> অনূদিত বিশ্বকবিতাগুচ্ছ

সংকলিত কবি ও অনুবাদক

হেলমুট জেনকের [অস্ট্রিয়া] >> উৎপলকুমার বসু অনূদিত
হেনরিক নরড্ব্রানট্ [ডেনমার্ক] >> প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত অনূদিত
আন্দ্রেই ভজনেজেন্স্কি [রাশিয়া] >> জিয়া হায়দার

কবিরাই কবিতার অনুবাদ ভালো করতে পারেন। বুদ্ধদেব বসু এরকমটাই বিশ্বাস করতেন। শুক্রবাসরীয় এই বিশেষ সংখ্যায় সদ্যপ্রয়াত এরকম তিনজন বাঙালি কবির অনূদিত একাধিক কবিতাগুচ্ছ প্রকাশ করা হলো। বলা বাহুল্য, আজ এই অনুবাদকদের সবাই মৃত। যে অনূদিত কবিতাগুলি সংকলিত হলো, সেই কবিতাগুলিও বিস্মৃতিতে চলে গিয়েছিল। তীরন্দাজ এই উজ্জ্বল অনূদিত কবিতাগুলিকে পুনঃপ্রকাশ করলো।

হেলমুট জেনকের >> উৎপলকুমার বসু অনূদিত

জন্ম অস্ট্রিয়ায় ১৯৪0 সালে। পেশা হিসেবে একসময় ট্রাক ড্রাইভারের কাজ করেছেন। কবিতার পাশাপাশি উপন্যাসও লিখেছেন। প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে – নাম সার্কহেব্ট বা নোটবুক। ১৯৬৯ সালে পিটার হেনিশ্কের সঙ্গে মিলে ওয়েসপেন্নেস্ট নামে একটা সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। এরপর ফ্রিল্যান্স লেখক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

নোট

আমি বাগানের পরিচর্য়া করি
(আমার কোনো বাগান নেই)
এবং
ফুল তুলি
(যেগুলি আমার জন্যে প্রতিশ্রুতি)

আমি মৌচাষ করি
(আমার বাগানে)
এবং মধু বিক্রি করি,
(তাদের কাছে যাঁরা বহুদিন মৃত)

পদ্ধতি ক

কবিতায়
শব্দের ব্যারিকেডে আড়ালে আমি
লুকিয়ে থাকি
কেননা আমি সূক

পরিবর্তন

জাহাজের পুরো প্র্রপেলারটি
আজ পড়ে আছে
সেখানে বাসা বেঁধেছে পাখিরা
ওখানে একদা মৃত্যু ঘটত মাছের

সমাপ্তি

একদা একটা বাড়ি ছিল এখানে
তোমার বাড়ি ছিল ওখানে
আমাদের বাড়ি ছিল এখানে
এটা ছিল আমাদের শহর
এটা ছিল আমাদের দেশ
ওম শান্তি!

হেনরিক নরড্ব্রানট >> প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত অনূদিত

হেনরিক নরড্ব্রান্ট ১৯৪৫ সালে ডেনমার্কে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। ১৯৬৬ সালে সাহিত্যক্ষেত্রে Digte শীর্ষক কবিতাগ্রন্থের মাধ্যমে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। ২০০০ সালে তিনি স্বপ্নের সেতু কাব্যগ্রন্থের জন্যে নরডিক কাউন্সিল সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন। ২০০৭ সালে পোল্যান্ডের চিত্রশিল্পী কাসিয়া বানাস তাঁর কবিতার অনুপ্রেরণায় একটা চিত্রমালা আঁকেন।

ভোরবেলার ছোটো প্রার্থনা

পৃথিবীতে করুণ বিষয়
একটি মোম

ভোরবেলার রাতের আলোয়
যা পুড়ছে

রতিরাত্রিকে এতো সুন্দরভাবে
আলোকজ্বল করবার পর।

হে ঈশ্বর, আমাদের প্রেম
যেন কখনোই এমন না হয়।

এখন তোমাকে আর ব্যবহার করতে পারবো না

আর তোমাকে আমি ব্যবহার করতে পারি না
গোলাপ হিসেবে, আমার প্রেমের কবিতায়,
তুমি অনেক বেশি বড়ো, অনেক বেশি সুন্দর,
আর এখন একেবারেই একেবারেই তুমি নিজে।

এখন তোমার দিকে আমি তাকাতে পারি
যেভাবে লোকে তাকায় নদীর দিকে

যা খুঁজে পেয়েছে নিজের ভিৎ

আর প্রতিটি স্রোতোবিভঙ্গে, প্রতিটি মৎসে,
প্রতিফলিত প্রতিটি সূর্য়াস্তে,
যা নীলাভ তুষারগিরির মাঝখান দিয়ে গ’লে পড়ে
যা আমার, শুধু আমার, শুধু আমার,
এসবের মধ্য দিয়ে তুমি পথ ক’রে নিয়েছো ব’লে
আমি নিজেকে এখন প্রতিবিম্বিত দেখতে পারি
তোমার শান্ত বহতা সলিলে
ফুলের পাপড়ি যার ওপর ঝ’রে পড়ে

গন্ধনৌকো আর পরিত্যক্ত খনির শহরতলী
যেখানে তোমার প্রেমিকেরা রোজ মদ খেয়ে মাতাল
আর ডুবে মরে তোমার ঘোর চন্দ্রালোকে
আর তীরে ওঠে, একেবারে বিধৌত –

সেইসব প্রাচীন নগরীতে যেখানে স্বপ্নে আমাদের দেখা হতো।

আন্দ্রেই ভজনেজেন্স্কি >> জিয়া হায়দার অনূদিত

আন্দ্রেই ভজনেজেন্স্কি (১৯৩৩-২০১০) রুশ কবি। রবার্ট লাওয়েল বলেছিলেন, ‘যে কোনো ভাষার শ্রেষ্ঠ জীবিত কবি তিনি।’ গত শতকের ষাটের দশকে কবি হিসেবে তাঁর উত্থান ঘটে। একসময় ক্রুশ্চেভের দ্বারা তিনি নির্বাসিত হওয়ার হুমকি পেয়েছিলেন। কবি হিসেবে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, স্টেডিয়ামভর্তি মানুষ টিকিট কেটে তার কবিতা শুনেছেন। ড্ব্লিউ এইচ অডেনের মতো কবিও ইংরেজিতে তাঁর কবিতা অনুবাদ করেছেন। মৃত্যুর পূর্ব-মুহূর্ত অব্দি তিনি ছিলেন শীর্ষ রুশ বুদ্ধিজীবী।

ইয়েনিসেই নদীর তীরে

(ডব্ল্যু. সিয়াকিনের জন্যে)

গরমকালে সে কাজ করে কাঠের কারখানায়, আর শীতে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়
খড়-বিচালির ব্যস্ত সমারোহে। রমণীকুলের সুপ্রিয় যদি কেউ থেকে থাকে,
সে তাও।

ঠিক এই মুহূর্তে, একটা ছোট্ট টিনের পাত পালিশ করতে করতে, সে আমাদের
কোনো এক স্কুল-শিক্ষিকার সঙ্গে তার আনন্দময় অভিসার-ভ্রমণের কাহিনি
শোনাচ্ছিল। তাকে সে উত্তর দিকে নিয়ে চলেছিলো…

তখন তুষার আমাদের ঘিরে ধরে, আঘাত করতে থাকে। সে অবস্থায় একজন
মানুষ কী করতে পারে? কেবল একটি কাজই করা যায়, যখন ওই ভয়ঙ্কর ঝড় বইতে
থাকে তখন ঘুমোনোর থলির ভেতরে ঢুকে পড়া আর নিজেকে জড়িয়ে নেয়া।
এবং ঝড় নেমে না যাওয়া পর্য়ন্ত অপেক্ষা করা। কিন্তু আমাদের দুজনের কাছে
কেবল একটি মাত্র ঘুমানোর থলি ছিলো। অতএব, সে ক্ষেত্রে একজন মানুষ কী
করতে পারে? তা’ বেশ। সম্পূর্ণ থেমে না যাওয়া পর্য়ন্ত আমাদের অপেক্ষা
করতেই হলো, তিন দিন আর তিন রাত।

তার কথাগুলো হাসির দমকে তলিয়ে যাচ্ছিল : যেন আমরা কিছুই জানি না,
কেমন ধরনের ছিলো ওই ‘অপেক্ষা’… সে চারদিকে তাকাতে লাগলো, দৃষ্টিতে
তার কেমন এক দ্বিধা :

তোমরা পাগল না আর কিছু? অমন করে চোখ টিপছো কেন? আমি তাকে
স্পর্শ পর্য়ন্ত করিনি। কেমন করে করবো, ওই ভয়ঙ্কর অবস্থার ভেতরে, ওই পরিণতির
ভেতরে তাকে টেনের নিয়ে যাবার পর! –
সে অনেকক্ষণ ধরে আমাদের অভিশাপ দিতে থাকলো। তারপর উঠে গেলো ধীরে
ধীরে, দরজা খুললো, দাঁড়ালো বারান্দায়। একা। চাঁদকে শুনছিলো।
তোমার জন্যে ওখানেই একটি কবিতা রয়েছে।

লাইলাক ফুলের গাছ, ‘মস্কো-ওয়ারস’

(রসুল গামজাতভের জন্যে)

১০-৩-৬১
লাইলাক গাছ বিদায় নিচ্ছে,
লাইলাক গাছ যেন শী-চলা পথ,
ছোট্ট কুকুর ছানা, আমার গালে আদর দিচ্ছে!
অশ্রুসিক্ত আঁকাবাঁকা রেখাময় মুখ যেন লাইলাক গাছের,
লাইলাক গাছ যেন কোনো জারের মেয়ে,
লাইলাক গাছ কোনো উজ্জ্বল অথচ বর্ণহীন গ্যাসের মতো ঝলসে ওঠে।

রসুল গামজাতভ বাইসনের মতো চোখে ভ্রুকুটি করে থাকে।
রসুল গামজাতভ বলে উঠলো, “সরিয়ে নাও একে!”

১১-৩-৬১
রসুল ইদানিং দুর্বলবোধ করছে। রসুল ঘুমোতে পারে না।

ট্রেনের কামরায় লাইলাক গাছ কাঁপছে,
যেন ঠান্ডা হিম স্নানের ঘরে কোনো বালিকা। কী যে ভয়ার্ত সে!
নীচে
ট্রেনের চাকাগুলো ঘর্ঘর শব্দে গতিময়,
কোথাও কোন কালো মাটি নেই।

এবং তবু, সম্ভবত মে মাসে ফুটে ওঠা লাইলাক-ই
অনেক বেশি ‘সুন্দর’…
আমার দ্বিতীয়, আমার জাদু, লাইলাক গাছ, লাইলাক গাছ,
লাইলাক গাছ, স্বগোত্রীয় আত্মা!
এইসব সম্পর্কের ভেতরে,
এই তৃতীয় গতির ভেতরে লাইলাক ফুল একাকীই ফুটে চলে!

কয়েক শ’ বুনো মেঘ – কেবল একটি হরিণীর রূপকল্প!
কয়েক শ’ বিচ্ছিন্ন শিস্ – একটি বাঁশি।
কোনো বাগানে ফুটে ওঠা, সময়ের অনেক আগেই।
কয়েক সহস্র লাইলাক গাছ রয়েছে –
আমি কেবল অমনটিই ভালোবাসি।

তার রাত্রির দুর্বহ নিস্তব্ধতা
আদিম শব্দাবলীকেই ছড়িয়ে দেয়
যেন নকল-রূপোর তৈরি মাইক্রোফোনের ধ্বনি-তরঙ্গ।
ও ঈশ্বর কী গাছ এটি…
কুইনিন ছাড়াই উঁচিয়ে রাখা শির যেন, নির্ভার।
কয়েক শ’ সামরিক সম্মানের মতো দাঁড়িয়ে আছে
লাইলাক গাছ।

১২-৩-৬১
কাস্টমসের কর্তা লাফিয়ে উঠলো : ‘গাছ? জীবন্ত?
কাস্টমসের কর্তা সমস্ত আইনবিধি ভুলে গিয়ে গরগর করে উঠলো।
হায়রে, বিস্ময়-বোধের কারণে, সেই সপ্তম বোধ!

একটি সবুজ ঝাড়বাতি, গ্রহের চারদিকে ঘুরে ঘুরে
নিচের গ্রামগুলো আর ওপরের তারাগুলোর মধ্যবর্তী শূন্যের ভেতরে
শিস্ দিয়ে চলেছে নিরন্তর –
লাইলাক গাছ তার মাশুল বাড়িয়ে চলেছে!
এবং হাসছে,
মাটির প্রতি, ঘাসের প্রতি, আইনের প্রতি…

পুনঃ
আমি একটা চিঠি পেলাম, ‘লাইলাক গাছটি মারা গিয়েছে।’