নবনীতা দেব সেন > কবিতাভাবনা ও ১০টি কবিতা >> মৃত্যুদিন

0
338

কবিতাভাবনা ও ১০টি কবিতা

কবিতাভাবনা >>

কবিতা আমার নাড়ির সঙ্গে জড়ানো কবচকুণ্ডল। কবিতা আমার অভিমান, আমার প্রার্থনা, আমার নিঃসঙ্গতা, আমার সঙ্গ, আমার পূর্ণতা, আমার অতৃপ্তি। চিরকালের পথে সে নুপুর হয়ে জড়িয়ে থাকে। যে-কবিতা ফুরোয় না, আজ পর্যন্ত তেমন কবিতা কি লিখতে পেরেছি? জীবনের প্রত্যেকটি কবিতাই বোধহয় সেই কবিতাকে খোঁজার চেষ্টা। একটু পর্দা, একটা আব্রু, কিছুটা রহস্য থাকা চাই। এটা কবিতার অত্যাবশক ধর্ম। “দেখ না দেখায় মেশা” বোধের অতীত এক বিদ্যুৎলতার উপস্থিতি চাই কবিতার “দ্য লা ম্যুজিক আভঁ ত্যুলে শোজ,” সবার আগে সংগীত। তখন ভাষা তো সংকেত, ভাষা তো এক বুনো ঘোড়া। তাকে পোষ মানিয়ে জ্বলন্ত আগুনের রিঙের মধ্য দিয়ে তালে তালে লাফ দেওয়ানোর নাম কবিতা।

এতই নেমকহারাম আমি যে জীবন আর কবিতার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বললে প্রত্যেকবারই বলব—“জীবন চাই”। যদিও বেশ জানি জীবন বিশ্বাসঘাতক, শেষ আশ্রয় কবিতাই। কবিতা ঠকায় না। জোয়ার ভাটার শাসন না মেনে জীবন যখন উদ্দাম জলস্তম্ভ হয়ে আমাকে তলিয়ে দিতে এসেছে, তখন তো ছুটে গেছি কবিতারই দালানকোঠায়। আশ্রয় পেয়েছি। বেঁচে গেছি। আমার কোনো কাব্যাদর্শ নেই…। “কাব্য ভাবুকরা কাব্য নিয়ে ভাবুক, আমি বরং ততক্ষণে আর দু-খানা কবিতা লিখে ফেলি,” এই হল আমার একমাত্র কাব্যভাবনা। কিন্তু যখন কবিতা লিখতে পারি না কিছুতেই লেখা হয় না। তখনই কাব্য নিয়ে ভাবনায় পড়ি। (সেটাকে কি ‘ভাবনা’ বলা চলবে!)।

কাব্যভাবনা না থাক আমার দুর্ভাবনা ঢের আছে। নানাজাতের। হাংরি জেনারেশনের সময়ে যেমন এক রকমের দুর্ভাবনা হয়েছিল। এই যে এত শত সহস্র লিটল ম্যাগাজিন বেরোয়, এতে আর-একরকম দুর্ভাবনা হয়। অনেকের ধারণা হয়েছে আধুনিক কবিতা মানে যা খুশি তাই।…কোনো তরুণ সম্পাদক যখন বলেন- “তা, গদ্য যদি নাই দিতে পারেন তবে কবিতা-টবিতা যা, হোক” বলতে নেই ? আর-এক কবিতা-দুর্ভাবনা হল কবি সম্মেলন। …যেন সম্মুখ-সমর। কবিতায় একটু আড়াল ভালো। মঞ্চে চড়ে মাইক লাগিয়ে চড়া গলায় সভা ডেকে হাটবাজারে হেঁকে বেড়ানোর মতন কবিতা আমি লিখতে পারি না। আমার কবিতা একলা পাঠক নিজের মনে মনে পড়বেন বলে লেখা। আবৃত্তির জন্য একরকম কবিতা, আর মনে মনে পড়ার জন্য আর-একরকম।

নিজের কবিতার বিবর্তন? নিজের কবিতার চরিত্র। এসব কথার উত্তর আমি কি জানি? আমার জীবন যেভাবে পাড় ভাঙতে ভাঙতে চলেছে, কবিতাও তেমনি পাড় গড়তে গড়তে এগোচ্ছে। হঠাৎ হয়তো একটা লাইন মনে চলে আসে, কিংবা পরপর কয়েকটি লাইন। কখনো-বা ছন্দটাই আগে থেকে মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। এর কি কোনো নিয়মকানুন আছে যে “এতদিন ‘ক’ স্টাইলে লিখেছি, এইবার বরং ‘খ’ স্টাইলে লেখা যাক—এ জাতীয় সুবুদ্ধি আমার মগজে কদাচ আসে না। হরেক রকমের কবিতা লিখি আমি। কিন্তু যখন যেটা লেখার, তা কলমই ঠিক করে দেয়। আমার কবিতায় যা যা পরিবর্তন এসেছে, তা বর্ষার পরে যেমন শরৎ আসে, শীতের পরে বসন্ত, ঠিক তেমনই স্বচ্ছন্দ। …আর প্রভাব? কখন কীভাবে কার প্রভাব পড়ে তা কেউ নিজে বলতে পারে? তবে ইচ্ছে করে অনেক কবির অনেক পঙক্তিই তো আমি পুরাণের মতো করে সচেতন ব্যবহার করি। একে বলব চয়ন। প্রভাব খুঁজুক অন্য লোকে।

“কবি, তুমি গদ্যের সভায় যেতে চাও ? যাও, কিন্তু পা যেন টলে না।” গদ্য লিখছি বলে কবিতা লেখা কম হচ্ছে? কী জানি, গদ্য লিখতে আমার প্রচণ্ড পরিশ্রম হয় ঠিকই, কেননা লেখার ধরনটা কবিতার কাছেই শেখা। বারবার কাটি, বারবার টুকি, বারবার লিখি। কিছুতেই আশ মেটে না। যতক্ষণ না ছাপাখানায় চলে যাচ্ছে ততক্ষণ কেবলই বদলে যেকে থাকে। …গদ্যে যা লিখি, পদ্যে তা লিখি না। এটা খুব জরুরি। কবিতায় মানুষ তো তাই লিখবে, যা গদ্যে কিছুতেই লেখা যায় না? যা গদ্যেও লেখা সম্ভব তা গদ্যেই বেশি গুছিয়ে লেখা সম্ভব। কবিতায় ফুটবে কেবল সেই অধরা মাধুরী যা গদ্যে ধরা দেয় না। যা অনিবার্যভাবে, বিশুদ্ধভাবে শুধুই কবিতার। কবিতাকেই যে সর্বত্রগামী হতে হবে, আমি তা মনে করি না। কেবল বিচিত্র পথে গেলেই হল। সৎ কবিতা হল টাইমক্যাপসুল, তার মধ্যে অতি সংক্ষিপ্তসারে কবির অন্তর-বাহিরের সবটুকুই গুছিয়ে তোলা থাকে। সিসমোগ্রাফ যন্ত্রের মতো, ভালো কবিতায় আপনিই ধরা পড়বে পরিপার্শ্বের সূক্ষ্মতম কম্পনও, তার জন্যে কবিকে আলাদা করে চেষ্টা করতে হবে না। একটা কবিতা নয়, কবির সমগ্র কবিতা থেকে এই সামগ্রিক ছবি উঠে আসবে।

শুনি কবিতা নাকি পলায়ন। অথচ আমি তো দেখি কবিতাই স্থিতি। আমার জীবনের প্রথমতম প্রত্যয়। পায়ের তলা থেকে যতবারই মাটি কেড়ে নিয়েছে জীবন, ঠেলে দিয়েছে একটা হিম-হিম অন্ধকারে গর্তে, কবিতা ততবার এসে হাত ধরেছে, টেনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে শক্ত জমির ওপরে। আলোয়, উষ্ণতায়। ঈশ্বরের মতো, কবিতারও বড়ো মমতা। শত হেলাফেলাতেও কবিতা কবিকে একেবারে পরিত্যাগ করে যেতে পারে না। ফিরে ডাকার অপেক্ষায় থাকে।

পরিচিতি >>

জন্ম : ১৯৩৮, পিতা নরেন্দ্র দেব, মাতা : রাধারানী দেবী (অপরাজিতা দেবী), স্বামী : অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন (ভারতরত্ন’ এবং নোবেল পুরস্কার প্রাপক, ১৯৯৮)। শিক্ষা : এমএ, ১৯৫৮ (যাদবপুর ইউনিভার্সিটি), এএম ১৯৬১, (হারভার্ড), পিএইচডি (১৯৬৩)। যাদবপুর ইউনিভার্সিটির অধ্যাপনা পদ থেকে অবসরের পর লেখালেখিতেই ব্যস্ত থাকতেন। কাব্যগ্রন্থ : প্রথম প্রত্যয় (১৯৫৭-৫৯), স্বাগত দেবদূত (১৯৫৯-৭১), রক্তে আমি রাজপুত্র (১৯৭২৮৮), লায়নটেমারকে (১৯৮৯-১৯৯৫), তুমি মনস্থির করো (২০০৭-০৯) ইত্যাদি। অন্যান্যগ্রন্থ : উপন্যাস- ‘আমি অনুপম’ (১৯৭৬), ‘প্রবাসে দৈবেরবশে’ (১৯৭৮), ‘স্বভূমি’ (১৯৮৬), ‘দেশান্তর’ (১৯৯৮), ‘ঠিকানা’ (২০০০), ‘অন্যদ্বীপ’ (১৯৮৩), ‘বামাবোধিনী’ (১৯৯৭), ‘তিসিডোর’, ‘ফিনিক্স’ (২০১১) ইত্যাদি। পুরস্কার : ‘পদ্মশ্রী’ (২০০০), সাহিত্য অকাদেমি’, ‘কবীর সুমন’, ‘রবীন্দ্র পুরস্কার এবং সংস্কৃতি পুরস্কার’ ইত্যাদি। Among her honours, She was a Fellow of the Royal Asiatic Society of Great Britain and Vice President of the Indian National Comparative Literature Association. She was the Radhakrishnan Memorial Lecturer at Oxford in 1996-97. She has been a Visiting Professor at many universities including Harvard, Cornell, Columbia, Chicago.

১০টি কবিতা >>

আরগ্য

শুধু তুমি সুস্থ হবে।
আমি দিয়ে দেবো আমার কোজাগরীর চাঁদ,
শাদা দেয়ালের ময়ূরকণ্ঠী আলাে,
দিয়ে দেবাে বিগত বছরের মরা পাখির মমতা,
আর আগামী বছরের কলাগাছটির স্বপ্ন।

চলে যেতে যেতে সবাই তাে তাই বলে গেলাে।

কুন্তী নদীর গেরুয়া জল তার সবুজ ছায়া কাপা ঠাণ্ডা গলায়
আমাকে বলেছে,
শুকনাে সােনালি গােরুর গাড়িগুলাে
ক্লান্ত কাদাটে গলায় আমাকে বলেছে,
শেষ হেমন্তের বুড়াে সবুজ পাতারা
আসন্ন মৃত্যুর খখসে গলাতে বলেছে।

তুমি সুস্থ হ’লেই ওরা আবার ফিরবে।

এমন কি
তুলসীতলার যে-প্রদীপটি ধ’রে তুমি
আমার মুখ দেখেছাে, তাকেও ভাসিয়ে দিয়ে,
একটি শুভ্র স্তব হয়ে জ্বলবাে তােমার শিয়রে
আসুক, ওরা ফিরে আসুক, যারা চিরকাল
শুধুই চলে যাচ্ছে, এখান থেকে অন্যখানে
উৎপাটিত একগুচ্ছ কচি সবুজ দুর্বার মতাে
তুচ্ছ, উষ্ণ, কাতর
আমি তােমার যন্ত্রণা মুছে নেবাে :
তার বদলে, ঈশ্বর, তার বদলে আসুক
তােমার কাক্ষিত আরােগ্য।

দ্বন্দ্ব

একবার আমার দিকে চোখ তুলে তাকাও
আমি তােমার চোখের মধ্যে একটু হাসি।
সে-হাসির আদরে তােমার চোখ কাঁপুক
তােমার চোখ কাঁপুক
তােমার চোখ লাজুক
আমি কঁপি আমি কঁদি আমি দাঁড়াই।
তােমারই মতাে একা, ব্যাপ্ত
সহস্রাক্ষ সহস্রবাহু
অনাদি অনন্ত অজর
নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অনুক্ষণ লীলায়িত
আমি
তােমার আশ্চর্য অনিবার্য সঙ্গী।

ওপরে ফাঁকা নীচে ফাঁকা সামনে ফাঁকা পিছনে ফাঁকা
সময় যখন আপনি ফাঁকি দেয়
সেই তাে ইচ্ছার লগ্ন।
আমি এসেছি তুমিও এইবার এগিয়ে আসবে
রাগ কোরাে না ত্যাগ কোরাে না আশা কোরাে না, শুধু তাকাও
আমার নির্মল আকাশে তােমার সােনালি রােদুর
ভয় কোরাে না জয় কোরাে না ছলা কোরাে না, শুধু তাকাও
তােমারই মতাে উজ্জ্বল আর নিষ্ঠুর, দর্পিত আর মায়াবী,

পবিত্র আর করুণ আঁখির অরণ্যে
শ্রাবণের বৃষ্টির মতাে তাকাও
ভৈরবী স্বপ্নের মতাে
বৈরাগী মৃত্যুর মতাে
নিশ্চিত
আর মনে করাে তুমি আমার জন্যে
বৃষ্টি আমার জন্যে, বকুল আমার জন্যে, শস্য আমার জন্যে
মনে করাে, দুঃস্বপ্ন আমার নৈবেদ্য আমার, চৈতন্য আমার
আর তখন আমি তােমার হই, তখন
আমি তােমার হই
তুমি
আমার কোলের শিশু হয়ে আমাকে বরণ করাে
আমাকে হরণ করাে
পূরণ করাে।

এই প্রিয় মুখগুলি মেঘের মতন

প্রিয়জনদের জরা আমি আর দেখতে পারি না

আমি চোখ মেলে-মেলে দেখতে পারি না
এই প্রিয় মুখগুলি মেঘের মতন গ’লে যায়
চোখের পুকুর ঘিরে পানা ছেয়ে আসে, প্রিয় ভ্রুর
রেখাগুলি ডানা গুঁজে ম’রে যাওয়া পাখির মতন
মুখ থুবড়ে পড়ে, এত প্রিয় ওষ্ঠাধর ঝরে ঝরে পড়া
অপক্ক ফলের মতো ধুলোয় শুকোয়, সব কী-ভাবে শুকোয়,
সব কী-ভাবে এখন ওড়ে হাওয়ায় হাওয়ায়,
কুচি-কুচি কাগজের মতো সব কীভাবে মিলায়।

কী-ভাবে হৃদয় ছাউনি গুটিয়ে ফেলে
প্রস্তুতিতে পথে নেমে আসে,
এইমাত্র হাত তুলে ভাড়াগাড়ি যে-কোনো থামাবে,
হাত তুলে বিদায় জানিয়ে চলে যাবে।
কীভাবে এখন দেখি হৃদয় গুটোয়।
কী-ভাবে অন্তর সব ঝকঝকে বাসনগুলো তাক থেকে য়ে
ভীষণ ঝংকার তুলে পাথরে ছিটিয়ে ফেলে ভাঙে,
কী-ভাবে এমন করে রোদে সব শব্দ মিশে যায়,
সব চিহ্ন গলে যায়,
এই প্রিয় মুখগুলি মেঘের মতন
আকৃতি বদল করে ভেসে চলে যায়
আমি চোখ মেলে রেখে ঘাস জ্বলে যাওয়া
এত কাছের উঠোন আর
দেখতে পারি না।

দ্বীপান্তরী

এখন তাহলে আমি বিনা প্রতিবাদে
সব অভিযোগগুলি মাথা উঁচু করে মেনে নিয়ে
স্পষ্টত অন্তরশূন্য প্রস্তরফলক হয়ে যাবো।

আমি তোমাদের সব প্রীতিহীনতার পাপ
নিজেই স্বীকার করে নিয়ে, নিজের মণ্ডলে সরে যাবাে।

একদা নির্জন রাত্রে অকস্মাৎ শূন্য আদালতে
বিচারক, বাদীপক্ষ, উকিল, কেরানি
একজোটে চায়ের টেবিলে গােল হয়ে, আমাকে একেলা
নিতান্ত নিঃসঙ্গ, নগ্ন, কাঠগড়ায় তুলে
দ্বীপান্তরে ঠেলে দিয়ে, দল বেঁধে
চায়ের মজলিশে ফিরে গেলাে।
যাবজ্জীবন সেই চায়ের আসরে তােমরা বন্দী হয়ে আছে।
আমি পাল তুলে, ভেসে-ভেসে দ্বীপে চলে যাবাে।

হৃৎপিণ্ড কোনােদিন ছিলাে কি ছিলাে না-
কৈফিয়ৎ অদরকারি। সব কিছু পেয়েছিলে, যা-কিছু
আমার বুকে ছিলাে। বিনা প্রত্যাশায় আমি
নিরাকার প্রিয়মন্যতায় পকেট ভরিয়ে নিয়ে
এইবারে দ্বীপে চলে যাবাে।

সেই দ্বীপে কোনােদিন তােমাদের জাহাজ যাবে না।

লায়নটেমারকে

মনে থাকবে না? বাঃ! সবগুলাে
চাবুকের দাগ, যত কালশিটে, সব
বাদামি চামড়ার নিচে ঢাকা।
খুব মনে আছে।
একবার ‘সপাৎ’ শুনলে, দুইপায়ে খাড়া।
দু’থাবায় ভিক্ষে চাওয়া। ‘সপাৎ-সপাৎ’
শুনলে কেশর-টেশরসুদ্ধ শানের মেঝেয়
গড়াগড়ি, গড়াগড়ি, শীত-গ্রীষ্ম
নেই। তিনবার ‘সপাৎ শুনলে? নির্দ্বিধায়
আগুনের ব্যুহের ফাঁদেও
চমৎকার ঝাপ দিই। আবার?

আবার-
খুব মনে আছে। কানেকানে নেশাতুর আদুরে ‘সপাৎ’—
অক্লেশে লাফিয়ে পড়ি দাউ দাউ
জ্বলন্ত বলয়ে। আবার ?
আবার-
অন্ধকার থেকে
নিশিডাক বেজে ওঠে, শৃঙ্খলের মতাে
ঝমঝম্ করতালি আষ্ঠেপৃষ্ঠে
সর্পিল জড়ায়। -দু’চোখ
ধাঁধিয়ে দেয় অলাতচক্রের
মায়া-দ্যুতি, এমন কি আগুনও
কিছু নয়। রিং মাস্টার,
ভুলিনি কিছুই। মনে নেই

শুধু পূর্বনাম। মনে নেই
অরণ্য কেমন ?

মেয়েটা

দুঃখ তাকে তাড়া করেছিল
মেয়েটা ছুটতে, ছুটতে ছুটতে
কী আর করে? হাতের চিরুনিটাই
ছুঁড়ে মারলাে দুঃখকে-
আর অমনি চিরুনির
একশাে দাঁত থেকে
গজিয়ে উঠলাে হাজার হাজার বৃক্ষ
শ্বাপদসংকুল সঘন অরণ্য, বাঘের ডাকে,
ছম্ছম অন্ধকারে,
কোথায় হারিয়ে গেল
দুঃখ-
ভয় তাড়া করছিল তাকে
মেয়েটা, ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে
কী করে? মুঠোর ছােট্ট আতরের শিশিটাই
ছুঁড়ে মারলাে ভয়কে—
আর অমনি সেই আতর ফুসে উঠলাে
কেঁপে উঠলাে ফেনিল ঘূর্ণিতে, প্রখর কলরােলে
যােজন যােজন ব্যেপে হিংস্র গেরুয়া স্রোতের
তােড়ে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল
ভয়কে-

প্রেম যেদিন ওকে তাড়া করল
মেয়েটার হাতে কিছুই ছিল না
ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে কী করে?
শেষে বুক থেকে উপড়ে নিয়ে হৃদয়টাকেই
ছুঁড়ে দিল প্রেমের দিকে,
আর অমনি
শ্যামল এক শৈলশ্রেণী হয়ে মাথা তুলল
সেই একমুঠো হৃদয়
ঝরনায়, গুহায়, চড়াইতে, উতরাইতে
রহস্যময়
তার খাদে, তার উপত্যকায়
প্রতিধ্বনি কাপছে।

ঝােড়াে বাতাসের, জলপ্রপাতের-
তার ঢালুতে ছায়া, আর
চুড়ােতে ঝলসাচ্ছেন
চাঁদ সূয্যি
সেই ঝলমলে, ভয়ভর্তি হৃদয়টাই
বুঝি এগােতে দিলে না
তার প্রেমিকের ভীতু
প্রেমকে,
আহা
এবার ওকে তাড়া করেছে ক্লান্তি
হাত খালি, বুক খালি,
ছুটতে, ছুটতে, ছুটতে, কী করে?

এবারে মেয়েটা পিছন দিকে
ছুঁড়ে মারলাে শুধু দীর্ঘশ্বাস
আর অমনি
সেই নিশ্বাসের হলকায় ফস্ করে
জ্বলে উঠল তার সমস্ত অতীত
দশদিশিতে দাউ দাউ ছড়িয়ে পড়ল
উড়ন্ত পুড়ন্ত বালির মরুভূমি

এখন মেয়েটা নিশ্চিন্ত হয়ে ছুটছে,
দুই হাত মাথার ওপরে তােলা—
যাক্,
এবার তাকে তাড়া করেছে, তার
গন্তব্যটাই।

তারা খসে পড়ে

এক যে ছিলাে কাঠুরের ছেলে
রােজ আনে, রােজ খায়।
কাঠ কাটতে কাটতে কাঠ কাটতে কাটতে
তার হাত ব্যথা করে
তবু কাটতে হয় কাঠ …
একদিন এক পরীকন্যে এলাে
বললাে, আহা গাে, বললাে, থাক্-
আমিই তােমাকে ভাত বেড়ে দেবাে আজ থেকে …
কাঠুরের ছেলে খুব খুশি
কুড়ুল নামিয়ে রাখলাে
সঙ্গে সঙ্গে তার হাত দুটি
খসে পড়লাে
ঠিক কুড়ুলের পাশটিতে …
সামনে ভাত-
সে এখন ভাত খাবে কী দিয়ে?

একটি মেয়ে ছিলাে
কবিতা লিখতে লিখতে কবিতা লিখতে লিখতে
তার সাঁঝ ফুরিয়ে সকাল হয়ে যায়

সকাল মিলিয়ে যায় রাত্তিরে
একদিন এলাে এক রাজপুত্তুর
মেয়েটাকে বসিয়ে নিলাে তার পক্ষীরাজে
বললাে, এসাে, বললাে, চলে এসাে
তােমার কবিতা নিয়ে তােমার দিন নিয়ে
তােমার রাত্রি নিয়ে
আমার কাছে চলে এসাে
আমার কাছে দিনও পাবে
আমার কাছে সব কিছুই কবিতা…
মেয়ে খুব খুশি
কলম নামিয়ে রাখলাে
সঙ্গে সঙ্গে তার চাঁপার কলি আঙুল
আঙুলগুলি সব ঝরে পড়লাে. ..
যেমন ঝরে যায় ফুলে পাপড়িরা
টুপটাপ শব্দহীন
ওই কলমটার ওপরেই

আর সূর্য চন্দ্র একসঙ্গে ঝলসে উঠে
ধাঁধিয়ে দিলাে তার রাত্রি-দিনের হিশেব
খসিয়ে দিলাে তার দুটি নয়নতারা ফুল
এখন সেই মেয়ের
সকালও নেই
রাত্রিও না

এখন সেই মেয়ের
কবিতাও নেই
পক্ষীরাজও না

টেলি-কম্

জয়ের ওই মেঘবালিকাদের
একজনকে সেদিনই দেখলম
আমাদের বাস স্টপে
অবিকল আগের মতােই
কাঁধে ব্যাগ, দুবিনুনি চুল,
পরনে স্কুলের ইউনিফর্ম

নাকে ঘাম, ভুরুতে অলকচূর্ণ ওড়ে-

সেই যে ফোনের আশেপাশে
তক্কে তক্কে ঘুরু ঘুরু যে-মেয়েটা-
জেঠুর পাহারা থেকে কখন যে মুক্তি পাবে ফোন!
ভােরবেলা জেঠু যেই হাঁটতে যাবেন—
তক্ষুনি ম্যাজিক করে ছেলেটাও
ফোন করবে ঠিক
জেই সেই পান-দোকান পার—
টুং করে একটিবার বাজলেই
চটপট ফোন তুলতে হবে
—“কার ফোন ছিল রে তখন?”
—“রং নাম্বার, মাগাে”, …
নিঝুম রাত্তিরে
সক্কলে ঘুমিয়ে পড়লে
ঘড়ি দেখে বারােটা পঞ্চাশে
পা টিপে দালানে এসে
মেয়েটাই ফোন করবে তাকে
সেও তাে রাত্তির জেগে পড়া করছে কিনা—
বাজতে না বাজতেই ঘন্টি
ঝাঁপ দিয়ে ফোন তুলে নেবে
বারােটা পঞ্চাশে
এলােমেলাে কুজনে গুঞ্জনে
পল অনুপল যায়
হৃদয়ের শব্দ শুনে শুনে
স্বেদবিন্দু মুক্তোমালা সর্বাঙ্গে জড়ায়
অবিকল সেই মেয়ে-
সেই ব্যাগ, দু’বিনুনি, সেই স্কার্ট ব্লাউজ
ফোন-কানে কথা কইছে অন্যমনে-
খর রৌদ্রে রাসবিহারীর মােড়ে
জেঠু ও জেঠিরা হেঁটে যান
সে-মেয়ে নিশ্চিন্ত চোখে, নিজস্ব সময়ে
একান্ত নিজস্ব ফোনে
একান্তে নিজস্ব কথা কয়
ভিড় বাস-স্টপে

ভুরুর ওপরে উড়ছে বিচূর্ণ অলক
নাকে ঘাম, চুল চোখ
ঠমক ঠামক,
সবই এক, অবিকল
আগের মতনই সব, শুধু …
বালিকা, জানিসনে তুই
সে ফোন তাের
মেঘ-টুকু কেড়ে নিয়ে গেছে।

জলকন্যা

জলকন্যা বসে আছে
হিমশৈলে একা
ভেজাবুকে জোড়া শঙ্খ বাজে
এলােচুলে প্রবালজালিকা
কোমরে ঝিনুকমালা
দু-চোখে আকাশ
জলকন্যা বসে থাকে
আকাশবিহারী দুই চোখ
চন্দ্ৰতারকার সঙ্গে কথা বলে
কথা বলে সারা রাত ঝিলিমিলি ঢেউয়ে
জলকন্যা বসে থাকে
আকাশ, সিন্ধুর মধ্যে
একা

যতক্ষণ না দিগন্তে মাস্তুল
পাল তুলে জেগে ওঠে
অচেনা জাহাজ

তার পরে তার গান শুরু

গান শুনে ভিড় করে পাটাতনে নাবিকের দল
দাঁড়টানা থেমে যায়
স্তব্ধ হয় মনন, স্মরণ।
সুরের আড়াল দিয়ে ফণা তােলে
ভীষণা মায়াবী
কুহকিনী ডাক দেয়
নাম ধরে ডাক দেয়
ডাকে…

মাত্রই একজন শােনে সেই ডাকনাম
মাত্রই একজন শুধু সুরের ছােবলে মরে
মাত্রই একজন
একজন ঝাপ দেবে জলে
একজনই পাগল

তৃতীয় ডাকের পরে আর সেই পাগল নাবিক
জাহাজে থাকে না, তার সমস্ত শরীর
সুরের গরলে জরজর
জলে ঝাঁপ দেয়

সে তখন সারস, শুশুক
সে তখন ফসফরাস আলাে

জলকন্যা মিশে যায় জলে…
একজন নাবিক শুধু
হিমশৈল হয়ে
ডুবে থাকে, ভেসে থাকে, গানে…

দুঃখরঙের বাড়ি

এক
বাড়িটি হয়ে গেল দুঃখ রং
বাড়িতে ফিরবাে না, নাও ফেরাও
অন্য দেশে বও, মন-পবন।

দুই

সকলেই একটু একটু করে বদলে যায়
সবখানি বদলায় না
শুধু একটুখানি— তাতেই পালটে যায় দিন, রাত্রি, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত।

তিন

জানাজানি হয়ে গেল
সে কখনাে ছিল না ওখানে
শুধু ছায়াটুকু ছিল।

চার

লজ্জার কী আছে, যদি
বসন্ত বারবার ভুল বলে?
লজ্জার কী আছে, অশ্রুজলে?

পাঁচ

এখন প্রশ্ন হবে, ফিরি, কি না-ফিরি?
ফেরা ফেরার চেয়ে অনেক কঠিন
অন্তরাত্মা যদিও বাহিরি।

ছয়

পূর্ণিমাটি ঝাপ দিল
তেলঝুলমাখা কালাে বিষে-
এত বিষ জমেলি,
ফুল তােলা রেশমি বালিশে?

সাত

নরকযন্ত্রণার এখনই অন্ত না
বালিতে ডুবে গেছে সমুদ্দুর
প্রলাপে থৈ থৈ হৃদয়পুর।

আট

চোখ বলছে, সময় হয়েছে-
প্রশ্ন শুধু
খিল খুলবে কে?

নয়

বলবাে না, ছুঁয়ে থাকো
বলবাে না, তুলসী চন্দন দিও চোখের পাতায়,
শেষ দৃষ্টি নগ্ন চেয়ে থাক্-
বলে যাক, ফিরিস না কখনাে।

দশ

এইমুখ, এ-মুখ অচেনা।
এই জিব, এ জিহ্বা অচেনা।
আমাকে এখন আর আমার শরীরে ধরছে না।