নাজমুল হাসান পলক > আলোর তরণী বেয়ে দিন চলে যায় >> সংগীত

0
266
নাজমুল হাসান পলক > আলোর তরণী বেয়ে দিন চলে যায় >> সংগীত

 

“ক্ষেমচাঁদ প্রকাশের সুরে মধুবালার জন্য গাওয়া ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটি তাঁর জীবনে প্রথম সাফল্য এনে দেয়। এই গানটি রেকর্ড করার জন্য তাঁকে প্রায় কুড়িবার কণ্ঠ দিতে হয়েছিল। তারপর, সেবছরই মুক্তি পেল রাজ কাপুর-নার্গিস জুটির বিখ্যাত সিনেমা ‘বারসাত’। এই ছবিতে লতা মঙ্গেশকর সুরকার শঙ্কর জয়কিষাণের সুরে গাইলেন ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে’ কিংবা ‘জিয়া বেকারার হ্যায়’-এর মতো তুমুল জনপ্রিয় গান। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি।”

উপনিবেশের সদ্য অবসান ঘটেছে। নওশাদের সুরে ‘আনমল ঘাড়ি’ (১৯৪৬) সিনেমায় ‘আওয়াজ দে কাঁহা হে’ কিংবা ‘মেরে বাচপান কে সাথ মুঝে ভুল না জানা’র তুল্য সাড়া জাগানো গানের শিল্পী নুরজাহান চলে গেলেন পাকিস্তানে। আমরবাঈ কর্নাটকী, জোহরাবাঈ আমবালা, কানন দেবী, উমা দেবীর তুল্য থিয়েটারি ঢঙের গায়িকারা তখন অস্তাচলগামী। মুব্বাই চলচ্চিত্রের গানে চলছে এক নতুন যুগের আবাহন; আসছেন রাজকুমারী, সুরাইয়া, শামশাদ বেগম, গীতা দত্তের মতো প্রতিভাদীপ্ত শিল্পীরা। লতা মঙ্গেশকরের আবির্ভাব ঘটে এই সময়েই। শুধু আবির্ভাব নয়, সেই সঙ্গে আরম্ভ হলো এক সংগীত-অভিযাত্রিকের সুর-মুর্ছনার অনিঃশেষ অমোঘ অভিযান। আরো সম্মান জানিয়ে ব্যক্ত করলে বলতে হয়- সংগ্রামের। সেই সংগ্রামের একদিকে যেমন রয়েছে চলচ্চিত্র-শিল্পে নিজেকে একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী রূপে আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রত্যয়, তেমনি অন্য দিকে রয়েছে চিকিৎসার অভাবে অকালপ্রয়াত পিতার ভগ্ন সংসারে মা-ভাই-বোনদের মুখে অন্ন জোগাবার অনিবার্য তাড়না।
প্রায়ই মুব্বাইয়ের স্টুডিও পাড়া থেকে পায়ে হেঁটে নিজের আবাসস্থলের স্টেশনে ফিরতেন উনিশ-কুড়ি বছর বয়সের তরুণী লতা মঙ্গেশকর। এভাবে পয়সা বাঁচিয়ে বাজার থেকে কিনতেন সবজি, গ্রাসাচ্ছদনের খাবার। এমন একজন শিল্পীর সর্বভারতীয় স্তরে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন- প্রবাদে, কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া এক অনিঃশেষ অপরাজেয় সংগ্রামই বটে। পিতা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উস্তাদ এবং অভিনেতা, থিয়েটারের সংগঠনও ছিল তাঁর। স্ত্রী সুধামতি এবং প্রথম কন্যা লতার মতো আরও চার প্রতিভাময় সন্তান- মীনা, আশা, ঊষা ও হৃদয়নাথ। এদের নিয়েই তাঁর সংসার। বাড়িতে গান শিখতে আসতেন অনেক সঙ্গীতনবিশ। দীননাথ একদিন অবাক হয়ে দেখলেন তাঁর এক ছাত্রের সুরের অসঙ্গতি শুধরে দিচ্ছেন পাঁচ বছরের কন্যা লতা। প্রতিভার ছটা প্রকাশ পেয়েছিল তখনই। তবে মুব্বাইয়ের গানের জগতে প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ। লতা মঙ্গেশকরের প্রিয় শিল্পী ছিলেন কুন্দরলাল সাইগল। রেডিওতে তাঁর কণ্ঠগীত শুনতে বড্ড ভালবাসতেন তিনি। স্বপ্ন দেখতেন বড় শিল্পী হয়ে সাইগলের পাশে দাঁড়িয়ে ডুয়েট গাইবেন। তবে, বিয়োগান্তক ঘটনা এই যে, নিজের পয়সায় কেনা প্রথম রেডিওটি চালুর দিনই তাঁকে সাক্ষী হতে হয়েছিল সাইগলের মৃত্যু সংবাদ শ্রবণের। প্রাথমিক পর্যায়ে এক সুরকার তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তাঁর কণ্ঠস্বরকে ‘পাতলা’ এবং ‘প্লেব্যাকের অনুপযুক্ত’ অভিহিত করে। এতে অবশ্য লতা মঙ্গেশকর দমে যাননি। নিজেকে রত রেখেছিলেন সংগীত সাধনায়। ‘মহল’ (১৯৪৯) সিনেমায় ক্ষেমচাঁদ প্রকাশের সুরে মধুবালার জন্য গাওয়া ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটি তাঁর জীবনে প্রথম সাফল্য এনে দেয়। এই গানটি রেকর্ড করার জন্য তাঁকে প্রায় কুড়িবার কণ্ঠ দিতে হয়েছিল। তারপর, সেবছরই মুক্তি পেল রাজ কাপুর-নার্গিস জুটির বিখ্যাত সিনেমা ‘বারসাত’। এই ছবিতে লতা মঙ্গেশকর সুরকার শঙ্কর জয়কিষাণের সুরে গাইলেন ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে’ কিংবা ‘জিয়া বেকারার হ্যায়’-এর মতো তুমুল জনপ্রিয় গান। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি নানান প্রতিযোগিতা এবং সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু নিজের কর্মনিষ্ঠা ও প্রতিভার কারণে সব সময়ই উতরে গেছেন।
সাত দশকের সংগীতজীবনে লতা মঙ্গেশকর গান গেয়েছেন প্রায় ছত্রিশটি ভাষায়; পেয়েছেন শুধুমাত্র ভারতবর্ষ নয়, বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীত শিল্পীর দর্শকনন্দিত ও রাষ্ট্রীয়-সামাজিক শিরোপা। এই দীর্ঘ অভিযাত্রায়, নব্বই বছর বয়সে এসে দেখা যাচ্ছে যে তাঁর সংগীতজীবনের দুটি প্রান্ত অব্যাহতভাবে প্রবহমান। সংগীতের প্রতি নিষ্ঠার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন তিনি আর সুললিত তুলনারহিত কণ্ঠস্বর তাঁকে জনপ্রিয় করেছে। এই কণ্ঠের জন্য অনেকেই তাঁকে অভিহিত করেছেন কণ্ঠানুশীলনের পৌরাণিক প্রতিমারূপে।
লতা মঙ্গেশকরের সংগীত-জীবনের কেন্দ্রে রয়েছে মুব্বাইয়ের সিনেমা পাড়া বলিউড। তাঁর উত্থান এবং প্রতিষ্ঠা মূলত চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠদান করে। এখানে প্রায় ছয় দশক ধরে তিনি এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। দীর্ঘ জীবনে কাজ করেছেন ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ, অনিল বিশ্বাস থেকে আরম্ভ করে আল্লারাখখা, রহমানের মতো আধুনিক সুরকারের সঙ্গে। রাজ কাপুরের সিনেমায় তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন অনিবার্য শিল্পী রূপে; তেমনি কণ্ঠ দিয়েছেন তাঁর নাতনিতুল্য কারিশমা কাপুরের জন্যও। এই সুদীর্ঘ অভিযাত্রা থেকে তাঁর সঙ্গীত প্রতিভার কালিক ব্যাপ্তির সমান্তরালে একধরনের শৈল্পিক অনিবার্যতার দিকটিও আমরা আবিষ্কার করতে পারি।
সত্তর বছর ধরে কোনো সংগীত শিল্পী তাঁকে তাঁর আসন থেকে টলাতে সক্ষম হয় নি। বছরের পর বছর অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু লতা মঙ্গেশকর প্রতিষ্ঠিত রয়ে গেছেন তাঁর নিজের অতুলনীয় জনপ্রিয়তার শিখরে। আর নিজেকে এই অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে রয়েছে তাঁর ব্যক্তিজীবনের নানান ত্যাগও। সংগীত সাধনাকে অব্যাহত রাখতে গিয়ে সমাজের আর পাঁচজন সাধারণ নারীর মতো স্বামী, সংসার, সন্তানের স্বপ্নে নিজেকে বিলিয়ে দেননি তিনি। বরং সকল নারীসুলভ ছাপোষাপনা, জাগতিক অভিপ্রায়কে পরিত্যাগ করে সংগীত সাধনাকেই জীবনের অনিবার্য এবং একমাত্র সত্যরূপে স্বীকার করে নিয়েছেন। ভারতবর্ষীয় সমাজ-ব্যবস্থার প্রাচীন পিতৃতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় তাঁর অবিবাহিত একক জীবনযাপনকে সেক্ষেত্রে এক কঠিন সংগ্রাম রূপেই বিবেচনা করা চলে। মুখে নানান সময়ে নানান কথা বললেও অনেকে সেসব কথা বাস্তবে রূপদান করতে পারেন না। জীবনে কী পেয়েছেন তিনি কিংবা কিই-বা রয়ে গেছে তাঁর অধরা? এমন নানান প্রশ্নের সম্মুখীন লতা মঙ্গেশকরকে হতে হয়েছে বহুবার। তবে, দীর্ঘ সময় ধরে, বারবারই তিনি দিয়েছেন এক এবং অভিন্ন উত্তর, ‘না পাওয়ার কোনো যন্ত্রণা বা আক্ষেপ আমার নেই।’ তবুও একটা গোপন দুঃখ বহুদিন ধরে বয়ে চলেছেন হৃদয়ে; যে-পিতার জন্য তাঁর এতবড় শিল্পীরূপে আত্মপ্রতিষ্ঠা, সেই পিতা দীননাথ মঙ্গেশকর তাঁর সাফল্য, অর্জন দেখে যেতে পারেননি। সম্ভবত, এই দুঃখ স্বল্পাংশে হলেও লাঘব করার অভিপ্রায়েই লতা মঙ্গেশকর তাঁর সারা জীবনের উপার্জন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন চিকিৎসার অভাবে অকালপ্রয়াত পিতার নামে হাসপাতাল; যেখানে দুস্থ, সহায়হীন, পীড়িত মানুষ চিকিৎসাসেবা পাবে পরম আন্তরিকতায়।
লতা মঙ্গেশকর নব্বই বছর পূর্ণ করলেন। তাঁকে মূল্যয়নের কোনো সাধ্য, পাণ্ডিত্য কিংবা গুণপনা আমার নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, মানুষের অপার ভালোবাসা ও প্রাপ্তির সমান্তরালে তিনি নিজেকে উন্নীত করেছেন এক মহৎ মানুষ রূপে। মানবিক গুণসম্পন্ন শিল্পীরূপে। ব্যক্তিশক্তির অনিবার্যতা, মহত্ব সম্পর্কে আমরা সকলেই অবহিত। কালে কালে লতা মঙ্গেশকর বিপুল পরিমাণে এই শক্তিটিই অর্জন করেছেন। তাঁর সামনে ছোট হয়ে গেছে, ম্লান হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানের শক্তি; এমনকি রাষ্ট্রশক্তিও। বহু পদকে ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। এ সবের মধ্যে ‘ভারতরত্ন’ এবং ফ্রান্সের ‘লিজিয়ঁ অব অনার’ অন্যতম। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি যতটা না সম্মানিত হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি সম্মানিত বোধ করেছে পদকদাতা রাষ্ট্র বা সংস্থাগুলি। এভাবেই লতা মঙ্গেশকর স্মরণ করিয়ে দিতে পেরেছেন যে, ব্যক্তির চেয়ে বিশাল, মহৎ, অনিবার্য আর কিছু নেই। যে-কোনো ক্ষেত্রই হোক না কেন, প্রয়োজন শুধু নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কাজ করে যাওয়া। বাংলা গান গেয়েও লতাজি জয় করেছেন আমাদের হৃদয়। ঠাঁই করে নিয়েছেন শুধু ভারতের বাঙালি শ্রোতাদের মনে নয়, আমাদের বাংলাদেশের মানুষের মনেও।
আজ লতা মঙ্গেশকরের জন্মদিন। এই দিনে মহান এই শিল্পী পরম সুস্থতায় শতায়ু হবেন, এরকম অভিপ্রায় আমরা ব্যক্ত করছি। তাঁর কণ্ঠ আমাদের আরও বিস্ময় বিমুগ্ধ করে যাক, এই প্রার্থনা।