নারায়ণ দত্ত >> রবীন্দ্রনাথের কবিতা চুরি >> রবীন্দ্রপ্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য

0
202

রবীন্দ্রনাথের কবিতা চুরি 

বিশ্বাস করতে হয় তো মন চাইবে না, কিন্তু সত্যিই এমন ঘটনার খবর রয়েছে। এমন ব্যাপার নয় যে রবীন্দ্রনাথ তখনও সাহিত্যগগনে সামান্য অখ্যাত জ্যোতিষ্ক মাত্র – সূর্য নন, কাজেই কোনো কবিযশঃপ্রার্থীর এই দুঃসাহস। যে সময়ের কথা, কবি তখন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, জগৎকবির সভায় আমরা তাঁর গর্ব করি। তখন তিনি গানের রাজা। আর সেই রাজার গানই চুরি হয়ে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির নামে বেরোলো। কাহিনীটা গোড়া থেকেই বলা যাক।
রবীন্দ্রনাথের এই কবিতাটি অবশ্য আলাদা করে ছাপা হয়নি। সেটি তাঁর ‘অচলায়তন’ নাটকের একটি গান। ‘অচলায়তন’ লেখা হয় সন ১৩১৮ আষাঢ়ে শিলাইদহে। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারকে আন্তরিক শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে কবি উৎসর্গ করেন এটি। এই নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যে নায়ক পঞ্চক শোণপাংশুদের জিজ্ঞাসা করছে, ‘তোরা চাষ করিস তো?’ শোণপাংশুরা জবাব দিচ্ছে, ‘চাষ করি বইকি, খুব করি। পৃথিবীতে জন্মেছি, পৃথিবীকে সেটা খুব কষে বুঝিয়ে দিয়ে তবে ছাড়ি।’ তা’দের উত্তরটা আরো প্রাঞ্জল করার জন্যেই যেন গান ধরে : ‘আমরা চাষ করি আনন্দে।/ মাঠে মাঠে বেলা কাটে সকাল হতে সন্ধে।/ রৌদ্র ওঠে, বৃষ্টি পড়ে,/ বাঁশের বনে পাতা নড়েু,/ বাতাস ওঠে ভরে ভরে চষা মাটির গন্ধে।/ সবুজ প্রাণের গানের লেখা,/ রেখায় রেখায় দেয় যে দেখা,/ মাতে রে কোন তরুণ কবি নৃত্যদোদুল ছন্দে।/ ধানের শীষে পুলক ছোটে,/ সকল ধরা হেসে ওঠে,/ অঘ্রানেরি সোনার রোদে পূর্ণিমারই চন্দ্রে।’
‘অচলায়তন প্রকাশের ছয় বছর পরে ‘মালঞ্চ’ নামে এক সচিত্র মাসিক পত্রিকায় এই গানটি ছাপা হয় জনৈক সত্যনারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের নামে। পত্রিকাটির চতুর্থ বর্ষের তৃতীয় সংখ্যায় আষাঢ়, তেরশ চব্বিশ সনে। সত্যনারায়ণ কবিতাটির নাম দিয়েছিলেন : ‘চাষার গান ‘। তাঁর নামে ছাপা কবিতাটি এই : ‘আমরা চাষ করি আনন্দে, আমরা চাষ করি আনন্দে/ রৌদ্র ওঠে বৃষ্টি পড়ে, বাঁশের বনে পাতা নড়ে।/ বাতাস ওঠে ভরে ভরে চষা মাটির গন্ধে/ আমরা চাষ করি আনন্দে/ তারা চাষ করে আনন্দে/ সবুজ পাতায় গানের লেখা, রেখায় রেখায় যায় যে দেখা,/ গাছে রে কোন তরুণ কবি নিত্য দোদুল ছন্দে।/ ধানের ক্ষেতে পুলক ছোটে, সকল ধরা হেসে ওঠে/ অঘ্রাণেরি সোনার রোদে, পূর্ণিমারই চন্দ্রে।/ তারা চাষ করে আনন্দে।’
সত্যনারায়ণ বোধহয় ভেবেছিলেন, ছয় বছরের পুরনো একটা নাটকের ভেতরের গানের কথা কেই-বা মনে রাখবে? এই চুরি কারও নজরেই আসবে না; মাঝখান থেকে তাঁর ভাগ্যে খানিকটা কবিযশ জুটে যাবে। তাঁর ধারণা যে একেবারে মিথ্যে নয় তার প্রমাণ সেই ‘মালঞ্চ’ কাগজের সম্পাদক মহাশয় তো তাঁর চুরি ধরতেই পারেননি, উপরন্তু কবিতাটি তাঁর কাগজে ছেপেছিলেন। প্রাথমিক মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হলেও সত্যনারায়ণের শেষরক্ষা হয়নি। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী সেক্রেটারি ‘বচনে রচনে অক্লান্ত’ সুধাকান্ত রায়চৌধুরীর চোখ এড়িয়ে যাওয়া অত সহজ নয়। কবিতাটি বেরোনোর কয়েকদিনের মধ্যেই শান্তিনিকেতন থেকে তাঁর একটা চিঠি এলো সম্পাদক মহাশয়ের কাছে। সেটা এই :
“শ্রদ্ধাস্পদেষু, সবিনয় নিবেদন, আষাঢ়ের মালঞ্চে শ্রীযুক্ত সত্যনারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘চাষার গান’ দেখিয়া হাসি পাইল। কবি – রবিবাবুর – অচলায়তনের গানকে দু’এক জায়গায় মাত্র একটু বদলাইয়া নির্ভয়ে কেমন করিয়া ছাপাইয়া দিলেন, তাহা ভাবিয়া পাইতেছি না। উক্ত কবিতাকে যদি নিজের বলিয়া তিনি চালাইয়া থাকেন – তাহা হইলে তাহা দোষের হইয়াছে। যদি প্যারোডি করিয়ে থাকেন তাহা হইলেও দারুণ অক্ষমতার পরিচয় দেওয়া হইয়াছে। যদি আপনি কিছু মনে না করেন তাহা হইলে উক্ত কবিতার যথার্থ স্বরূপের সহিত মালঞ্চের পাঠক পাঠিকাবর্গের যাহাতে পরিচয় হয়, সেজন্য প্রেরিত রবিবাবুর কবিতা ও সত্যনারায়ণবাবুর কবিতা পাশাপাশি ছাপিয়া দিলে সুখী হইবো। …
অনুগত শ্রী সুধাকান্ত রায়চৌধুরী, শান্তিনিকেতন, বোলপুর।

ভাদ্র মাসের ‘মালঞ্চ’-এর শেষ পৃষ্ঠায় সুধাকান্তবাবুর এই চিঠিখানা এবং তাঁর অনুরোধমাফিক কবিগুরুর গান ও সত্যনারায়ণের ‘চাষার গান’ পাশাপাশি নয়, উপরে-নিচে ছেপে সম্পাদকমহাশয় জিজ্ঞাসা করেন, ‘কবিযশঃপ্রার্থী শ্রীযুক্ত সত্যনারায়ণ মুখোপাধ্যায় এ সম্বন্ধে কি বলিতে চান?’ এভাবে কাঁচা চুরি ধরা পড়ার পর বোধকরি সত্যনারায়ণ মহাশয়ের আর বলার কিছু ছিল না; যদিও তিনি সাতপাঁচ সাফাই কিছু গেয়েছিলেন কিনা তা জানবার উপায়ই নেই, কেননা পরের সংখ্যা মালঞ্চের কোন কপির হদিশ করে ওঠা যায়নি।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা এবং সত্যনারয়ণের কবিতা উপরে-নিচে ছেপে দেন সম্পাদক

ওই মাসিক পত্রের চতুর্থ বর্ষের বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত পাঁচটি সংখ্যার একটি বাঁধানো খণ্ড স্থানীয় পাঠাগারে পাওয়া গেছে। কিন্তু সেগুলিতে কে যে এর সম্পাদক কে যে প্রকাশক ছিলেন বা কোথা থেকে ছাপা হয়েছিল – যাকে ছাপাখানার পরিভাষায় বলে ‘ইমপ্রিন্ট লাইন’ – তার কোনো উল্লেখ নেই। হয়তো এ সংবাদ মলাটের কাগজে ছাপা হত। বাঁধাইয়ের সময় মলাটের সঙ্গে সেই তথ্য বর্জন করা হয়েছে। যাই হোক সচিত্র-কাগজটি মোটামুটি উচ্চমানের ছিল বলেই মনে হয়। কুমুদরঞ্জন মল্লিক, কালিদাস রায়, বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতো খ্যাতনামা কবি; সুরেন্দ্রনাথ সেন, ক্ষিতিমোহন সেন, মন্মথনাথ ঘোষ ও রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো বিশিষ্ট প্রাবন্ধিকেরা এতে লিখতেন। ‘ভারতী’, ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’ ও ‘নারায়ণ’-এর মতো নামকরা কাগজের নিয়মিত সমালোচনা করা হতো। মতামত মোটামুটি রক্ষণশীল ছিল। ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিগুলির বিরূপ সমালোচনা পত্রিকাটি মুখর থেকেছে। রবীন্দ্রনাথ বনাম চিত্তরঞ্জন দ্বন্দ্বে এঁদের বিচারের পাল্লাটা একটু যেন ‘নারায়ণে’র দিকে ঝুঁকেছিল। আশ্চর্যের কথা আদিত্য ওহেদদারের ‘রবীন্দ্র-বিদূষণ বৃত্তে’ এই পত্রিকাটির উল্লেখ নেই।
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাঙলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে’র দ্বিতীয় খণ্ডে একটি উচ্চাঙ্গের মাসিক পত্রিকার উল্লেখ আছে – এরও নাম ‘মালঞ্চ’। বারশ’ পঁচানব্বই সনের পৌষ মাসে এটির প্রকাশ শুরু হয়। একদা ‘পাক্ষিক’ সমালোচক সম্পাদক ঠাকুরদাস মুখোপাধ্যায় ঝনকারপুরে (ত্রিহুত স্টেট রেলওয়ে) থাকবার সময় এটি প্রকাশ করেন। ব্রজেন্দ্রনাথ এরপর লিখেছেন, এর পরমায়ু ছিল দুই বছর। মৃত মালঞ্চকে সাতাশ বছর পরে পুনরুজ্জীবিত করেই কি আলোচ্য ‘মালঞ্চে’র প্রকাশ? কে জানে। তবে বলা যায়, পুরনো মালঞ্চে যেমন রাজনীতির আসর বেশ সরগরম ছিল, এই নতুন মালঞ্চেও রাজনৈতিক ফুলের ঘ্রাণ বেশ মৃদুমন্দ বইতে দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু যে কথা হচ্ছিল। তাজ্জব হতে হয় কবিতা-চোরের দুঃসাহস দেখে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও পিয়ারসন অভিনীত এই ‘অচলায়তন’ নাটকের একটি গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে কবির নোবেল প্রাইজ বিজয়ী ইংরেজি গীতাঞ্জলি ‘সঙ অফারিংস’-এ ঠাঁই পেয়েছিল। এই নাটকের একটি গান ম্যাকমিলান প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘ফ্রুট গ্যাদারিং-এর অন্তর্গত। কাজেই সেকালের সর্বজনবিদিত আন্তর্জাতিক পরিচয়ে ধন্য এই নাটকের গান চুরি – কবিতা চুরির ইতিহাসেও বোধ করি তুলনারহিত। সত্যনারায়ণ কীভাবে যে এই মিথ্যার বেসাতি করলেন, সুধাকান্ত রায়চৌধুরীমশায়ের ভাষায় বলা যায়, ‘আমরাও ভাবিয়া পাইতাছি না।’
পুনশ্চ, এই ঘটনার ছয় মাসের মধ্যেই ফাগুন মাসে কবি শান্তিনিকেতনে নাটকটি ছোট করে লিখে প্রকাশ করেন। নাম হয় ‘গুরু’। কবি লিখেছেন, সহজ অভিনয়যোগ্য করিবার অভিপ্রায়ে ‘অচলায়তন’ নাটকটি ‘গুরু’ নামে এবং কিঞ্চিত রূপান্তরিত লঘুতর লতর আকারে প্রকাশ করা হইল। ‘গুরু’তেও এই গানটি রইল। তবে শোণপাংশুদের মুখে নয়, যূণকদের মুখে। দুটো ঘটনার মধ্যে হয়তো কোন সম্বন্ধই নেই, তবে দুটো ব্যাপারই যে খুব কাছাকাছি ঘটেছিল, সেটা অস্বীকার করা যায় না।