নাসরীন জাহান > কবিতাগুচ্ছ >> উৎসব সংখ্যা ১৪২৬

0
285

নাসরীন জাহান > কবিতাগুচ্ছ >> উৎসব সংখ্যা ১৪২৬

বন্দিমুক্ততা
টানা বদ্ধঘরে কাটিয়ে
শূন্যতায় লাফ দিয়েই আমি
মুক্ত বাতাসের খোঁজে
আসমান মুখী হলাম।
দেখি পিচঢালা আসমান সমস্ত আলো হাওয়া
নিজ পকেটে লুকিয়ে রেখেছে।
হাসফাঁস করে ছুটে গিয়ে তোমার কাছে আশ্রয় চাইলাম।
বললাম, আত্মার চাইতে ততোধিক ভালোবাসি তোমাকে।
নির্লিপ্ত তুমি তোমার আকাশের নীলাভ
মেঘের ছায়ার মধ্যে লুকিয়ে পড়লে।
ফুঁটো পকেটে মরা বৃক্ষের তলায় উপুড় হয়ে
গলা ছেড়ে কাঁদতে চাইলাম।
চোখের নোনাজল জানালো,
আমি বহু আগেই ফতুর হয়ে গেছি।
এক মর্মভেদী বিষচাপা দেয়া কণ্ঠে
জীর্ণ পথের রাস্তায় হোঁচট,
ধাইধাই শূন্যতায় আঁচল উড়িয়ে
সমুদ্রের দিকে দুহাত উড়াল করলাম
চারপাশে শুধু কল্পনাতীত স্রোতের চিৎকার।
যেনবা হাজারো গোখরোর হিসহিস।
অতঃপর সমুদ্র তার বিশাল পেটের ওমে
নিশ্চিন্তে আমাকে টেনে নিয়ে নিলো।
টাল
ঘুম ভেঙে পথে নামতেই দেখি,
আজব এক জগৎ।
অরণ্যের দরজা খুলে গেছে
চারপাশে কোন মানুষ নেই।
সিংহ আর হরিণেরা গলা জড়াজড়ি করে
নদীতে জল খেতে যাচ্ছে
যাবতীয় পশুর দল হুজ্জৎ করে
হাডুডু, এক্কাদোক্কা খেলছে।
বাঘেরা সব গাছের ডালপাতা চিবিয়ে খাচ্ছে।
আচমকা আমার দিকে চোখ যায় সবার।
শিম্পাঞ্জিরা আমাকে দেখে শুইয়ে দেয় ঘাসে।
আমাকে ঘিরে ধরে শিম্পাঞ্জির দল
আমার পেটটাকে টেবিল বানিয়ে
তাস খেলায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে।
উদাসীন
তুমি কোত্থেকে এসেছো?
শূন্যতা থেকে।
আমার এই জনবহুল
জীবন ভালো লাগেনা,
আমাকে ওখানে নিয়ে চলো।
এখানে আমার চুলের মুঠির কান ধরে
হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যায় বেশ্যালোকে।
এখানে গয়না নারীর রূপকথা।
জঘন্য লোকগুলো কুয়াশার মাথা ফুঁড়ে
আমাকে নিয়ে সাপলুডু খেলে।
মাথাকুটেও সন্ধ্যার শান্ত নীরবতার নাগাল পাইনা।
তুমি কোথায় যাচ্ছো?
মৃত্যুলোকে।
আমাকেও তবে সঙ্গী করে নাও।
নিস্পৃহ তুমি আমাকে আরও গভীর
দোজখের গহ্বরে ফেলে
অনন্ত লোকে হারিয়ে যাও ।
যুদ্ধ

তুমি যখন আমাকে না বলে
যুদ্ধে গেলে, আমি তখন
সবুজ অরণ্যের বাতাসে দোল খাচ্ছিলাম।
আমার অজগরের মতো প্রলম্বিত সময় আর ফুরোয়না।
নৈঃসঙ্গ্যের ধূমল ঘেরাটোপে ভারী দেহ
আর টানতে পারিনা।
কোথায় তুমি? কবে আসবে?

বৃক্ষপ্রেমিক বিপ্রদাস বড়ুয়া যেই একটা সবুজ ফুল
দেখিয়ে বলছিলেন, এটা,
অমনি পাশের একজন গুলির শব্দে ঢলে পড়লেন।
হুহু নিঃসীম, আলো গিলে খাচ্ছিলো,
ঢেউ তুলছিলো শিশুবাতাস।
বৃক্ষগুলো জানাচ্ছিলো, বিপদ!
মাথা ঘোরাতেই গণরেপ।
খারাপ মানুষদের কেন পশু বলা হয়।
অবুঝ ওরা তো খাদ্যের জন্য অন্য পশু মারে!
অথবা নিজ প্রাণ বাঁচাতে, মানুষতো ঠাণ্ডা মাথায়,
রক্তাক্ত মৃতপ্রায় দেহ নিয়ে,
তুমি আমার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়তে পড়তে
বন্দুকটা আমার দিকে এগিয়ে দিলে
মুহূর্তে আমার সত্তায় উজ্জ্বলিত অগ্নি জেগে উঠলো।
বন্দুকটা মাথার সীমাহীনতায় উচ্চকিত করে
বদমাশদের চরাঞ্চল
রক্তবার পেইন্টিং বানিয়ে ফেললাম।