নাসিমা আনিস > পুত্রবতী ভবতী >> ছোটগল্প

0
510

“বাচ্চা পড়ে আছে আমার দু পায়ের ফাঁকে, গর্ভফুল বেরিয়ে এসেছে, কেউ বাচ্চার নাড়ি কাটে না। আমি জানতাম কেউ আসবে না। গরমপানি, নতুন ব্লেড আরো কী কী সব আয়োজন, সব ভণ্ডুল হয়ে যাবে, তা কী হয়! এই রূপবতীর জন্য সারা পৃথিবী অপেক্ষা করে আছে না! আমি নিজেই সব করি। নাড়ি কাটি, তাকে কাঁদাই, মোছাই, বুকে নিয়ে আল্লার অসীম রহমতকে কৃতজ্ঞতা জানাই, তিনি একটিবার অন্তত আমার প্রার্থনা কবুল করেছেন।” 

জানালার পর্দাটা বাতাসে একটু দুলেই ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকে। প্রথমে নীলাভ তারপর কার্বন কালো, জগতচ্যুত বলা যেতে পারে। কতটা সময় কে জানে। যখন আবার সবাইকে দেখতে পাই এত লজ্জা লাগে! নিজেকে এমন গুরুত্বপূর্ণ মানুষে হিসাবে দেখে মরমে মরে যাই। চুয়ান্ন বছর পাড়ি দেয়া মানুষ। বাংলাদেশের গড় আয়ু আমার পাওয়া হয়ে গেছে, আর কেন! বহু প্রকারের মৃত্যু আমাকে ইতিমধ্যে ছুঁয়ে-ছেনে, কখনও বা কিঞ্চিত চেখেও দেখে গেছে। কিন্তু কি কারণে কে জানে, অথবা নির্দিষ্ট কোন কাজেই হয়ত ধরাধামে আরো কয়েকটা অঙ্কে অভিনয়ের জন্য আমাকে ফেলে রেখে গেছে বিধাতা। অসুস্থতা ছাড়াও আট সন্তানের জন্য আটবার আমাকে বীরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে। বীর বলছি আজকে, কিন্তু যখন বীর হয়েছি, বীরত্ব বুঝিইনি। বীরত্বের বদলে কেবলি এক পলায়নপর পরাজিত মানুষই আমার অস্তিত্বের সবটুকু জুড়ে ছিল। প্রতিবারেই সেই যোদ্ধাবীর মৃত্যুর ভীষণ মূর্তির হাত ফসকে বেঁচে গেছে। বাঁচার কি অর্থ তার সন্ধান করে কিছু একটা খুঁজে পেয়েছেও সে, নইলে বাঁচবেই বা কেন! মৃত্যু ছুঁয়ে বেঁচে আসার কাহিনি শুনে কেউ হয়তো বলে বসবে মৃত্যু তো আর হয়নি, তা হলে আর কিসের গল্প তোমার! সত্যি কথা। হলেই বা জগতের কি ক্ষতি হতো! তা না হলে আমার বিশ বছরের মেজো মেয়েটা মারা যাবে কেন! হৃৎপিণ্ড নাকি ফুঁটো ছিলো আগেই, অথচ আমরা জানতামই না! নাকি জানার চেষ্টাই করিনি! আর বিয়ের পর ওর স্বামীও বুকের ব্যথার জন্য তিনটা বছর শুধু  অ্যাসিডিটির ওষুধই খাইয়ে গেলো! মৃত্যু এত নির্ধারিত! মেয়েটা ছিলো শান্ত আর নির্বিবাদী, কি জানি, হয়তো বিবাদ করার মতো কোন শক্তিই ছিলো না। আমরা এ বিষয়ে খবর নেয়ার চেষ্টা করিনি। খাওয়াপড়ার কষ্ট ছাড়াও যে কত কষ্ট জগতে হামা দিয়ে এসে হামলে পড়ে! পরিবার প্রতিবেশ আত্মীয় এমনকি নিজের কাছেও নিজে নিতান্ত করুণার পাত্র হয়ে যেতে হয় কখনও। আটটা সন্তানের জনক-জননী হতে হতে আমরা এতটাই ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে শেষ পর্যন্ত আমাদের যৌনজীবন শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছিল। ফলে আটটি সন্তান ছাড়া যৌথ কোন কর্মপ্রয়াসের হিসাব আমাদের নাই। তারপরও মানুষ তো, প্রাচীন হাড্ডিসার ডালিম গাছটায় নতুন কুচিকুচি পাতায় ভরে গেলে কী যে অভিমান হত! কিসের জন্য অভিমান, কার জন্যই বা, খোঁজার ফুরসত যদিও পাইনি কখনও।
একেকটা সন্তানের জন্ম বজ্রাঘাতের মতো আমাদের শরীর-মনে এমনি প্রভাব ফেলতে লাগল যে আমরা জেদ করে পরের সন্তানটি কন্যা সন্তান হবে না, এই প্রার্থনা করে অপেক্ষা করতে লাগলাম। নিমর্ম এক খেলা!
 শীতবসন্তগ্রীষ্মবর্ষা এমন কোন সময় নাই যে সময়ে আমি তার জন্য অপেক্ষা করে থাকি নি। কিন্তু সে আসেনি। সত্যি কথা, শেষ তিনটির প্রথম দুটি আমার  জেদে, অষ্টমটি আমার ফুফু শাশুড়ির প্রবাদবাক্যে। প্রতিবারই ভয়াবহ গর্ভযন্ত্রণা দিয়ে আমার একটি করে কন্যা হয়েছে, আমার শাশুড়ি এসেছেন, দেখেছেন, যাবার সময় পুত্রসন্তানের গর্বিত মাতা হওয়ার আর্শীবাদ করে ফিরে গেছেন। যাবার সময় তাঁকে এত বিষণ্ন আর অবসাদগ্রস্থ মনে হতো যে আমি অন্তত সাতদিন ভালো করে খেতে পারতাম না, তার মুখটা আমার চোখের সামনে ভাসত, প্রায় কিছু না বলা শক্ত চোয়াল যে কত কিছু বলে! যেন ভর্ৎসনা করে বলছেন, ছিঃ এবারও পারলা না, তুমি কি জন্য এখনও এ সংসারে আছ! আর তুমি, যে কিনা  সবসময় আমি আরেকটা সন্তান পেটে নিতে রাজি হবো কিনা সে বিষয়ে সংশয়িত থাকতে। সন্দেহ তোমাদের ছিলো প্রথম থেকে, আল্লার ইচ্ছায় তো বউ বিএ পাশ! সে কি আর দশটা মেয়ের মতো সংসার করবে! বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি এসে আমার প্রেমট্রেম নিয়েও কয়েকবার তদন্ত চালিয়েছ। আমার এক চাচাতো ভাই বিয়ে করেননি। তুমি ধরেই নিয়েছ তাঁর সাথে আমার প্রণয়, কিন্তু যেহেতু সে বেকার তাই বাবা তার সাথে আমার বিয়ে দেননি। বেকার থাকুন আর যা-ই থাকুন, উনি এমন একজন মানুষ, আজ বলি, তার সাথে আমার বিয়ে হলে আমি অনেক খুশি হতাম। তিনি ছিলেন ভয়াবহ পড়ুয়া, বাউণ্ডুলে আর দেশপ্রেমিক। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন আর পাড়ার নানা রকম কর্মদ্যোক্তার ছিলেন প্রতিভূ। হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া ছিলো তাঁর চরিত্রের বিশেষ দিক। প্রথম দিকে উনি চলে গেলে পাড়ার সবাই সত্যিকার অর্থেই বেকার হয়ে যেতো, কিঞ্চিত এতিমও। শুনেছি দাদির কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে তিনি দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতেন। তিনি যে কোথায় যেতেন কিভাবে দিনের পর দিন মাসের পর মাস বাড়ি না এসে থাকতেন, এটা শুধু আমাদের কাছে এক বিস্ময়ই। না আমরা এ ব্যাপারে কথা বলতাম, না তার কাছে গিয়ে সে ব্যাপারে জানতে পারতাম। বয়সে যেমনি অনেক বড় ছিলেন তেমনি ছিলেন গম্ভীর। বিয়ের পর আমি তাঁর প্রশংসা করেছিলাম আর কেঁচো খুঁড়তে শুরু করলে তুমি। তিনি কোন দিন আমার সংসার দেখতে আসেননি, এটাও তোমার সন্দেহের আরেকটা কারণ। আসবেন কি, তোমার মতে, বেচারা তো কষ্টেই মারা যাচ্ছে। আজ এটা বলা যায়, তুমি যত তাঁর উপর বিরক্ত আর কটু কথা বলেছ, আমি তত তাঁর শুভকামনা করেছি। আমার শুভকামনা যদিও তাঁর কোন কাজে লাগেনি, দশ বছর আগে তিনি শেষ বাড়ি ছেড়েছেন, বেঁচে আছেন কিনা কেউ জানে না।
দুর্ভিক্ষের পরের বছর আমাদের বিয়ে হয়। আমাদের মফস্বল শহরে আমাদের মহল্লায় আমিই প্রথম নারী গ্রাজুয়েট। স্কুলশিক্ষক পিতা আরেক জন স্কুলশিক্ষক খুঁজে আনলেন। সর্বাংশে যোগ্য পাত্র। আমিও যোগ্য বউ হয়ে উঠতে চাইলাম। কাউকে কিছুই করতে হয়নি, সংসারে ঢুকে আমি আপনি পুরাতন সব বিদ্যা ভুলে নতুন বিদ্যা গ্রহণ করতে লাগলাম। প্রথম প্রথম লুকিয়ে গল্পের বই পড়েছি, কিন্তু অল্প দিন, স্কুল মাস্টারের পক্ষে দুর্মূল্যের বাজারে বাড়তি কেরোসিন জোগান দেয়া অসম্ভব। আর দিনের আলোয় সময় ছিলো না মোটেই। কিন্তু কাজের ফাঁকে ডালিমগাছ, লেবুর ঝাড়, পুকুরের টলমল পানি বড় আপন ছিল। ইতিহাসভূগোল, আর্যমৌর্য, পাহাড়সমুদ্র যে মোহনায় এসে ভিড়লো, তার নাম সংসার। হাড়িকুড়ি থালঘটিবাটি হাঁসমুরগি চাকরবাকর আত্মীয়স্বজন মেহমান, আমার সব, সমস্ত বশীভূত এদের পায়ে। পোলাওয়ের কিসমিসের মতো উড়ন্ত সুখ, কখনো বা বড় চেনা সুখও হাত ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়, পড়ে থাকে মনের অসুখ। কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না এমন বিষয়ের সাথে আপোষ রাতদিন। মা-ছেলেতে মিলে কত শিক্ষা-অশিক্ষা আমায় দিলে, কিন্তু লাভের লাভ কি হলো বলো! মেয়ের পর মেয়েতে ভরে গেলো তোমার জীর্ণ সংসার। বড়র জামা মেজো পরে, মেজোর জামা সেজো পরে, সেজোর জামা ন, ন-এর জামা ফুল, ফুলের জামা মলি, মলির জামা কলি…।  নাম রাখতে কোন কষ্ট করা লাগেনি, ওরা স্বনামেই জন্মগ্রহণ করেছে, বিস্ময়! ইস্কুলে ভর্তি হওয়ার আগের দিন কেবল বেশ চিন্তিত হয়ে ঘুমাতে যেতে। সকালে ঘুম ভাঙতো মেয়ের একটা ভালো নাম নিয়ে। তোমার চিৎকারে বাড়ির সবাই চমকে যেতো। প্রথম দুটোর বেলায় আমি চমকালেও পরেরগুলোর বেলায় একদমই না। আমি চুলার আগুন নিভিয়ে ধীরেসুস্থে তোমার পাশে গিয়ে দাঁড়াব, তুমি বলবে ফুলের নাম জান্নাতুল ফেরদৌস কিংবা মলির নাম জান্নাতুল বাকিয়া কিংবা কলির নাম আসমাউল হুসনা কিংবা জলির নাম…। জলির নাম তুমি রাখার সুযোগ পাওনি কিংবা কি-জানি হয়ত ইচ্ছা করেই রাখতে চেষ্টা করনি।
সংসার আর তোমার কাছে আমার শরীরের যাবতীয় প্রয়োজন একটু একটু করে কমতে শুরু করলে শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য যাবতীয় রোগ এসে বাসা বাঁধতে শুরু করে। হাসপাতাল আর বাড়ি, বাড়ি আর হাসপাতাল। বড় মেয়ের বিয়ের আগের দিন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলাম আবার তিন মাস পর মেজো মেয়ের বিয়ের তিন দিন পর হাসপাতাল ভর্তি হলাম। শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গ হাসপাতালে দিতে দিতে শেষে বোধ করি তুমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালে যে আমি আর নারীই রইলাম না। সোজা বাংলায়, জরায়ু নাই ডিম্বাশয় নাই। শরীরে মাংস বলতে বস্তু নাই, বাকি রইলো কি! তোমার খিটখিটে মেজাজ, চিৎকার চেঁচামেচি, বাড়িতে তেষ্ঠানো দায় হয়ে গেল। প্রথমে বড় অভিমান, একেবারে আবর্জনার কাতারে নিজেকে নামিয়ে আনলাম। কিন্তু একসময় দেখলাম আটটা মেয়ে এমনভাবে জড়িয়ে রয়েছে, বাঁচার বড় সাধ জাগলো। বলতে পারো তখনও একটা কঠিন সমন এসেছিল। আমার বাঁচার আশা তোমরা ছাড়লে, ছাড়লাম না আমি। ঢাকার ডাক্তাররা বলেই দিয়েছে, বড়জোর  তিনমাস। কিন্তু আমি জানতাম, তিন বছরেও আমি মারা যাব না। সমন পাওয়ার পর তোমরা এত ভালোবাসলে যে রোগে ভয় পেয়ে গেল। আমি জানতাম, এতগুলো মেয়ে মানুষ না করে আমার মরা চলবে না। কিন্তু আরেক রকমের রক্তঝরা আমার জন্য অপেক্ষা করে রইল। মেজো মেয়ে বিয়ের বছর তিনেকের মধ্যেই মায়া কাটিয়ে চলে গেলো। বড় দুটো ছাড়া সব কয়টাকেই ভালোভাবে পড়াতে পেরেছি। বড় দুটোর বেলায় আমি নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম কিংবা বলা চলে চেষ্টাই করিনি। কিন্তু হায়! আমার শিক্ষিত, যৎকিঞ্চিত সুন্দরী মেয়েরা জবুথবু হয়ে পাত্রপক্ষের সম্মুখবর্তী হয় আর পাত্রপক্ষ প্রশ্ন করে, কলমা বলতে পারো? এশার নামাজ কয় রাকাত? শ্বশুর-শাশুড়িকে যত্ন করতে পারবে তো? আমার মেয়েরা উত্তর দেয়। তারা পছন্দ করে, বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু আমি তাদের প্রশ্ন করতে পারি না- আমার শিক্ষিত রূপসী মেয়েরা মানুষের মর্যাদা পাবে কিনা, সংসারে তাদের বুদ্ধি-বিবেচনার মূল্যায়ন হবে কিনা। যে-কজনের বিয়ে হয়েছে, তারা কেমন আছে তা ওদের জিজ্ঞাসা করে বোঝার কোন উপায় নাই। পরিস্কার বুঝতে পারি আমার কাছে গোপন করছে। ধরতে গেলে প্রথম সাতটার ছয়টার বেলায়ই অন্ধকার, দ্বিতীয়টি বেঁচে থাকলে খুব সুখী হতো, একথা তো বলাই যাবে না। মেয়েরা প্রায় সবাই যদিও কর্মজীবী তবুও বড় দুর্বল।  ‘মা ভালো আছি, মা ভালো আছি।’ ‘কেমন ভালো আছো মা?’ ‘অনেক ভালো মা, তুমি টেনশান করো না, টেনশান করা তোমার নিষেধ।’ বেগম রোকেয়া বেঁচে থাকলে আমার মতো মায়েদের মেয়েদের কতো না ভৎর্সনা করতেন!
এমন উৎকন্ঠিত মুখে এখন দাঁড়িয়ে আছ। মেয়েরা, জামাইরা, নাতিনাতনি। তোমাকে কেন এত বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে! আমার চলে যাবার পর তোমার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী জুটবে, বৃদ্ধ বয়সে একজন সেবিকার প্রয়োজন হবে, তুমি নিশ্চিন্তে তা গ্রহণও করবে। কি করা, পুত্র থাকলে আজকে একটা পুত্রবধু থাকত, তাতো নাই। গত পঁয়ত্রিশটা বছর, প্রথম বিশ বছর গেছে তোমার বিবিধ বিপুল বিরক্তিতে, পরের পনের বছর কেটেছে অভ্যাসবশত, বিরক্ত নিয়ে। কিন্তু আমি সব জানি, সে জানাকে আমি কোনদিন নিজেকেও আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই না। বছরের পর বছর আমার মেয়েরা বাড়িতে কেন কাজের লোক ঢুকতে দেয়নি। যখন যেখানে বদলি হয়ে গেছো, মেয়েরা জোর করে তোমার সঙ্গে যেতো, বাবার যত্ন নিতে। বছরের মাঝখানে গিয়ে কত হাঙ্গামা করে নিজেরা ভর্তি হয়েছে। বিরক্ত চিৎকার চেঁচামেচি করলেও শেষপর্যন্ত তুমি পারতে না মেয়েদের সাথে। আমি জানতাম মেয়েরা ভয় পায়, ভাবে বাবা নতুন জায়গায় গিয়ে বিয়ে করে ফেলবে। কিন্তু যা হলো! বিয়ে করা তার চেয়ে ভালো ছিল। এত পাহারা সত্বেও কত নয়ছয় করেছ! তোমার প্যান্টে পকেটে আমি বহু আলামত পেয়ে হতবাক হয়েছি কিন্তু কাটা কান চুল দিয়ে ঢেকে রাখাই তো বুদ্ধিমানের কাজ! সংসারটা তছনছ হয়ে যাবার ভয়ে এতগুলো মানুষ যেখানে ভীত! তারপরও অসম্ভব আলোর দিনে সোনারুলু গাছে যখন ফুল এলো, আমি তোমাকে ডেকে দেখালাম। কেন দেখালাম? কারণ এখন তোমাকে আর ভয় পাই না আগের মতো, তাই হয়তো শেষ পর্যন্ত আমার একটা ভালোলাগার বস্তু দেখাতে চাই। পুকুর পেরিয়ে সোনারুলু গাছের মাথায় আকাশ, আকাশে চোখ রেখে তুমি অন্যমনস্ক হলে, বললে, কত ফুল ফুটলো এত বছর বকুল, কিন্তু এসবে আমাদের আর কিছুই যায় আসে না। আমি চমকে উঠে নিজের দিকে তাকাই। আমি বকুল, বকুল তোমার দেহাংশ হাসপাতালে জমা দিতে দিতে একেবারে সব কিছু পর হয়ে গেলো! মন বলে পৃথিবীতে সত্যি সত্যি কোন অপদার্থ নাই! দেহেরও কোন কিছু নিজের না! একটা ফেললে আরেকটা যেন ফেলতেই হবে ডাক্তারদের! টিউমার ফেলতে গিয়ে জরায়ু, সিস্ট ফেলতে গিয়ে ডিম্বাশয় আর এবার যে জিনিসটা ফেলবো বলে হাসপাতালে গেলাম, পেট ওপেন করে ওরা বিলকুল ফেলতেই পারলো না! কিডনির গায়ে এমনভাবে সে জড়িয়ে  ছিলো যেন সে কিডনি থেকেও আপন, আপন জিনিসকে তো যেতে নেই। একমাত্র এইবারই প্রথম ওটিতে ঢোকার আগে তুমি আমার কপালে হাত রেখে অভয় দিয়েছিলে! কারণ ওটি থেকে ফিরে আসার আশ্বাস ডাক্তাররা তোমাকে একেবারেই দেয়নি। আবেগ জড়ানো গলায় কত কী বলে যে সান্ত্বনা দিতে চাইলে, অভয় দিতে চাইলে। তুমি যত অভয় দিতে থাকলে আমি তত বিস্ময় নিয়ে তোমার অভয় বাণী শুনতে লাগলাম। আমি বুঝতেই পারছিলাম না এসব কেনো। তার আগে অন্তত তিনবার গেছি ওটিতে, তুমি ছিলে কর্মক্ষেত্রে। মেয়েরাই ফিরিয়ে এনেছে সেবা আর সাহস দিয়ে। এবারও হয়তো বাঁচতাম, কিন্তু কী বল তো? চার মাস আগে ডাক্তাররা আমার পেট ব্যথার হিস্ট্রি নিলো তোমার কাছ থেকে। নানা পরীক্ষা করে শেষে বলে, বাড়ি যান, মেয়েদের বাড়িতে ঘুরে বেড়ান, সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনার আসলে কিছুই হয়নি। পুরোটাই মানসিক, ঠিকমত খাওয়াদাওয়া করলে ঠিক হয়ে যাবে। তিনটা মাস বাড়িতে মরণযন্ত্রণা নিয়ে পড়ে রইলাম, বারবার মনে হলো, সবটাই মানসিক? এত যে ব্যথা, এটা কীভাবে মানসিক হয়! নিজেকে বলতে চেয়েছি, আসলে মনের উপর দীর্ঘদিন ঝড় বয়ে গেছে, মানসিক হলে হতেও পারে। হাজার যন্ত্রণার ভিতর একটা মাত্র বিজয় গুনগুন করে আমাকে কত যে উজ্জীবিত করতে চাইল! কী সেটা!
ইতিমধ্যে আমাদের সাতটা মেয়ে হয়ে গিয়েছে। তখন আমার হঠাৎ হঠাৎ স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার মতো এটা ব্যাপার হতো। কিছু একটা বলতে গিয়ে পুরো ব্যাপারটাই গুলিয়ে ফেলতাম। মেয়েটাকে বুকের দুধ দেয়ার সময় এমন একটা অনুভূতি হতো যেন কেউ আমার মগজে গরম পানি ঢেলে দিচ্ছে। আমি সইতে পারতাম না। রাতদিন কান্নাকাটি করতাম, দিনে থাকতাম দাঁত কামড়ে। ছড়িয়ে পড়লো কথাটা বাইরে। আমার স্মৃতিবিলোপ কিংবা বাচ্চাকে দুধ না দেয়া জিনেরই কাজ। বহুদিন গেলো অদ্ভুত নির্বাসনে, সে সব অন্য গল্প।
কিন্তু উদ্ধার পেলাম, আমার একমাত্র ফুপুশাশুড়ি আমাকে জানালেন, সাতের ফাঁড়া কেটে গেছে এবার তোমার নিশ্চিত সুপুত্র। স্বয়ং আল্লাহ তোমার মতো র্ধৈযশীলাকে এই উপহার দেবেন। অপুষ্ট শরীর নিয়ে বসে আছি কখন সে আসবে। স্ফীত উদোরের দিকে তাকিয়ে একবার নিজেকে বড় ভাগ্যবতী মনে হয়, একবার কাঙালেরও অধম। এবারও যত্ন সীমাহীন। মালটোভা হরলিক্স সব লুকিয়ে লুকিয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী মেয়েকে খাওয়াই। গায়ে পায়ে পানি নেমে স্বাস্থবতী, ডাক্তার বৈদ্য বাড়ি আসে, তাঁরা হাসে মাস্টার সাহেবের কাণ্ড দেখে। সেবাযত্ন এমন জায়গায় পৌঁছাল, এমনকি ঢাকায় এনে আমার নিরাপদ প্রসবও তোমরা চাইলে। যা হোক, অসুস্থ মায়ের জরায়ু ছেড়ে একবার পৃথিবীর মাটিতে পড়লে হয়, ছেলেকে মানুষ করবে তারাই। বড় মেয়ে পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত, মেজো কাছে ঘেঁষে না, সেজোটা খুবই বিরক্ত, জানে তাকে কষ্ট করে কোলে-কাখে রাখতে হবে। পরেরগুলো ভাইয়া হবে ভাইয়া হবে বলে মেতে রইল। যত ছেলে হবে ছেলে হবে বলা হতে লাগল, তত মেয়েগুলোর প্রতি আমার আদর কমে করুণা হতে লাগলো। যেন অনাহূত মেহমান ওরা, ভুল করে এসেছেই যখন, থাক না! আহা, ওরা জানলো না, ছেলে হয়ে জন্মালে ওরা কত আদর পেত! স্বয়ং ঈশ্বর তাদের প্রতি এত অবিচার করল!
তারপর শবেবরাতের রাতে উঠল ব্যথা। সৌভাগ্যের রজনীতে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমার সাতটি সন্তানের মুখ আমার চোখের সামনে দুলতে দুলতে মিলিয়ে যেতে লাগল। প্রবল যন্ত্রণায় আমি মারা যাচ্ছি, আমার চারপাশ আগলে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েগুলো। যে আমার জান কবজ করবে বলে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে খুব বিরক্ত। আমাকে বলছে, এদের সরতে বল, তা না হলে আমি কাজটা করব কিভাবে? তুমি তো আরো কষ্ট পাবে, সরতে বল, সরতে বল! আমার জ্ঞান লুপ্ত হতে হতে আমি সজ্ঞান হলাম। আমি কায়মনে প্রার্থনা করলাম, আমায় আর একটা কন্যা সন্তান দাও প্রভূ, আর মাত্র একটি, এটাই আমার শেষ প্রার্থনা, দয়া কর প্রভূ। আমি আমার আটটা সন্তান সমানভাবে ভালোবাসতে চাই।
সারারাত আমার স্বামী, শাশুড়ি, ফুপুশাশুড়ি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকল। শেষরাতে রূপার দলার মতো এক রূপবতী কন্যা আমার বিছানায় এসে পড়লো। বিজলি চমকানো আলোয় আমার সারা ঘর ঝলসে গেলো আর অপেক্ষমান যাত্রীরা ঘর ফেলে ছুটে পালাল বাঁচার জন্য। যেন-বা এক অদ্ভূত ট্রেন লাইন ছেড়ে ওয়েটিং রুমে ঢুকে পড়েছে। বাচ্চা পড়ে আছে আমার দু পায়ের ফাঁকে, গর্ভফুল বেরিয়ে এসেছে, কেউ বাচ্চার নাড়ি কাটে না। আমি জানতাম কেউ আসবে না। গরমপানি, নতুন ব্লেড আরো কী কী সব আয়োজন, সব ভণ্ডুল হয়ে যাবে, তা কী হয়! এই রূপবতীর জন্য সারা পৃথিবী অপেক্ষা করে আছে না! আমি নিজেই সব করি। নাড়ি কাটি, তাকে কাঁদাই, মোছাই, বুকে নিয়ে আল্লার অসীম রহমতকে কৃতজ্ঞতা জানাই, তিনি একটিবার অন্তত আমার প্রার্থনা কবুল করেছেন।