নাহার তৃণা > শোনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গলবারতা >> চলচ্চিত্র

0
354

নাহার তৃণা > শোনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গলবারতা >> চলচ্চিত্র

 

“জীবন বাজি রেখে বাতাসহীন বদ্ধ কনটেইনারে ঢুকে ঠিক কোন পরিস্হিতিতে একজন মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাড়ি দেয়- ‘হেথা নয় হোথা নয় অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে’- সেই ভাবনার উপযুক্ত উত্তর খোঁজার দায় দর্শকের উপর নীরবে-নিঃশব্দেই রেখে দিয়েছেন পরিচালক ও কাহিনিকার আইসোল্ড উগ্গাদোত্তির।”
নামেই ইঙ্গিত দিচ্ছে এই সিনেমার কাহিনির সমাপ্তিতে আছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আশ্বাস। কিন্তু সেই পথে এগিয়ে যাবার মধ্যবর্তী সময়টুকুতে হৃদয়ক্ষরণও কম নেই। পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই নারীর দুই ধরনের টানাপোড়েন তাদের পথকে একই সমান্তরালে এনে কীভাবে বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থিতে, And Breathe Normally (২০১৮) সেই গল্পটিই সযত্নে আমাদের বলে।
কাহিনির প্রধান তিন চরিত্রের একজন লারা আইসল্যান্ডীয় এক সিঙ্গেল মা। নীল চোখের আদুরে এলডার তার একমাত্র ছেলে। অন্যজন গিনি বিসাওয়ের আজা।
লারা কর্মহীন, গ্রোসারির বিলের পয়সা মেটাতেও হিমশিম খেতে হয় তাকে। তা সত্ত্বেও মাতৃস্নেহের উষ্ণতায় সে একমাত্র ছেলেকে ভরিয়ে রাখতে সচেষ্ট। ছেলের সাথে তার সম্পর্ক নিটোল সুন্দর। এমন এক সঙ্গীন অবস্হার মুখোমুখি যখন লারা, তখন কেফ্লাভিক, যেখানে আইসল্যান্ডের প্রধান এয়ারপোর্ট সেখানকার বর্ডার সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শিক্ষানবিস হিসেবে কাজের ডাক পায়। সানন্দে সে ডাকে সারা দেয় লারা। এ যেন খানিকটা ‘তোমারে বধিবে যে’ কেফ্লাভিকে আসিলো সে অবস্হার সূত্রপাত ঘটায়।
কাজের অংশ হিসেবে লারার প্রশিক্ষক ট্রানজিট প্যাসেঞ্জারদের পাসপোর্ট-ভিসা আসল না নকল সেসব সনাক্তের তরিকা বোঝাতে শুরু করেন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্যাসেঞ্জারদের একে একে ডেকে পাসপোর্ট আসল কী নকল তা মেশিনের নীচে ফেলে পরীক্ষার নমুনা তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে লারা। পর পর কিছু প্যাসেঞ্জারের পাসপোর্ট পরীক্ষার নির্ভুল রিডিং দেখে করিৎকর্মা লারা কাজের ধারা কিছুটা বুঝে যায়। এ কারণেই খট্ করে একজন পাসপোর্টধারীর পাসপোর্টের গড়বড় প্রশিক্ষকের চোখ এড়িয়ে গেলেও লারার চোখের রাডারে ঠিক ধরা পড়ে যায়। প্যাসেঞ্জারটিকে ফের ডেকে নেয়া হয়। জানা যায়, তিনি গিনি বিসাওয়ের নাগরিক আজা। ট্রানজিট রুট আইসল্যান্ড, গন্তব্য কানাডা। দ্বিতীয়বারের পরীক্ষায় নাম ভাঁড়িয়ে নকল ফরাসি পাসপোর্ট বহনকারী আজা ধরা পড়ে যায়। দর্শক আজার মতই ব্যথাতুর নীরব দৃষ্টি মেলে তার উপর আইনের খড়্গ নেমে আসতে দেখেন। পরে জানা যায় সে তার একমাত্র মেয়ে আর বোনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এখান থেকেই শুরু হয় চলচ্চিত্রের আসল গল্প। সেই গল্প খুব সন্তর্পণে সবার উপরে মানবিক সত্য প্রতিষ্ঠার তাগিদ নিয়ে হাঁটতে শুরু করে। এই যাত্রায় সেই সব দরদি দর্শকের মন সহযাত্রী হিসেবে এর গল্পের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ে, যারা ক্ষেত্র বিশেষে খোলা মনে ভাবতে পারেন, ‘ন্যায় অন্যায় জানি নে, জানি নে’, শুধু জানি মানুষের জীবনের মূল্য অসীম। কেননা সন্তানের সঙ্গ হারিয়ে ফেলার আতঙ্কে থাকা বিপদগ্রস্ত মায়ের হাত ধরার জন্য আইনকে পাশ কাটানোর মধ্যে কোনো পাপ থাকে না। কিছু পাপ দিব্যি পূণ্যের মহিমা নিয়ে নেয়। লারা কিংবা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় প্রত্যাশী আজা পরস্পরের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়, সেসব করার জন্য শুধু সাহস থাকলে চলে না। বুকের ভেতর থাকতে হয় মানুষের জন্য গাঢ় মমত্ববোধ আর মানবিকতার এক উদার আকাশ। এই আকাশে চাইলেও কাঁটাতারের বেড়া তোলা যায় না।
কেন করে লারা চরম সেই দুঃসাহসিক কাজটি, যা তার মতো বর্ডার সিকিউরিটি চাকুরের পক্ষে আইনের চোখে মারাত্নক অপরাধ বলে গণ্য হবে? একইভাবে শরণার্থী আজা বিপজ্জনক পরিস্হিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কেন নিজের কাঁধে তুলে নিতে আগ্রহী হয় নেশার মতো বস্তু রাখার দায়ভার? কিংবা শরণার্থী শিবির কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়ি ভাড়া দিতে না পারায় ঘরহীন লারা আর এলডারকে দিনের পর দিন গাড়িতে রাত কাটাতে দেখে আশ্রয় দেয় তার জন্য বরাদ্দ ছোট্ট ঘরে?
প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে নেবার তাগিদ মনে জন্ম নিলে অবশ্যই আপনাকে সিনেমাটি দেখে নিতে হবে। চলচ্চিত্রটি ইতিমধ্যে আইসল্যান্ডীয় উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক সিনেমা অঙ্গনের বোদ্ধাদের কাছ থেকে সমাদর কেড়েছে।
পরিচালক-কাহিনিকার আইসোল্ড উগ্গাদোত্তির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এটি। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএফএ ডিগ্রি অর্জনকারী উগ্গাদোত্তির এর আগে চারটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ২০১০ ও ২০১১ সালে পর পর দুবছর নিজের দেশ আইসল্যান্ডীয় একাডেমি থেকে শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্যের পুরস্কার লাভ করে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক প্রোগ্রামেও তিনি ২০১১ সালে শ্রেষ্ঠ নারী-নির্মাতা হিসেবে সম্মানিত হন। কাহিনির রচয়িতা পরিচালক নিজেই। আইসল্যান্ডসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তের শরণার্থীদের মুখে তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা শুনে তিনি এই কাহিনি রচনায় আগ্রহী হন। কাহিনির প্রয়োজনে চরিত্রগুলোকে যাতে কৃত্রিম মনে না হয় সেজন্য তিনি শরণার্থী হিসেবে যেসব চরিত্র ব্যবহার করেছেন, তাদের বেশিরভাগই এমন সব শরণার্থীর পূর্বপরিচিত। এমন কী শরণার্থীদের পক্ষের আইনজীবী চরিত্রটিও বাস্তবে অভিনয়ের পাশাপাশি এই আইন পেশার সঙ্গেই যুক্ত। ব্যক্তিগতভাবে তিনি পরিচালকের বন্ধুতুল্য পরিচিত জন।
আমার এই আলোচনায় এসব তথ্য অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও উল্লেখ করা প্রয়োজন হল এই কারণে যে, আইসোল্ড উগ্গাদোত্তির নির্মিত এই মানবিক চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে, অনেক কিছু বিবেচনায় নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। চলচ্চিত্রটি সেদিক থেকে পরিচালকের আন্তরিকতা ও মমত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। শুধু সিনেমার খাতির সিনেমাটি তৈরির তাগিদ অনুভব করেছেন পরিচালক, তেমনটা মনে হয়নি।
উপযুক্ত তথ্য প্রমাণের অভাবে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় প্রার্থনার আবেদনটি খারিজ হয়ে যাওয়ার খবরে আজার মুখে তুলে দেয়া তির্যক একটি প্রশ্নাতুর সংলাপ তিনি যেন দর্শকের দিকেও ছুঁড়ে দিয়েছেন। জীবন বাজি রেখে বাতাসহীন বদ্ধ কনটেইনারে ঢুকে ঠিক কোন পরিস্হিতিতে একজন মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাড়ি দেয়- ‘হেথা নয় হোথা নয় অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে’- সেই ভাবনার উপযুক্ত উত্তর খোঁজার দায় দর্শকের উপর নীরবে-নিঃশব্দেই রেখে দিয়েছেন পরিচালক ও কাহিনিকার আইসোল্ড উগ্গাদোত্তির। এ দায়, বলা যায়, দুনিয়া জুড়ে শরণার্থী ট্যাগ বুকে নিয়ে সকাতরে কেঁদে ফেরা আশ্রয় প্রার্থনাকারীদের জন্য কতটা কল্যাণকর, সেই প্রশ্ন না হয় তোলাই থাকলো। কেননা, তাদের ব্যথাটুকু মানুষ হিসেবে অন্য মানুষকেও যেন স্পর্শ করে, এই মানবিক চাওয়াটা আজকের এই দ্বন্দ্ব সংঘাতময় বিরূপ বিশ্বের জন্য ভাবাটা বড্ড জরুরি! ক’জন আমরা সেটা ভাবতে পারি, শিল্পনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারি?
এই সিনেমায় চোখে মায়ঞ্জন মাখিয়ে দেবার মতো তেমন প্রাকৃতিক দৃশ্য নেই। নেই সিনেমাটোগ্রাফির চটকদার কারসাজি। প্রধান তিন চরিত্রের পাশাপাশি আইসল্যান্ডের একেবারে প্রান্তসীমায় অবস্হিত রেইক্যানিজ উপদ্বীপের বিবর্ণ চেহারা, সেখানকার আর্থ-সামাজিক কাহিল দশা, শরণার্থীদের ভিড় ঠেকানোর কৌশল, এই সিনেমার উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও চরিত্র। কাহিনির সাথে তাল মিলিয়ে সঙ্গীতায়োজনে জিসলি গালদুরের বিষন্ন সুরের খেলা দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায়। নীল চোখের ছোট্ট এলডার, যে কিনা বাস্তব দুনিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়, তার চাওয়া বড় হয়ে শীতার্ত রুক্ষ পরিবেশ ছেড়ে, এমন এক উষ্ণ আন্তরিক পরিবেশে চলে যাওয়া, যেখানে দিনমান হাফপ্যান্ট পরেই কাটিয়ে দেয়া যায়। এমন সরল ভাবনার রূপক পেরিয়ে আশ্রয় খুঁজে ফেরা মানুষেরাও হয়ত পৌঁছাতে চাইবেন তেমন এক গোলার্ধে, যেখানে দাঁড়িয়ে শান্তিতে বুক ভরে নেয়া যায় স্বস্তির নিঃশ্বাস। প্রাণে প্রাণে যেখানে বাজবে মঙ্গলবারতা। এই সিনেমায় নানান রূপকাশ্রিত বেশকিছু দৃশ্য দর্শক-মনকে তাড়িত করবে সন্দেহ নেই।
চলচ্চিত্রটির প্রত্যেকের অভিনয়ও যথাযথ হয়েছে বলতে পারি। পিচ্চি এলডার চরিত্রে পাত্রিক নকভি পিটারসন, মায়ের চরিত্রে ক্রিস্টিন থোরা হারাল্ডদোত্তির আর বিশেষ করে আজার চরিত্রে বেলজীয় অভিনেত্রী বেবেদিতা সাজোর অনবদ্য সেলুলয়েডীয় উপস্হাপনা মনে দাগ কেটে যায়। বলা প্রয়োজন, এই সিনেমা যতটা না উপভোগ্য, তার চেয়ে অনেক বেশি অনুভব করার মতো একটি চলচ্চিত্র। কাহিনির ন্যায়-অন্যায় নিয়ে যারা তর্ক জুড়তে চাইবেন আর ট্রাম্প বাবাজির মতো যারা অবৈধ অভিবাসীদের প্রতি একবুক ঘৃণা পুষে রাখতে ভালোবাসেন, এই সিনেমা থেকে তারা নিজেদের দূরে রাখলেই মঙ্গল। চলচ্চিত্রকার আইসোল্ড উগ্গাদোত্তির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য And Breathe Normally চলচ্চিত্রের কিছু গভীর নির্জন প্রশ্নের ইঙ্গিতময়তাও মানবিক এক সিনেমার গল্পই বলে। মুভিটি আমাদের বুঝিয়ে দেয় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কতটা গভীর।