নাহিদ কায়সার > রবীন্দ্রনাথের শেক্সপীয়র-চর্চা >> প্রবন্ধ

0
295

নাহিদ কায়সার > রবীন্দ্রনাথের শেক্সপীয়র-চর্চা

ম্যাকবেথ অনুবাদের সময়ই রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটে ডাকিনি ‘হেকেটি’র সঙ্গে। পরে বউদি এবং অনেকের মতে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীলতার উৎস কাদম্বরী দেবীকে ‘হে’ বলে ‘ভগ্নহৃদয়’ নামের গ্রন্থটি উৎসর্গ করেন। মাত্র সতেরো বছর বয়সের বউদির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ অপার রহস্যময়তার এমন আভাস পেয়েছিলেন যে তাঁর ‘মালতীপুঁথি’ শীর্ষক খাতায় তিনবার ‘বউঠাকুরণ’ না লিখে তিনবারই লেখেন Hecate Thakrun!
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বারা প্রভাবিত হননি এমন কবি-লেখক খুব কমই পাওয়া যাবে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ প্রভাবিত হয়েছেন এমন গুণীজনের সংখ্যাও কম। মহান নাট্যকার ও ষোড়শ শতকের ইংরেজ কবি উইলিয়াম শেক্সপীয়রও কী রবীন্দ্রজীবনে আর কর্মে কোনো প্রভাব ফেলেছিলেন? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা যা জেনেছি তা হল, রবীন্দ্রনাথ শেক্সপীয়রের রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। শেক্সপীয়রের লেখা পাঠ ও চর্চার কথা রবীন্দ্র-জীবনীকাররাই উল্লেখ করেছেন। বর্তমান লেখায় এই বিষয়টিই আলোচিত হবে। কিন্তু তাঁর আগে আমি শেক্সপীয়র সম্পর্কে আমাদের ধারণা কিছুটা হলেও স্পষ্ট করে নিতে চাই। আজ শেক্সপীয়রের জন্মদিনে এই আলোচনা, আশা করছি, পাঠকদের কাছে প্রাসঙ্গিক বলেও বিবেচিত হবে।
শেক্সপীয়র-কথন
পাঠকদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, জন্মের পর চারশো বছর ধরে কী কারণে এই  এলিজাবেথীয় নাট্যকার প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হতে পারেন। আমার আলোচনাটা এখান থেকেই শুরু করতে পারি। হ্যাঁ, কেবল ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী বলেই যে শেক্সপীয়র আমার পছন্দের শীর্ষলেখক তাই নয়, একজন সাহিত্যানুরাগী মানুষ হিসেবেও তিনি আমার পছন্দের লেখক। আমি যা বলতে চাইছি তা হলো তিনি একজন কালজয়ী লেখক। তাঁর নাটকগুলো ঐতিহাসিক নির্দিষ্ট প্লট বা ঘটনাক্রমের অনুসরণে তৈরি। কিন্তু ঘটনাক্রম নয়, তাঁর চরিত্রগুলো একান্তভাবেই তাঁর নিজের সৃষ্টি।  মানবচরিত্র সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতাই এই চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর রচনাবলি যেন মানবমনের আয়না। মনস্তত্ত্বের নিখুঁত শৈল্পিক উপস্থাপনায় শেক্সপীয়রের চরিত্রগুলো অনন্য। এ কারণেই বলা হয়,  শেক্সপীয়র ছিলেন প্রথম মনস্তাত্ত্বিক লেখক আর ফ্রয়েড কেবল তার শিষ্য।
শেক্সপীয়রের সৃজনীপ্রতিভা ট্রাজেডি বা বিয়োগান্তক নাটকে স্পষ্ট। এই কাজটি ইতিপূর্বে কেবল গ্রিক নাট্যকাররাই করতে পেরেছিলেন। অ্যারিস্টটলের ধ্রুপদী গ্রন্থ ‘পোয়েটিক্স’। এই গ্রন্থটি আসলে আর কিছুই নয়, গ্রিক নাট্যকারদের বাছাই করা নাটকের একটি চৌকস পাঠ এবং নাট্যরীতি ও কলাকৌশলের কাঠামো নিয়েই রচিত। কিন্তু তিনি নাটক সম্পর্কে যেসব তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক কথা বলেছেন, শেক্সপীয়রের কলম সেইসব শর্তই শুধু পূরণ করেনি, বরং সেইসব প্রসঙ্গকে ছাড়িয়ে গেছে। গ্রীক নাটকে মানুষের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল ঈশ্বর বা ঈশ্বরতুল্য কোনো শক্তির। মানুষের ভাগ্য ছিল মূলত ঈশ্বরের ইচ্ছাধীন। মানবিক ট্রাজেডিরও ক্রীড়নক হচ্ছে কোনো দৈবশক্তি বা ঈশ্বর।  কিন্তু শেক্সপীয়রের ট্রাজেডিতে মানুষের লড়াই তার নিজের সঙ্গে, নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। ওথেলোর শত্রু তার নিজের সন্দেহপ্রবণতা, ইয়াগো কেবল সেই আগুনে তেল ঢেলেছে। ম্যাকবেথের উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তার পতনের কারণ। লেডি কেবল তার হাতে ছোরা তুলে দিয়েছেন। হ্যামলেটের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তহীনতা তার দুর্ভোগকে বাড়িয়ে দিয়েছে। আর রাজা লিয়র, ৮০ বছর বয়সে একজন শিশুর মতোই আচরণ করে। লিয়র নিজের ধ্বংস ডেকে এনেছিলেন কেবল নিজের বিবেচনাবোধের অভাবে।
কমেডি বা মিলনাত্মক নাটক সৃষ্টিতেও শেক্সপীয়র অনন্য। তাঁর কমেডিগুলোকে নিছক স্যাটায়ার বা বিদ্রূপাত্মক রচনা বলে আখ্যায়িত করার উপায় নেই। এগুলোকে ফার্স বা কৌতুকপ্রদ নাটক বলেও হেলাফেলা করার দুঃসাহস হয় না। তিনি কমেডি সৃষ্টিতে যেমন মনোযোগী ছিলেন, তেমনি ট্রাজেডি রচনাতেও। শেক্সপীয়র এমন একজন বিশ্বনন্দিত লেখক যিনি সাহিত্যের একটি নতুন জ্যঁর বা প্রকরণ সৃষ্টি করে পরবর্তী নাট্যকারদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁর রচিত অ্যাজ ইউ লাইক ইট রোমান্টিক কমেডির এমন এক নমুনা হয়ে আছে, যার প্রভাব পরবর্তী কালের নাট্যকার বা চলচ্চিত্র নির্মাতারা এড়িয়ে যেতে পারেননি। মার্চেন্ট অফ ভেনিস এবং মেজার ফর মেজার-এর মতো নাটক লিখে শেক্সপীয়র ট্রাজি-কমেডি বলে নতুন একধরনের জ্যঁর সৃষ্টি করে গেছেন। এর প্রধান চরিত্রগুলো প্রথমে চরম অনিশ্চয়তা ও হুমকির মুখে পড়ে এবং সবশেষে বড় কোনো শাস্তির শিকার না হয়ে বের হয়ে আসে। রচনাটির শেষটা মিলনাত্মক বলে একে ট্রাজি-কমেডি আখ্যা দেয়া হয়েছে।
শেক্সপীয়রের সনেট-শিল্প নিয়ে আমার মুগ্ধতা প্রকাশের জন্য আজকের এই ছোট্ট লেখাটি যথেষ্ট নয় বলে আমি মনে করি। কবিতার পাঠক আর সাহিত্যের শিক্ষক ও সমালোচক হিসেবে আমি শেক্সপীয়রের সনেটকে পৃথিবীর অন্যতম সেরা সৃষ্টিশীল রচনা বলতে চাই। সনেটের স্রষ্টা যদিও ইতালীয় কবি পেত্রার্ক। কিন্তু শেক্সপীয়র তাকে লালনপালন করে এমন একটা পরিণত রূপ দিয়েছিলেন যে এই সাহিত্যরীতি বা ফর্মটি কাঠামোগতভাবেই আলাদা উচ্চতা লাভ করে। ইতালীয় সনেটের অষ্টক ও ষষ্টকের কাঠামো ভেঙে দিয়ে শেক্সপীয়র তিনটি চার লাইনের স্তবক আর একটি দুই লাইনের কাপলেট উদ্ভাবন করেন। একারণেই বিষয় ভাবনা ও কাঠামোর দিক থেকে  অভিনব তার সনেটগুচ্ছ। এই সনেটগুচ্ছে মানবীয় অনুভব, মৃত্যু, আত্মআশ্রয়ী প্রেম, দেহাশ্রয়ী প্রেম, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য- এর কোনকিছুই বাদ যায়নি। ফলে, তাঁর সনেটগুচ্ছের বিশুদ্ধ বঙ্গানুবাদ প্রায় অসম্ভব বলে আমি মনে করি।
স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, শেক্সপীয়র একজন কালজয়ী লেখক আর তিনি যে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল সত্তায় অভিঘাত তুলবেন, সেকথা সহজেই বলা যায়।
রবীন্দ্রনাথের শেক্সপীয়র
এই প্রবন্ধের পূর্ববর্তী অংশে সংক্ষেপে শেক্সপীয়রের সৃজনীসত্তা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, এবার রবীন্দ্রনাথ শেক্সপীয়রের দ্বারা কতটা কিভাবে প্রাণিত হয়েছিলেন, সেই প্রসঙ্গ। আসলে শেক্সপীয়র বিশ্বসাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তাঁকে নিয়ে স্তব করেননি এমন লেখক-কবি খুঁজে পাওয়া যাবে না। ব্রিটিশ শাসনামলে যখন ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজি সাহিত্যের চর্চা শ্রেণি ও বিশেষ রুচিবোধের নির্ণায়ক হয়ে উঠেছিল, তখনও ঠাকুর পরিবারের মূল ভাবনা ছিল এটাই : আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শেখার পত্তন।
রবীন্দ্রনাথের জীবনেও তাই ঘটেছিল। তাঁর শেক্সপীয়রচর্চা শুরু হয় একজন গৃহশিক্ষকের প্রেরণায় ম্যাকবেথের কাহিনির প্রথম দৃশ্য অনুবাদের মাধ্যমে। অনুবাদটি বিদগ্ধজনের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে তিনি পুরোটা অনুবাদ করেছেন কিনা জানা যায়নি। শেক্সপীয়রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক পরিচয় ঘটে মূলত ইংরেজি ভাষা শিখতে গিয়ে। ১৮৬৮ সালের জুলাই থেকে রবীন্দ্রনাথ আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজি শিক্ষা শুরু করেন। যে শিক্ষকের হাতে তাঁর ইংরেজি শিক্ষার সূচনা ঘটে তিনি হচ্ছেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়। তিন অন্য দুই বালকের সঙ্গে বালক রবীন্দ্রনাথকে পড়াতে আসতেন সন্ধ্যার পর। একে ইংরেজি একটা বিজাতীয় বিষয়, তারপরে শিখতে হতো সন্ধ্যাবেলায়, শরীর তখন ক্লান্ত, ফলে শিক্ষক অঘোরবাবুর সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, মাস্টারমশাই মিটমিটে আলোয় পড়াতেন প্যারী সরকারের ফারস্টবুক। প্রথমে উঠতো হাই, তারপর আসত ঘুম। তারপর চলতো চোখ রগড়ানি। (ছেলেবেলা)
স্কুলবিমুখ রবীন্দ্রনাথ ইতিমধ্যে তিনটি স্কুল ত্যাগ করে এসেছেন। রবির শিক্ষালাভ তাই কতটা কী হচ্ছে তাই নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ। শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করা হলো নতুন একজন শিক্ষক জ্ঞানচন্দ্র ভট্টাচার্য়কে। ইংরেজি পড়ানোর সময়টাও বদলে গেল- সন্ধ্যার পরিবর্তে সকালে। জ্ঞানচন্দ্র স্কুলের পাঠ্যপুস্তকগুলো বাদ দিয়ে ইংরেজি ভাষা শেখাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যের অন্দরমহলে আহ্বান জানালেন। সংস্কৃত ভাষার শিক্ষক না হয়েও ‘কুমারসম্ভব’ পড়ালেন। ‘ম্যাকবেথ’ মানে করিয়ে বুঝিয়ে তার ছন্দোবদ্ধ বাংলা অনুবাদ করতে দিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন :
ইস্কুলের পড়ায় যখন তিনি কোনোমতেই আমাকে বাঁধতে পারলেন না, তখন হাল ছাড়িয়া দিয়া অন্য পথ ধরিলেন। আমাকে বাংলায় অর্থ করিয়া কুমারসম্ভব পড়াইতে লাগিলেন। তাহা ছাড়া খানিকটা করিয়া ম্যাকবেথ আমাকে বাংলায় মানে করিয়া বলিতেন এবং যতক্ষণ তাহা বাংলা ছন্দে আমি তর্জমা না করিতাম ততক্ষণ ঘরে বন্ধ করিয়া রাখিতেন। (জীবনস্মৃতি)
ম্যাকবেথ তর্জমার কিছুটা বিনা নামে ‘ভারতী’ পত্রিকায় ছাপা হয়। শুধু তাই নয়, রামসর্বস্ব পণ্ডিতের সঙ্গে গিয়ে বিদ্যাসাগরকেও এই তর্জমার কিছুটা রবীন্দ্রনাথ শুনিয়ে এসেছিলেন। আর তাঁকে শুনিয়ে কিশোর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে উদ্দীপনারও সৃষ্টি হয়েছিল; তাঁর নিজের কথায়, “বোধ করি কিছু উৎসাহ সঞ্চয় করিয়া ফিরিয়াছিলাম।” লক্ষণীয়, দুই প্রান্তের দুই মহাকবি- কালিদাস ও শেক্সপীয়রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছিলেন শিক্ষক জ্ঞানচন্দ্র। স্কুলের পাঠ্য বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ জন্মাতে ব্যর্থ হলেও ভাষাশিক্ষক হিসেবে জ্ঞানচন্দ্র সফল হয়েছিলেন নিঃসন্দেহে। এই অনুবাদচর্চাও যে রবীন্দ্রনাথের কাব্যপ্রতিভা বা সৃজনীপ্রতিভা বিকাশে সহায়ক হয়েছিল, বলা যায় সেকথাও।
শুধু ভাষাশিক্ষা নয়, ‘জীবনস্মৃতি’র পাঠকমাত্রই জানেন, ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগের কথা তিনি বলে গেছেন। সংস্কৃত সাহিত্য, বিশেষ করে কালিদাসের সাহিত্য, শেক্সপীয়রের নাটক ও ইংরেজি রোমান্টিক সাহিত্য, ওড-সনেট ইত্যাদি সাহিত্য-প্রকরণ এবং ইতিহাসের যেসব ঘটনা সাহিত্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সে সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন।
ডাকিনি হেকেটি ও রবীন্দ্রনাথ
ম্যাকবেথ অনুবাদের সময়ই রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটে ডাকিনি ‘হেকেটি’র সঙ্গে। পরে বউদি এবং অনেকের মতে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীলতার উৎস কাদম্বরী দেবীকে ‘হে’ বলে ‘ভগ্নহৃদয়’ নামের গ্রন্থটি উৎসর্গ করেন। মাত্র সতেরো বছর বয়সের বউদির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ অপার রহস্যময়তার এমন আভাস পেয়েছিলেন যে তাঁর ‘মালতীপুঁথি’ শীর্ষক খাতায় তিনবার ‘বউঠাকুরণ’ না লিখে তিনবারই লেখেন Hecate Thakrun! কাদম্বরী দেবী ‘অলীকবাবু’ নাটকের নায়িকা ‘হেমাঙ্গিনী’ সাজার পর পুরুষমহলে হেকেটি ডাকনামের সূত্র ধরে তিনি জনপ্রিয়তা পেয়ে যান। এই হেমাঙ্গিনীর ‘হে’ আর হেকেটির হে-ই পরবর্তী কালে ‘ভগ্নহৃদয়’ গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে ‘শ্রীমতি হে’ নামে অমর হয়ে আছে। ‘হে’ রবীন্দ্রগবেষকদের মতে ম্যাকবেথের ডাইনি হেকেটির সংক্ষিপ্ত রূপ। অবশ্য এ নিয়ে ভিন্নমতও পোষণ করেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, রবীন্দ্রনাথ কাদম্বরীকে ‘হে ’ সম্মোধন করতেন হেমাঙ্গিনীর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে। উল্লেখ্য, হেমাঙ্গিনী হচ্ছে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লেখা নাটকের নায়িকা।
১৮৭৮ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন আইন পড়ার জন্য প্রথম লন্ডনে যান, তখনও তাঁর শেক্সপীয়রের রচনা পাঠের সুযোগ ঘটে। সেখানে শিক্ষক হেনরি মরলের বিদগ্ধ সঙ্গ পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ এবং এই সুবাদে পাঠ করেছিলেন শেক্সপীয়রের নাটক। রবীন্দ্র-গবেষক উজ্জ্বলকুমার মজুমদারের ‘রবীন্দ্রনাথের পড়াশোনা’ শীর্ষক বইয়ের তালিকায় অবশ্য শেক্সপীয়রের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না।
এই মহান ইংরেজ নাট্যকারের প্রতি এশিয়ার কিংবদন্তি রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধা আরও একবার প্রকাশ পায় ১৯১৬ সালে প্রকাশিত ‘বলাকা’র একটি সনেটে। এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী কবি তাঁর বন্ধু পিয়ারসনকে উৎসর্গ করেছেন এই কাব্যগ্রন্থ। এই শ্রদ্ধাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঘটনাটি এখানে উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৪ সালে যখন কলকাতা আর্ট সোসাইটি শেক্সপীয়রের ত্রিশত জন্মবার্ষিকী উদযাপন করছিল, তখন তাঁরা শেক্সপীয়র সেন্টারকে একটি ফলক উপহার দেন। সেই ফলকটিতে রবীন্দ্রনাথের কবিতার পাণ্ডুলিপি ও তাঁর নিজের ইংরেজি অনুবাদ খোদিত ছিল। তিন দশক পরে লন্ডনের ভারতীয় দূতাবাসের চোখে পড়ে ফলকটি।
পরবর্তীকালে রবীন্দ্রভক্ত আর শেক্সপীয়রের প্রবল অনুরাগী শিক্ষাবিদ এল এম সিনথিয়া দুই মহান কবির ভক্তদের জন্য এক চমৎকার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি ১৯৯৬ সালে শেক্সপীয়রের স্টামফোর্ড প্রাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করেন। আর এভাবেই শেক্সপীয়র ও রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন প্রতিবেশী। বিশ্বসাহিত্যে এই দুজনই এখন স্বনামখ্যাত লেখক। পরস্পরের প্রতিস্পর্ধী নন, পরিপূরক সৃজনীসত্তার দ্বারা পাঠকদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত।
আজ শেক্সপীয়রের জন্মদিন। তাঁর প্রতি এই শেক্সপীয়র অনুরাগীর অপার শ্রদ্ধা।