নাহিদ ধ্রুব > কবিতাগুচ্ছ

0
427

[সম্পাদকীয় নোট : ৩ ডিসেম্বর কবি নাহিদ ধ্রুব’র ২৭তম জন্মদিন উপলক্ষে তীরন্দাজে শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ তার একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশিত হলো।]

লুপ

হাওয়ার জমায়েতে তাল দিতেছে শোক
গোলকধাঁধাঁয় আটকা পড়েছে নুড়ি —
কেঁপে উঠিলো ট্রেনলাইন নিজে থেকে
ফাঁস হয়ে গেলো বেহাগের জারিজুরি!

জগতেরে ছেড়ে গিয়েছে জগত চলে
কালকেন্দ্রিক পথচ্ছেদ হয়েছে একা
গুপ্ত মনের অনুপ্রবেশে মানুষ —
নির্মম চোখে — দেখতেছে ঝরাপাতা!

গাছ হয়ে মানুষ — জঙ্গল খুঁজে মরে
ঝোপঝাড় কেটে তৈরি করে পথ —
জঙ্গলে তারে হারায়ে ফেলার পরে,
দেখি চলে যাচ্ছে শববাহকের রথ!

তাদের গন্তব্য ঠিক করে দেয়া আছে
সমবেত সকলের চোখে আছে ধাঁধা
কণ্ঠবিয়োগে সোচ্চার মড়কের বেশে
প্রান্তরে প্রান্তরে পড়ে আছে শুধু বাধা

ছায়াদের মিতালি ভালো লাগেনা তাই
রোদ্দুর দেখে সূর্য চলেছে বাড়ি —
গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ন্ত্রণ করতেছে যারে
জগত তারে দেয় নাই কানাকড়ি!

 

সমান্তরাল

গাছ, তুমি ব্যথা পাইলে আমারে বইলো,
আমি তোমার থিকাই পাতা ছিঁড়ে —
হামানদিস্তায় পিষে পিষে তোমারে খাওয়াবো।
তাতে ক্ষয় হবে কিছু বটে,
একটা ক্ষত মুছতে গিয়া আরেকটা ক্ষত হবে;
এইভাবেই, হয়তো শাপমোচন হয় —
পৃথিবী আর ক্ষত — একদিকে নত,
সমান্তরালে রয়।

 

নৈরাশ্য

ছায়ার ভেতর ঢুকে যাইতেছে অন্ধকার —
তারে আগায়ে দিতে আসছিল লণ্ঠনের আলো
আমরা দু’জন হাঁটতেছিলাম দূরে,
অকস্মাৎ বনের গহীনে বিদ্যুৎ চমকালো ;

গাছ চেপে ধরলো পাতাদের হাত —
শব্দ কইরা চলে গেলো অপরাজিতা হাওয়া,
ফুল নিজেই খেয়ে নিলো সবটুকু মধু,
তোমারে দেওয়ার মতো কিছুই থাকলো না।

তখন ছাইয়ের ভেতর কাঁদতেছে আগুন,
নক্ষত্রের কাঁপন ছড়ায়েছে চক্ষুহীন আকাশে —
এইভাবেই জগতে নৈরাশ্য আসে,
মৌতাতের গভীরে বিচ্ছেদ টেনে!

 

কিশলয়

ধানমন্ডি লেকের পাশ দিয়া হাঁইটা যাওয়ার সময় ইদানীং প্রায়শই মনে হয়, যেখানটায় গজাইছে নতুনত্বহীন দূর্বাঘাস — নলখাগড়া, সেইখানে একটা পাক-পবিত্র ডুব দিয়া আসি। তারপর — ভীষণ কাফনের কাপড় গায়ে জড়ায়ে বসিয়া থাকি মানুষের কিশলয়ে। রবীন্দ্র সরোবরে — যেইখানে পোলাপান গান- বাজনা করে আর পরিযায়ী প্রেমিক দল উইড়া আসে গোল্লাছুটের মতন — সে প্রশস্ত দলে ভিড়িয়া যাই — হাওয়া কথান্তর শুনি, তাদের সুখেদুঃখে ভাগ বসাই — চা খাই দহরমমহরম ; এইভাবে সন্ধ্যা নামিলে ফাঁসির আসামীর বুকের ধুকপুকানি নিয়া আমি ক্রমশ অন্ধজলে মিলায়ে যাই। মনের গোলচত্বর ধরিয়া দিগবাজি খাই — মনে হয় কাটাই এক মৃত মানুষের জীবন। যে জীবিত বোধ নিয়া আমি পার করিয়াছি কতকাল, হাঁইটা গেছি এই পথে একা একা — মৃত মানুষের বিষণ্ণ ছায়ার মতন।

 

মনোলেখ

ব্যর্থতায় চোখ রেখে দেখো জীবন ক্যামনে
আয়ুরোধ করে; আসলে কোথাও কিছু নাই
শুধু একপ্রাণে চুপচাপ বইসা থাকা —
মোহময় অপেক্ষার কাছে গিয়াও মানুষের
থাকে গন্তব্যের তাড়াহুড়া; আর অহেতুক
সম্পর্কস্থাপন — মন, কেন যে কখনো মানে
না কোন বারণ! শুধু করে আয়োজন,
হেরে যাওয়ার, ভুলে যাওয়ার, মরে যাওয়ার,
মানুষ সামাজিক — ঈষৎ হাস্যকর;
তবুও, সকলেই হতে চায় সকলের সহায় —
জগতে আসলে কিছুই নাই, শুধু,
মানুষে মানুষে ব্যর্থতার মনোলেখ রয়ে যায়!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here