নীলাব্জ চক্রবর্তী > আগুন আবিষ্কার ও অন্যান্য : আমার ব্যক্তিগত শহীদুল জহির নিয়ে সামান্য কয়েকটা কথা >> জন্মদিনে স্মরণ

0
232

নীলাব্জ চক্রবর্তী > আগুন আবিষ্কার ও অন্যান্য : আমার ব্যক্তিগত শহীদুল জহির নিয়ে সামান্য কয়েকটা কথা >> স্মরণ

“বাংলাভাষা, আপনি এখনও গর্ব অনুভব করেন তো ওই ১৮-১৯ পাতার গল্পটির জন্য?…”

প্রিয় গদ্যকার তো অনেকেই। কিন্তু, প্রিয়তম, একজনই। শহীদুল জহির। এ আর কখনও নড়চড় হবে না মনে হয়। দ্বিতীয়জন, জানিয়ে রাখা যাক, অমিয়ভূষণ মজুমদার; মূলতঃ, ওঁর ‘ফ্রাইডে আইল্যাণ্ড অথবা নরমাংস ভক্ষণ এবং তাহার পর’ উপন্যাসটির কারণে। যাই হোক, যেটা বলার, শহীদুল জহিরকে শুধু আমার প্রিয়তম গদ্যকার বললে যেন সবটা বলা হয় না; ওঁকে নিয়ে আমার অবসেশনটা, উচ্ছ্বাসটা সবটা বোঝানো হয় না। এদিকে ঘটনা হল, আমার শহীদুল জহির আবিষ্কার কিন্তু একেবারেই আকস্মিক। সম্ভবতঃ বছর আড়াই আগে আহমদ ছফা সাহেবের ‘অলাতচক্র’ বইটা পড়ে তাৎক্ষণিক পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখেছিলাম ফেসবুকে। এমনিই লিখেছিলাম। সেই পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে, বন্ধুজন, কবি শৌভ চট্টোপাধ্যায়; আমায় শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’-র কথা জানায়। সেই শুরু। শহীদুল জহিরের সমস্ত লেখা একে একে পড়ে ফেলি তারপর। বিস্মিত হই, আক্রান্ত হই, গ্রস্ত হই… হতেই থাকি। ব্যক্তিগতভাবে, আমার চূড়ান্ত এক আবেগের নাম হয়ে ওঠেন শহীদুল জহির।
কোথাও কেউ শহীদুল জহির নিয়ে কথা বললে সে আমার আত্মীয়, এরকম মনে হয় এখন আমার। আমি তো অ্যাকাডেমিকভাবে, প্রথাগতভাবে; সাহিত্যের ছাত্র নই। আমার ক্ষমতা, বা প্রকারান্তরে ধৃষ্টতা নেই শহীদুল জহির সাহেবের কাজের সামগ্রিক মূল্যায়ন করার। আমি আমার মতো করে, নিজের ভাবা কয়েকটা জিনিস একটু লিখে রাখি বরং এখানে…
সংগ্রহে পিডিএফ রয়েছে, এমনকি বইটার পুরোটাই পড়া হয়ে গেছে, তারপরেও বইটার হার্ড কপি কিনে ফেললাম, এরকম তো আর অজস্র বইয়ের ক্ষেত্রে হয়না… আপাতত এমন একটাই বইয়ের নাম মনে পড়ছে… শহীদুল জহিরের ‘ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প’… আসলে, কবিতার বইয়ের একটা রিপিট-রিডিং ভ্যালু থাকে সাধারণত। বারবার পড়া যায়, যখন-তখন। গল্প-উপন্যাসের বই, দেখা যায়, সেই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত।
স্রেফ নিটোল একটা গোলগাল গল্প পড়বেন বলে একাধিকবার পড়বেন কোনও গল্পের বই? বা, উপন্যাস? হা হা… ইউজ অ্যাণ্ড থ্রো বেশিরভাগই। তবে, হ্যাঁ, সেইসব চিরপ্রণম্য ব্যতিক্রমেরা, ওহ! যেখানে গল্পটার চেয়েও যেন গল্প বলার কায়দাটা মুখ্য; অর্থাৎ, কনটেন্টের চেয়েও সিনট্যাক্স। হ্যাঁ। ধরুন শহীদুল জহির। বারবার। ওঁর লেখা প্রায় সবকিছুই বারবার পড়া যায়।
ধরুন এই যে ‘ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প’ বইটার কথাই। ওই বইটা থেকেই ধরুন না কেন ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ গল্পটা। হ্যালো বাংলাভাষা, কেমন আছেন? আপনার মনে আছে তো আজ থেকে ২৪ বছর আগে শহীদুল জহিরের লেখা ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ নামের গল্পটির কথা? বাংলাভাষা, আপনি এখনও গর্ব অনুভব করেন তো ওই ১৮-১৯ পাতার গল্পটির জন্য? স্বীকার করেন তো, যদি অকালপ্রয়াত শহীদুল জহির (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ থেকে ২৩ মার্চ ২০০৮) তাঁর স্বল্প জীবনে আর কিচ্ছু না লিখে শুধু ওই একটিই গল্প লিখতেন, তাহলেও তিনি পুরোপুরি শহীদুল জহির হয়েই স্বমহিমায় থাকতেন?
আমি ঠিক ভাল লোক না। এই পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত রাষ্ট্রের যেসব পণ্ডিত, লেখক, পাঠক বাংলাভাষায় অন্যরকম গদ্যের কথা, গদ্যকারের কথা বলতে গিয়ে সুবিমল, সন্দীপন, কমলকুমার ইত্যাদি প্রভৃতি বলতে থাকেন, কিন্তু কিছুতেই একবারও, ঘুণাক্ষরেও শহীদুল জহির বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা আহমদ ছফা-র নাম উল্লেখ করেন না, তাঁদের পাণ্ডিত্য, লেখা, পাঠ – সবকিছুতেই আমি এখন সন্দেহ করি। নানারকম সন্দেহ। গভীর গভীরতর সব সন্দেহ। অথবা কে জানে, আমি তো আমিই, নানারকম বিভ্রান্তির ভেতরে, অপশনের ভেতরে, সবটা কি মনে রাখতে পেরেছি না কি, বা হয়তো সত্যিই পড়িনি এর আগে, এরকম, কখনো, ধরা যাক ‘মুখের দিকে দেখি’ শহীদুল জহিরের সেই উপন্যাসের মতো জটিল, অদ্ভুত ভাষা ও বিন্যাসের আখ্যান সেভাবে, ফলে মনে হতে থাকে, মনে থেকে যায় অনেকদিন সেই চানমিঞা, জুলি, মামুন, খরকোস অথবা কুতুবমিনার অথবা আইবেক, খৈমন, ময়নামিঞা, রাজাকার আব্দুল গনি, মিসেস জোবেদা রহমান, বান্দরবাহিনি; একবার নারিন্দার ভূতের গলিতে যাওয়া লাগবে কখনো ঢাকা গেলে – এরকম মনে হয়, আসলে গল্পের মধ্যে গল্প, একসাথে অনেকরকম সময়, হয়তো তা না, কে জানে আসলে একটাই সময় হয়তো সবটাই, হতেও তো পারে, মধ্যে মধ্যে অ্যাবসার্ডিটি, সম্ভাব্যতা মানে প্রতিসম্ভাব্যতা মানে এভাবে প্রতিমুহূর্তে তছনছ হওয়া একটা গল্পের মানে, তবে, খালি মনে হয় উনি লেখাগুলির নাম দেওয়ার ব্যাপারে হয়তো তাড়াহুড়ো করতেন, বা হয়তো তেমন কিছু না, হয়তো অনেক ভেবেচিন্তেই নামগুলি এরকম রাখতেন তিনি, কি জানি…
পাঠিকা-পাঠককে একটা বিভ্রান্তির মধ্যে নিয়ে যায় শহীদুল জহিরের লেখা। তাঁর নির্মিত প্রায় সমস্ত গল্প ও উপন্যাস যেন, এই সঙ্কটে ফেলে দেয়। অপশনস রাখা পছন্দ করতেন শহীদুল, নিজেই বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে। তাঁর চরিত্ররাও প্রায়শই বিভ্রান্ত, ফলত, পাঠিকাপাঠকও। চরিত্রদের নাম নিয়ে, গন্তব্য নিয়ে, উদ্দেশ্য নিয়ে, সময় নিয়ে – বিভ্রান্তি তৈরি করা ওঁর নখদর্পণে ছিল। জটিলতা নির্মাণে ছিল অনায়াস সারল্য ও সাবলীলতা। এবং, নির্মাণ নিয়ে নানা পরীক্ষাতেও তাই। ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ গল্পটির কথা আরেকবার একটু বলি। এই গল্পে কোথাও কোনও দাঁড়ি নেই। এমনকি শেষেও না, হুঁ, নির্মাণ!
হে পাঠিকা-পাঠক, আপনি হয়তো ভাবছেন নির্মাণ এক ওপেন-এণ্ডেড কৌশল তাহলে! এবং, ঘটনা হল, নির্মাণকৌশলের নানা মোচড়ে, কার্যত, তাঁর প্রায় সমগ্র সাহিত্যকর্ম জুড়েই আমরা দেখি, গল্প আর গল্পের ভেতরের বিভিন্ন এলিমেন্টের মধ্যেকার যে যাতায়াত, যে সেতু, তা ইচ্ছাকৃতভাবে গুলিয়ে দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও ভেঙে দেওয়া হয় অন্তর্বর্তী লজিক্যাল রিজনিং। আর, নিশ্চিতভাবেই, ন্যারেটিভের নিশ্চিন্ত রুটম্যাপকে আক্রমণ করা হয় বারবার।
লক্ষ করি, বিভ্রান্তি তৈরি করতে করতে, নানারকম অপশন রাখতে রাখতে, শহীদুল, এত কিছুর পরেও, কীভাবে মানুষের কথা লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের কথা তাঁর কলমে অনেকবার এসেছে। অত্যাচারের বীভৎসতার কথা, ভয়ের কথা; আবার সাহসের কথা, লড়াইয়ের কথা। মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বর্ণনার চেয়েও বেশি করে তাঁর লেখায় উঠে এসেছে বিভিন্ন চরিত্রের মনে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও তার আফটার-এফেক্টসের কথা। নানাভাবে ভালোবাসা ও বেদনার গাথাই লিখে গেছেন তিনি। নানারকম ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের কথাও বটে। একের মধ্যে বহুকে আর বহুর মধ্যে এককে খুঁজতে খুঁজতে শহীদুল, বস্তুত, লিখেছেন মানুষের অসহায়তার কথাই। ক্ষমতার কাছে, রাজনৈতিক পেশীশক্তির কাছে, এমনকি স্মৃতির কাছে; অসহায়তার কথা। লিখেছেন অত্যাচারিত, বিপন্ন, প্রান্তিক, সংখ্যালঘু মানুষের কথা। সংখ্যালঘু শব্দটিকে শুধু এর ধর্মীয় আঙ্গিক ও তাৎপর্যের বাইরেও, এক বৃহত্তর ও উন্মোচিত পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণ করার কথা একবার ভেবে দেখুন হে পাঠিকা-পাঠক। আমরা সবাই, প্রত্যেকে, আসলে, কোনও না কোনওভাবে, কোনও না কোনও পরিস্থিতিতে, বিপন্ন এবং সংখ্যালঘু, নই? শহীদুল জহির (ভাল কথা, জন্মসূত্রে ওঁর প্রকৃত নাম শহীদুল হক), সেটাই বারবার মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন বলে আমার মনে হয়। সে আপনি ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ উপন্যাসটার কথাই ভাবুন; বা ‘প্রথম বয়ান’ বা ‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’ বা ওঁর অন্য কোনও গল্পের কথা। এভাবেই শহীদুল জহিরের নিজস্ব রীতিতে, পরীক্ষায়, ভাষায়, সিনট্যাক্সে রচিত কাহিনিগুলো, আসলে, কোথাও না কোথাও আমাদের সবার কাহিনি হয়ে উঠতে চেয়েছে। সেখানেই এই রচনাগুলির অন্য আরেকরকম সার্থকতা।

কলকাতা, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

লেখক পরিচিতি 
কবি। বসবাস পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। প্রকাশিত গ্রন্থ : পীত কোলাজ নীলাব্জ (২০১১), প্রচ্ছদশিল্পীর ভূমিকায় (২০১৪), লেখক কর্তৃক প্রকাশিত (২০১৭), আপনার বার্গার আরও (২০১৮), কোনও চরিত্র কাল্পনিক নয় (২০১৯)।