পরিতোষ হালদার ও শ্বেতা শতাব্দী এষ >> কবিতাগুচ্ছ

0
266

পরিতোষ হালদার >> গুচ্ছকবিতা

সিমেট্রি রোড
জীবনানন্দ প্রতিদিন তরঙ্গ সাজান, তারপর নক্ষত্র পুড়ে গেলে পরে থাকে পেতলের ছাই।
কাটা রসনার কাছে আরও কিছু হেতালছায়া।
কেউ ডাক দিলে, অবিরাম শূন্য থেকে বেরিয়ে আসে মাল্টিলিরিক। ত্রিমাত্রিক ময়ূর তবু নাচ খুলে রাখে, সামনে অসংখ্য যুগলতারা।
সুরঞ্জনা প্রতিদিন ঘাস হয়ে যায়, একটি যুবক থেকে আরেকটি যুবকের দিকে তার লম্বা অরণ্যরেখা।।
ওপারে সেনহাটি গ্রাম, শ্রীমতি লাবণ্য গুপ্তের বাড়ি। জীবনানন্দ আজও হেঁটে যান সিমেট্রি রোড ধরে ডাকবাংলোর দিকে।
ভুল
ডিসেম্বর থেকে পাখি আসে, যেতে যেতে তারা মার্চকে খুন করে দেয়, তাই বাসবি দাঁড়িয়ে থাকে একা।
সমস্ত শরীরে ফুটে ওঠে অদ্ভূত সব তারিখÑজলদস্যুর লিবিডো ভ্রমণ। অথচ নিজেকে সে করুণাময় অন্ধকার ভাবেÑডাকনামের মতো নির্জন।
যদি খুব দ্রুত মুছে যায় স্পর্শের দাগ, যদি পাথর থেকে লাফিয়ে পড়ে পাপ ও পূন্যের যুগল দস্যুতা।
এরূপ অসংখ্য যদির পরে, যদি উড়ন্ত সসার থেকে ডাক দেয় কোন ভার্সুয়াল পুরুষÑ
বাসবি তাকে জীবনানন্দ বলে ভুল করতেই পারে।
আলোকবাজি
ঝরে পড়ে সেওতো শিশিরকুচি, ভোরের চুমুক ফেলে যায়…যুবকেরা যায়Ñযাদের শরীরে আঁকা দ্বাবিংশের ট্যাটু।
জীবনানন্দও সংখ্যার মতোÑএকা ও অমৃতলিঙ্গম।
তবু রোদ্দুর প্রতিদিন ফুল হয়ে ফোটে।
অবিরাম কান্নার কণা, তারে ও সেতারে তার প্রতিধ্বনি বাজে। সুরঞ্জনা যায়, যুবকের পথ ধরে অধিক দূরে।
ছায়াবার্ষিকী শেষে জীবনানন্দ ডাকে, আর ঘুম খুলে দেখে নেও কল্পের আলোকবাজি।
চিল
একটু কোলাহল তবু ফতুয়ার পকেটে চিকচিক নির্জন। হেঁটে গেলেন তিনিÑশান্ত অথচ উপনিবাস, পাথরের কাছাকাছি একটি পাথর।
কেউ কী দেখেছে তারেÑনা জুঁই, না কি দুর্বিনিত সন্ধ্যাবেলা।
ওই দিকে জেব্রাজগৎÑওই দিকে আবহমান চিল।
পেছনে গৃহস্থালী, টেবিলভর্তি সসেমিরা আর ছোট বোনের মতো রোদÑ
আর ঘাস
আর একদল ট্রাজিক যুবক।
অথবা জোড়াসাঁকোর কাছে পড়ে থাকা হরিণশিশু।
যাই বলেই চলে গেলেন তিনি; মাঝখানে মন্থর ট্রামÑ
অন্ধকার…
যার দুই পাশে পড়ে থাকে হেমন্তের ছায়া।
ঋকলিপি
বাসবি নন্দী ডাকেÑআয় সখা, হেমন্তের চন্দ্রকণা। ওইতো অসীমগুচ্ছ, শঙ্খচিলের মাঝে আমাদের ছায়ার পাতন।
এখানে সন্নাস ফোটেÑউপমানে না আগুন, না হয় বাউললতা। এখানে ঝাপসা হয়ে আসে রোদ, রঙ্গ ও রুদ্রমায়া।
একজন মৌনি দেখো সারেঙ্গী বাজায়, মৃত্যু তার সহোদর বোন।
সুচরিতা জানেনা- ওইতো জীবনানন্দ যায়, ভুবনরেখাও যায়…। শুধু বাসবি নন্দী জানে, প্রানের কোথায় ঋকলিপি জাগে।
তবু ঘুমাতে দাও তারে, ভেজা নীহারিকা, একা একা কার্তিকের রাত।
পরিতোষ হালদার >> পরিচিতি

প্রধানত কবি। উপন্যাসও লিখেছেন। জন্ম বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানার আন্ধারমানিক গ্রামে। বাবা মতিলাল হালদার, মা চারুবালা হালদার। পরিতোষের পেশায় শিক্ষক।
প্রকাশিত গ্রন্থ
কবিতা >> আগামী যুদ্ধের তারিখ, শব্দজলের ছবি, উত্তর বয়ান, নৈঃশব্দ্যের জলতৃষ্ণা, তীব্র নৈর্ঋত, মা, আপেল গড়ানো রাত, রাত ও রঙ্গনরেখা।
উপন্যাস >> গাঙপরান, চুকনগর।
যোগাযোগ : পরিতোষ হালদার। সরকারি মুকসুদপু কলেজ। মুকসুদপুর। গোপালগঞ্জ।
ফেসবুক https://www.facebook.com/photo.php?fbid=2096143730455916&set=a.100547456682230&type=3&theater

শ্বেতা শতাব্দী এষ >> কবিতাগুচ্ছ
জলবিরাগী
কী আর করবো! নিউরন ধরে সংকেত আসে সূর্যপতনের—
এমন ঘোরতর বৃষ্টিদিন
হঠাৎই শুরু হয় কর্কটক্রান্তি জুড়ে—
কোনখানে দাঁড়ালে পাবো জলের আড়াল
সন্তরণ শিখিনি যেখানে!
সূর্যের কেন যে ছায়া নেই— এই বৃষ্টিপথে যেতে যেতে
কেবলই মনে হয় একটা ছায়ামেদুর সূর্য
এঁকে দেই হিমগ্রস্ত পৃথিবীর কপালে!
ধূলিদৃশ্যের দিকে
*
অনেক যত্নের পরও ফোটার অধিক দ্বিধা ঝরে পড়ে
বাগান ক্রমশ দূরবর্তী হারিয়ে যাওয়া ঘ্রাণে—
ফেলে আসা স্টেশন থেকে শালবনের দৃশ্য ভেসে আসে—
আয়নাভরা সবুজ যেন অজস্র কুচি কুচি পাতায়
ছিঁড়ে উড়ে যাচ্ছে মূকের হাসিতে—
নগরে জমে থাকা জ্বরগ্রস্ত ঘুমে কত আর সাঁকো পারাপার!
ফেরার তৃষ্ণা নিয়ে শালিক হারিয়ে ফেলে পথ—
অসমাপ্ত গল্পের ডিলেমায় হঠাৎই সন্ধ্যা নামে!
কোথাও কী মায়ার জন্ম হলো আজ—
ঘাসের ডগায় লেগে থাকা নীলের আশ্বিনে!
প্রশ্নের পরে মানুষের চলে যাওয়া উজ্জ্বল!
তবু নিজের কাছে ফিরবো বলে ধূলায়
তাকিয়ে থাকি বিস্ময়ে—
কুর্চিবনের হাওয়া

না-হয় কুর্চি ফুলের বন থেকেই হাওয়া আসুক
আমি তো কল্পনাতেই রঙ দেখে নিই,
মাথা নীচু করে পায়ের দিকে চেয়ে হাঁটি পথ ,
এমন স্বভাবে আরো একা হওয়ার সুরে
কল্পনার কাছেই থাকে সমস্ত আশ্রয়!
না-হয়
একটা আশ্বিনের বিকেলের কথা ভেবে
জানালায় গোপনে নীল সমুদ্র খুলে বসি,
দূরে ফেলে আসা বিশালাক্ষীর মন্দিরে
দেবীও যে একা—সেই কথা ভেবে
আজো কেন ব্যথা জাগে মনে!
একটা হাওয়া আসুক—
শূন্য থেকে ওলোট-পালোট হয়ে যাক সব—
সূত্র মেনে তোমাদের নির্ভুল বেঁচে থাকা!

এই যে যাপন

সময়কে আমি
খুব ভালো করেই কাটিয়ে দিতে জানি—
ঊর্ধ্ব আয়ন থেকে যতক্ষণে ফিরে আসে
প্রতিধ্বনি
তারও আগে চলে যাই
অধীত ছায়ার থেকে দূরে—
যেখানে একটা নির্ভার গুল্মবনে
থরে থরে কুয়াশা সাজানো থাকে—
সেইখানে ধূলি আর ধূলির গভীরে
আমার অন্য নাম লিখে দিয়ে আসি—
যেকোনো ফুল ফুটে ওঠার আগেই
সময়কে কাটিয়ে দেই আমি
নিজস্ব ঘোরের ভেতরে—

চন্দ্রপ্রভা

অদ্ভূত ডার্কনেস মুছে দিয়ে
বিপন্ন শীতের থেকে উড়ে যাচ্ছে পাখি
অন্যকোথাও—
যখন কুয়াশার গভীরে গাঢ় সমস্ত আকাশে
একই অন্ধকার ছিল চোখের সীমানায়
আরেকটু সহজ করে দেখার অভিলাষে
জেগে ওঠে হেম—অবনত ভোরের শরীরে।

ছোট্টো একটা প্রানে ধরে না সমস্ত কথা
কথার মতো সব এলোমেলো নীরবতাও
পার হয়ে—মেলে ধরে সবটুকু ডানার উড়াল—
সারি সারি প্রশ্নের পথে।
ঘরের ভেতর থেকে ঘর ভেঙে দিয়ে
হিমমসাগরের সোলালি পাড়ে
কারা যেন শুশ্রূষা রেখে চলে গেছে—
চলে যায় তারা চন্দ্রপ্রভার হলুদ আভায়
সূর্য ফুটবে বলে!