শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৩৪]

0
347

পর্ব ৩৪

কেমন এক অদ্ভুত অভিমান যেন ধুম্রবাষ্পের মতো উড়ে উড়ে আবার স্থির নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকে টুলটুলের বুকের মাঝখানে, আর সেই ধূমায়িত ‍পুঞ্জমেঘের ছায়ায় উঁকি দেয় দীপার আঁচল। মেঘের কালো অন্ধকারে গোপনে চেয়ে থাকে দীপার চোখ। ক্ষ্যাপা বরষার আকাশে জমতে থাকা মেঘের মতো গাঢ় ফেনিল হয়ে উঠতে থাকে সে বিষধর অভিমান টুলটুলের শরীরে, মগজের কোষে কোষে। ছ’মাস ধরে এমনই চলছে। আজ যেন সেই সে নীলবিষ তরঙ্গায়িত হয়ে লক্ষ বিক্ষুব্ধ সাপের ছোবলে আছড়ে পড়ছে আসি আসি শীতের হালকা শীতল আমেজে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ ভেঙে গেছে শতখণ্ড হয়ে। ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে আলুথালু অবহেলায় তুচ্ছ এক অতিন্দ্রীয় আর অলঙ্খনীয় দূরত্বে। সেই চাঁদের ভেঙে যাওয়া শতখণ্ডে এক-এক করে ছড়িয়ে পড়েছে দীপার মুখ। তার মুখের ছায়ায় প্রলয়ের তাণ্ডব। চোখে লেলিহান আগুনের শিখা। জ্বালাময়। সেই শিখায় শিখায় ছড়িয়ে পড়ছে শতশত যুগের কামনা এবং বাসনার সারাংশ। টুলটুলের তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী চোখে ঠিক এরকমই প্রতিভাত হয় আজকাল দীপার প্রতিমা। নিষ্কলঙ্ক পূণ্যের ভূগোলে ধরা পড়ে কোনো অজানিত সুরঙ্গপথের অলিগলি। ভুল হয়নি কোনো নিরীক্ষা। বরং একসেকেণ্ডে পড়ে নিয়েছে সে ব্যাখ্যাটুকুও, যখন উদোম মাঠে জোৎস্নার অপরূপ আলোয় তার বুকের উপর শৈলর ধরে রাখা ছুরির পেছনে, দূরে, বেশ হালকা গাছ গাছালির ফাঁকে দেখা যাচ্ছিল দীপার মুখ তখনি নীল বিষে ভরে গেছে তার বুকের কোথাও গোপনে এখনো রয়ে যাওয়া এতটুকু ভালোবাসাও। শৈলর সাথে কোনো একটি যোগ রয়েছে দীপার। সেটা ভাবতে ভাবতেই বাড়িতে আসে টুলটুল। আর এখন, শেষ হয়ে আসতে থাকা নীরব রাতের আধো আলো আঁধারিতে খুব স্পষ্ট হয়ে আসে নীল নকশার ব্যাখ্যাটি তার কাছে। টুলটুলের কোনো বংশধর পৃথিবীতে আসতে দেবেনা শৈল। তাই দীপার বালিশের নিচে পড়েছিল ভ্রূণহত্যার পিলগুলো, আর তাই দীপাকে বশ করেছে সে যে কোনো মূল্যে। তার অর্থ এই যে, দীপা বিকিয়েছে টাকায়। হঠাৎ শেষ রাতের আকাশ ভেঙে অট্টহাসিতে উত্তাল হয়ে ওঠে টুলটুলের ভেতরের আড়ষ্ট নীরবতা। তার অর্থ হলো পৃথিবীতে ভালোবাসার কোনো ‍মূল্য নেই! নারী কেবল ছলনাময়ী। নারী টাকায় পরিমাপ্য! বেশ হলো। ভালোই হলো। বুকের গভীর সমুদ্রের নিচে যা একটুখানি নীল ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল দীপার জন্য তাও আজ অন্তরীণ। নিজেকে কেমন হালকা হালকা লাগছে টুলটুলের। ভালোবাসার ও দাহ্য বেদনাটুকু আর সহ্য হচ্ছিল না অনেকদিন :
-হা হা হা। হা হা হা। একটা পাহাড় চাই আমার। টাকার পাহাড়। অসংখ্য দীপার কবর দিয়ে রাখা যাবে যে পাহাড়ের মাটির নীচে। বুকের গভীর থেকে কোনো এক পড়ন্ত বিকেলেও যেন ‍মুখ বের করতে না পারে তার হাড় কঙ্কালও।
ভোর হয়েছে। মাধবীর ঘুম হয়নি সারারাত। ছেলের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে টুলটুল জেগে। তাই ওর ঘরে ঢোকে।
-চা দেব, খাবি?
-মা একটু বসো তো এখানে।
মাধবীর বসতে বসতে বলে।
-আমার আর ভালোলাগছে না কিছু। তোর বাবাকে আর সরানো যাবে বলে মনে হচ্ছে না বাংলাদেশ থেকে। দীপার বিষয়ে কিছু ভেবেছিস? আগামী সপ্তাহে তো কোর্ট বসবে?
-ও নিয়ে তুমি ভেবো না। আমি ডিসিশন নিয়ে রেখেছি।
-কী ভেবেছিস?
-আমি সাইন করে দেব।
-শেষ করে দিবি সব?
মায়ের মুখে বেদনার মেঘ জমে। বুকের ভেতর কি এক অজানা অচেনা পাখি নেই নেই সুরে ডেকে ওঠে। কিন্তু টুলটুলের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। টুলটুলের নির্বিকার মুখের দিকে তাকিয়ে মাধবীর আর কিছুই বলার থাকে না। উঠতে যান তিনি। টুলটুল তাকে কথায় টেনে ধরে আবার।
-আচ্ছা মা, এভাবে মৃত্যুঝুঁকিতে আমরা এখানে পড়ে থাকবো?
মাধবীর বুকে চিরে একটি দী্র্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে।
-আচ্ছা মা, আমরা যদি ভারতে ফিরে যাই তাহলে দাদু কী আমাদের ঠাঁই দেবে না। ওখানে তো তোমার প্রাপ্য সম্পত্তিও রয়ে গেছে?
একথায় মাধবীর কণ্ঠস্বর কঠিন হয়। সে স্বর টুলটুলের অচেনা লাগে।
-সে ইতিহাস নিশ্চয়ই তোর অজানা নয়। তোর কংগ্রেস সমর্থক দাদু আমাকে তোর নকশাল বাবার কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনতে কী না চেষ্টাই করেছেন। আজ কোন মুখ নিয়ে তার কাছে যাব? আর গেলেই কেন তিনি প্রাপ্য সম্পত্তি আমাকে কিংবা তোমাকে দিতে চাইবেন?
-যাহ। বাবাটাই যত ঝামেলা বাধালো?
কথা শেষ করতে পারে না টুলটুল। দরজায় দাঁড়ানো তমালকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে খানিকটা হতচকিত হয়ে পড়ে। মনে মনে নিজের উপর রাগ হয় তার।
-ধুর ছাই, এতটা বেভুল হলে চলে। কখন যে বাবা এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি। ধুর।
নিজেকে এভাবেই মনে মনে বকাঝকা দিতে দিতে ঘর থেকে বের হয়ে যায় টুলটুল। মাধবীও বিব্রত হয় ছেলের কথাটি তমালকৃষ্ণের কানে যাবার কারণে। তমালকৃষ্ণের স্বভাব মাধবীর জানা। তার মুখের উপর মেঘের ঘন আস্তরণ মাধবীরও দৃষ্টি এড়ায় না। সে ইতস্তত করে।
-তোমাকে চা দেব?
-না থাক।
খুব নম্রস্বরে কথাটি বলেই তমালকৃ্ষ্ণ নিজের ঘরে ফিরে যান। বুকের বাঁ পাশের ব্যথাটি কী এইক্ষণে বাড়ছে! গোপনে একটা নীরব যন্ত্রণার জন্ম হয়েছে বুকের ভেতর। মাধবী কি জানে। ও কী টের পায় কিছু। টুলটুল! কেন যে এই সময়ই মাধবী টুলটুলের পাশে পাশে মনস্বিতার মুখটিও মনে পড়ে। কী যে এক অদ্ভুত মায়াভরা শ্যামলা মুখখানি। কী কঠোর পরিশ্রমী। চোখের তারায় তারায় উদ্ভাসিত বুদ্ধিমত্তার ছায়াঘেরা শান্তি। অথচ কেমন জটিল আর কঠিন মেয়েটির চারপাশ। আচ্ছা এ কী সেই, দ্বিতীয় জন্মে মাধবী আর তার অন্তর্গত সত্তাই কী তবে নেমে এসেছে আবার মাটির পৃথিবীতে! না হলে কিসের এই মায়া মেয়েটির প্রতি তার। এ তো মোহ নয়। যেন এক নাড়ির টান। শেকড়ের কোথায় যেন একটা চেনা ডাল চেনা শাখা প্রলম্বিত হতে হতে মেয়েটির শেকড়ের শাখায় মিলে যায়, গোপনে, অন্ধকার মাটির গভীরে। ধুর কি যে ভাবছেন এসব। চিরকাল মার্কস পড়া পরকালে দ্বিতীয় জন্ম এসবে অবিশ্বাসী তমারকৃষ্ণ এসব কী ভাবছেন। তবু আজ মনস্বিতার কথা ভেবে মনটা কেমন স্থির হয়ে আসে। কিছুক্ষণ আগেও টুলটুলের কথাটি শুনেই বুকের ব্যথাটি যে হারে বিপদসীমা অতিক্রান্ত করতে চলেছিল মেয়েটির মুখ যেন ঠাণ্ডা শীতল এক মায়াবী স্পর্শে তাকে খুব সহজে বাগে নিয়ে এসেছে। অথচ মেয়েটির বুকের ভেতর কেবলই সমুদ্র ভেঙে পড়ে। প্রলয়ে প্রলয়ে বিধ্বস্ত। সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে যে কোনো সময়। মানুষ সাধারণের স্তরের বাইরেও ধৈর্যশীল হতেই পারে। কিন্তু তারপরও সীমা থাকে তার। সীমা লঙ্ঘিত হবার সাথে সাথে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে তার সকল। এসব ভাবতে ভাবতেই মাধবীর পায়ের শব্দ শোনা যায়। মনটা তার খানিক স্নিগ্ধ। মাধবীর একটু অদ্ভুতই ঠেকে। নিজেই তাকে কাছে ডাকেন তমালকৃষ্ণ।
-এখানে এসো। বসো।
-কী বিষয়? শরীর ভালোলাগছে কি এখন একটু?
মাধবীর কথায় কান যায় না তমালকৃষ্ণের। আজ তিনি মাধবীকে তার ফিরে পাওয়া কন্যার কথা শোনাতে চান।
-জানো, কেন যে তাকে মনে হয় আমাদেরই সে আত্মজা।
হঠাৎ তমালকৃষ্ণের কথা শুনে মাধবী মেলাতে পারে না কিছুই।
-কার কথা বলছ? আমাদের আত্মজা!
-ওই যে আমি তোমাকে ফেলে চলে গেলাম পিকিং, কমরেডের দলিল পৌঁছাতে মাও সেতুঙের কাছে। তখন সে অভিমানে ছেড়ে গেছিল পৃথিবীর মায়া। সে কী আবার ফিরে এসেছে মাধবী? একদিন তাকে নিয়ে আসবো তোমার সাথে পরিচয় করাতে।
মাধবীর মুখ ভার হয়ে আসে। ঘন বেদনার মেঘ জমাট বাঁধতে শুরু করে। তমালকৃষ্ণের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই।
-শোন, আমাদের বাড়ির কাছেই থাকে। রাস্তার উল্টোপার্শে। একদিন আসতে বলেছি আমি।
-তুমি কেমন করে পেলে ওকে?
-সেই এক তুমুল বৃষ্টির দিনে আট মাসের সন্তান পেটে নিয়ে বৃষ্টির জলে পা ডুবিয়ে মেইন রোডে উঠে আসতে গিয়ে পিছল খেয়ে পড়তে পড়তে এসে কোনোমতে দাঁড়িয়েছিল আমার গাড়ির সামনে।
মাধবী উৎসুক হয়ে ওঠে।
-তারপর?
মনস্বিতার মনটা খুব আঁধার হয়ে আসে ফারুকের অদ্ভুত কথায়। এই লোকটি কী পৃথিবীর কোনো কিছুই স্বাভাবিকভাবে নিতে শেখেনি! পিতার মতো একজন লোককে নিয়ে যা তা বলতে শুরু করে দিল। দিন দিন ওর অধঃগতি দেখে ভয় পায় মনস্বিতা। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা নেই। স্ত্রীর প্রতি ‍ন্যূনতম দায়িত্ববোধ তো দূরের কথা নিজের দায়িত্বটাও নির্বিঘ্নে মনস্বিতার ঘাড়ে দিয়ে আরামসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতটুকু বিকার নেই। মাঝে মাঝে খুব শূন্য-শূন্য লাগে মনস্বিতার। কী আছে এই যৌথজীবনের সামনের দিকে। একটা মহাশূন্য তাকিয়ে থাকে তার দিকে আগামীর আকাশে। সেখানে কিছু গভীর নীল অলক্ষ্য অস্থির সময় যাপন ছাড়া আর কিছু দেখতে পায় না মনস্বিতা। এভাবে আর কতদিন! এ নিরব কবরের ভেতর দিন দিন দম আটকে আসছে। কাপড় বদলে হাতমুখটা ধুয়ে শুয়ে পড়ে। গলা দিয়ে তার খাবার নামে না কতদিন। মৃত কন্যার মুখ মনে পড়ে গেলে খাবারগুলো গলা থেকে আর নিচে নামতে চায় না। তাই রোগা-রোগা একটা অনুভূতি আজকাল শরীরে লেপ্টে থাকে। আলসে। কর্মস্পৃহাহীন। নির্বাক নিশ্চল মনস্বিতার সময় যেন ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। অপরূপ সুন্দর সে মুখের মায়ায় ভেসে যায় জোৎস্না। ভেসে যায় স্বপ্ন। ভেসে যায় কুণ্ঠিত মাতৃত্ব। কুন্ঠিত কেন! তার উত্তর মনস্বিতার কাছে খুব স্পষ্ট। হঠাৎ দৈবযোগে যে পাওয়া তাকে হাত পেতে কোলে তুলে নিতে রাজি হয়ে গেল থেকেই সে বুঝতে পারছে তার ভেতরে চিরকালের এক মাতৃহৃদয়ের অস্তিত্ব। কিন্তু এই মাতৃত্বের বোধ তার ইপ্সিত ছিল না। হঠাৎ হাওয়ায় উড়ে আসা ধূলোর মতো। তাই এমনি সে হারালো বুঝি অলক্ষ্যে। বুঝতে পারে নি ফারুকের এমনি অবহেলায় খসে পড়বে সে ধ্রুবতারা। একেই তো অবলম্বন করে বাকিটা জীবন বাঁচবে বলে মনস্থির করে নিয়েছিল মনস্বিতা। কিন্তু এত নিষ্ঠুর আর নিস্তরঙ্গ ফারুকের মন। আর একবার নবজন্মই কী ভরিয়ে তুলতে পারে মনস্বিতার মাতৃত্বের এই অপূর্ণ শূন্য সাধ! কিন্তু এই আজন্ম অসংস্কৃত মানুষটির সাথে সন্তানের জন্য আবার শারীরিক মিলন, ভাবতেই গা ঘিনঘিন করে ওঠে মনস্বিতার। অথচ মনস্বিতা ঠিক বুঝতে পারে কোনো ভালোবাসই মুছে দিয়ে যেতে পারে না পাওয়ার এই গভীর শোক। কিন্তু কোথায় কে আছে, কেমন করে সম্ভব করে তোলা যায় এই অসম্ভব লিপ্সাকে। সন্তানের জন্য এত কাতরতা তো আগে কখনো নিজের ভেতর অনুভব করেনি মনস্বিতা। এসব ভাবনার মাঝখানেই ফারুক রাতের খাবার শেষ করে পায়ের স্যাণ্ডেলে ঠাসঠাস শব্দ তুলতে তুলতে শোবার ঘরে ঢোকে। আরও সশব্দে আলো জ্বালায়। চোখে এক অদ্ভুত জ্বালা ধরায় মনস্বিতার। কপালের উপর হাত রেখে চোখ বন্ধ করে থাকতে দেখে ফারুক বলতে শুরু করে।
-আমি জানি তুমি ঘুমোও নি।
ফারুকের কথা শুনে মেজাজটা আজ ভীষণ বিরূপ হয়ে ওঠে। কিন্তু কথা বলতে ইচ্ছে করে না। শরীর আর মনের কোথাও যেন একটা অসহযোগ সবেতেই আজকাল তার। কিন্তু ফারুক নাছোড়বান্দা। মনস্বিতার বুকের উপর ঝুঁকে আসে এই তীব্র প্রখর আলোতে। আর ‍স্বভাবগত ভঙ্গিতেই বুকের কাপড়টা একটানে সরিয়ে দেয়। ফারুক জানে না সন্তান মরে গেলেও মৃত সন্তানের জন্য জমে থাকা দুধের বন্যায় তখনো রাতের পর রাত ভিজে থাকে মনস্বিতার শরীর বুকের কাপড়। ভিজে যায় চোখ। ভিজে ভার হয়ে থাকে মনস্বিতার বুক। স্তন বেয়ে গড়িয়ে পড়া সন্তানের খাবারের ওম যেন মৃত সন্তানেরই স্পর্শ দিয়ে যায়। আর নীরবে সে অমৃত ধারায় ভিজে ভিজে কতরাত ঘুমিয়ে পড়েছে মনস্বিতা। বিছানা ছেড়ে উঠে যায়নি গায়ের কাপড় ধুতে কিংবা বদলে নিতে। ফারুক কী করে জানবে তার সব! তখন অসহ্য লাগে পৃথিবীর সব। মনস্বিতার ভিজে স্তনে ফারুকের দুই হাত অক্টোপাশের মতো অনুভুত হতে থাকে। দু’হাতে ফারুককে সরাতে চেষ্টা করে মনস্বিতা। ধাক্কা খেয়ে দূরে ছিটকে পড়ে গিয়ে আবার নিজেকে সামলে নেয়।
-তুমি কী মানুষ!
ঘেন্নায় অপমানে মরে যেতে ইচ্ছে করে মনস্বিতার। এক কুৎসিত ক্লেদ জমতে থাকে রাত প্রহরের ভাঁজে ভাঁজে। অমীমাংসিত এই পাশবিকতার হাত থেকে মুক্তি কী তবে একমাত্র মরণেই।
ঠোঁটের কোণায় একটা ক্রূড় হাসিতে নৃশংস হয়ে ওঠে এই স্তব্ধ রাতের নীরবতা।
-হা হা হা । হা হা হা। তুমি আমার বিবাহিত স্ত্রী। তোমাকে ভোগ করার অধিকার আমার আছে।
-ভোগ? ছিঃ। স্ত্রীকে মানুষ ভোগ করে?
-আরে রাখো তোমার নীতিকথা। কোথায় পড়ে আছ তুমি? প্রেম ভালোবাসা এই সব দু’দিনের। তারপর সব এক। সবই ভোগ। অতঃপর নির্ভার পৃথিবী।
-অনুরোধ করছি তোমাকে। এসব রাখো। আমার বুকে ভীষণ ব্যাথা। মনটা খুব অস্থির। এখন এই সময় আমার শরীর এসবের জন্য একেবারেই প্রস্তুত নয়।
কি যেন ভেবে ফারুক একটা তাচ্ছিল্যে দৃষ্টিতে তাকায় মনস্বিতার দিকে একবার। বিছানার উপর পড়ে থাকা মনস্বিতার মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে অন্য ঘরের দিকে হন হন করে হাঁটতে থাকে। মনস্বিতা পিছু ডাকে না। তার ভেতরে এক গভীর কালো নদী আছড়ে পড়ে সবগুলো বেদনার ভার নিয়ে। উত্তুঙ্গ সে নদীর স্রোত। এই মুহূর্তে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বুকের কাপড় সবটাই ভিজে ওঠে। মৃত সন্তানের জন্য এখনো তার শরীরে জমে থাকা দুধের আষ্টে ঘ্রাণে কেমন মাতালের মতো লাগে মনস্বিতার। গা গুলাতে থাকে। দুর্বিসহ হয়ে ওঠে রাত। আজন্ম অর্জিত জখমগুলো থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে। আর কত যুদ্ধ আর কত রক্তের দরকার এই আজন্ম যুদ্ধ জয়ে! কত প্রাণ দেবে মনস্বিতা! আর কত প্রাণ বাকি আছে তার।
[চলবে]
পূর্ববর্তী ৩৩ পর্বের লিংক। যাঁরা পড়েননি, তাঁরা পড়ে নিতে পারেন :

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-27/