পলি শাহিনা >>চিরকালের গল্প >> ছোটগল্প

0
181

চিরকালের গল্প 

আকাশে কালো মেঘের এলোমেলো ঝাঁক, পৃথিবীর সঙ্গে গভীর প্রণয়ে মেতে উঠেছে। শুক্লা কাচের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বিষাদঘেরা ধূসর দিন। বৃষ্টি সব সময় শুক্লাকে অখুশি করে। ওর কাছে নানাবিধ কারণে বৃষ্টি মানে ভোগান্তি- হাহাকার-যন্ত্রণা। বৃষ্টির সঙ্গে কোনো কালেই ওর সখ্য গড়ে ওঠেনি। বৃষ্টি নামলেই মনে হতাশা বাড়ে। ফেলে আসা জীবনের হরেক রঙের স্মৃতিরা মনের আলপথ ধরে ঝড় তোলে। বাইরে আজ অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। গুমোট অন্ধকার দিন। বৃষ্টির বাড়াবাড়ি দেখে মনে হয়, যেন বৃষ্টির ঢল নেমেছে ধরণিতে। এরই মধ্যে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় না ঘটিয়ে দিনের আলো ফুটলেও, ফ্যাকাশে আলোর পদচারণায় মনের খাঁজে খাঁজে বিষাদ জমেছে। দিনের আলোতেও চারপাশ বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। নাবালক সকাল পেরিয়ে দিনের আলো গাঢ় হতে না হতেই, প্রকৃতি যেন তড়িঘড়ি করে অন্ধকারের লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমাতে আবার ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এই মুহূর্তে শীত কিংবা গরম কোনোটাই বেশি অনুভূত না হলেও দুর্দান্ত প্রতাপে বেশ বাতাস বইছিল। এমন দিনে শরীর মনে অসারতা ভর করে। মন চায় ঘরের প্রিয় কোণে বসে বাইরের দিকে অপলক চেয়ে থাকতে, অথবা গরম চায়ের পেয়ালার উষ্ণ ওমে প্রিয় বই পড়তে, রবীন্দ্রসংগীত শুনতে। ইচ্ছে ও বাস্তবতার মধ্যে জীবনভর যোজন যোজন ফারাক রয়ে যায়। জীবনের রূঢ় বাস্তবতার কাছে কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছা মলিন হয়ে পড়ে। ইচ্ছার তীব্রতাগুলোকে বুকের গহিনে মাটি চাপা দিয়ে শুক্লা বেরিয়ে পড়ে কাজের উদ্দেশ্যে।
বৃষ্টি শুক্লার অপ্রিয় হলেও, বৃষ্টির ছন্দে তার হাত-পা আজও দুলতে থাকে। ছোটবেলায় ঘরের সাদাকালো টেলিভিশনে বাংলাদেশের বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদের নাচের ক্লাস দেখে দেখে, শুক্লা হুবহু অনুকরণ করে নাচতে পারত। জীবন সংসারের হেঁশেলে সেই কবেই শুক্লার নাচ-গান বাষ্পীভূত হয়ে হারিয়ে গেছে! কিন্তু বৃষ্টি নামলেই হারিয়ে যাওয়া শখ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, বুকে জমে থাকা বাষ্প দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসে।
এমন বৃষ্টিমুখর দিনে শুক্লার বুদ্ধিমতী সহকর্মী নিতু সিক কল করে বাসায় বসে আরাম করছে, আর কিছুক্ষণ পরপর বৃষ্টির দিনটা উদযাপনের হরেক রঙের খাবারের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করছে। নিজের এমন সব বোকামির জন্য আগে অভিমান হলেও আজ নিজের ওপর রাগ হয় শুক্লার। জীবনের এত এত বছর পেরিয়ে এসেও, সে হাবাগোবাই রয়ে গেল। সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলে যায়। বুদ্ধিমান হয়। শুক্লা সে আগের মতোই বোকা থেকে গেলো।
শরীর ভালো বোধ না করলেও আজ সারা দিন একাই কাজ করতে হবে শুক্লাকে। ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ বেড়েই চলছে। জিপসি ফুলের মতো ভারী বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে জমিনে। কর্মস্থলে কাস্টমারের সমাগম কম। অন্যদিনের চেয়ে আজ হাতে বেশ অবসর। অবসর সময়ের আস্কারা পেয়ে শুক্লা আপনমনে স্মৃতির অরণ্যে বিলি কাটতে কাটতে হারিয়ে যায় বহু বছর আগের ফেলে আসা সেদিনের বাসস্ট্যান্ডে।
সে বছর ঈদের ছুটি শুরু হয় ঈদের বেশ আগেই। ঈদের ছুটিতে আগেভাগেই হোস্টেল বেশ ফাঁকা হয়ে গেলেও, শুক্লা যেতে পারেনি। বিজ্ঞান বিভাগের আরো কয়েকজনের সঙ্গে ও থেকে যায় প্রাইভেট পড়ার জন্য। হঠাৎ একদিন দুপুরে ওর হোস্টেলের অন্য সহপাঠীরা সিদ্ধান্ত নেয় বাড়িতে চলে যাবে। শুক্লা ভেবেছিলো আরো দু-একদিন পরে যাবে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যদের সঙ্গে বিকেলে শুক্লাও কলেজ হোস্টেল ত্যাগ করে বাড়ির পথে। সাধারণত শুক্লা বাবার সঙ্গে বাড়ি যায়, সেদিন নিরূপায় হয়ে একাই রওনা দিল।
কলেজ গেটে রিকশার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে দেখে, পরিচিত সেই মুখটা দাঁড়িয়ে আছে। যাকে প্রতিদিন প্রাইভেট পড়তে আসা-যাওয়ার পথে শুক্লা দেখতো। খুব নীরবে চেয়ে থাকতে। পরিচিত মুখ কিন্তু অচেনা। নীরব দৃষ্টি বিনিময় হলেও কখনো কথা হয়নি তার সঙ্গে। সব সময় কলেজ গেটে এ সময় কোলাহল থাকলেও সেদিন সুনসান নীরবতা বিরাজ করছিল।
ছেলেটি শুক্লার কাছে এসে বলল, ‘আমি তমাল, আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল। দয়া করে আমাকে একটু সময় দেবেন, কথাগুলো শুনবেন?’
নিরুত্তর শুক্লা রিকশায় চেপে সোজা বাসস্ট্যান্ডে চলে আসে। তমালও আরেকটি রিকশা নিয়ে তাকে অনুসরণ করে হাজির হয় সেখানে। রিকশা থেকে নেমে শুক্লা তাড়াতাড়ি বাসে উঠে বসে। তমালও বাসে উঠে তার পেছনের সিটে বসে। শুক্লার ভয় কেটে যায় লোকারণ্যে। বাস দাঁড়িয়ে আছে। হালকা বৃষ্টি শুরু হয়। শুক্লা বাসের জানালা দিয়ে বিস্তীর্ণ সবুজের গা ঘেঁষে জলের নৃত্য দেখছে। খানিক আগের উজ্জ্বল কমলা রঙের অপরূপ সুন্দর বিকেল মেঘের আড়ালে ঢেকে যায়। শুক্লার মনে হয়, এ যেন আলো-অন্ধকারের লুকোচুরি খেলা। প্রকৃতির মন, আকাশের রঙ, মানুষের অবস্থান – এসবের কোনো ঠিক নেই। আজ যে বাড়ি যেতে হবে ওকে, কয়েক ঘণ্টা আগেও তা ভাবেনি। বাসের জানালা দিয়ে শুক্লা আপনমনে প্রকৃতির রংবদল দেখছে। বৃষ্টির কারণেই বোধ হয় হকারদের আনাগোনাও চোখে পড়ছে না। শুক্লা খানিক জড়সড় হয়ে অপেক্ষা করছে বাস ছাড়ার জন্য।
যাত্রীরা একে একে বাসে উঠছে। কেউবা বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। আজ মনে হচ্ছে যাত্রী সংখ্যাও কম। অবশ্য বৃহস্পতিবার-শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের অন্য দিনে যাত্রীসংখ্যা কমই থাকে। তমাল পেছন থেকে শুক্লার মনোযোগ নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেই যাচ্ছে। নিরুত্তর শুক্লা নীরবে বাইরের পৃথিবী দেখছে। বাস ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তে তমাল উঠে এসে শুক্লার হাতে একটা হলুদ খাম ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমাকে ঝরনা ভিডিও সেন্টারে পাবে। আমি তোমার ফেরার অপেক্ষায় থাকব।’
বাস থেকে নেমে এসে বাইরে থেকে তমাল আবার শুক্লার বাসের জানালায় এসে দাঁড়াল। শুক্লা মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে বাস ধীরগতিতে চলা শুরু করল। কিছুদূর যাওয়ার পর শুক্লা বাসের জানালা দিয়ে ঘাড় বের করে দেখে তমাল করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। শুক্লাকে তাকাতে দেখে হাসিমুখে তমাল হাত নাড়াল। শুক্লা তখন হাত বের করে তমালের দেওয়া হলুদ খামটি শূন্যে উড়িয়ে দিল। তমাল স্থির দৃষ্টিতে সে খাম উড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল। বাসের গতি বেড়ে যেতে যেতে তমালও দৃষ্টি সীমানা থেকে হারিয়ে গেল। তমালের সঙ্গে শুক্লার আর কোনো দিন দেখা হয়নি।
জীবনের এ-বেলায় এসে আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামলেই শুক্লার ভীষণ তমালের কথা মনে পড়ে। এত বছর পরেও শুক্লা ভুলতে পারে নি তমালকে। কি যেন ছিল ওর চাহনির গভীরে। তমালের জন্য শুক্লার মন খারাপ হয়, বুকে চিনচিন একটা কষ্ট অনুভব করে। তমালের মুখে অদ্ভুত রকমের একটা মায়া ছিল, যা আজও শুক্লাকে তাড়িত করে। একসমুদ্র অনুশোচনা হয়। ওর কথা মনে হলে ঢিলছোঁড়া পুকুরের অশান্ত জলের মতো ওর বুকে ঘূর্ণন ওঠে। আজন্মকালের ভিতু, বোকা শুক্লা তমালের সঙ্গে ভয়ে কোনো কথা বলেনি। খাম খুলে পর্যন্ত দেখেনি। কী ছিল সে-খামে? চিঠি? কী লেখা ছিল তাতে? বৃষ্টি নামলেই ওর মনের ঘরে তমাল এসে পায়চারি করে। প্রশ্নবাণে জর্জরিত শুক্লা উদাস হয়, উত্তর খুঁজে পায় না। সময়ের হাত ধরে তমাল হারিয়ে গেলেও শুক্লার মনের নির্জনতায় ও শীতল মুগ্ধতা হয়ে ঠাঁই নিয়েছে ।
শীর্ষেন্দুর লেখায় শুক্লা পড়েছিল—‘কেচ্ছা কেলেঙ্কারির মতো বৃষ্টি হচ্ছে।’
লাইনটি পড়ার সময় বৃষ্টির সঙ্গে কেচ্ছার সম্পর্ক কী তখন না বুঝলেও আজ বৃষ্টির গতি দেখে বেশ বুঝতে পারছে। কেচ্ছার মতো বৃষ্টিও ছুটছে অবিরাম গতিতে শহরের এক প্রান্ত হতে আরেক প্রান্তে, আয়েশ করে। যে বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু হয়ে আছে পথঘাট, অলিগলি, গোটা শহরের আনাচকানাচ। একটু দূরের আকাশে ধবধবে ফরসা সিগাল ভেজা শরীরে উড়ছে, গাছের ডালগুলো সুর তুলে বাতাসে দুলছে। সামনের রাস্তায় পথচারী সুন্দর হ্যাট মাথায় কুকুর কোলে ফুটপাত ধরে হাঁটছে। আহা! কি সুন্দর প্রকৃতি!
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। সভ্যতার চেয়ে ক্ষুধার বয়স বেশি। ক্ষুধায় শুক্লার পেট জ্বলছে। পৃথিবীর কোনো সুন্দর দৃশ্যই এখন আর ওর ভালো লাগছে না। বৃষ্টির এমন বাড়াবাড়ি অসহ্য লাগছে। শুক্লা একা কাজ করছে বলে খাবারের জন্য বাইরেও যেতে পারছে না। শরীরও খারাপ লাগছে। জ্বর জ্বর বোধ করছে। সাতটার আগে কোনোভাবেই কাজ থেকে ছাড়া পাবে না। এখন মাত্র বাজে পাঁচটা। শুক্লা অসহায় বোধ করে। বসকে কয়েকবার কল করেও কোনো উত্তর পেল না। শুক্লা আপনমনে বিড়বিড় করছে – বস হয়তো ফোনের সুইচ অফ করে এমন বর্ষণমুখর দিনে সুখনিদ্রায় আছে।
শুক্লার মনে পড়ে মায়ের কথা। ক্ষুধা লাগলে সবসময় ওর মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। জীবনের যে কোন অসহায় বোধে শুধু মা-কে মনে পড়ে। এমন বৃষ্টির দিনে শুক্লা ঘুম থেকে একদম উঠতে চাইতো না। বৃষ্টির গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওর ঘুমও বেড়ে যেত। মা যত ডাকতো শুক্লা তত কাঁথা মুড়ি দিয়ে নাকমুখ ঢেকে দিত। মাথায় হাত বুলিয়ে কত আদর করে মা তখন ওকে খেতে ডাকতো।
মাতৃহীন শুক্লা আকাশের দিকে তাকায়, ওর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মহাপ্রকৃতিতো মায়েরই মতো। অদ্ভুত একটা শীতল ভালোবাসায় মোড়া বাতাসের ঝাপটা এসে শুক্লার গায়ে লাগে। ভেতর থেকে গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর শুক্লা কাজের ফাঁকে বাসায় কল দেয়। ফোন রিসিভ করেই শুক্লার মেয়ে জানতে চায়,
-আম্মু তুমি কী খুব ক্ষুধার্ত?
-কী করে বুঝলে মা?
– তোমার ক্লান্ত কণ্ঠস্বর ও দুর্বল নিশ্বাসের শব্দ শুনে বুঝতে পেরেছি।
শুক্লা তার ছোট্ট মেয়েটির কথা শুনে ক্ষুধার কথা ভুলে ভাবতে থাকে, জীবন একটি অদ্ভুত চক্র। এই জীবন ফিরে ফিরে আসে। জীবন শুধু ছিনিয়ে নেয় না, মুঠোভরে দেয়ও। জীবনের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকে শীতল ভালোবাসা। অজান্তেই জীবনের ভাণ্ডার ক্রমশই ভরে ওঠে প্রাপ্তিতে। ঘুঁচে যায় যত শূন্যতা। শুক্লার মা-হারা শূন্যস্থান পূর্ণ হয়ে ওঠে মেয়ের ভালোবাসায়। মেয়েটা তার জীবনে স্রষ্টাপ্রদত্ত শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। শুক্লার মনের সব কষ্ট উবে যায় নিমেষেই। হাতের তালু ভেজা দেখে শুক্লা ভাবছে, এ কী বৃষ্টিভেজা জল নাকি আনন্দাশ্রু?
সে যাই হোক, জীবনে মেয়ের ওই স্বর্গীয় শীতল ভালোবাসাটাই শুক্লার সবচেয়ে বড় পাওয়া মনে হলো।
বাতাসে ঠান্ডার দাপাদাপি। নিউইয়র্ক শহরটিকে বাংলাদেশের শীতকালের মতো ধোঁয়াটে দেখাচ্ছে । ঠান্ডা বাতাসে শরীর শিনশিন করলেও মেয়ের আদুরে ভাবনায় ডুবে আছে শুক্লা। মেয়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া মায়ের ভালোবাসার অদৃশ্য একটি মিল খুঁজে বেড়ায়, মেয়ের কাছে ও সর্বদা মায়ের স্বর্গীয় সুখ, মমতা খুঁজে পায়। মেয়ের ভালোবাসার কাছে ওর সব দীর্ঘশ্বাস বিলীন হয়ে যায়। মেয়ের সঙ্গে ফোন রাখার পর থেকে বুকে সুখের তোলপাড় বয়ে চলে। মেয়ে তার বেঁচে থাকার, ভালোবাসার অনুষঙ্গ। মেয়ের মাঝে শুক্লা জীবনের গতিপ্রবাহ খুঁজে পায়।
আকাশভাঙা বৃষ্টি। যেন অন্তহীন বৃষ্টি নেমেছে আজ। বৃষ্টির সঙ্গে শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দে চারপাশ দুলছে। গাড়িগুলো যেন জলপ্রপাত ডিঙিয়ে সামনে এগোচ্ছে। এর মধ্যেই শুক্লা দেখে তার মেয়ে ঝড়বৃষ্টির মধ্যে কাকভেজা হয়ে খাবার হাতে ওর কর্মস্থলে এসে উপস্থিত। খাবার হাতে মেয়েকে এভাবে দেখে শুক্লা তার অশ্রুসিক্ত চোখ লুকানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। নির্বিকার শুক্লা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে এক স্বর্গীয় শীতল ভালোবাসায়।
শুক্লার কাজ শেষ হতে এখনো খানিকটা দেরি আছে। এতক্ষণ বসে থাকতে কষ্ট হবে ভেবে মেয়েকে বাসায় ফিরে যেতে বলে। শুক্লার মেয়ে নোভা এতে অসম্মতি জানায়। নোভা মাকে নিয়ে বাসায় ফেরার অপেক্ষায় এককোণে চুপচাপ বসে থাকে। মেয়ের এমন হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা দেখে, শুক্লা যেন বৃষ্টির জলে সুখের ভেলায় ভাসতে থাকে। তার বুকের ভেতরে এমন দুর্যোগপ্রবণ দিনে, বসন্তের কোকিল ডেকে ওঠে। মনের বাগানে রংবেরঙের ফুল ফোটে। রঙিন প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়। ভাবনার দশদিক আলো করে পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে। শুক্লা চাঁদের আলোয় স্নান করে। ওর মুখ থেকে কেবল খাঁটি আলো গলে গলে পড়ছে। ওর অনুভূতিতে এই জীবন ভালোবাসার, এই জীবন উদযাপনের। এ জীবনে কোন অপূর্ণতা নেই!
ঝিরিঝিরি ভালো লাগার হাওয়ায় শুক্লা ভাসছে। মেয়ের মুখে শুক্লা নিজেকে দেখে আর ভালোবাসার মহাকাব্য রচনা করে চলে। ভালোবাসার এ অতল সমুদ্রে মুখ লুকিয়ে বহুকাল বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে।
কাজ শেষে মা-মেয়ে হাত ধরে একসঙ্গে বাসায় ফিরে আসে। বাসায় ফিরে শুক্লা টের পায় তার জ্বর এসেছে। কেঁপে কেঁপে জ্বর আসছে। দুপুর বেলায় কাজের জায়গায় মনে হয়েছে শরীর একটু একটু দুলছে। কষ্টের দিনে সবার আগে মাকে মনে পড়ে। শুক্লারও তাই হয়েছে। জ্বরের ঘোরে শুধু মাকে মনে পড়ছে। মেয়ের এত কষ্ট করে বানানো খাবারও খেতে পারেনি। মুখে খাবার বিস্বাদ লাগছিল। খাবারে কোনো ঘ্রাণ না পেয়ে তখনই শুক্লা বুঝেছে, দেহের কোষগুলো বিগড়েছে। বারবার মায়ের কথা মনে ভেবে শুক্লার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।
ছোটবেলায় জ্বর এলে মা কত যত্ন করত বুকে জড়িয়ে ধরে। লেবু, ডাল দিয়ে জোর করে ভাত খাওয়াত। ভাত খাওয়ানোর পর ওষুধ খাওয়াত। ও কোনভাবেই ভাত, ওষুধ খেতে রাজি হতো না। মায়ের জোরাজুরিতে শুক্লার তখন মনে হতো, দুনিয়ার সবচেয়ে বিরক্তিকর বস্তু মা। অবুঝ শুক্লা তখন মনে মনে প্রার্থনা করত, বড় হয়ে মায়ের থেকে অনেক দূরে চলে যাবে। এত দূরে যাবে যেখানে মা আর তাকে খুঁজে পাবে না। শুক্লাও বেঁচে যাবে মায়ের যত শাসন আর যন্ত্রণা থেকে৷
শুক্লা সত্যি সত্যি মায়ের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে। মায়ের জন্য কষ্টে শুক্লার বুকের আলপথ রক্তস্রোতে ভেসে গেলেও, মায়ের দেখা পায় না। আজ মায়ের হাতের ডাল, ভাত খাওয়ার জন্য শুক্লার মন ব্যাকুল বৃষ্টির মতো অঝোরে কাঁদছে। কিন্তু শুক্লার মা নেই। জগতের কোথাও নেই।
শুক্লার গায়ের কাঁপুনি বেড়ে চলছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। শক্তি পাচ্ছে না শরীরে। বুকে ব্যথা করছে। কোনো মতে কম্বল গায়ে ও সোফার ওপরে শুয়ে পড়ে। নোভা মাথার নিচে একটা বালিশ এনে দেয়।
শুক্লার মায়ের সঙ্গে নোভার অন্তরঙ্ ভালোবাসা ছিল। নানি-নাতনি মিলে সারা দিন কুটুর কুটুর গল্প করত। মাঝে মধ্যে শুক্লা মা-মেয়েকে শাসন করে বলত, ‘কিসের এত গল্প করো তোমরা রাত জেগে?’
নানির কাছ থেকে নোভা শিখেছে, থার্মোমিটারের বদলে কপালে হাত রেখে কীভাবে জ্বর মাপতে হয়! নানির কাছ থেকে নোভা এমন আরও অনেক কৌশল শিখেছে, যেমন মোবাইল স্ক্রিনে আবহাওয়ার সংবাদ না দেখে, ঘর থেকে জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে তাপমাত্রার পরিমাণ দেখে নেওয়া। একদিন প্রচণ্ড শীতের সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে নোভা যখন এভাবে ঘর থেকে জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে তাপমাত্রা দেখছিল, তখন শুক্লা অবাক হয়ে যায়। পরে জানতে পারে নোভাকে এসব অ্যানালগ কৌশল তার নানি শিখিয়েছে!
আজও নানির থেকে শেখা কৌশল প্রয়োগ করে নোভা মায়ের মাথায় হাত রেখে বলে, ‘মা অনেক জ্বর এসেছে তোমার। ওষুধ খেতে হবে।’
নোভা তাড়াহুড়ো করে রান্নাঘরে যায়। স্লাইস হোল হুইট পাউরুটির মধ্যে গ্রেপ জেলি লাগিয়ে নিজ হাতে মাকে খাইয়ে দেয়। ঠান্ডা পানিতে তোয়ালে ভিজিয়ে মুখ মুছে দেয়। জ্বরের ওষুধ নিয়ে আসে। যত্ন করে মুখে তুলে ওষুধ খাইয়ে দেয়। তীব্র ভালোবাসার সুখে শুক্লার চোখ আবারও ঝাপসা হয়ে আসে। ভালোবাসার রঙ একইরকম। জীবনের নানান স্তরে শুধু ভিন্নভাবে ধরা দেয়৷ মাথার চুলে বিনুনি কাটতে কাটতে নোভা মায়ের চোখ মুছে দেয়।
বেঁচে থাকার জন্য, দীর্ঘ জীবনের জন্য শুক্লার বড্ড লোভ হয়। মেয়ের নিষ্পাপ ভালোবাসার শীতলতায় শ্রান্ত-ক্লান্ত শুক্লা ঘুমিয়ে পড়ে।
মেয়ের সেবা-যত্নে শুক্লার জ্বর নেমে যায়। মধ্যরাতে ওর ঘুম ভাঙলে পরে মেয়ের কথা ভেবে বোকার মতো হাউমাউ কান্না পায়। দুঃখ পেলেই কাঁদে না, মানুষ সুখেও কাঁদে। এই কান্না সুখের কান্না। নোভা মাকে জড়িয়ে ধরে আছে পরম আদরে। দুর্বল শুক্লা মেয়ের হাত দুটো শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ওর শরীরের স্বর্গীয় ঘ্রাণ নেয়। মাথায়, কপালে হাত বুলিয়ে দেয়। মেয়েও তার মাকে অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরে বুকে। ভালোবাসা, নির্ভরতার পরম আশ্রয়ে মেয়ের আদরে শুক্লা আবারও ঘুমিয়ে পড়ে। মা-মেয়ের ভালোবাসার আদর মাখা চাদরে মোড়ানো পৃথিবী তখন স্বর্গ হয়ে ওঠে।
শেষ রাতে ঘুম ভেঙে শুক্লা ফুরফুরে, সতেজ বোধ করছে। রাতভর মেয়ের সেবা শুশ্রূষায় শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। ফজরের নামাজ শেষে ও লিভিং রুমের জানালার পর্দা সরিয়ে প্রকৃতির কাঁচা সৌন্দর্য উপভোগ করছে প্রাণভরে। ভোরের কাঁচা হিম হিম হাওয়ায় সুখের গল্পরা বুকসিন্দুকে ভালোবাসার তুমুল আলোড়ন তোলে। আনন্দে বুক কেঁপে কেঁপে ওঠে। ভেতরে-বাইরে কে যেন ভালো লাগার বাঁশিতে সুর তোলে, যে সুর জীবনের শাখায় শাখায় ভালোবাসার গল্প বুনে চলে। নিঃসীম শূন্যতায় অপলক তাকিয়ে থাকে শুক্লা। সুরের পিছু নেয়। ভালোবাসার ঝালরে ঢেকে আছে গোটা আকাশ। জমিনজুড়ে পড়ছে সে ভালোবাসার উজ্জ্বল ছায়া। চোখের বিলে শুধু ভালোলাগার উপচে পড়া ঢেউ। সুন্দরের কাজ একটাই, অসুন্দরকে দূর করে দেওয়া। সুন্দরের কাজ আলো জ্বেলে দেওয়া, ভালোবাসা বিলি করা। অফুরান ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া ছাড়া জীবনের তো আর অন্য কোনো মানেও নেই। ঘোরের রাজ্যে সাঁতার কাটতে কাটতে শুক্লা ভালোবাসার এক গাঢ় অরণ্যে এসে পৌঁছেছে।
ঘোরের ভেতর থেকে বের হয়ে শুক্লা পুনরায় লিভিং রুমের জানালার পর্দা টেনে দিয়ে মেয়ের কাছে যায়। বিশ্বচরাচর কাঁপানো আনন্দ বুকে ঘুমন্ত নোভার কপালে আলতো করে চুমু খায়। নোভা অতল ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে আছে। অনেক সময় ধরে শুক্লা আত্মজের ঘুম জড়ানো নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। নোভার মুখের দিকে তাকিয়ে শুক্লা তার অতীতে হারিয়ে যায়। ঠিক এভাবে কত দিন ঘুম ভেঙে শুক্লা দেখেছে, মা ওর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। জগতের সব মায়েরা যুগ যুগ ধরে সন্তানের মনোভূমিতে একইভাবে ভালোবাসার বন্দনা করে চলে। বাঁচার আনন্দ খোঁজে। ভালোবাসায় আশ্রয়ে জড়িয়ে থাকে।
মনের উথালপাথাল অবস্থা দূরে সরিয়ে রেখে শুক্লা শোবার ঘরের লাগোয়া বারান্দায় গিয়ে বসে। ভালোবাসা উপচে পড়ছে বুকের রেলিঙে। দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দে ও একাকী ভাবতে থাকে – জীবন আসলে কী?
জীবন একই সুতোয় গাঁথা একটি ফুলের মালা। জীবনে অনেক ধরনের দিন আসে, ফুল ফোটে, ভালোবাসারা হাসে। যে যেভাবে মালা গাঁথে, জীবন সেভাবে প্রস্ফুটিত হয়। যে যেভাবে জীবনের পরিচর্যা করে, সেভাবে জীবন আলো বিলায়। জীবন একটি খোলা জানালা। যে যেমন জীবনের চাষ করবে, সে আবহাওয়া এই জানালা দিয়ে জীবনে প্রবেশ করবে। এত এত আদর, স্নেহ, ভালোবাসায় মাখামাখি জীবন উপভোগ করতে পারার জন্য শুক্লা কায়মনোবাক্যে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানায়।
রাজ্যের ভাবনা ভেসে বেড়ায় শুক্লার মনে। পৃথিবীতে হরেক রঙের মানুষের বাস। সবার মত-পথ আলাদা। প্রতিটি মানুষ বাঁচার মতো বাঁচতে চায় ভালোবাসার আদরে। কেউ তার সন্ধান পায়, কেউ পায় না। পৃথিবীতে যতই না-পাওয়া থাকুক, মালিন্যহীন হৃদয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারাটাই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শুক্লা প্রাণভরে ভালোবাসার আদরে শ্বাস নেয়।
ভালোবাসা ভালোবাসে ভালোবাসাকে। জীবনকে ভালোবাসলে বিনিময়ে জীবনও ভালোবাসে।
কল্পনার চেয়ারে দুলতে দুলতে শুক্লার মনে জীবনের গূঢ় রহস্য নিয়ে অগণিত ভাবনারা দোল খেতে থাকে। শুক্লার চোখ বন্ধ। ও আরাম পায় তার জীবনকে ভেবে। দেয়াল ঘড়ির সঙ্গে তার বুকের ঘড়িও ঘাসফড়িংয়ের মতো আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে সম্মুখে এগিয়ে চলে।
একমাত্র মেয়ে নোভার ভালোবাসায় শুক্লার দিনগুলো পরিণত হয় একেকটি স্নিগ্ধ কবিতায়; আর রাতগুলো ভরে ওঠে প্রশান্তি জড়ানো শীতল ভালোবাসার গল্পে। গল্পগুলি চিরকাল একইরকম।