পাঁচ কবির কবিতা >> অনুপম মণ্ডল > কচি রেজা > তিথি আফরোজ > পার্থ সরকার > মাম্পী দত্ত >> কবিতাগুচ্ছ

0
277

পাঁচ কবির কবিতা >> অনুপম মণ্ডল > কচি রেজা > তিথি আফরোজ > পার্থ সরকার > মাম্পী দত্ত 

অনুপম মণ্ডল >> দুটি কবিতা

প্রভাস্বর

ছায়াঘন ঝুমকো-লতার মাচায় ঝুপসি আঁধার নেমেছে।
কেউ নাই ঘাটে।
হাওয়ায় দুলছে আকন্দ ফুলের ঝাড়।
কেউ কি গোপনে নিঃসঙ্গ হতে হতে নিজেকেই দূরে ফেলে আসে!
বুঝিনি ও কার মূর্ছাহত প্রভাস্বর।
যতদূরে আঁখি মেলি, অমল মহুয়ার শাখা।
জল হতে উত্থিত তরঙ্গেরা, এগিয়ে চলেছে, বন্ধনসকল
দগ্ধ করিতে করিতে।

তারার লালচে বাকলগুলো

এইসব ছায়াঘন, নিবিড় ঝোপঝাড়
মাড়িয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে তারার লালচে বাকলগুলো—
দূরে ঈষৎ আনত কোনো সুর। পাপড়ির রেশমি।
হয়তো-বা, জলার ধারে বেনাবনের সবুজ শীষগুলো নড়ে উঠলো।
আর কোথাও রাত্রি দুপুর গড়িয়ে যায়।
দীর্ঘ নমিত কোনো হংসলতার মাথায়,
একটি বা দুটি জোনাকি—থেকে থেকে দোল খায়।
দ্যাখে, অনেক উঁচুতে নিবিড় সবুজ তাঁর পত্রসজ্জার আড়ালে
ঝরে যায় গাঢ়-ধূসর ওই নক্ষত্রের ধুলো—

কচি রেজা >> দুটি কবিতা

টোটেম ও জাদু

বাদাম ভেঙে দেখি বৃদ্ধ পিতামহের মুখ
অসম্ভব শীত লাগলে আমিও ইশতেহার পড়ি
ধার করে নিয়ে আসি দাঁত
মাঝে মাঝে গোড়ালিতে মিছিল নামে
এখনও যারা অষ্টাদশ শতকের চাবি দিয়ে গর্ভবতী হয়
টোটেম আর জাদুই কী তাদের ভবিষ্যৎ
আমার ভিতর রাতভর শিশুও রুটি
পিছিয়ে যাচ্ছে বিবাহ!

তাৎপর্য

দংশন কি এমন
আমার মিষ্টি লাগছে ঘুমিয়ে যেতে
কত কি রোদ দেহের চারপাশে
সাইবেরিয়ার শীত পৌঁছে দিচ্ছে চক্রাকার ঠোঁট
নামকরা পাখিও
এভাবেই জগতের গল্প বলি আমি, এভাবেই বর্ণনা হয় নদীর
যে দুঃস্বপ্ন ঠান্ডা ভাতের মতো গিলি
সেখানেও চোখের দীপ্তি নেই, ব্যথা নেই কোনো
এক হরিয়াল আমার চোখে নিজেকে খোঁজে
তার বাড়ির পাশেই আরশিনগর
ভালবাসা ফুরিয়ে গেলে আবার জ্বালিয়ে নিয়ে
হৃদয়টা বুঝিয়ে দেব তাকে
আমার স্ফটিকের হাত থেকে খোঁড়া পুতুলও পড়ে ভেঙে যায়
তাই কারণে অকারণে আমি হাত মুছি
আর কোটি কোটি রূপকথায় ভরে ওঠে মাতৃমুখ
আমার মায়ের বিচার করো না হে ঈশ্বর
আমিই তার একমাত্র পাটিগণিত
মা উচ্চারণে আমার ঠোঁটের জ্বর অনেক কমে যায়,
তোমার চুম্বনে অনূদিত হই আবার
গায়ে হরিণকালের শীত
পাতাপাতা বুকের শেষটুকু একদিন শিষ্ট হবে
না, কোনো তাৎপর্য নেই!

তিথি আফরোজ >> তিনটি কবিতা

পিপাসা

তোমার যাবতীয় পিপাসা আমিই মিটাবো; জানো তো, এখানে কুসুমতিথিতে শেফালির ডালে ডুমুর ফুল ফোটে। লতানো রক্তজবার রেণু দুলে উঠলেই লক্ষ্মীপ্যাঁচাটা স্থির তাকিয়ে থাকে মঙ্গলের আশায়।
আমি আকাশ থেকে মঙ্গলপ্রদীপ নামাবো বলেই
খনার জিহ্বা গজিয়ে ফেলেছি পুনঃবার।
তোমার সকল সাধ অবলীলায় শুধু আমাকেই বলো;
আমি শখের তোলা আশির উর্ধ্বে ক্রয় করে রেখেছি পরম যত্নে। একজীবনের সকল অবগাহনে ফুরাবার নয় প্রলম্বিত সমুদ্রস্রোত। অবগুণ্ঠন খুলে সূর্য ওঠার আগেই জেগে আছে তোমার মহাপৃথিবীর স্বর্গ। সুরার পেয়ালা তৈরি আছে ইস্কের ভাণ্ডারে : সুবেহ-সাদিকের আগেই পান করে নাও, মেটাও পিপাসা।

সম্রাট

চেয়ে দেখো – নীরব কুটীরে
নিবিড় যত্নের রত্ন জেগে আছে।
প্রলম্বিত রাত্রির আঁধারে শোভিত তাজ
তারর ফুলকি ফুলে খচিত কারুকাজ;
অপেক্ষার প্রহরে হাঁটছে মহল,
মহীয়সী যমুনা :
ভোরের বাতাসে বাজায় মোহবাঁশি।
ছুঁয়ে তোল মাথায় অলৌকিক আলোয়
জেগে যাবে তুমিও
প্রলুব্ধ প্রবালে;
মমর গভীরে তুমিই
অবিনশ্বর সম্রাট।

চাঁদ

নীরবে হেঁটে এসে দাঁড়িয়ে থাকা চাঁদ
জানে না কী আবেশে জ্যোৎস্নায় ভিজে যায় পৃথিবী!
এক একাকী আকাশ, নিঝুম রাত চেয়ে চেয়ে ফেরে,
নিজেরি ছায়ায়, ভূগোলের কায়ায়, জড়িয়ে মায়ায়
উড়ে যায় সীমান্তে পাখিরই পাখায়,
জানি না কী এমন আছে তোমার ওই আলোয়, আলিঙ্গনে কাঁপে তোমায় না দেখার মুহূর্ত!
ভেবে হয় উদাস এই সোনালি রাত,
নদীর ঢেউয়ে জেগে ওঠে ডুবন্ত সে চাঁদ;
মেঘের প্রলাপ।
পৃথিবী ডুবে যায় : মন খারাপের ওই আঁধারে। না-ছোঁয়া বাতাস এসে, ভেবে হয় দিশেহারা।
নতুন রাতের পূর্ণিমা হয়ে কবে  দেবে আলো!
ও-চাঁদ নীরবে হেঁটে দাঁড়াও পাশে, ভিজে যাক;
যাক ওই দিগভ্রান্ত দিগন্ত…

পার্থ সরকার >> তিনটি কবিতা

ধূলিসাৎ

অখণ্ড পতনে দাঁড়িয়ে আছে শুধু গঞ্জ
যেন এখনই মুক্তি আসন্ন
পরিছন্ন ধূলিসাৎ
যেন এখনই কুরুক্ষেত্রে
ভীষ্ম
শরশয্যা
তীরে উঠে আসা জল
উত্তরায়ণ
অথচ মুক্তির নিরিখে
এখনো নিক্তিতে
পুরসভার পরিশ্রুত জল
মাটি বেয়ে উঠে আসা তীর
যবনিকা পতনের আগে
গোলাপি ঔদ্ধত্য…
তবু,
অকাল গরিমা
আর তার জলভরা শরশয্যায়
ভেঙে যায় ভীষ্ম

বিছিন্ন মৌতাতে
ভেঙে যেতে ভালোই লাগে বিদুরের

মহাপ্রস্থানের ঘোড়া

বিভক্ত মাঠ
অপ্রতুল বিভাজিকা –
আবীর ওড়ায় কর্ষণ,
অপ্রয়োজনীয় ক্লান্তি
সারাদিনের দর্শনে আর কোথায় পরিচয়
প্রথম দেখার?

নেমে আসে ঠিকানা
দূরান্তের স্বরলিপির চৌকাঠে
এক পরাকাষ্ঠা প্রয়োজনীয়
গোমুখ আহ্বান

কাষ্ঠহেসে
জল ঢেলে চলে যায়
সারস্বত
বীণার শেষ সংলাপে।

মাতোয়ারা টালমাটাল মাতাল

অবরুদ্ধ পুরী
পাতালপুরী
স্থলজ ভাঁটায় অপঠিত
পাথর নুড়ি

অগুন্তি সময়

কার সাথে
আলাপ
প্রলাপ
সংলাপ
শব্দছলাৎ?

ডুবে যাবে বলে
ভেসে উঠেছে মড়ক
নরকের কানাগলি
প্রশান্ত এসেছে বলে
স্থিতাবস্থার দোহাই পারে দীপাবলি

অন্ধকারেই তো
জমে খেলা
বিশুদ্ধ অপহরণের পর ।

মাম্পী দত্ত >> দুটি কবিতা

তুমি দূরে বসে আছো বলে

আমার সবক’টি অভিযোগের তীর তোমাকেই বিদ্ধ করে।
পথের নুড়িতে হোঁচট খেলেও মনে হয়
আমাকে কেন হোঁচট খেতে হবে সামান্য নুড়িতে,
আমি তো তোমাকে ভালোবাসি!
যে-কোন অনিবার্য জীবন-যন্ত্রণার মুখোমুখি দাঁড়ালে
আমি তোমার অভিযুক্ত মুখটি ছাড়া কিছুই দেখি না।
মনে হয়
ওসব কখনো আমার প্রাপ্য নয়,
কেননা আমি তোমাকে ভালোবাসি।

সকালে হকার যেন পত্রিকা নয়, তাজা বোমা রেখে যায় দরজায়
পাতা উল্টাতেই বিস্ফোরিত বিপন্নতার আঘাতে
ভেঙে পড়ে একে একে অন্তর্গত আস্থার ক’টি সুরম্য দালান,
চোখ প্রায় না-মেলেই জীবনের স্লেজগাড়িটাকে টানি।
পরিপার্শ্বের অযাচিত ভার কবিতার গায়ে চেপে বসতে চাইলে
আমার নিরাশ্রয় কবিতাগুলি চোখভরা অভিযোগ নিয়ে
চেয়ে থাকে তোমার দিকেই।

তুমি ওই দূরে বসে আছো,
এই ফাঁকে আমাকে বিরক্ত করছে খুব দুঃখ
দুঃখের এত স্পর্ধা
আমার একদম সহ্য হচ্ছে না, সোনা!
আমার নখাগ্র স্পর্শ করার দুঃসাহস কী করে হয় ওর!
কার প্রশ্রয়ে এতোটা শরীর ঘেঁষে বসে ও আমার—
যখন দুঃখকে আমি ভালোইবাসিনি!

সাহিত্যের ক্লাসরুম

মর্গের ঘরে কোন জানালা থাকে না
তাতে আলো আসে না, হাওয়া আসে না
সেখানে সর্বব্যাপী হিম, শীতলতা।
লাশদের রোদ, জল চাই না
আদর চাই না
লাশদের অনুভূতি নেই
তাই সেঁধিয়ে দেয়া ছুরির প্রান্ত থেকে রক্ত গড়ায় না।
শবাগারে অভিনব আবিষ্কার আছে,
সৃষ্টি নেই।

অথচ শিশুর জন্মের ঘর মুখরিত,
মমতায় উষ্ণ।

উলঙ্গ শবের দেহ চিরে
প্রাণপণ চেষ্টায়
ডোম সেই শরীরের বৃত্তান্ত
মায়ের মতোই নিখুঁত দেখে নিতে পারে—
ক’টা তিল, কোনখানে দাগ
মায়ের মতোই সে-ও নির্ভুল বলে দিতে পারে
শেষবার এ শরীর পেটপুরে খেয়েছিলো কি না।

তবু প্রসব-বেদনা নেই বলে, একান্ত জঠরদেশে
সৃষ্টির প্রপঞ্চ নেই বলে—
শবাগার নিরানন্দ, শব্দহীন, হিম।