পাবলো নেরুদা >> কবি তো কোন গড়ানে নুড়িপাথর নন >> তানজিমা তাসলিম অনূদিত >> জন্মবার্ষিকী

0
253

কবি তো কোন গড়ানে নুড়িপাথর নন

কবি তাঁর জনগণের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত হন সে-বিষয়ে উপাচার্য মহোদয় চমৎকার কথা বলেছেন, এবং এ ব্যাপারে আমিও তাঁর কথারই পুনরুক্তি করতে চাই।
হ্যাঁ, ঠিকই, আমিই সেই কবি।
আমি কথাটা যে বললাম ‘ঠিকই’, তার কারণ হলো ইতিহাসে দেখা গেছে এই সম্পর্ক নিশ্চিত করার দায়িত্ব কবিদেরই। এই দায়িত্ব পালন করতে হয় ভক্তিভরে, কষ্ট স্বীকার করে এবং আনন্দের সঙ্গে।
কোনো কবিকে তাঁর জীবনের প্রথম পর্যায়ে জন্মভূমির নির্যাস আত্মীভূত করতেই হয়, পরে সেগুলোই ফিরিয়ে দিতে হয় তাঁকে। তাঁকে সেগুলো সংরক্ষণ করতে হয়, ফেরতও দিতে হয় তাঁকে। তাঁর কবিতা ও তাঁর কর্মধারা নিশ্চয়ই তাঁর দেশবাসীর পরিণত ও বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখে।
একমাত্র বলপ্রয়োগ ব্যতিরেকে কবিকে কখনোই নিজ বাসভূমি থেকে ছিন্ন করা যায় না। যদি পরিস্থিতি তেমন হয়, তখন তাঁর শেকড় ঠিকই গভীর তলদেশ পর্যন্ত না গিয়ে পারে না, হাওয়ায় হাওয়ায় তার বীজ ভাসতে থাকে পুনর্বার তাঁর জন্মস্থানে শরীরী রূপাবয়ব গ্রহণের আকাঙ্ক্ষায়। যৌক্তিকভাবে ও আত্মচিন্তায় স্বজাতিক, পরিণত বোধসম্পন্ন দেশপ্রেমিক, হতেই হয় একজন কবিকে।
কবি তো কোনো গড়ানে নুড়িপাথর নন। তাঁর রয়েছে দুটি পবিত্র দায় : ছেড়ে যাওয়া আর ফিরে আসা।
একজন কবি যিনি ছেড়ে যান, আর কখনো ফিরে আসেন না – তিনি হয়ে যান বিশ্বনাগরিক। বিশ্বনাগরিক হিসেবে তিনি তখন আর ঠিক মানুষ নন, তিনি মুমূর্ষু আলোকের ক্ষীণ প্রতিবিম্ব যেন। সর্বোপরি আমাদের দেশের মতো কোন নিঃসঙ্গ, এই গ্রহের কোনো খাঁজেখোঁজে পড়ে-থাকা বিচ্ছিন্ন ভূমি, অপরিহার্যভাবেই তো এই জনগণের আবির্ভাবের প্রত্যক্ষদর্শী; আমাদের সকলের – বিনায়বত থেকে শুরু করে মহাদেমাগী লোক পর্যন্ত সকলেরই – সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের জাতির জন্মলগ্নে হাজির থাকার, আমরা প্রত্যেকেই যে যার মতো করে এর জন্মদাতা পিতা।
বিশ্বসংস্কৃতির অঙ্গনে থেকে এসব বই আমি সংগ্রহ করেছি, আর আমি সাত সাগরের এই সমুদ্রফেনা দিয়ে দিচ্ছি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে। এ হল আমার বিবেকমুক্তি, আবার সেইসঙ্গে আমার দেশবাসীর কাছ থেকে যা পেয়েছি তার যৎকিঞ্চিৎ ফেরত দেওয়াও। কোনো অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় নি, বরং মানুষের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এর জন্ম। আমাদের ইতিহাসের নানা অভ্যুত্থান থেকে উঠে-আসা অগ্রগতির এই ঐতিহ্য – যা আজ পুনরুজ্জ্বীবিত হচ্ছে উপাচার্য গোমেস মিল্লাসকে দিয়ে, – এবং এটাই হচ্ছে আমাদের পতাকার তারকাবিন্দু।এই অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে। অদূরভবিষ্যতে জনসাধারণের এই বিশ্ববিদ্যালয় বহুপ্রতীক্ষিত পরিবর্তনের ফলে আরো বিস্তৃত হবে। আমি এ বইগুলো পৃথিবীর সমস্ত জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছি। আমি যত জায়গায় গেছি বইগুলো তত জায়গায় গেছে। কিন্তু এদের অনেকগুলো আমার এই পঞ্চাশ বছরের জীবনের চাইতে আরো চার-পাঁচ শ’ বছর বেশি বেঁচে আছে। এদের কিছু আমি পেয়েছি চীনদেশে, অন্যান্য কিছু কিনেছি মেহিকোতে । পারী থেকে পেয়েছি এসবের শত শত; খুবই মূল্যবান কিছু বই এসেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। এগুলোর সবই আমার জীবনের, আমার ব্যক্তিগত ভূগোলের, এক অংশ। এসব খুঁজে বের করা ছিল ভীষণ ধৈর্য়ের কাজ। যখন খুঁজে পেলাম তখন অবর্ণনীয় আনন্দ হল। ওগুলোর জ্ঞান ও সৌন্দর্য আমাকে উপকৃত করেছে। এখন থেকে এরা আর কত জনেরই-না উপকার করবে – গ্রন্থের স্বভাবসিদ্ধ ঔদার্যই হল এরকম।
সময় যত এগোতে থাকবে, এসব বই যখন কোনো পাঠক উল্টেপাল্টে দেখবে তখন সে বুঝে উঠতে পারবে না – কেমন ছিল সেই লোক যে জড়ো করেছিল এগুলো; আর এরও কোনো কূলকিনারা পাবে না – কেনই-বা এদের ভেতর কিছু কিছু বই এ সংগ্রহের ভেতরে রয়েছে। এই গোতা বর্ষপঞ্জিকাসমূহ বুড়ো থুত্থুরে অভিজাত পরিবারগুলো নানা খেতাব-পদবী, রাজপরিবারের নামধাম বাঁচিয়ে রেখেছে। তারা যেন ভ্যানিটি
ফেয়ারের বস্তুতালিকা।
বইটি আমি রেখেছি একটিমাত্র লাইনের জন্য, খুদে খুদে হরফে ছাপবার কারণে যা প্রায় চোখেই পড়ে না, তা হলো ‘১২ই ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭। রুশ কবি আলেকসান্দর্ পুশকিন, দ্বন্দ্বযুদ্ধে মারা গেছেন।’ এ লাইনটি আমার বুকে ছুরি বসিয়ে দেয়। ওই ক্ষতস্থান থেকে বিশ্বকবিতা এখনো রক্ত ঝরাচ্ছে।
হয়েছে Romancero gitano, আরেকজন খুন-হওয়া কবির বই। ফেদেরিকো আমার উপস্থিতিতে এর প্রাণ-উজাড়-করা উৎসর্গপত্রটি লিখেছিলেন এবং এর প্রথম পাতায় স্বাক্ষর করেছিলেন পল্ এলুয়ার্ – তিনিও আজ প্রয়াত।
তাঁরা আমার কাছে শাশ্বত হয়ে রয়েছেন। মনে হয় তাঁরা চিরন্তন। কিন্তু তাঁরা তো চলে গেলেন।
পারীতে এক রাত্রে আমার বন্ধুরা আমাকে আপ্যায়ন করেছিলেন। ওই পার্টিতে বিখ্যাত ওই ফরাশি কবি এসেছিলেন কিছু অমূল্য রত্ন হাতে নিয়ে। এর মধ্যে একটি ছিল সে-সময়ের এক খুদে অত্যাচারীর হাতে নির্যাতিত ভিক্তর উগোর গুপ্ত সংস্করণ। তিনি আমাকে আরো কিছু দিয়েছিলেন, এগুলো আমার যাবতীয় সকল কিছুর ভেতরে সম্ভবত সবচেয়ে দামি – মার্সেই-এর এক হাসপাতাল থেকে ভাইয়ের মৃত্যুর কথা মা-কে জানিয়ে ইসাবেল্ র্যাঁ বোর লেখা দুটি চিঠি।
আমার জানা কোনো চিঠিই এতোখানি হৃদয়বিদারক নয়। চিঠি দুটি দিতে দিতে পল্ আমাকে বললেন : “দেখবেন শেষের গুটি কয়েক শব্দ নেই, কেবল বলা হয়েছে : আর্ত্যুর্ যা চাইছে…।” এর পরের কথাগুলো কী ছিল কখনো খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর লোকটা কিনা র্যাঁ বো। কেউ কখনো জানতেই পারল না তিনি কী চেয়েছিলেন।”
এই সেই দুটো চিঠি।
এই যে আমার প্রথম কেনা গার্সিলাসো, মাত্র পাঁচ পেসেতা দিয়ে সে যে কি অবিস্মরণীয় আবেগে কিনেছিলাম। তারিখটা দেওয়া আছে ১৫৪৯ সাল। সপ্তদশ শতকে ফ্লেমিশ প্রকাশক ফোপেন্স, প্রকাশিত গোন্গোরার এই চমৎকার বইটি, যখন কবিদের লেখা বই বেরুতো তুলনীয় রাজকীয়ভাবে – তখনকার। মাদ্রিদ শহরে গার্থিয়া রিকোর দোকানে বইটার দাম ছিল এক শ’ পেসেতা, কিন্তু মাসিক দশ পেসেতা কিস্তিতে শোধ দেয়ার কড়ারে বইটি আমি কিনি। আমার এখনো মনে আছে, কাস্তিলের চাষাভুষো চেহারার দেখতে এই আশ্চর্য দোকানদার গার্থিয়া রিকোর মুখটা বিস্ময়ে কেমন হাঁ হয়ে গিয়েছিল – আমি তাঁকে বইটা ঠিক সময়ে পাবো তো, এ-কথা জিজ্ঞেস করায়।
আর এ দুটো বই হল আমার প্রিয় স্বর্ণযুগের কবিদের প্রথম দুটি সংস্করণ এল দেসেঙ্গাইওঁ দে আমোর্ এন রিমাস্ (পঙক্তিমালায় রচিত প্রেমের হৃত চিত্তবিভ্রম), পেদ্রো সোতো দে রোহাস্-এর লেখা, আর অন্যটি ফ্রান্সিসকো দে লাতোররে – রচিত নৈশ পঙক্তিমালা :
বেহেশতের আলো দেখে ভাবিছে সকলে ভীষণ আঁধার রাতে চোখ তার জ্বলে, উজ্জ্বল রাজ-উচ্ছাস, উজ্জ্বল ক্যাসিওপিয়া, পার্সেউস, আরো আছে গ্রহ অ্যান্ড্রোমিডা…
এত বই। এত জিনিস! এর মধ্য দিয়েই অতীত এখানে বেঁচে থাকবে। আমার মনে আছে তখন পারীর সিন্ নদীর ধারে রাফায়ে্ আলবের্তির সঙ্গে থাকছি। একদিন আমরা আমাদের সময় কীভাবে বাস্তববাদের যুগ হল, নাদুসনুদুস কফিদের যুগ, তা নিয়ে আলোচনা করছিলাম।
“রোগাপাতলা কবিদের নিয়ে যথেষ্ট হয়েছে, বাপু”, রাফায়েল উৎফুল্ল কণ্ঠে রায় হাঁকালেন। “রোমান্টিসিজম্ হাড়জিরজিরে মেলা কবি পয়দা করেছে।”
আমরা চাইতাম বালজাকের মতো মোটাসোটা হতে, বেকেরের মতো রোগাপটকা নয়। আমাদের বাড়ির নিচতলায় একটা বইয়ের দোকান ছিল। সেখানে জানালার শার্শিতে ঠেস-দিয়ে-রাখা রচনাসমগ্র ছিল ভিক্তর উগোর। বাইরে বেরুবার সময় আমরা ওই জানালার কাছে একটু থমকে দাঁড়িয়ে নিজেদেরকে মাপজোক
“তুমি কতখানি মোটা?”
“লে ত্রাভেইয়্যর দ্য লা মের্ (সাগরের গতর-খাটা মানুষ) যেমন ততখানিই প্রায়। আর তুমি?
নৎর্ দাম্ দ্য পারী (পারীর নতোর দাম গির্জা) থেকে বড় হব না।”
পশুপাখি ও বৃক্ষলতাদের ওপর এত বই কেন – একথা কখনো কেউ জিজ্ঞেস করতেও পারে। এর উত্তর মিলবে আমার কবিতায়।
তা ছাড়া, প্রাণিবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যার বই আমাকে সর্বদা মুগ্ধ করে। এগুলোর জন্যেই শৈশব এখনো ধরে রাখতে পেরেছি। প্রকৃতির অফুরন্ত বিশ্ব আর অসীম গোলকধাঁধার কাছে এরা আমাকে নিয়ে যায়। ভূমণ্ডলের নানা অনুসন্ধান ও আবিষ্কার নিয়ে এই-যে সব বই, এগুলো আমার খুব প্রিয়। এমন খুব কমই হয় যে আমি নানান বাহারি পাখি আর উজ্জ্বল ঝলমলে পোকামাকড়ের ছবি – সে-সব আবার ঘড়ির ভেতরের কলকব্জার মতো জটিল – ইত্যাদি না-দেখে ঘুমোতে গেছি।
কিন্তু উপাচার্য মহোদয়ের হাতে যা দিচ্ছি, যা ফেরত দিচ্ছি, যা রেখে দিচ্ছি, তার সামান্য। তাঁর মাধ্যমে জাতির নিকট এসব উত্তরাধিকার হিসেবে আমি দান করছি। আমি তেমন পরিবারের লোক নই যারা সবকিছু নিয়ে বংশগরিমা রটিয়ে বেড়ায়, তারপর সেই অতীতকে নিয়ে নিলাম হাঁকে।
এ-সব বইয়ের উজ্জ্বল দীপ্তি, এসব ঝিনুকের ভেতর সমুদ্রপল্লব – এ সমস্ত কিছুই আমি আমার জীবদ্দশায়, দারিদ্র্য ও নিরন্তর কঠোর পরিশ্রম সত্ত্বেও পুঞ্জীভূত করেছি। আজ আমি এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়ে দিচ্ছি। অর্থাৎ প্রত্যেককেই দিচ্ছি।
আরেকটি কথা।
বিশেষ একটি সময়ে অবক্ষয়মাহাত্ম্যের প্রতিক্রিয়ার ফলে আমার প্রজন্ম ছিল গ্রন্থবিদ্বেষী ও সাহিত্যবিমুখ। আমরা ছিলাম ভ্যাম্পায়ারবাদ, রাত্রির দুনিয়া বা আধ্যাত্মিক মাদকতার ঘোরতর বিরোধী। আমরা ছিলাম প্রকৃতির সন্তান।
তার পরেও জ্ঞানের সংহতিকে প্রকৃতি প্রতিফলিত করে, বুদ্ধিবৃত্তি প্রকাশ করে বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে সর্বাধিক দূরের বা সহজ সম্পর্কগুলোকে; আর তখন ঐক্য ও সম্পর্ক, প্রকৃতি ও মানুষ উঠে আসে বইয়ের পাতায়।
আমি কোনো বুদ্ধিজীবী নই, আর আমার এ বইগুলোতে অনুসন্ধানের চেয়ে বরং সম্ভ্রমই বেশি। চোখ-ঝলসানো সুন্দর জিনিসই আমি সংগ্রহ করেছি। আর আমার বিবেকের অতল গভীর তলদেশের যন্ত্রণা আলোকবর্তিকা হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে বইগুলোকে আমি ভালোবেসেছি অতি মূল্যবান সামগ্রী হিসেবে – সময়ের স্রোতে পবিত্র ফেনপুঞ্জ, মানুষেরই অপরিহার্য ফসল এগুলো। এখন থেকে তারা অসংখ্য নবীন পাঠকের চোখের সামনে রয়ে গেল, তাদেরই অধিকারে।
এখানে তারা আলোক বিচ্ছুরণের ও গ্রহণের নিজ ভবিতব্য সম্পূর্ণ করবে।

[১৯৫৪ সালের ২৫ জুন সান্তিয়াগে চিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পাবলো নেরুদা ফাউন্ডেশন অব দ্য স্টাডি অব পোয়েট্রি’ প্রতিষ্ঠার অনুষ্ঠানমালায় প্রদত্ত ভাষণ।]