“পুরস্কারের জন্য আমাকে আহামরি কিছু করতে হয়নি” : টনি মরিসন >> মাইনুল ইসলাম মানিক অনূদিত সাক্ষাৎকার

0
241

নারীদিবস স্মরণে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার

[সম্পাদকীয় : প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক টনি মরিসন (১৯৩১-২০১৯) ছিলেন পাণ্ডুলিপি সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ব্লুয়েস্ট আই’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে।তাঁর অন্যান্য উপন্যাস হচ্ছে সুলা (১৯৭৩), সং অব সলোমন (১৯৭৭), টার বেবি (১৯৮১), বিলাভেড (১৯৮৭), জাজ (১৯৯২)। তিনি ১৯৮৭ সালে পুলিৎজার এবং ১৯৯৩ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। এখানে যে অনূদিত সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হলো, সেটি ২০১২ সালের ১ মে ‘ইন্টারভিউ’ নামক একটা পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারের অনুবাদ। নারীদিবস উপলক্ষে সাক্ষাৎকারটি তীরন্দাজ-এ প্রকাশিত হল।]
আপনি তো ভার্জিননিয়া উলফের আত্মহত্যা নিয়ে গ্র্যাজুয়েশনের থিসিস করেছিলেন, তাই না?
আমি উলফ ও ফকনারকে নিয়ে থিসিস লিখেছিলাম। ফকনারের অনেক লেখা তখন পড়ে ফেলেছি। আপনার হয়ত একটা বিষয় জানা না-ও থাকতে পারে, পঞ্চাশের দশকে আমেরিকান সাহিত্য একেবারেই নতুন ছিল। এটি ছিল একেবারেই পথচ্যুত ও আনকোরা। ইংরেজি সাহিত্য ইংলিশদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আমেরিকান সাহিত্যকে বেশিকিছু করার জন্য উঁচুমাপের অধ্যাপকগণই ভরসা ছিলেন। তাদের সেসব কাজ আমাকে নাড়া দিয়েছে।
এই অধ্যাপকগণ কি তখন আফ্রিকান-আমেরিকান লেখকদের সাহিত্যকর্ম পড়াতেন?
তারা আফ্রিকান-আমেরিকান স্কুলেও সেসব লেখকদের সহিত্যকর্ম পড়াতেন না। আমি হাওয়ার্ড বিশ্বদ্যিালয়ে গিয়েছিলাম। আমার মনে পড়ে, আমি জানতে চেয়েছিলাম শেক্সপিয়রের সাহিত্যকর্মে কৃষাঙ্গ চরিত্রসমূহ নিয়ে একটা থিসিস করা যাবে কি-না (তিনি হাসলেন)। শিক্ষক খুব বিরক্ত হলেন। তিনি বললেন,‘কী?’ তিনি এটিকে একটি নিচু শ্রেণির বিষয় ভাবলেন। বললেন, ‘না, না, আমরা এসব করছি না। এটা খুবই ক্ষুদ্র বিষয়- উল্লেখযোগ্য কিছু না।’
সম্প্রতি ওথেলো নাটকের দেশদিমনা চরিত্রটি নিয়ে আপনি একটি নাটক লিখেছেন। নাটকে একটি বিষয় আলোকপাত করেছেন, যা আমি আগে কখনো চিন্তা করে দেখিনি। দেশদিমনা লালিত হয়েছিলেন বার্বারি নামে একজন সেবিকার কাছে। সুতরাং একদিক থেকে চিন্তা করলে ওথেলোকে বিয়ে করার আগেই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সাথে অতীত যাপনের অভিজ্ঞতা তার হয়েছে। এটি দেশদিমনার চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নাটকের পট কিছুটা পরিবর্তন করে দেয়।
আর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেশদিমনা কোনো শঙ্কাও বোধ করেনি। আপনাকে একটি ঘটনা বলি। কয়েক বছর আগে আমি বিয়েনেলের আতিথেয়তায় ভেনিসে একটি নৈশভোজে অংশ নিই। একজন আমাকে সেখানে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি জানেন, ইউরোপে কেউ বর্ণবাদী আচরণ করে না।’ আামার মনে হয় সে সময় আমি ক্লান্ত ছিলাম। আমি তার সাথে যা করেছিলাম, সেটা হয়ত আমার উচিত হয়নি। আমি তাকে বলেছিলাম, ‘না, তোমরা তোমাদের সব আবর্জনা আমাদের উপর ছুঁড়ে দিয়েছ।’ থিয়েটারের পরিচালক পিটার সিলার্স আমার মুখোমুখি বসেছিলেন। আমার কথা শুনে তার চোখগুলো ছানাবড়া হয়ে যায়। নৈশভোজের সময় সুবিশাল পর্দা দিয়ে আয়োজকেরা দেয়ালগুলো ঢেকে দিয়েছিল। সেখানে একজন বিশালদেহী রাজকীয় কৃষাঙ্গ ছিলেন। আপনার প্রশ্নের উত্তরে ফিরে আসি। একজন আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গর ভেনিসে আসতে পারাটা কোনো সমস্যা ছিল না, সমস্যা ছিল তার শ্রেণিবৈষম্য নিয়ে। তবে আমি তখন নাটকটির শুরু নিয়েই ভাবছিলাম। পিটার যখন প্রিন্সটনে ছিল, সে বলেছিল ওথেলোকে নিয়ে লেখা এই নাটকটি সে কখনো করবে না। সে আরো বলেছিল, এই নাটকটির বিষয় খুবই হালকা ধরনের। আমি তাকে জবাবে বলেছিলাম, ‘না, তুমি হয়ত পারফরমেন্স নিয়ে বলছ, নাটক নিয়ে নয়। নাটকটি সত্যিই দারুণ।’

সেটি মূলত আমার সেরা সময় ছিল। এখন আমার বয়স একাশি। তখন আমি ছিলাম এক আগ্রাসী তরুণী। ‘ডরিস ডে’ বা ‘ম্যাড ম্যান’ নাটকে সেটিরই ছায়া দেখতে পাবে।

পঞ্চাশের দশকের আমেরিকাকে আপনি আপনার নতুন উপন্যাসে কীভাবে উপস্থাপন করেছেন?
আমি সাধারণত পঞ্চাশের দশকের শুভ্রতা, আচ্ছাদন ও সারবস্তুকে তুলে আনতে আগ্রহী ছিলাম। আমি ভেবেছি বিষয়টি কি আসলে সেরকম কিছু? আমি বুঝাতে চাচ্ছি, সেটি মূলত আমার সেরা সময় ছিল। এখন আমার বয়স একাশি। তখন আমি ছিলাম এক আগ্রাসী তরুণী। ‘ডরিস ডে’ বা ‘ম্যাড ম্যান’ নাটকে সেটিরই ছায়া দেখতে পাবে।
এটি তো ডগলাস সির্কের দশকই ছিল বলা যায়।
একদম ঠিক বলেছেন। ব্যাপারটা শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না বলে মনে হতো আমার। যাযা ঘটছিল সেসব নিয়েই ভেবেছিলাম । বাস্তবেই তখন কোরীয় যুদ্ধ চলছিল। যদিও সেটিকে পুলিশি অভিযান হিসেবে প্রচার করা হতো। মোটেও যুদ্ধ হিসেবে স্বীকার করা হতো না। ৫৩ হাজার সৈন্য মারা যাওয়ার পরও। পঞ্চাশের দশকের আারেকটা চলমান ঘটনা ছিল যোসেফ ম্যাককার্থি। তারা চতুর্পাশের কৃষাঙ্গ ও শেতাঙ্গদেরকে হত্যা করছিল। ইমেট টিল মারা গেলেন ১৯৫৫ সালে। তারপর মেডিকেল পরীক্ষার নামে পৃথিবীতে নেমে এল আরো বিপত্তি। এখন আমরা জানি সৈনিকদের এলএসডি পরীক্ষা করা হয়। তখন শুধু সিফিলিস নিয়ে মেডিকেল পরীক্ষা করা হত। তাস্কিজিতে এই পরীক্ষাটা করা হতো শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গদের। কৃষ্ণাঙ্গরা একে স্বাস্থ্যসেবা মনে করত।

আমি যখন ‘সং অব সলোমন’ নিয়ে কাজ করছিলাম তখন সেটিরও অন্য একটি নাম রেখেছিলাম। ঔপন্যাসিক জোনাথন গার্ডনার এটার নাম ‘সং অব সলোমন’ রাখতে প্রভাবিত করেছেন। আমি বললাম, এটা ভয়ঙ্কর নাম।

তাহলে তাদের কি গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হত?
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এটি এখনো ঘটছে।
আপনার লেখার শিরোনামগুলো অসাধারণ। এই শিরোনামে অকৃত্রিম বিশুদ্ধতা, অবিচ্ছিন্নতা আর চেতনার বিস্তৃতি আছে। একটা উপন্যাসের নাম ‘হোম’ রাখার ক্ষেত্রে তো যথেষ্ট প্রতিশ্রুতিশীল হতে হয়েছে আপনাকে।
আমি যখন এই বইটি নিয়ে কাজ করছিলাম, তখন এটার নাম রেখেছিলাম ‘ফ্রাঙ্ক মানি’। আমার সম্পাদকই আমাকে নাম পরিবর্তনের কথা বললেন। আমি যখন ‘সং অব সলোমন’ নিয়ে কাজ করছিলাম তখন সেটিরও অন্য একটি নাম রেখেছিলাম। ঔপন্যাসিক জোনাথন গার্ডনার এটার নাম ‘সং অব সলোমন’ রাখতে প্রভাবিত করেছেন। আমি বললাম, এটা ভয়ঙ্কর নাম। আমি তখন নফের অফিসে কাজ করি। জন গার্ডনারও সেখানে ছিলেন। তিনি বললেন, ‘সং অব সলোমন’ তো মিষ্টি একটা নাম। এইটা রাইখা দাও।’ আমি বললাম, ‘আপনি কি সিওর, এটাই রাখতে বলছেন?’ তিনি বললেন,‘হ্যাঁ’। আমি বললাম, ‘আচ্ছা’। বলে তিনি চলে গেলেন। আমি ভাবলাম, ‘আমি তার কথায় মনযোগ দিচ্ছি কেন? সে নিজেই তো ‘সুর্যাস্তের সংলাপ’ নামে একটা একটা বই লিখেছেন। তার লেখালেখির শুরু থেকেই তো তিনি কোনো ভালো নাম রাখতে পারেননি নিজের বইয়ের (হাসলেন)! কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
‘সুলা’ বইটির পুনর্মুদ্রণ সংস্করণে একটা ভূমিকা লিখেছিলেন। ভূমিকায় দুই সন্তানের লালনপালন আর র্যা নডম হাউসে ফুলটাইম চাকরির অতিরিক্ত চাপের মধ্যে বইটি লিখেছেন বলে জানিয়েছেন। আপনি সেসময় কুইন্সে থাকতেন। আমার যেটা মনে হয়, আমরা তরুণ বয়সে লিখতে শুরু করা লেখকদের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিই। কিন্তু মধ্যবয়সে লেখালেখি শুরু করাটা তো আরও কঠিন, বিশেষ করে ফুলটাইম চাকরি ও সন্তান লালনের পর।
আমি তো ঊনচল্লিশ বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করেছিলাম।
ব্যাপক জনশ্রুতি আছে, আপনি সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠে লেখালেখি শুরু করেন।
সকাল বেলাটাতে আমি খুব চনমনে থাকি। এই সময়টা আসলে গ্রামের কৃষকদের সময়। আমি সুর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠতে পছন্দ করি। যাই হোক, আমি আমার ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’ শেষ করার পর এটি অনেকের কাছে পাঠাই। অনেকের কাছ থেকেই আমি ফিরতি চিঠি পাই। তাদের অধিকাংশই এই বইটাকে মানোত্তীর্ণ লেখা বলে জানায়। তবে একটি চিঠি পাই যাতে বইটিকে উল্টা দিক থেকে দেখেছেন। এটাকে ভালো বই বলে মনে করেননি। সেই সম্পাদক ছিলেন একজন নারী। তিনি অবশ্য ভাষাশৈলী নিয়ে প্রশংসা করেছিলেন। তারপর লিখেছিলেন, ‘এটির কোনো শুরু নেই, মধ্যভাগ নেই এবং সমাপ্তি নেই।’ আমার মনে হয়েছিল তিনি ভুল করেছেন। কিন্তু এটি আমাকে শিহরিত করে। তারপর ক্লদ ব্রাউন আমার কাছে কয়েকজনকে পাঠালেন। এদের মধ্যে হল্ট, রাইনহার্ট এবং উইনস্টন ছিলেন। ‘স্ক্রু হোয়াইটি’ বইটির লেখার পরের দিনগুলোর কথা। বইটির মধ্যে ‘স্ক্রু হোয়াইটি’ আন্দোলনের যে কয়েকটি আগ্রাসী বিষয়বস্তু ছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘কালোই নান্দনিক।’ আমি ভাবলাম, ‘এটি আসলে কী? তারা কী নিয়ে কথা বলছে? আমাকে নিয়ে? তারা কি বলতে চাচ্ছে আমি সুন্দরী?’ তারপর ভাবলাম, এরা আমার দর্শনীয় কৃষ্ণাঙ্গ গাড়িতে চড়ার আগে আমাকে নিয়ে এসব কথা বলবে।’(তিনি হাসলেন)। তুমি জানো, বর্ণবাদ যা করতে পারে তা হচ্ছে আত্মবিতৃষ্ণা সৃষ্টি করা। এটা আমাদের আঘাত দেয়। এমনকি ধ্বংসও করে দিতে পারে।

সিটি কলেজ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাদের পাঠ্যক্রমে ভর্তি হওয়া নবাগতদের জন্য নারী এবং আফ্রিকান-আমেরিকান লেখকদের বই তারা পাঠ্য রাখবে। আমার বইটাও সেই তালিকায় ছিল। তার মানে এই নয় যে বইটি শুধু নতুনরাই পড়বে, বইটি আরো অনেক ক্লাসেই পাঠের সুযোগ তৈরি হয়।

একজন বালিকা যে কি-না নিজেকে কুৎসিত ভাবত এবং নীল চোখ প্রত্যাশা করত। এমন একটি গল্প বলার মধ্য দিয়ে আপনার প্রথম উপন্যাসটি শুরু করেছিলেন। আসলে পরিপূর্ণভাবেই যা ছিল ‘কালোই নান্দনিক’ আন্দোলনের বিপরীত একটা ব্যাপার। আপনার শুরুর দিনগুলোর কিছু সমালোচক যারা কি-না কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়েরই ছিল, এই উপন্যাসটির মাধ্যমে আপনি কী ইঙ্গিত করতে চাইছিলেন?
হ্যাঁ, তারা এটার নিন্দা করেছিল। সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার যা ঘটেছিল সেটা আমি কোনো সমালোচকের কাছ থেকে নয়, পেয়েছিলাম আমার এক ছাত্রীর কাছ থেকে। সে বলেছিল, ‘আমি ব্লুয়েস্ট আই পছন্দ করি, কিন্তু আপনি এমন একটি বই লেখার পর আমার পাগল পাগল লাগছে।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’ সে জবাব দেয়, ‘কারণ এখন তারা আমাদের ভালো লাগার বিষয়টি জেনে যাবে।’ বেশিরভাগ সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল উড়িয়ে দেবার মতো। ও রকম পারিপার্শ্বিক অবস্থায় আমার মনে হয়েছিল, বইটি তেমন কেউ পড়বে না। দেড় হাজার কপি ছাপা হওয়ার কথা থাকলেও ছাপা হয় মাত্র ১২০০ কপি। আমার মনে হয়েছিল ওরা হয়তো চার শো কপির বেশি ছাপেনি। নরম মলাটের একটা বই। এটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার মতো ছিল। তারপর অসাধারণ কিছু একটা ঘটল। আমি মনে করি এই অসাধারণ ঘটনাটির পেছনে সিটি কলেজের ভূমিকা রয়েছে। বইটি ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয়। সিটি কলেজ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাদের পাঠ্যক্রমে ভর্তি হওয়া নবাগতদের জন্য নারী এবং আফ্রিকান-আমেরিকান লেখকদের বই তারা পাঠ্য রাখবে। আমার বইটাও সেই তালিকায় ছিল। তার মানে এই নয় যে বইটি শুধু নতুনরাই পড়বে, বইটি আরো অনেক ক্লাসেই পাঠের সুযোগ তৈরি হয়।
আপনাকে আমেরিকার ‘জাতীয় ঔপন্যাসিক’ বলা হয়। আপনাকে ‘আমেরিকার বিবেক’ও বলা হয়। মূলত ওয়াল্ট হুইটম্যান ছাড়া আরেকজন লেখককে চিন্তা করা কঠিন যার নাম জাতীয়ভাবে এতটা জোরের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। আপনার কি কখনো মনে হয়েছে, ব্যাপারটা আপনাকে আপনার লেখার জগত হতে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে? এরকম বিশাল সাফল্য কি একজন লেখককে পায়রার খোপের মতো ছোট্ট জীবনে আটকে দেয় না?
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর আমি কিছুটা বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম। কিন্তু স্রষ্টাকে ধন্যবাদ, সে-সময়ে আমি ‘প্যারাডাইস’ লিখছিলাম। এই পুরস্কারের জন্য আমাকে আহামরি কিছু করতে হয়নি। এখন আমি শুধু যা কিছু ভালো, সে-সবই মনে রেখেছি। একটা ফরমায়েশি কাজের কথা মনে পড়ছে। তবে সে-সব ভুলে গিয়ে যা কিছু ভালো তাকেই গ্রহণ করি।(তিনি হাসলেন)

সাড়ে বারোটার দিকে সুইডিশ অ্যাকাডেমির ফোন পাই। তারা জানায়, আমি নোবেল পেয়েছি। ফোন দেয়ার জন্যে এটা দিনের একটা স্বাভাবিক সময়ই ছিল। এরপরও আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি। আমি বললাম, ‘ঘোষণাটা কি ফ্যাক্স করে দেবেন?’

নোবেল কমিটির একটি ভাবাবেগপূর্ণ একটা ব্যাপার আছে। ওরা সকালে আমেরিকান নোবেল বিজয়ীকে ফোন দিয়ে ঘুম ভাঙায়। আপনার ক্ষেত্রেও কি তেমনটা ঘটেছিল?
না, এই রীতির বোধহয় পরিবর্তন ঘটেছে। নোবেল কমিটি এখন অনেক বেশি সুসভ্য। যখন থেকে তারা এই ব্যাপারটিকে অশোভন বলে মনে করেছে, তখন থেকেই তারা অনেক বিচার বিবেচনা করে সবার জন্য সুবিধাজনক সময়ে পুরস্কার ঘোষণা করে। তারা মানুষকে অস্থির-উন্মত্ত না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তারা রাতেই ফোন করে এবং সে যে দেশেরই হোক, তার সুবিধা অনুযায়ী স্বাভাবিক সময়ে ফোন করে। আমার ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল, রুথ সিমন্স নামে আমার এক বান্ধবী আছে। সে এখন ব্রাউনের প্রেসিডেন্ট। সিমন্সও তখন প্রিন্সটনে থাকত। সে আমাকে সকাল সাতটায় ফোন করে বলল, ‘তুমি নোবেল পেয়েছ। আমি ভাবলাম, কী! আমার মনে হয়েছিল সিমন্স ভুল দেখেছে।
নোবেল পুরস্কারের দৌড়ে আপনি আছেন, এমনটা কি কখনও মনে হয়েছে?
সত্যি বলতে আমি এ নিয়ে কখনো ভাবিইনি। সুতরাং আমি তার উপর চড়াও হলাম। আমি তাকে বললাম, ‘তুমি আসলে কী বলছ?’ কারণ, আমি ভেবেছিলাম, আমি যেটা জানি না, সেটা সে কী করে জানবে? সে আমকে আবার ফোন করল। আমি বললাম, ‘তোমার আসলে কী হয়েছে বলতো? কোথায় এসব শুনেছ তুমি?’ সে বলল, ‘আমি ব্রায়ান্ট গাম্বেলের টুডে শো’তে শুনেছি। তখন আমি ভাবলাম, বেশ… এমনটা কি হতে পারে? কিন্তু আমি পরে বুঝেছি, আমাদের জীবনে এরকম অনেক মুহূর্ত আসে যা আমাদের ভাবনারও অতীত মনে হতে পারে। অনেক লেখক এর-ওর মুখে পুরস্কার পেয়েছেন শুনে বিশ্বাস করেছেন, রটনা হিসেবে, সাংবাদিকরাও তাদের চারপাশে জটলা পাকিয়েছেন, অথচ দেখা গেছে তারা পুরস্কার পায়নি।
আমার মনে হয় বেচারা নরম্যান মেইলারের ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছিল। এমনকি বন্ধুরাও তাকে বলেছিল সে নোবেল পেয়েছেন এবং তাকে সাক্ষাৎকার দিতে হবে। অথচ তিনি কোনোদিনই নোবেল পাননি।
আমি জানি। এটা জয়েস ক্যারোল ওটসের ক্ষেত্রেও একবার ঘটেছিল। সাংবাদিকরা বাইরে তার জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু আমি নোবেল পাচ্ছি শোনার পর কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। আমি সোজা ক্লাস নিতে চলে যাই। এরপর সাড়ে বারোটার দিকে সুইডিশ অ্যাকাডেমির ফোন পাই। তারা জানায়, আমি নোবেল পেয়েছি। ফোন দেয়ার জন্যে এটা দিনের একটা স্বাভাবিক সময়ই ছিল। এরপরও আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি। আমি বললাম, ‘ঘোষণাটা কি ফ্যাক্স করে দেবেন?’
আপনি লিখিতভাবে চাচ্ছিলেন?
(হাসি) ঠিক ধরেছেন। কিন্তু সেই ব্যাপারটি ছিল একটা দারুণ ব্যাপার। লিখিতভাবে ঘোষণা দেখতে পাওয়াটা সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা ছিল।
আপনি ১৯৮৩ সালে চুড়ান্তভাবে সম্পাদনা করার চাকরিটা ছেড়ে দেন লেখালেখিতে মনোনিবেশ করার জন্য। সে ক্ষেত্রে চাকরিটা ছাড়ার পর এমনটা কি মনে করেছেন, ঠিক আছে, আর ফিরে না যাওয়াই ভালো?
এটা একটা আলাদা ব্যাপার। আমি চাকরিটা ছেড়ে এসে এই করিডোরে এসে বসেছিলাম (তিনি তাঁর করিডোরের জানালার দিকে ইঙ্গিত করেন)। এখানে যে হাডসন নদীটা দেখছো, নদীটা তখন এতটা সুন্দর ছিল না। আমি এখানেই বসেছিলাম এবং কিছুটা ভীত হয়ে পড়েছিলাম। ভীত না বলে উদ্বিগ্নও বলা যায়। আমার কোনো চাকরি ছিল না। তখনও বাচ্চারা আমার সাথে। এটা এক বিচিত্র রকমের অনুভূতি। এরপর মনে হল, আমি আসলে উদ্বিগ্ন হচ্ছি কেন। সেটা ছিল একধরনের সুখ, সুখের অনুভূতি বলতে পারো।
একে কি মুক্তি বলবেন?
মুক্তির চেয়েও বেশি কিছু। আমি সত্যিই সুখী অনুভব করছিলাম। যেভাবে এই কথাটা বলা দরকার, আমি মনে হয় তোমাকে সেভাবে বলতে পারছি না। আমি ঠিক অন্যরকম কিছু অনুভব করছিলাম। সেটা ছিল মূলত সুখ আর অন্য কোনো কোনো অনুভূতির সংমিশ্রণ। তারপরই আমি ‘বিলাভেড’ লিখেছিলাম। এই বইটি লেখার সময় আমি আবেগে ভেসে যাচ্ছি বলে মনে হয়েছিল।

আফ্রিকান-আমেরিকান সমাজে ব্যাপারটা ছিল অন্য রকম। আফ্রিকান-আমেরিকান সমাজে মেয়েদেরকে পড়াশোনা করানো হয় কিন্তু পুত্রসন্তানদের পড়াশোনা করানো হয় না।

আপনি কি শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন?
কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীরা যেমনটা বলে থাকেন সেটাই হচ্ছে আসল নারীবাদ। কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ নারীবাদ এক নয়। পুরুষের সাথেও তাদের সম্পর্ক ভিন্ন ভিন্ন রকমের। ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা সবসময়ই তাদের পুরষদেরকে আশ্রয় দিয়েছে। কারণ, ওই পুরুষরা ছিল বহিরাগত। কিন্তু শেষে দেখা গেছে ওই নারীরাই পুরুষদের হাতে খুন হতো। বাস্তবে, এই ব্যাপারটি আমার খুব আগ্রহের বিষয় ছিল। আমি যখন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে যাই তখন অনেক নারী আমাকে অনেক কিছু জানিয়েছিলেন। তারা আমাকে মেয়েদের কলেজে যাওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক প্রতিবন্ধকতার কথা বলেছিলেন। পরিবারগুলো তাদের পুত্রসন্তানকে পড়াশোনা করায়, কিন্তু মেয়েরা পড়াশোনা করতে চাইলে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হত। কিন্তু আফ্রিকান-আমেরিকান সমাজে ব্যাপারটা ছিল অন্য রকম। আফ্রিকান-আমেরিকান সমাজে মেয়েদেরকে পড়াশোনা করানো হয় কিন্তু পুত্রসন্তানদের পড়াশোনা করানো হয় না। তারা মনে করে, মেয়েরা শিক্ষালাভ করলে বিভিন্ন সেবামূলক পেশা- যেমন শিক্ষকতা, নার্সিং এসবে প্রবেশ করতে পারবে। কিন্তু পুত্রসন্তানদেরকে পড়াশোনা করানো হলে তারা এসব চাকরিতে আসতে দ্বিধাগ্রস্ত হবে। এসব চাকরিতে তারা অত সহজে প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে পারবে না। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির অবশ্য অনেক পরিবর্তন ঘটেছে।
২০০৮ সালে ফিরে আসি। বারাক ওবামা ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় আপনার সমর্থন চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আপনি তাকে সমর্থন দিয়েছিলেনও। আপনি বলেছিলেন, তাকে ক্ষমতায় বসানোটা তার কর্মেরই প্রতিদান হতে পারে। আপনি এটিকে বিপ্লবের পরিবর্তে আবশ্যক পরিবর্তন বলেছিলেন।
আমি এটা বলেছিলাম নাকি? তাহলে তো খুবই ভালো কথা (তিনি হাসলেন)।
আপনি একথাই বলেছিলেন। এখন তাঁর পুনর্নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে কি আপনার মনে হচ্ছে ওবামা তাঁর অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়িত করতে পেরেছেন?
অনেক। অনেক। আমি যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়েও অনেক বেশি ভালো করেছেন।
আমারও সবমিলিয়ে তেমনটাই মনে হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংশয়ে পড়ে যাই। একজন প্রেসিডেন্টের উপর কোনো কোনো সময়ে আস্থা হারানোর ব্যাপারটি তো স্বাভাবিক।
এমনটা হতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও আমি তাঁর প্রতি বৈরি মনোভাব পোষণ করি না। আমি জানি কিছু ভুল হয়ত করেছেন, অনেক বেশি ভুলও থাকতে পারে। কিন্তু বৈরিতা সত্যিই এক ধরনের উন্মাদনা। যারা ওবামাকে ঘৃণা করেন, তাদের কাছে ওবামার কাজের কোনো মূল্যই নেই, তা তিনি যত ভালো কাজই করেন না কেন। তাদের কাছে ওবামার কাজগুলি একেবারেই মূল্যহীন। কিন্তু তারা যা বলে, তা একেবারেই স্ববিরোধী।