প্রেমভাবনা ও প্রেমের কবিতা >> নাসরীন জাহান / নির্ঝর নৈঃশব্দ্য / জুননু রাইন / সারাজাত সৌম

0
81
Mujib Erom প্রেমের কবিতা

নাসরীন  জাহান >>

 

 

প্রেমের কবিতা 

রঙধনু

কি বলছ?
কিচ্ছুনা।
তবে রাত্তিরে তোমার শব্দাবলী কেন এমন আওয়াজ শোনায় আমাকে, যাতে দেহ থেকে দেহের ঘ্রাণ এক মিশেলে চলতেই তুমি চন্দ্রাহত রাত্তিরে, আমার শরীরের দিকে ঝুঁকে পড়লে?
কি দেখছ আমাকে?
ঝুমকো ঢেউ তুলছিলো তোমার আলিংগন,আর আমার প্রেমের নির্জনকে ভেঙেচুড়ে ঠায় চোখ মেলে বললে,
তুমি অনন্য
তুমি উজ্জ্বলিত রঙধনু
তুমি অমাবস্যায় আচমকা উঠে যাওয়া চাঁদ।
তুমি আমার আত্মা উজার করা প্রেম।

এইসব শব্দাবলী যখন শুনছি
তুমি নিঃশব্দে শোনালে, তোমার জীবনে অন্য এক প্রেম এসেছে।

আমার আত্মা ভেঙেচূরে
ভুমণ্ডলে ঝড় উঠলো।
কি দোষ আমার ছিলো?
ছায়া আঁধার ফুঁড়ে জলজকন্ঠে প্রশ্ন তুলি।
অনন্তের দিকে যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে তুমি শ্লেষ কন্ঠে আমাকে বললে, বোরিং।

 

বিবর

যেন আদিগন্তের মাটি ফুঁড়ে তুমি দাঁড়ালে আমার সামনে।
কত কতো অপেক্ষার পর।
কৈশোর থেকে একটা স্বপ্নালু মুখ ফিনকি ওঠা ছায়ার মতো
আমার হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্র এসে
আমাকে রোমাঞ্চিত করে করে
আসতো আর মিলিয়ে যেতো

ঠাকুরমার ঝুলি পড়তাম
আর রাজপুত্রের ছবির মধ্য খুঁজতাম তোমার জীবন্ত রূপ।
বাতাসের কেশরে কেশরে উড়তো বহুবর্ণ রঙধনু।

ছাতিমের ঘ্রাণে বিভোর আমি
যখন পাখির ডানার সংগীতে
হেমন্তের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
তুমি উড়াল হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলে,
আমার পেছনে দাঁড়ানো সহদোরাকে।
আমার দিনগুলো আগুনে ঝলসানো ছায়ার মতো,
রাত্রির দিকে ছুটে গেলো।

 

 

প্রেমভাবনা

প্রেম এমন একটা অনুভব, যা স্পর্শ করা যায়না। দুটি প্রাণের একীভূত মিলনে যে তরঙ্গ তৈরি হয়, তার মধ্যেই প্রেমের বাস। প্রেম একাধিকবার আসতে পারে। অনেকে তার জীবনে দ্বিতীয় কি তৃতীয়বার আসা প্রেমকে প্রথম প্রেমের মর্যাদা দেয়। প্রেমের কবিতা লিখতে হলে প্রেমে পড়তেই হবে এমন কোন কথা নেই। প্রেম আসছেনা, – এই শূন্যতাও প্রগাঢ় প্রেমের কবিতা সৃষ্টি করতে পারে। অবশ্য প্রেমে পড়াকালীন স্রোতের মতো প্রেমের কবিতা আসে। প্রেমে ব্রেকআপ ঘটলেও বিরহ অনেক স্পর্শকাতর কবিতা সৃষ্টি করে। প্রেমে কেয়ারিং অনেক জরুরি। ক্ষেত্রবিশেষে ছোট্ট একটা অবহেলা প্রেমকে ঘাসের পাতায় শিশিরবিন্দুর রূপ দিতে পারে, যা পলকা বাতাসেই ঝরে পড়ে।

 

 

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য >>

 

প্রেমের কবিতা

 

 

লাল তৃষ্ণা
‘তোমার সঙ্গে দেখা হলেই আমার মাথার ভিতর, আমার বুকের ভিতর, আমার রক্তের ভিতর কেবল কবিতা তৈরি হতে থাকে গানের মতো।’
‘বলো, কবিতা।’
‘তুমি সকল সময় আমার মনের মধ্যে থাকো, আমার চোখের মেঘের বুকে বাদল ধরে রাখো। বাদল যখন নামবে ভুলে—আকাশ ভেঙে যাবে…’
‘তারপর?’
‘হেমন্তিকার পায়ে ঘুমায় রুপার নূপুর, নূপুর জেগে নেচে বেড়ায় সকল দুপুর।’
‘তারপর?’
‘ইমেইল করে তুমি পাঠাতে পারো মেঘ—ফোনে তোমার মেঘের আকাশ ডাকে। চাইলে আরো পাঠাতে পারো ছোঁয়া, টকটকে লাল তৃষ্ণা বুকে কাঁপে। গভীর রাতে পাঠাও শাদা ফুল, ফুলের ছবি ছাপাই দেয়াল জুড়ে।’
‘আমার নিজেকে একটা ঘাসফড়িং-এর মতো লাগছে কেনো জানি না। মনে হচ্ছে ঘাসে ঘাসে হেঁটে বেড়াচ্ছি।’
‘তোমার সঙ্গে আমার আছে আরো একটা মিল—আমার মতো তোমার আছে একলা থাকার ঝিল। ঝিলের মধ্যে একটা ডাহুক দাঁড়ায় সারাদিন,
মাছগুলি তার পায়ের কাছে বাজায় শঙ্খবীণ। শঙ্খবীণার তারে পোড়ে হু হু বিলাবল, বিলাবলের আলাপ শেষে জলের কলকল। জলের কথা শেষ হলে পর ডাহুক উড়ে দূরে উড়তে উড়তে পাখির বুকে জলের স্মৃতি ঘুরে…’
‘আর?’
‘একটা আকাশ তাকিয়ে আছে দিঘির জলে নীল, একটা ঘুড়ি উড়তে উড়তে হয়ে হয়ে গেলো চিল। পাহাড় ডাকে, নদী ডাকে, ডাকে সমুদ্দুর,
একটা ছেলে সে ডাক শুনে হয়েছে দুপুর। দুপুর রোদের রঙের ভিতর ছড়িয়ে আছে গান, গানের কথায় বাতাস রাঙে, রাঙে সবার প্রাণ…’
‘আচ্ছা।’
‘তুমি ভয় পাও?’
‘না। ভয়-ডর নাই আমার। আমার কাউকে ভয় লাগে না। তোমাকে না।’
‘জানো, আমি চুরি করে দেখতাম!’
‘আমিও যে চুরি করে যে কতজনকে দেখেছি! কিন্তু তেমন কারো কথা মনে নেই। কয়েকজনের মধ্যে তোমাকে মনে আছে।’
‘কেনো, আমাকে কেনো মনে আছে?’
‘হয়তো তোমাকে সকল সময় বৃষ্টিস্নাত মনে হতো বলে। কিংবা জানি না আসলে।’

প্রেমভাবনা

সবক্ষেত্রে একইভাবে প্রেম হয় না। ক্রাশ খাওয়া আর প্রেমে পড়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। ক্রাশ হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী বিষয়। কেউ প্রেমে পড়ে সৌন্দর্যের কারণে, পরস্পরের কেমিস্ট্রি মিললে প্রেম হয়। কেউ প্রেমে পড়ে পার্সোনালিটির কারণে। কেউ প্রেমে পড়ে বুদ্ধিমত্তা ও জানাশোনা দেখে, এই ক্ষেত্রে পরস্পরের রুচি, জানাশোনা, পড়াশোনা বিষয়, কথা বলার বিষয় মিলে গেলে প্রথমে বন্ধুত্ব হয়,  সেখান থেকে প্রেম হতে পারে।

 

জুননু রাইন >>

 

প্রেমের কবিতা

 

 

এয়া

গ.
ফুটলেই ঝরে যাও
গন্ধরা ফুরায়
তখন,
তুমি নেই পৃথিবীতে

না থাকলে
কারোরই হয় না কিছুই
প্রতিদিন প্রতিক্ষণের
মৃত্যু হয়, জন্ম হয়
কেউ পায়
কিছু নেই থেকে কেউ
বারবার তোমাকে হারায়

ঘ.
ধর,
আমাদের মনেপড়াগুলো দূরে গেল। গেল ফুল ফুটতে, ফসল ফলতে
বনে আগুনের প্রতিবাদে- জলে আগুন দিতে।
কিংবা মানুষের সঙ্গে সবুজের দূরত্বের ইতিহাস লিখতে।

আমাদের দেখাগুলো গেল দৃশ্যের সাথে ছায়ার সম্পর্ক বুঝতে
দু’দিনের বাঁকা চাঁদে তোমার অভিমান খুঁজতে,
অথবা তোমার কপাল ছোঁয়া একটি বিশেষ নীলের খোঁজে
পাহাড়ের তলদেশে…

ধর,
আমাদের মনেপড়াগুলো দূরে গেল,
গেল ফুল ফুটতে,
ফসল ফলতে।
ঙ.
প্রিয়, দম বন্ধের আগে তোমাকে খুব দরকার হয়। অনেক দীর্ঘ একটি কবিতা লিখতে হয়। কবিতায় আমার বসার জায়গা লাগে, শোয়ার জায়গা লাগে, একটু হাঁটাহাঁটিও তো করতে হয়! নয়তো বুকের বাতাসের পায়ে ফুটবল হতে হয়।

কিন্তু দেখ, তুমি নাই বলে আমার দীর্ঘ হয় না কোনো কিছুই।
আমি আমার পালকের মধ্যে ডুবে থাকতে চাই,
সেখানে তোমার ভালোবাসার একফোঁটা জল এসে পথ আগলে দাঁড়ায়।

প্রিয়, দম বন্ধের আগে তোমাকে কেন এতো দরকার হয়?

চ.
ভেবেছিলাম একদিন কোনো এক রাস্তায় চায়ের দোকানে
তোমার পাশে বসব। আমাদের একপাশে বসবে নীরবতা
অন্যপাশে প্রকৃতি, তোমার চোখ দুটোয় নদী থাকবে
ভালোবাসার জল থাকবে,
স্বপ্নের ঢেউ থাকবে-
আমার জোয়ার-ভাটায় তোমাকে ডানে বাঁয়ে টানবো
কিন্তু তুমি তখনও আমার পাশেই থাকবে
পায়ের বুড়ো আঙুলের নখে নরম মাটি খুঁড়বে,
সামনের সবুজ ধানক্ষেতের দিকে তাকিয়ে আরও বহু দূরে
তোমাকে রেখে দিয়ে, আমার পাশেই বসে থাকবে।

ছ.
তোমার পাশে শুয়ে থাকব- মৃত্যুর পাশে শুয়ে থাকা লাশ
আমাকে তুমি খুঁজবে, আমি খুঁজব; আমরা সবাই খুঁজব
সেইসব সন্ধানে চোখ মেলে হারিয়ে থাকবো।
প্রেমভাবনা
ভালবাসা সেই প্রার্থনা- যে নিজেই মন্দির। দু’জনই প্রকৃতি, দু’জনই জ্যোৎস্না, দু’জনই ঈশ্বর; যদি তাঁরা তাদের দেখা পায়।

 

 

সারাজাত সৌম >>

 

প্রেমের কবিতা

 

লো হাওয়া
তোমার কোনো শরিক নাই
—তবু এই গান
ফুলের উপর ছড়ানো বিস্মৃত রং
যে কোনো জীবনের মতোই উদাস

—ভাবি কে তুমি?

লগ্ন বেয়ে দাঁড়িয়ে আছো বনের মাথায়
—সুদূর, ডুবন্ত ফলের মতোই
গাঢ় লাল আভিজাত্য নিয়ে
পাখিদের ঠোঁটের কাছে নুয়ে পড়া এক গ্রাম

—মানুষের শ্রী!

যেন গাছে গাছে ঝুলে থাকা শ্লোক
প্রাণের লুকোচুরি—দেখা হবে তো?

যেন পিঁপড়ার ভেতর
—একদিন আমারই ভাষা দিয়ে বলেছিলাম
নিশ্চয় আমাদের দেখা হবে
অজস্র লেবুপাতার তলে

 

ফুল

যদি আমি জন্ম না নিতাম-
তবে কেমন করে তুমি সুন্দর হতে

আর কেইবা বলতো তোমাকে
ওই যে একটা কান মুচড়া ‘ধ’

বুড়ো, সারাজীবন কাসার মিস্ত্রি–
বানিয়েছে এক আশ্চর্য ফুলদানি

যেন এই নিঃশ্বাস ভরা শব্দ তার
লহমায় নিজেকেই জন্ম দিতে থাকে

ভালোবাস কি তাকে?
ভালোবাস কি তাকে!

আহা, দূরে তুমি চকচক শূন্যদানি-

জানি, কোন এক বসন্তে এসে গাছ
ছায়ার মতো নুয়ে তোমাকে বলবে-

এই একটিমাত্র ফুলের লগ্ন ছাড়া আর
আমার জীবনে তেমন কিছুই ঘটেনি।

 

প্রেমভাবনা

 

আমি, আমি মানেই তো এক বিশদ প্রেম। নানা অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাকে পাই আবার কখনো পাই না, সেই হলো চির বিস্ময়! যেভাবেই আসুক না কেন তাকে ধরতেই বোধ করি একটা তুমি লাগে বা বহুতুমির প্রয়োজন পড়ে। আর এইসব খেলনা যেন আমার বাহুর—বহু পুরনো অংশই। বলো, তবে কে কাকে ছেড়ে আর খুব বেশিক্ষণ থাকতে পারে। ভাবছি তুমি, আরও বহুতুমির ভেতর এই আমিই প্রেমের শিরোমণি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here