প্রেমের কবিতাগুচ্ছ ও প্রেমভাবনা > পরিতোষ হালদার / তুষার কবির / প্রমিতা ভৌমিক / সাফিনা আক্তার

0
675

প্রেমের কবিতাগুচ্ছ – ৪

পরিতোষ হালদার > প্রেমভাবনা

এক সত্ত্বার সাথে অন্য সত্ত্বার যে টান বা অনুভব তাই প্রেম। প্রকৃতি-পুরুষের দ্বৈত-দ্বৈততা নামে একে মহাজাগতিক স্তরে নিয়ে যান দার্শনিক-কবি-চিন্তকরা। নারী ও পুরুষের ভেতর পারস্পরিক টানের সাথে প্রকৃতিক অনুসঙ্গের মিশেলে রচিত হয় এপিকসহ নানান ক্লাসিক। সময় যেতে যেতে প্রেম এখন শুধু দর্শন নয়, প্রবল শক্তির নামও। ব্যক্তিমানুষ হিসেবে এই বিষয়ের উপর আমার ভাবনা বয়সের বিভিন্নস্তরে পরিবর্তিত হয়েছে, সংগঠিত হয়েছে, বিবর্তিত হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি পারস্পরিক বিশ্বাস, মর্যাদাবোধ, সমঅধিকার প্রেমের মূল ভিত। পুরুষতান্ত্রিক-পুঁজিবাদী চিন্তাকাঠাতে প্রেমানুভূতিও পুঁজি ও পুরুষের স্বার্থে পরিচালিত হয়। এই ভাবনা থেকে মানুষের মন নতুন ভাবনার পথে যাবে, এ আশাবাদ আছে। সাইবার ফ্রিডমের এই সময়ে মানুষের প্রেম কোন স্তর অতিক্রম করে তা এখন দেখার বিষয়।

পরিতোষ হালদার > দুটি প্রেমের কবিতা

সন্ধিবিচ্ছেদ

স্পর্শের স্কুলে এসো, সপ্তম পিরিয়ড ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি। যদি বাঁশি বেজে ওঠে ভুলে যাবো হিব্রুদের সন্ধিবিচ্ছেদ,
প্রণয় ও প্রাচিন মহিমা।
তুমি স্বপ্ন খোলো…খুলে দাও শিশিরকাহিনি।

একঝাঁক পাখি মহুয়ার ঘরে রেখে যায় ঘুম, ডানার অক্ষরে যার সিন্ধুপুরুষ। কোন কোন অন্ধকার প্রশ্নের মতো-
মিত্রাক্ষর থেকে জন্ম নেয়া সাইবারছায়া।

উড়ালমঞ্জুরি নিয়ে যাই- দৃশ্য খুঁজি, মাতৃনারীর চোখে একবেলা অপলক চোখ; যেন পাতা
ছিঁড়ে যায়।
একেকটা লগবই কেঁদে ওঠে চিঠির মতো।
কেউ কি জানে তোমার শরীরভরা অজস্র সময়, তুমি আজ অপার প্রযুক্তিবেলা।

ঘড়ির জগৎ

উড়িয়ে দিয়েছি সব-হরপ্পাপাখি, আকাশ আর চতুর পরির বানানো ঘুড়ি। তাকিয়ে দেখি, ধুপগাছের পেইন্টিংয়ে দোল খায় একটি নি:সঙ্গ ডাহুক।
উপমায় যেতে যেতে যদি হেসে ওঠে কালো অনুভব, তুমি ছুঁয়ে দিও প্যাপিরাসপাতা।

স্তব্ধের ভেতর যে পুরুষ থাকে, তার অনন্ত নাশপাতি ছায়া। যদি হুইসেল বাজে, লোকালট্রেন ধরে দেবীরা যায়।
তুমি উল্টা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এসো ঘড়ির জগতে।

তোমার গৌড়ঘরে আইফোন আড়ি পেতে আছে- তারে তুমি মঞ্চ ও নাচ দিও, শিখিয়ে-পড়িয়ে দিও আমাদের জিরোব্রহ্মকলা।

 

তুষার কবির > প্রেমভাবনা

প্রেম আমার কাছে সবসময়ই রক্তমাংসে ধরা দেয়! প্রেমিকার কথা ভাবতেই আমি খুঁজে পাই তিরতিরে শেমিজের ঘ্রাণ, আঁটসাঁট কামিজের রেখা, স্পন্দিত স্তনের ওঠানামা, কাঁপা কাঁপা আঙুলের টানটান শিহরণ! অলৌকিক বা অশরীরী প্রেম—এরকম অনুভূতি আমার কখনো হয়েছে বলে মনে পড়েনা। আমার প্রেমিকা কখনোবা জমাট বৃষ্টিতে ভেজা শাড়িতে মধুবালা; আবার কখনোবা লাল ভেলেভেট জড়ানো ব্যালেরিনা নাচের সিনোরিটা! প্রেম আমার কাছে সবসময় টালমাটাল উত্তেজনায় ঠাসা! প্রেমিকাকে আমি কখনোবা খুঁজে পাই ভাঁটফুল খোঁপায় পরে নদীতীরে হেঁটে যাওয়া কোনো শারদীয়া রাধার মাঝে; আবার কখনোবা তাকে খুঁজে পাই রেস্তোরাঁয় রিস্টওয়াচ হাতে অপেক্ষারত কোনো সুতনুকা তরুণীর মাঝে! প্রেমের জন্যে আমার চাই পিয়ানো বেজে ওঠা একটি গানঘর বা গহিন জঙ্গলের ভেতর একটি তাঁবু!

তুষার কবির > দুটি প্রেমের কবিতা

 

গানঘর

প্রেমের কথাই যদি বলো তবে একবার গানঘরে
ঘুরে আসো!
বাইরে তুমুল বৃষ্টি—আর রেস্তোরাঁয় বাজছে
একটানা মেঘের পিয়ানো। এখানে চায়ের কাপে
প্রেমিকাদের ঠোঁটের দাগ লেগে যায়! এখানে
বৃষ্টির শব্দে প্রেমিকাদের নতুন শেমিজ ভিজে যায়!

কোনো এক প্রেমিক কবিকে দ্যাখো—সে ভুলে
গেছে তার শেষ স্বরগ্রাম—সে হারিয়ে ফেলেছে
তার নোটবুক—বৃষ্টিভেজা জলের লিরিক!

প্রেমের কথাই যদি ভাবো তবে একবার
পিয়ানোর ঘুমসুরে নেচে ওঠো!

জঙ্গল ও তাঁবু

তোমাকে আগেও আমি বলেছি প্রেমের জন্যে
আমার একটা নিঝুম জঙ্গল চাই! অথবা প্রেমের
জন্যে আমার একটা নিঃশব্দ রিসোর্ট চাই!
কমপক্ষে আমার একটা সুনসান তাঁবু চাই!

অথচ তোমার পাশে বসতেই কোত্থেকে যেনবা
কিছু ছায়াশরীর এসে জুড়ে যায়—তারা
আচমকা ঘিরে ধরে আমাদের—তাদের চোখের
লেন্স ধরে ফেলে রেস্তোরাঁর আলো-আঁধারিতে
হাত ধরে বসে থাকা আমাদের!

জঙ্গলের গহিন ভিতরে একটা তাঁবুর জন্যে
অপেক্ষা করছে আমাদের প্রেম!

প্রমিতা ভৌমিক > প্রেম ভাবনা

প্রেম আসলে এক অদ্ভুত শব্দ, এক আশ্চর্য অনুভূতি। এই অনুভব ভাষায় প্রকাশ করা সহজ নয়। যুগ-যুগ ধরে মানুষ খুঁজে চলেছে তাকে। মানুষে-মানুষে যুদ্ধ যতটা সত্যি, তার থেকেও বেশি সত্যি মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রেম। পরস্পরকে চাওয়া বা পাওয়া নয়; প্রেম তার চেয়েও বেশি কিছু, যাকে ব্যাখ্যা করে বোঝানো যায় না। তা জন্মের মতো শাশ্বত, তা মৃত্যুর মতো চিরন্তন।

প্রমিতা ভৌমিক > দুটি প্রেমের কবিতা

এই শীত

এই শীত ফিরিয়ে দিয়েছে আমাকে-
প্রতিটা আঙুলের বাঁকে আশ্চর্য নূপুর

এই সুদীর্ঘ প্রত্যাখ্যানের পাশে
নিদারুণ থেমে গেছি আজ

যত বার ফেরা হয়,
তোমার দু হাতে খেলে
আঁকাবাঁকা চেনা আলপথ-

তারপর আমাদের খেলা থেমে গেলে
এই শীত কোনোদিন তোমারও হবে না।

স্বপ্নের চেয়েও সত্যি

স্বপ্নের চেয়েও দ্রুত জেনেছি তোমায়,
আচ্ছন্ন আলোয় খুঁজি
শব্দহীন অচেনা প্রহর

হঠাৎ জলের ভাঁজে নড়ে যায় সাঁকো-
ধুলো ওড়ে ঠোঁটের দু-পাশে

স্বপ্নের চেয়েও সত্যি চিনবো তোমায়;
অথবা বিনিময় করে নেবো আরব্যরজনী।

সাফিনা আক্তার > প্রেমভাবনা

প্রেম অমর, চিরন্তন, ইবাদত, ঈশ্বর। পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টির মূলে ছিলো একমাত্র প্রেম। মানব-মানবীর আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে সেই প্রেমের প্রকাশ পেয়েছে। পৃথিবীর বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ বাড়ে অক্ষত প্রেমেরও বিকাশ ঘটে মানুষের অস্তিত্বের সাথে সাথে। হৃদয়ের মৌলিক বিষয়বস্তু প্রেম, মর্মের ধ্বনি শুনি প্রেমে- আদমের রুহ থেকে হাওয়ার জঠরে আদি হতে অনন্তে প্রেম মানুষকে বর্বরতা থেকে সভ্যতায় এনেছে। আকাশ-বাতাস জমিন, গ্রহ-তারা, চাঁদ-সূর্য এই ভূমণ্ডল জুড়ে পরস্পরের প্রতি সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি করেছে কেবল প্রেমই। “রূপলাগি আঁখি ঝুরে গুনে মন ভোর। / প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর। / হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে / পরা-পিরীতি লাগি থির নাহি বান্ধে (জ্ঞানদাস)।” এই তো প্রেম, সর্বত্র।

সাফিনা আক্তার > দুটি প্রেমের কবিতা

কুইট

একদিন ওয়াকাউট করব! আই এম কুইট
ছেড়ে দেবো গৃহিণী হবার সংকল্প, একদিনের জন্য-
ভুলে যাব রাষ্ট্রপরিচয়, বাংলার মুখ, জননীর গর্ভ স্বামীর আদর
জরায়ুতে রাখবো না বীর্য কারুকাজ, তোমার বুক
নাক ঘষে করব না আহ্লাদ!
একদিন দেখবে সত্যি, ছেড়ে দেবো সব আবদার মাটির খোলস
সাদা ছানা, মিষ্টিমাখা ঠোঁটে পাতবনা ঠোঁট
আয়নার সামনে বসে বসে গুনব না পাকা চুল
কোঁচকানো হাতে কাঁপা কাঁপা আঙুলগুলি-
ছোঁব না মেটাডোর আইটেন; লিখব না অভিযোগ,
একদিন!
নিশ্বাসে-নিশ্বাস রেখে বলবো না আবে হায়াতের বাণী
আলখাল্লার ভেতর কুচকে যাওয়া স্তন দেখে কাঁদবে শিশু?
আমার ষোল পাটি দাঁত থাকব না!
একদিন তুমি আমি আলাদা বিছানায় মুখ ফিরে শোব।
আমাকে সেদিন নাইওরির মতো চার বেহারায় তুলে দিও
না হলে তো বোরাকে এসে তুলে নেবে আমায়।
কসম আল্লাহর- আকুতি রাখব না মনে

নতুন কোন পঙক্তি লেখার;
যেই দিন চলে যাব হঠাৎ- সেই দিন
জমিয়ে রেখনা একজনমের ঋণ, ভুলে যেও সাফিনা আক্তার।

জীবনানন্দের মতো

তুমি যদি বৃষ্টি হতে আজ একফোঁটা
তবে তোমাকেই ছুঁয়ে দেখতাম
লজ্জাবতীর লাজ ভেঙে দিতাম আঙুলের বাঁধ
তুমি যদি আজ খেলতে জলের রঙে
একটু হলেই মিশে যেতাম মনে মনে খুলে স্বপ্নফাঁদ
যদি তুমি হতে মেঘ-কোরাস
কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ তবে আমি
খেলে যেতাম তোমার কালো চোখের তারায়,
হতে যদি জলস্রোত- বেবিলনের রাজা!
আমি শুধু রানির মতো নক্ষত্র মেঘের আড়ালে
চাঁদ গলে পড়া জলজোছনায় আর বিদিশায় আমি
এশিয়ান রূপসীদের মতো নেচে- ধূমপ্রিয়!
তুমি বনহংসের মতো- শরীরে সুস্বাদু অন্ধকার মেঘমালা
শব্দের মতো ঝুমুর ঝুমুর ধ্বনি সুন্দর বেজে ওঠো
আমি বনহংসী ফাগুনের ভেজা রাত
তুমি জীবনানন্দের মতো তির্যক চেয়ে থাকো
মেখে নিয়ে ঠোঁট-শরীরের সবটুকু স্বাদ
যদি তুমি বৃষ্টি হও একবার-
আমি ভিজে যাবার আকাঙ্ক্ষায়- ভিজবো আবার।