ফারহানা আকতার > আজি প্রণমি তোমারে… >> রবীন্দ্র-জন্মবার্ষিকী

0
678

ফারহানা আকতার > আজি প্রণমি তোমারে… >> রবীন্দ্র-জন্মবার্ষিকী

 

[সম্পাদকীয় নোট : আমাদের বাঙালিদের জীবনে রবীন্দ্রনাথের গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, চিন্তামূলক লেখা, নৃত্যনাট্য ইত্যাদির অভিঘাত বহুমুখী ও বিপুল। বাঙালির চিত্ত আর চৈতন্যকে তাঁর মতো আরে কোনো বাঙালি লেখক এতটা ভালো করে অনুভব করতে পারেননি, প্রকাশও করতে পারেননি। সমসময়কে ছাড়িয়ে তাঁর গান ও লেখা এখনও তাই আমাদের আন্দোলিত করে চলেছে। সেই অভিঘাতের তরঙ্গটা কেমন, কতটা আমাদের মানসতটকে ছুঁয়ে দিতে পেরেছে, স্বল্পায়তনিক এই লেখায় তারই কিছু উল্লেখ পাওয়া যাবে এই লেখায়। বলা বাহুল্য অনেক বড় পরিসরে এই ধরনের লেখা হওয়া উচিত, কিন্তু এরকম লেখা তেমন একটা লেখা হয়নি। ফারহানা আকতার, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, এই ছোট্ট লেখায় রবীন্দ্রনাথ আমাদেরকে কীভাবে প্রভাবিত করে চলেছেন, সেকথাই বলবার চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে না পড়ে বা না বুঝে তাকে নিয়ে আমরা যে তর্ক তুলি, তারও জবাব মিলবে এই লেখায়।]

রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্র-রচনাবলীর মাঝে এলে আমি যেন আমার ভেতরের শক্তিকে খুঁজে পাই! আমাকে যদি কখনো প্রশ্ন করা হয় :
‘কী শুনছি?’
বলবো : ‘রবীন্দ্রনাথ।’
‘কী পড়ছি?’
– ‘রবীন্দ্রনাথ।’
‘কী ভাবছি?’
– ‘রবীন্দ্রনাথ।’
রবীন্দ্রনাথের মাঝে এলে আমি যেন আমার ভেতরের সবরকম প্রগাঢ় স্বচ্ছ অনুভূতিকে প্রকাশিত রূপে দেখতে পাই। ভীষণ আনন্দ হয় তখন আমার! তাই তো আত্মার তু্ষ্টির জন্য ঘুরে-ফিরে আমাকে কেবল রবীন্দ্রনাথের কাছে ফিরে আসতে হয়; তাঁর সুরের মধ্যে, তাঁর লেখার মধ্যে, তাঁর ভাবনার মধ্যে, তাঁর অজস্র সৃষ্টির মধ্যে।
যখন আমার প্রচণ্ড কষ্ট হয়, তখন রবীন্দ্রনাথ আমার কানে কানে এসে বলেন :

চারিদিকে দেখ চাহি…হৃদয় প্রসারি…
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি। প্রেম ভরিয়া লহ…
শূন্য জীবনে!

তাঁর একথা শুনে আমি আমার দুঃখ ভুলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলি! আবার জীবন যখন ফুরফুরে হয়ে ওঠে, তখনও আমাকে রবীন্দ্রনাথের ওপর ভর করতে হয়, তাঁর ভাষাতেই বলতে ইচ্ছে হয় :

এমনি করে যায় যদি দিন যাক না
মন উড়েছে উড়ুক নারে
মেলে দিয়ে গানের পাখনা!

কোনো এক ঝড়ের রজনীতে একাকী মুহূর্তে আমার হৃদয়ের গহীনে যে সুর বেজে ওঠে, সে সুর ‘রবীন্দ্রনাথ’-এর সুর :

ধীরে ধীরে ধীরে বও ওগো উতল হাওয়া।
নিশীথরাতের বাঁশি বাজে
শান্ত হও গো, শান্ত হও,
ওগো উতল হাওয়া।
আমি প্রদীপশিখা
তোমার লাগি ভয়ে ভয়ে একা জাগি,
মনের কথা কানে-কানে মৃদু মৃদু কও,
ওগো উতল হাওয়া।
তোমার দূরের গাথা
তোমার বনের বাণী, ঘরের কোণে দেহো আনি,
আমার কিছু কথা আছে ভোরের বেলায় তারার কাছে,
সেই কথাটি তোমার কানে চুপি চুপি লও
ওগো উতল হাওয়া।

কখনোবা শুধুই পরম ভালোবাসা আর মমতায় জড়ানো একটি নিখাদ প্রেমের জন্য অপেক্ষা করে আমার হৃদয়বীণায় বেজে ওঠে যে সুর, সেটিও ‘রবীন্দ্রনাথেরই সুর’ :

আমি কান পেতে রই
ও আমার আপন হৃদয়গহন-দ্বারে বারে বারে
কোন্ গোপনবাসীর কান্নাহাসির গোপন কথা শুনিবারে –
বারে বারে
কান পেতে রই।

অথবা –

কে সে মোর কেই বা জানে,
কিছু তার দেখি আভা
কিছু পাই অনুমানে,
কিছু তার বুঝি না বা…

মাঝে মাঝে তার বারতা আমার ভাষায় পায় কি কথা রে,
ও সে আমায় জানি পাঠায় বাণী গানের তানে লুকিয়ে তারে বারে বারে।
কান পেতে রই

রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গানগুলোর মধ্য দিয়ে তখন আমার হৃদয় অন্য এক অজানা-অচেনা জগতে হারিয়ে যায়। আমি যেন মাতাল হয়ে, বিভোর হয়ে ডুবে যাই সেইসব সুরের মাঝে আর হৃদয়ের সবটুকু অনুভূতি দিয়ে গেয়ে উঠি :

আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে দোলাও
কে আমারে কী-যে বলে,
ভোলাও ভোলাও
ওরা কেবল কথার পাকে
নিত্য আমায় বেঁধে রাখে,
বাঁশির ডাকে সকল বাঁধন খোলাও
মনে পড়ে, কত-না দিন রাতি আমি ছিলেম তোমার খেলার সাথী
আজকে তুমি তেমনি করে
সামনে তোমার রাখো ধরে,
আমার প্রাণে খেলার সে ঢেউ তোলাও।
আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে দোলাও।

এই যে প্রেমে, এই ‘প্রেমে’র কাছে হৃদয়ের গহীন থেকে আমার একান্ত চাওয়াটির কথাও রবীন্দ্রনাথ বলে গিয়েছেন সেই কত বছর আগে :

আমি ‘ধন’ লইয়া তোমাকে সমাদর করিব না।
‘জন’ দেখিয়া তোমাকে আদর করিব না
‘সিংহাসন’ দেখিয়া তোমায় সম্মান করিব না।
‘বাহুবল’-এর জন্য তোমায় সম্ভ্রম করিব না।
কেবল ‘মন’ দেখিয়া তোমার পূজা করিব!

মন? আহা, এই যে ‘মন’, মনের কথা, বাংলা সাহিত্যে ও গানে রবীন্দ্রনাথেরই আবিষ্কার, আমাদের জন্য তাঁর উপহার। তাঁর আগে, মন বলে যে একটা অদ্ভুত সুন্দর জিনিস আছে, কে বলতে পেরেছেন? কে তাঁর লেখায় বলেছেন বা সুরে সুরে ছুঁয়ে দিয়েছেন? কে লিখেছে এই মনের এত এত বিচিত্র রূপের কথা? সে-তো ওই রবীন্দ্রনাথ।
জীবনের প্রচণ্ড দুঃখ-কষ্ট, বিপদে নিজেকে সান্ত্বনা দেবার ভাষাটি যখন হারিয়ে ফেলি, তখনো আমি যেন আবার নিজের অজান্তেই রবীন্দ্র-রচনাবলীর কাছেই ফিরে আসি, ঠিক এইভাবে :

বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর

বিপদে আমি না যেন করি ভয়
দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই বা দিলে সান্ত্বনা,
দুঃখে যেন করিতে পারি জয়!
সহায় মোর না যদি জুটে নিজের বল না যেন টুটে-
সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি, লভিলে শুধু বঞ্চনা, নিজের মনে না যেন করি ক্ষয়।
আমারে তুমি করিবে ত্রাণ এ নহে মোর প্রার্থনা-
তরিতে পারি শকতি যেন রয়!
আমার ভার লাঘব করি নাই বা দিলে সান্ত্বনা,
বহিতে পারি এমনি যেন হয়!
নম্রশিরে সুখের দিনে তোমারি মুখ লইব চিনে-
দুখের রাতে নিখিল ধরা যে দিন করে বঞ্চনা
তোমারে যেন না করি সংশয়!

এমন সব মুহূর্তে যখন কিছুই ভালো লাগেনা, জীবনটাকে এলোমলো মনে হয়, তখনকার জন্য রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন, সে-ও তো আমারই কথা।

আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে

এ জীবন পুণ্য করো,
এ জীবন পুণ্য করো, এ জীবন পুণ্য করো
এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে…

আবার জীবন যখন আনন্দ আর সুখের জোয়ারে ভেসে যায়, তখন আপন মনে গেয়ে উঠি – ‘আ…আ…আনন্দধারা বহিছে ভূবনে…’

রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রতিটি অনুভূতিকে উস্কে দিয়েছেন, স্পর্শ করেছেন, অনুভব করতে শিখিয়েছেন। বাঙালির চিত্তের যে কত গভীর প্রগাঢ় বিচিত্র রূপ আছে, রবীন্দ্রনাথের আগে, এমনকি পরেও, কেউ সেভাবে তুলে ধরেননি বা  তুলে ধরতে পারেননি। এরকম একজন মানুষকে, লেখককে কি উপেক্ষা করা যায়! তাঁকে নিয়ে কী তর্ক চলে? ভালোবাসা ছাড়া তাঁকে আর কী দিতে পারি আমরা? এই ভালোবাসা ছাড়া আমাদের তাঁকে দেয়ার মতো সামর্থ্য আছে কি? সেই প্রগাঢ় অনুভব আর বলবার ক্ষমতা? রবীন্দ্রনাথ তাই রবীন্দ্রনাথই। একক, অনন্য আর অনতিক্রম্য এক প্রতিভা। আজও তিনি অপূর্ণ আমাদেরকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

ভাবি, তিনি কত সুন্দর করে যে জীবনের কথা বলে গেছেন। সম্প্রতি এটা  আমি আরও প্রগাঢ়ভাবে অনুভব করেছি তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ বইটি পড়তে গিয়ে। এরকম অজস্র লেখা তাঁর আছে।আমি শুধু এই একটি বইয়ের কথা বলি।

বইটি শুরু হয়েছে এইভাবে :

মানুষের একটা দিক আছে- যেখানে বিষয়বুদ্ধি নিয়ে সে আপন সিদ্ধি খোঁজে। সেইখানে আপন ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা নির্বাহে তাঁর জ্ঞান, তাঁর কর্ম, তাঁর রচনাশক্তি একান্ত ব্যাপৃত। সেখানে সে জীবরূপে বাঁচতে চায়। কিন্তু মানুষের আর একটা দিক আছে, যা এই ব্যক্তিগত বৈষয়িকতার বাইরে। সেখানে জীবন-যাত্রার আদর্শে যাকে বলি ক্ষতি, তাই লাভ। যাকে বলি মৃত্যু, তাই অমরতা। সেখানে বর্তমান কালের জন্য বস্তু সংগ্রহ করার চাইতে অনিশ্চিত কালের উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগ করার মূল্য বেশী। সেখানে জ্ঞান উপস্হিত প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে যায়। কর্মস্বার্থের প্রবর্তনাকে অস্বীকার করে। সেখানে আপন স্বতন্র্ জীবনের চেয়ে যে বড় জীবন সেই জীবনে মানুষ বাঁচতে চায়। স্বার্থ আমাদের যেসব প্রয়াসের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়, তার মূল প্রেরণা দেখি –জীবপ্রকৃতিতে। যা আমাদের ত্যাগের দিকে, তপস্যার দিকে নিয়ে যায়, তাকেই বলি -মনুষ্যত্ব, মানুষের ধর্ম।
আমি যত বড় হচ্ছি, ততই মনে হচ্ছে- আমি দিন-দিন ব্যক্তিগত বৈষয়িকতার বাইরে চলে যাচ্ছি। কারণ, এখন আমাকে অনেক বড় বড় কাজ করতে হয়, যেখানে আমার কোনো প্রাপ্তি নেই। কিন্তু সেসব কাজের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে অনেক অনেক কল্যাণচিন্তা ও কল্যাণ। বইটি পড়তে গিয়ে যতই এর ভেতরে প্রবেশ করছি ততই আমার আত্মা বিকশিত হচ্ছে। আমি তো আসলে এমনই একজন মানুষ। এগুলো তো আমার ভেতরের কথা।

রবীন্দ্রনাথ এত বছর আগে কী করে আমার জীবনদর্শনকে, আমার ভেতরের কথাগুলোকে সুর করে তাঁর গানে বসিয়ে দিলেন আবার গদ্যরচনাতেও লিখে গেলেন? আমি ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে পড়ি। আর মুগ্ধ হয়ে, বিমোহিত হয়ে রবীন্দ্রনাথকে আরো বেশি ভালোবাসি, আরো বেশি শ্রদ্ধা করি। আরো বেশি প্রণাম করি।

‘মানুষের ধর্ম’ বইটির আরো একটি জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘আত্মা যার পাপ থেকে বিরত ও কল্যাণে নিবিষ্ট, তিনি সমস্তকে বুঝেছেন। তাই তিনি জানেন, কোনটা স্বভাবসিদ্ধ, কোনট স্বভাববিরুদ্ধ।’

এ তো দারুন সত্যি কথা, রবীন্দ্রনাথ কী করে বলে গেলেন? আমি আবার নিজেকে প্রশ্ন করি।
অনেক অনেক বছর আগে (১৯৩৮ সালে) রবীন্দ্রনাথ বঙ্গীয় প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষা সমিতির সভাপতি ছিলেন। তখন তিনি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্হা নিয়ে যা ভেবেছিলেন, তা আজও আমাদের দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলার নতুন শাসনতন্ত্রে যে ৭০ লক্ষ লোক ভোটাধিকার পাইয়াছে, তাহাদের অধিকাংশই নিরক্ষর। ইহা দস্তুরমত বিপজ্জনক। সুতরাং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে শিক্ষা-বিস্তার করা আবশ্যক।’ ভাবুন, ভোট নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সেই কবে এরকম কথা বলে গেছেন। শিক্ষাপ্রাপ্ত না হলে যে ব্যক্তিমানুষ ভোটের মূল্য বুঝবে না, গণতন্ত্রের এই গোড়ার কথা এখনও কি বলি না আমরা? আর রবীন্দ্রনাথ সেই কবে এরকম কথা বলে গেছেন। শুধু ভোটধিকারই যে সব নয়। এরকম একজন ভাবুককে চিন্তককে কী তাই শ্রদ্ধা না করে পারা যায়? মানবচিন্তক হিসেবে তাঁর তুলনা কোথায়?
ভাবতে পারিনা, কী বিস্ময়, সেই যুগে রবীন্দ্রনাথ নিরক্ষর ব্যক্তির ভোটদান যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা ঠিক ঠিক শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনার মাঝেও আমি মিশে একাকার হয়ে যাই। আবার তিনই যখন বলেন , ‘সকলপ্রকার মিথ্যাকে অতিক্রম করে যেতে পারে একমাত্র নারী।’ এত সুন্দর, চমৎকার একটি বোধ এতদিন আমি শুধু মনে মনে অনুভব করতাম, কল্পনা করতাম। কিন্তু কখনো ভাষায় রূপ দিতে পারি নি। একমাত্র রবীন্দ্রনাথ পেরেছিলেন। মানব-মানবীর হৃদয়ের এমন কোনো কথা নেই, এমন কোনো অবস্থা নেই, এমন কোনো মুহূর্ত নেই, এমন কোনো ঘটনা নেই, যার ওপর তাঁর রচনা কিংবা লেখা নেই। কথা নেই, ভাবনা নেই।

আর তাই তো,
আমি প্রণাম করেছি মহৎকে,
আমি ভালোবেসেছি এই জগৎকে,
আমি বিশ্বাস করেছি –
মানুষের সত্য মহামানবের মাঝে।

আমার একাকী মুহূর্তে যখন মনে মনে প্রভুকে স্মরণ করি এবং তাঁর কাছে নিজেকে নিবেদন করি হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে, ঠিক সেই মুহূর্তেও আমাকে ‘রবীন্দ্র-রচনাবলী’র কাছেই ফিরে আসতে হয় :

প্রভু আমারো, প্রিয় আমারো পরম ধন হে
চিরপথের সঙ্গী আমার চিরজীবন হে
তৃপ্তি আমার, অতৃপ্তি মোর, মুক্তি আমার, বন্ধনডোর,
দুঃখসুখের চরম আমার জীবন মরণ হে।
আমার সকল গতির মাঝে পরম গতি হে
নিত্য প্রেমের ধামে আমার পরম পতি হে।
ওগো সবার, ওগো আমার, বিশ্ব হতে চিত্তে বিহার-
অন্তবিহীন লীলা তোমার নূতন নূতন হে।

আবার অনেক পরিশ্রমের পর ক্লান্ত-অবসন্ন আমি কান পেতে শুনি, রবীন্দ্রনাথ আমার ভেতর থেকে আমার সঙ্গে একাত্ম হয়ে বলছেন :

ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু,
পথে যদি পিছিয়ে
পিছিয়ে পরি কভু!
এই যে হিয়া থরথর
কাঁপে আজি এমনতর
এই বেদনা,
ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, প্রভু!
পথে যদি পিছিয়ে
পিছিয়ে পরি কভু!
এই দীনতা,
ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, প্রভু!
পিছন পানে তাকাই যদি কভু,
সেই ম্লানতা,
ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, প্রভু!

রবীন্দ্রনাথের গান, রবীন্দ্রনাথের সুর, রবীন্দ্রনাথের কথা, রবীন্দ্রনাথের ভাবনা, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথের যাপিত জীবন- এভাবেই আমার পুরো জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই সশ্রদ্ধচিত্তে কেউ যদি তাঁকে কবিগুরু বলেন, আমি তাতে কোনো অতিশয়োক্তি দেখি না। কবিগুরু কথাটার অর্থ যদি করি, ভাবুকশ্রেষ্ঠ, অনুভূতির যথার্থ প্রকাশক, অসাধারণ ভাবুক, তাহলে তো ভুল বলা হয় না। বারংবার আমার এই কবিগুরুকে আপন মনে তাই জানিয়ে যাই, ‘আজি কেবলই প্রণমি তোমায় চলিব মোর সংসারও কাজে…’!
কবিগুরুর গানের সান্নিধ্যে এলে, কবিগুরুর সুরের সান্নিধ্যে এলে, কবিগুরুর লেখার সান্নিধ্যে এলে, কবিগুরুর বিপুল-বিচিত্র ভাবনার সান্নিধ্যে এলে- আমার হৃদয়, মন, আত্মা, দেহ, চিন্তা পরিস্রুত হয়, পরিশুদ্ধ হয়! আমি আমার অস্থির মনের যা কিছু অনুভব ও জিজ্ঞাসা, সব কিছুর জবাব তাঁর কাছে পেয়ে যাই! অন্য কোনো লেখক তো তাঁর মতো আমার জীবন ও ভাবনাকে এতটা প্রভাবিত করতে পারেননি।

একটা কথা এখানে না বলে পারছি না। রবীন্দ্রনাথের যারা সমালোচনা করেন, হতে পারে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, হতে পারে অবচেতন মনে ধর্মীয় দূরত্বের কারণে, তাদের সমালোচনায় কিন্তু তেমন কোনো যুক্তি থাকে না। সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে, তারা রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনাবলী পড়েই মন্তব্য করেন। এই সব মন্তব্যকে কিন্তু আমার সমালোচনা মনে হয় না। মনে হয় অবচেতন মনের বিদ্বেষ। সমালোচনা যদি করতেই হয়, তাঁর একটি লেখা নিন, তারপর দেখিয়ে দিন রবীন্দ্রনাথের কোন কথাটি ভুল, কোথায় তাঁর সীমাবদ্ধতা। সেই কাজটি কিন্তু কেউ করেন না। আসলে সেটা করার ক্ষমতা বা বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য আমাদের নেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছিদ্রান্বেষিদের জন্য কোনো কিছুই রেখে যাননি।

ভেবে বিস্মিত হই, তিনি তো শুধু আমাদের দিয়েই গেছেন। কিন্তু আমরা এতটাই ক্ষুদ্র যে তাঁর দানকে গ্রহণ করবার উদারতাও আমাদের কারো কারো নেই। অথচ এই মানুষটি সবধরনের অহং থেকে নিজেকে সরিয়ে মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্যে কত ভাবনাই-না ভেবে গেছেন। রেখে গেছেন। আজও তিনি তাই আমার কাছে প্রাসঙ্গিক। তাঁর এই প্রাসঙ্গিকতা আগামী দিনেও এতটুকু মলিন হবে না। তিনি জীবনের শেষ দিকে একবার বলেছিলেন, ওই মহামানব আসে… এসেছিলেন, আমার কাছে তিনি রবীন্দ্রনাথই। দিকে দিকে তাঁর জন্মদিনে আজ তাই রোমাঞ্চ জাগে। রোমাঞ্চিত আমিও। এমন দিনে তাই বলি, প্রণমি তোমারে, অনন্য রবীন্দ্রনাথ।

লেখক পরিচিতি : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও লেখক।