ফারহানা আনন্দময়ী অনূদিত > মার্কেসকে লেখা পুত্র রদরিগোর খোলা চিঠি >> উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
441

মার্কেসকে লেখা পুত্র রদরিগোর খোলা চিঠি

গাবো,

গত ১৭ এপ্রিল ছিল তোমার প্রস্থানদিন, ছ’বছর গেল। কেউ চলে গেলে, কিছু থেমে যায় না, তাই পৃথিবীও এগোচ্ছে তোমাকে ছাড়াই, স্বাভাবিক গতিতে। কিছু ক্রুদ্ধতা, কিছু মমতা আর এদেরই মাঝামাঝি না-ভালো-না-মন্দ আর ভালোমন্দতে মিলিয়ে মিশিয়েই এর সামনে এগোনো। এর মধ্যে আকস্মিকভাবেই নতুন যা পৃথিবীর সামনে এসে প্রকাশ্যরূপে দাঁড়িয়েছে, তা হল এক অতিমারি, যার শুরুটা একটা খাদ্যদ্রব্যের বাজারে। এর উৎস এমনই এক ভাইরাস, আকারে আয়তনে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, অথচ ক্ষমতায় সর্বগ্রাসী, যা বিবর্তিত হচ্ছে অনেককাল ধরেই। সে পৃথিবীর মানুষের ক্ষতি করার মানসে আসেনি, সে কেবল নিজের কাজটা করে চলেছে, নিজের খেয়ালে, নিজ গতিতে বিস্তৃত হচ্ছে; ব্যক্তিগতভাবে কাউকে বা কোনোকিছুকে লক্ষ্য করে নয়। খেয়াল করে দেখলাম, এই অতিমারিকালীন সময়ে, তুমি যে ‘কলেরার সময়ে প্রেম’ বা ‘শতবর্ষী নিঃসঙ্গতা’র বেদনার্ত সময়টা এঁকেছিলে বিখ্যাত উপন্যাসে, সেই সময়টার কথা আবার ফিরে ফিরে এসেছে অনেকের আলাপ আর লেখালেখির সূত্রে।

তোমার সেইসব লেখা নিয়ে তাই আমারও আবার ভাববার অবকাশ হল। অতিমারি নিয়ে তুমি অনেক কৌতূহলী ছিলে। স্প্যানিশ ফ্লু’র সময়ে তুমি জন্মাওনি, কিন্তু এর বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য অনুকূল একটা আবহ ছিল ঘরময় এবং তুমি সেখান থেকে জেনেছ তোমার আগ্রহের সীমানা মিলিয়ে। হ্যালির ধূমকেতু যেমন একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে ফিরে ফিরে আসে, এরকম মহামারিরও একটা স্বাভাবিক আবর্তনকাল আছে। শত বছর পরে আরেকটা অতিমারি পৃথিবীতে আসবে, সেরকম একটা ধারণা তোমার ছিল, এবং তার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার ইচ্ছেও ছিল প্রবল। নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও তুমি এই অলৌকিকে কেন যেন আগ্রহী ছিলে, যে, ১০০ বছর পরে এরকম কিছু আবারো ঘটবে। এটা কি শুধুই এক অলৌকিকতা! নাকি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্বাভাবিক আবর্তন? এই আবর্তিত হওয়ার গল্পের কোনো কথক নেই। মহাকালের নিজের শর্তে গল্প এগোচ্ছে। আর এ নিয়ে তুমি আমার চেয়েও অনেক বেশি ভাবতে, আমি জানি।

সেই অতিমারি এখন আমাদের পৃথিবীতে এসেছে। বিজ্ঞান এতোটা এগিয়ে যাওয়ার পরেও আমরা ঘরবন্দি থাকা ছাড়া আর কোনো প্রতিরোধক বা প্রতিষেধকই আবিষ্কার করতে পারিনি এখনো। এতো সহজ এবং সাদামাটা একটা সতর্কতায় আমরা ওকে সামলাতে পারছি, সেটা ভেবেও আমাদের সদয় হওয়া উচিত নিজেদের প্রতি। তোমার প্রিয় শহরের মধ্যে ছিল স্পেন আর ইতালির বার্সেলোনা, মাদ্রিদ, মিলান; কতবার যে তুমি বেড়াতে গেছ মের্সেদেসের সঙ্গে; আর আজ এখানেই সবচেয়ে বেশি এই অতিমারি ছড়িয়েছে। তুমি আজ থাকলে দেখতে পেতে, তোমার সমসাময়িক মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি ভঙ্গুর অবস্থায় আছেন এবং ওদেরকেই এই অতিমারির সাথে সবথেকে বেশি লড়াই করতে হচ্ছে। এরা ক্যান্সারের মতো ঘাতকব্যাধি, রাষ্ট্রের কুশাসন, জীবনের অন্য সমস্ত সংগ্রাম মোকাবেলা করে এসে আজ ছোটো একটা ভাইরাসের কাছে নতজানু হচ্ছেন। এরা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুকে যতটা ভয় পাচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি বিষাদী হচ্ছেন মৃত্যু-পুর্ববর্তী কঠিন এবং নির্মমতায় ভরা নৈমিত্তিক যাপনকে। এই রোগে আক্রান্ত হলে প্রিয় মানুষ থেকে বিযুক্ত হয়ে, এমনকি পুরো বিশ্বকে একপাশে সরিয়ে একার যাপন এবং একলা গ্রহান্তরযাত্রা, সে বড়ো নির্মম। তুমিও এই একাকীত্বকে খুব ভয় পেতে, এই একলাযাত্রা তাই তোমার জন্য খুব ভয়াবহ বিষাদের হত। তুমি বলেছিলে, এইসময় মহামারি অতিমারিতে মানুষের মৃত্যভয় এতো বেড়ে যায় যে, ব্যক্তিগত ভাবনাই তাকে পেয়ে বসে সবচেয়ে বেশি।

ড্যানিয়েল ডিফোর ‘আ জার্নাল অফ দ্য প্লেগ ইয়ার’ আর গ্রিক আখ্যান ‘এদিপাস রেক্স’-এ তুমি অনেকটা প্রভাবিত ছিলে মহামারি, নিয়তি, মৃত্যু বিষয়ের ভাবনায়। তুমি এখান থেকেই জেনেছিলে, এরকম এক-একটা মহামারি এলে, মানুষ তখন ব্যক্তিগত ভয়ভাবনায় ডুবে যায়। অনুকূল বয়স, অর্থের প্রাচুর্য, চিকিৎসার সুবিধা পেয়েও আর অনেক সতর্ক থাকার পরেও এক একটা মহামারি আমাদের মৃত্যুকে কেবলই একটি সংখ্যায় রূপান্তরিত করে। এসব ভাবনার প্রভাবেই হয়তো, লেখালেখির জন্য তুমি সর্বদাই নিয়তি আর মৃত্যুকে বিষয় হিসেবে সবার আগে বেছে নিতে ভালোবাসতে।

আজকের পৃথিবীতে তুমি থাকলে, এই সময়ের পৃথিবীবাসীদের ভয়ভাবনা আর জীবনাচরণ তোমার আগ্রহের বিষয় হত, নিশ্চিত। মানুষের এই সময়ের অসহায়তা নিশ্চিতভাবেই তোমাকে ভারাক্রান্ত করত। আর যা তোমাকে ক্রুদ্ধ করত, তা হল এই বৈশ্বিক ক্রান্তিকালে কিছু বিশ্বনেতাদের ব্যর্থতা, তাদের কাজে এবং কথায়। আবার একই সময়ে শারীরিক ও সামাজিক দূরত্বে থাকার পরেও মানুষে মানুষে যে-আত্মিক সহমর্মিতা আজ বিশ্বজুড়ে, তা তোমাকে প্রবলভাবে অভিভূত করত। এই দুঃসময়ে পুরো বিশ্বজুড়ে চিকিৎসক, গবেষক, পুলিশ; যাদেরকে আমরা সম্মুখযোদ্ধা বলছি, তাদের মহত্ত্ব তোমাকে মুগ্ধ করত। সবচেয়ে বেশি তোমাকে অবাক করত, এই ভয়ার্ত সময়ে জীবনহুমকিকে পরোয়া না করে, কিছু মানুষ ভালোবেসে এখনো পরস্পরের হাত ছাড়েনি, একত্রে থাকার মধুর স্পর্ধা দেখিয়ে যাচ্ছে; তাদের প্রেম তোমাকে প্রাণিত করত। যদিও অনেক মমতাহীন কাজও এই সময়ের পৃথিবীতে আমরা দেখছি, তুমি থাকলে, এতসবের পরেও মানুষের মানবতাই তোমাকে মোহিত করে রাখত। এই মানবিক পৃথিবীকে তুমি ভালোবাসতে।

কয়েক সপ্তাহ আগে ভাবছিলাম, এই অতিমারি নিশ্চয়ই একদিন পৃথিবীকে ছাড় দেবে, শেষ হবে, তখন পৃথিবীর চেহারা কেমন হবে। দ্বিধা আর সংশয় আমাকে ঘিরে রেখেছিল। কোনোভাবেই আমি একে স্বস্তিদায়ী একটা ফ্রেমে বাঁধতে পারছিলাম না। পরিশোধিত বিশ্বে জীবন ঠিক আগের রূপে থাকবে না, অনেকে বলছে, জীবন অনেক বদলে যাবে যাপনের জন্য। কেউ বলছে, কমবেশি একই থাকবে ওদের জীবনধারা; একই ছন্দে বেঁচে থাকা রইবে। কিন্তু বাস্তবতা হল, এই অতিমারির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জীবনের ধারাকে আকস্মিকভাবেই বদলে দেয়; দিয়েছেও। আমাদের সেই বদলকে সহজ মনে মানিয়ে নিতে হবে, আগামীর সংকটকে ভাবনা থেকে সরিয়ে বরণ করে নিতে হবে বর্তমানকে। লকডাউনের শুরুতে নতুন পৃথিবীর জন্য যে-অঙ্গীকার আমরা করেছিলাম, ক্রান্তিকাল চলে গেলে যেন আমরা সেই অঙ্গীকারগুলো ভুলে না যাই। যদিও লকডাউনের মুঠি যতই শিথিল হচ্ছে, অনেকেই ভুলে যাচ্ছে; আবার সেই পার্থিব ভোগের জীবনে ফিরে যাচ্ছে, পুরনো নেশা কাটাতে পারছে না।

সব যখন গুছিয়ে নেবে সকলে আবার, দ্বিধান্বিত এই আমি তখন পেছনে ফিরে চাইব, এই ক্রান্তিকালে আমরা কী হারিয়েছি, কী সংযোজন করেছি, সেই হিসাবটা মিলিয়ে নিতে চাইব। এই সময়ে রচিত কোনো গান কিংবা বই, কিংবা চলচ্চিত্র হয়তো আমার এই হিসাব মেলানোয় অনুষঙ্গ হতে পারবে। এত কিছুর পরেও পৃথিবী নামের গ্রহ আগের মতোই নিজকক্ষপথে ঘুরছে, ঘুরবে; সেই গ্রহের বাসিন্দারা নিজজীবন কোনো না কোনোভাবে যাপন করেই চলেছে; এটা সত্যিই কেমন বিস্ময়জাগানিয়া আর রহস্য তো বটেই। তোমার জীবনকাব্যজুড়ে একথাই তো তুমি বলেছ, কেউই জীবনকে কিছু শেখায় না। জীবনই এক চলমান শিক্ষা।

– রদরিগো