ফারহানা আনন্দময়ী >> সত্তার পবিত্র শিল্প নকশি-আঁকা বেদনা >> মুক্তগদ্য

0
233

সত্তার পবিত্র শিল্প নকশি-আঁকা বেদনা 

উচ্ছ্বাস যেমন, শোকও তেমনি একসময় জীবনের সমান্তরাল হয়ে যায়। যাপনে মিশে যায়। যা ছিল গভীর আঘাত, হয়ে ওঠে ক্ষত-শুকোনো বেদনা। তবুও তো সে বেদনাই। শোক কখনো শূন্যতা, কখনো তা কারো অশ্রুনুন, কারো সৃষ্টির পাথেয়, কখনো বা কারোর শোকে ঢুকে পড়ে অভিমান। আর রবীন্দ্রনাথ তো সবচেয়ে বড়ো সত্যটাই জানিয়েছেন, শোক এক অপ্রতিম শক্তি। এইসব অনুভবের বাইরেও শোককে আরেক অদ্ভুতরূপে যে দেখা যায়। কেউ কেউ যে অন্যভাবে দেখেন, সেটা জানলাম জানলাম ‘লিট হাব’-এর একটি রচনা পড়ে। লেখাটি যিনি লিখেছেন, মৃত্যুশোককে তিনি প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করেছেন তাঁর ক্রোধ হিসেবে; কেন প্রিয়জন তাকে ছেড়ে চলে গেল, এই বোধ তাঁকে ক্ষুব্ধ করে। আগ্রহ নিয়ে পাঠ করলাম লেখাটা। লেয়া কার্পেন্টার, আমেরিকান লেখক ও চিত্রনাট্যকার – দুটো উপন্যাস লিখেছেন ইলেভেন ডেইজরেড হোয়াইট ব্লু নামে। কিছু দিন আগে চলে যাওয়া ‘বাবা দিবস’-এ ওঁর এই গদ্যটি ছেপেছে লিট হাব। তো, লেখাটি পাঠের পরে মধুরতম ভাষায় রূপান্তরের ইচ্ছে জাগলো।

অন ফাদার্স অ্যান্ড দ্য আর্ট অফ গ্রিভিং

সকালে ঘুম থেকে উঠে ইনস্টাগ্রামে একটা বিষাদী পোস্ট দেখলাম, কাছের এক বন্ধু পিতৃহারা হয়েছেন গতকাল। পোস্টে সে তিনটা ছবি সংযুক্ত করেছে। এর একটি হলো বাবা তাকে আর ওর ছোট বোনকে কোলে বসিয়েছেন; পিতৃবাৎসল্য মূর্ত সেখানে। আরেকটি ছবিতে ওর বাবা সাঁতারের পোশাকে, যেখানে তাঁকে সুদর্শন দেখাচ্ছে। আর তৃতীয় ছবিটি হলো, বন্ধুটির বিয়ের দিনে বাবা পাশে দাঁড়িয়ে – প্রথাগত ছবি যেমন হয়। সেখানে সে সেইসব অনুভব লিখে প্রকাশ করেছে, তার বাবা কেমন করে তাকে কোলে দোলাতো, কীভাবে কবিতা শোনাতো আর জীবনের সাফল্য যে অর্থ বা ক্ষমতা থেকে আসে না, এই জীবনদর্শন কীভাবে তার জীবনে সঞ্চারিত করেছেন, এইসব প্রসঙ্গ। যদিও সে গভীর বেদনাবোধ থেকে এই পোস্ট দিয়েছে, কিন্তু সে যতটা না বেদনা প্রকাশ করেছে, তার চেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়েছে ওর কৃতজ্ঞতা – বাবার প্রতি।
তবে আমার জীবনাভিজ্ঞতা বলে, এই কৃতজ্ঞতা এত দ্রুত আসে না; এমনকী হারানোর দুঃখও তার প্রকৃত চেহারা নিয়ে এত অল্প সময়ের ভেতরে সামনে এসে দাঁড়ায় না। বেদনায় ন্যুব্জ হতেও একজনের অনেকটা সময়ের প্রয়োজন। আমিও ব্যক্তিগতভাবে প্রথমে যা পেয়েছি, তা মোটেও দুঃখ নয়… শক্‌, আকস্মিক ধাক্কা। একটা শাদা কোলাহল, শূন্যতায় পূর্ণ। শোকের প্রথম স্তরে প্রায় সকলেরই অন্তর্গত অনুভব কমবেশি যেমন হয়, কবি অডেন সেটা লিখে গেছেন এইভাবে :

ঘড়ির কাটা বন্ধ হোক, বিচ্ছিন্ন হোক সব দূরালাপ
ঘরের কুকুরটার চিৎকার থামাও, থামাও বিলাপ
স্থগিত হোক ওর হাড্ডি খাওয়ার সমস্ত আয়োজন।
পিয়ানোকে নিঃশব্দ করো, দূরে যাক ঢোলের বাদন
কফিন সাজানোর সময়ে বাজুক শোকার্ত ক্রন্দন।

আমার বাবা যখন চলে গেলেন, তখন ইনস্টাগ্রামের দিন আসেনি। শোক সকলের সাথে ভাগ করে নেয়ার কথা মনে আসেনি। আমরা, পরিবারের খুব কাছের দু’একজন, নিজেদের সাথেই সময় কাটিয়েছি। ঘরে থেকে খালি এটা-ওটা রান্না করতাম। এও একধরনের প্রত্যাখ্যান। কিসের প্রত্যাখ্যান? সেই মুহূর্তে জীবনের সবচেয়ে কঠিন আর নিষ্ঠুর সত্যটাকে প্রত্যাখ্যান করতে চেষ্টা করেছি। শোকের বদলে খুব স্পষ্টতই যা আমাকে ঘিরে থাকতো তা হলো রাগ। মৃত্যু এবং চলে-যাওয়া মানুষটার প্রতি রাগ; মৃত বাবার কথা ভাবলে মনে হতো, আমাকে ফেলে রেখে চলে গিয়ে তিনি অন্যায় করেছেন। তখন বাবাকে নিয়ে যা কিছু লিখেছি, এখন ভাবলে খানিকটা বিব্রতই লাগে। আমার প্রথম উপন্যাসটা তাকে কেন্দ্র করেই লেখা। উপর-উপর পড়লে মনে হবে এ এক মায়ের কাহিনি যে তার সন্তানকে হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এই কাহিনির ভেতর দিয়ে আমি আমার বাবার হারিয়ে যাওয়ার পথটি এঁকেছি। আবার কাহিনির ভেতর দিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনারও পথ খুঁজেছি। ভেবেছি, সংলাপ আর প্রতি-সংলাপের মধ্য দিয়ে একটা পথ বের হবে তার ফিরে আসার। জাদুকরী ভাবনা… হয়তো। তবে এই জাদুকরী ভাবনাই একটা সময়ে নেশার মতো হয়ে ওঠে।
উপন্যাসে আমি মায়ের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তার রাগের ভাবটা ফুটিয়ে তুলেছি সন্তানের প্রতি, যে তার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। আসলে এই রাগটা ছিল বাবার প্রতি আমার রাগের প্রতিফলন। যদিও তখনও আমার অবুঝ ভাবনা মানতে চাইতো না যে এভাবে লিখে তাকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। আমার দ্বিতীয় উপন্যাসটিও লিখেছি সেই ক্রোধান্বিত শোককে কেন্দ্র করে, যেখানে একটি মেয়ে খুব অল্প বয়সে ওর বাবাকে হারায়। আমি আবারো সেই বেদনা আর রাগকে বইয়ের পাতায় আছড়ে ফেলেছি। কোনো একদিন আমার পুত্ররা এই উপন্যাস পড়বে, এবং আমাকে বুঝতে পারবে, আমার বেদনাকে, যা ফ্রেমেবাঁধা ছবির আমাকে দেখে যতটা বুঝবে না।
আমার পুত্রদের কাছে আমার বাবা, শুধুই এক ধারণামাত্র। ওরা কী জানে, তিনি পাইলট হতে চেয়েছিলেন; দুর্বল দৃষ্টিশক্তির কারণে তার সে ইচ্ছে পূরণ হয়নি। পাইলট হওয়া ছাড়াও তিনি একজন ঘোড়সওয়ারী অথবা মেষপালকও হতে চেয়েছিলেন। এত কিছু হতে চাওয়া ইচ্ছের মধ্যে তিনি শুধু আইনবিদই হতে পেরেছিলেন। পেশাগত জীবনে তাঁর অন্যতম অর্জন ছিল, ‘Mandatory-minimum-sentencing’ আইনের বিপক্ষে একটি বিল পাশ করানো, যা ‘ম্যান-মিন্‌স’ নামে আলোচিত, এবং বাবার নামের সাথে মিলিয়ে এটা ‘নেড’স বিল’ নামেও পরিচিতি পেয়েছে।
তার মৃত্যুর দু’দিন আগে তিনি আমার মা ফোন করে জানালেন, ‘এটাই সেই সময়।’ এর মানে হলো, তার সময় হয়েছে বাড়ি যাওয়ার। এর অর্থ, বাবা চলে যাচ্ছেন এই ধরাধাম থেকে। আমি বাবার উদ্দেশ্যে বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করার মুহূর্তে ফেডএক্স থেকে একটা খামেভরা চিঠি পেলাম। চিঠিটা পাঠিয়েছেন বাবা, আর তাতে লেখা, আমার মৃত্যুর পরে ‘ম্যান-মিন্‌স’-এর কাজটি, আমি চাই, সন্তান হিসেবে তুমিই চালিয়ে নেবে। চিঠিটা পড়ে শেষ করতেই আমার ভাই ফোন করলো এবং জানালো, ওকেও বাবা একটি চিঠি পাঠিয়েছেন, একই সিদ্ধান্ত জানিয়ে। আমার বাবা কেন তার সকল সন্তানকেই একই চিঠি পাঠিয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমি আজও খুঁজে পাইনি। আমি বাড়ি পৌঁছুলাম, তাঁর মৃত্যুশয্যায় বসলাম। ততক্ষণে তিনি লোকান্তরিত। আমার বোনের হাত ধরে আমি সেখানে বসে রইলাম, যেন অনন্তকাল! উপস্থিত সমব্যথীদের মধ্যে কেউ একজন বলে উঠেছিল, ‘কেউ আর তোমাকে এমন ভালোবাসবে না, যেমনটা তিনি তোমাকে ভালোবাসতেন।’ ঠিক সেই মুহূর্তে এটা আমার শুনতে খুব অপমানসূচকই লেগেছিল; খানিকটা মিথ্যে-মেশানো সান্ত্বনা। অনেক দিন কেটে যাওয়ার পরে আমার উপলব্ধি হল, সেটাই ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। এই কৃতজ্ঞতাবোধের উপলব্ধি আসতে দীর্ঘ সময় লেগেছে আমার। সেই প্রথম দিককার রাগ, ক্রোধ… আমার সৃষ্টির মধ্যে ঢেলে দিয়ে তবেই শোকের গভীর বেদনাবোধে ডুবে যেতে পেরেছি আমি। আমার বাবাও তার অন্তর্গত রাগকে কাজের মধ্যে বইয়ে দিতে পারতেন। আমিও বোধহয় তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার সাথে সাথে এই ধারাটি পেয়েছি। এটাই আর্ট অফ গ্রিভিং…। বিষাদশিল্প।
বাবার স্মরণ-আয়োজন যখন চলছিল, ফেডারেল জজ তার শোকবাণীতে বলেছিলেন, “হার্পার লি’-এর ‘To kill a mocking bird’ উপন্যাসে মূল চরিত্র অ্যাটিকাসের অন্তিম যাত্রার দৃশ্যটা এমনই ছিল, একটি আদালতভবনে অ্যাটিকাসের মৃতদেহ শায়িত। সমবেতদের একজন তার কন্যাকে বললেন, “উঠে দাঁড়াও কন্যা। একজন মহাত্মার প্রস্থান হচ্ছে।” আজ আমি আবারও সেই মুহূর্তটির পুনঃদৃশ্যায়ন দেখতে পাচ্ছি। সমবেত সকলকে বলছি, “আপনারা উঠে দাঁড়ান। একজন মহান মানুষ ওঁর অনন্তযাত্রা শুরু করেছেন। শুভযাত্রা।” আর সেই সময়ের বেদনাবোধে আবারও মনে পড়ে গেল অডেনকে …

সে আমার উত্তর-দক্ষিণ, সে-ই আমার পূর্ব-পশ্চিম
সে আমার কেজো সপ্তাহ, সপ্তাহান্তে বিষাদে রক্তিম
সে আমার মধ্যদুপুর, গল্পকথা, ভোরের পূরবী সুর
ভেবেছি ভালোবাসা অন্তহীন; সে-তো ভাবনার ভুল।

তারাগুলো এখনো কেন জ্বলছে, নেভাও এক-এক করে
চাঁদকে করো বাক্সবন্দী, সূর্যও যাক আকাশ থেকে সরে
সাগরের ঢেউ স্তিমিত হোক, অরণ্য হারাক সবুজ আলো
এমনই এক সর্বগ্রাসী শূন্যতা, কিছুই তো লাগছে না ভালো।

[ডব্লিউ এইচ অডেনের কবিতাগুলির অনুবাদ লেখকের]