বাশিরুল আমিন > আলতাফ শাহনেওয়াজের কবিতা : যন্ত্রণাদীর্ণ সময়ের বয়ান >> প্রবন্ধ

0
1543
অন্ধ আলাদিনের গ্রামে দ্বিধাগ্রস্ত সময়
আলতাফ শাহনেওয়াজের কবিতা প্রথমবারের মতো পড়ি একটি ওয়েব পোর্টালে। নির্লিপ্ত নয়ন নামে লিখতেন তখন, এ নামেই বেশ মশহুর ছিলেন তিনি। প্রথম পাঠেই তাঁর কবিতার বিমুগ্ধ পাঠক বনে যাই আমি। পঠিত কবিতার দুটা পঙক্তি বহুদিন আমার মগজে বাজতে থাকে- কিন্তু আমরা পরস্পর অন্ধ / নিজেদের চুরি করব বলে ক্রমাগত জলছি। এই পঙক্তি সংবলিত ‘চোর’ কবিতাটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ ‘রাত্রির অদ্ভুত নিমগাছ’-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আলাদিনের গ্রামে’এসে নির্লিপ্ত নয়ন হয়ে যান আলতাফ শাহনেওয়াজ। কবিতাতেও আসে দারুণ পরিবর্তন। গ্রন্থটিতে ভাষিক-প্রকরণিক দিক থেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হন তিনি। প্রথম গ্রন্থের কবিতার সাথে যথেষ্ট ফারাক তৈরি হয়। এ-গ্রন্থে তাঁর মনস্বিতা মূলত শব্দের অন্তর্গত দ্যোতনায় ও চেতনায়। তাঁর কাব্যপঙক্তিসমূহ অনুভূতি প্রকাশে গভীর এবং শৈলীর সারল্যে বেশ গতিশীল হতে থাকে।
চব্বিশটি সিরিজ সনেটের সম্মিলন আলাদিনের গ্রাম। সনেটের ভাঁজে, রূপকথার অবগাহনে আখ্যানবয়ান করেছেন আলাদিনের; যে আলাদিন আরব্য-রজনীর গল্প থেকে আসলেও তাঁর শরীরে দেশীয় মাটির গন্ধ ও ঝাঁজ, ভেতরে-বাহিরে এই অঞ্চলের জল-হাওয়ার ছোঁয়া। সনেটগুলোতে বাকসজ্জা ও উপমা প্রয়োগে আলতাফ শাহনেওয়াজের সচেতনতা উল্লেখ্য- যেখানে দূর্বোধ্য ও সুবোধ্য কিছুটা হলেও একসাথে চলে। শাহনেওয়াজ তাঁর নিজের অস্তিত্ব, সংকট ও স্বাতন্ত্রের সন্ধান করেছেন আরব্য রজনীর একটি চরিত্রের ঘাড়ে চড়ে; সপ্রতিভ হয়েই। পাঠককে দরাজ গলায় আহ্বান করেছেন সেই আলাদিনের গ্রামে, সিরিজের প্রথম সনেটেই :
তোমাদের ঘরে গিয়ে একথা-সেকথা
এরপর সেই ঢেউ ভিজিয়েছে জল
শানের ঘাটলাগুলো। না করো স্বীকার,
ঘটিবাটি ভেসে তবু ফের আজ আসো
আলাদিনের গ্রামে। এ পথ চেনো না
কুটিলা, নেমেছে জন্মে বিভূতি মুহূর্তে…
(সনেট-১, পৃ. ০৯)
সংযতবাক ও শিল্প-নৈপুণ্যে আলাদিনকে করেছেন ঋদ্ধ। যেখানে যেটুকু যত্ন নেয়ার সবটুকু যত্ন দিয়েই রূপকথার আলাদিনকে পূণনির্মাণ করেছেন কবিতাকলায়। লোকজ কাহিনির আত্তিকরণের সচেষ্টতা থাকলেও এই আলাদিনে আছে আরবান জীবনযাপনের অভিজ্ঞতাও। আলাদিনের গ্রামে আমরা শুধুমাত্র গ্রামই দেখি না। গ্রাম দেখতে দেখতে আলাদিনকেও দেখার ফুরসত করে দেন কবি। প্রারম্ভিকায় আমাদের আলাদিনের গ্রামে ডেকে তিনি ফের আলাদিনকেই ডাকেন সকরুণ :
মিতালি-দোসর তুমি এসো আলাদিন,
এই দেহ ফুলগাছ, কাঁটা হয়ে বসো।
(সনেট-৪, পৃ. ১২)
আলাদিনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিশেষত নারী-নদী ও নদীঘাটলা ইত্যাদিসহ আলাদিনের চারপাশ বদলাতে থাকে। কবির বাচনিক পরিক্রমায় বিবর্তিত আলাদিনকে একপর্যায়ে আমরা আর ঠিক চিনে উঠতে পারি না। কেননা আলাদিনকে মজমা ভেদে ভিন্ন জায়গায় ভিন্নরূপে ও আঙিকে দেখি। কখনো সুদৈত্য আবার কখনো মূর্খ :
তোমাকে দেখি না। তাই ঘন-ক্ষুধা মন্দা
নিয়ে ভিন গাঁয়ে ঘোরে মূর্খ আলাদিন।
(সনেট-৯, পৃ. ১৭)
যন্ত্রণাদীর্ণ আলাদিন ও কুটিল সময়ের চিরায়ত যন্ত্রণায় বেঁচেবর্তে থাকতে থাকতে প্রতিবাদী হয়ে ওঠা আলাদিনকে ফুঁসে উঠতে দেখি আচমকা :
এই হামলা চোরাগোপ্তা; সেখানে গেরিলা
আমি আর আলাদিন গাঢ় রক্তে লিখি-
‘তরবারি দাওনি তো, হস্তই সম্বল’
(সনেট-১১, পৃ. ১৯)
সূচনা ও মধ্যমা-পর্বের সনেটগুলোতে আমরা আলাদিনকে ভিন্নসত্তা হিসেবে দেখতে পেলেও যতিচিহ্নে আলাদিন ও কথক আলতাফ শাহনেওয়াজকে এক-ই সত্তা হিসেবে আবিষ্কার করতে সক্ষম হই। কবি নিজ থেকে আলাদিনকে রচে ফের আলাদিনেই ফানা হয়েছেন।
আর আমি পৌঁছে যাচ্ছি শ্যাওড়াবাগানে-
চোরের কালিমা নিয়ে শাকচুন্নিভূত!
এ গাঁয়ের আলাদিন- আগেও এসেছি
(সনেট-২৩, পৃ. ৩১)
তখন আমাদের বুঝতে আর কষ্ট হয় না যে, আলাদিন আসলে কে? আখেরে আমরা আলতাফ শাহনেওয়াজকেই আলাদিন হিসেবে চিহ্নিত করতে বাধ্য হই এবং আমাদের সামনে পরিস্কার হয়ে যায় যে, আলাদিনের গ্রাম মানে কবির-ই গ্রাম-সংসার। শাহনেওয়াজের এসব সনেটে রয়েছে- লৌকিক চেতনার রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা, খণ্ডের মধ্যে সমগ্রের সন্ধান, চৈতন্যে রুহের খোরাক ও আধ্যাত্মবাদ । তাঁকে মরমী মনসুর হাল্লাজের মতো ফানা হতে দেখা যায় কখনো কখনো। রূহের ভাঁজে শোনা যায় কুলভ্রষ্টা সূর আবার চেতনায় মনসুর হাল্লাজের সরব উপস্থিতি :
কুর্নিশে নত মন নিশ্চিন্তে দিলাম,
সামান্য ইনাম পেলে দেহ পেতে দেব;
দুহাত উপরে তুলে মনসুর হাল্লাজ,
জুয়া খেলে অন্য কেউ তোমার সদরে!
(সনেট-২২, পৃ. ৩০)
তাঁর কবিতা-গতর, রূহ ও মগজ আমাদের আন্দোলিত করে। প্রগাঢ় প্রণোদনা সৃষ্টি করে মননে, বাজিয়ে তোলে আত্মা। তার প্রথম বই অদ্ভুত নিমগাছের রাত্রির ফ্ল্যাপের কথক জাফর আহমদ রাশেদের কন্ঠে বলতে হচ্ছে- ‘তার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি গাঢ়, স্নায়ু অনেক বেশি সংবেদনশীল, তার দৃষ্টি একই সঙ্গে সহজ ও তীব্র। পাঠক, এ সনেটগুলোতে আপনি ঘুমের সঙ্গে জড়ানো একটি রক্তবর্ণ বেদনাফল।’
সুখী নৃশংসতায় কলহ
সময়কে ধারণ করে নিজেকে নিজে অতিক্রম-প্রচেষ্টার একটি শিল্পিত রূপ আলতাফ শাহনেওয়াজের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কলহবিদ্যুৎ’। আগের দু’টি কাব্যগ্রন্থেও ভিন্ন-ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছিলেন তিনি। তবে এবারে আরেকটু বেশি বদলেছেন। যেমনটি বিষয়বৈচিত্রে তার অধিক ফর্মে। আগের কাব্যগ্রন্থ ‘আলাদিনের গ্রাম’ ছিল সনেটের আবরণে মৃত্তিকাঘনিষ্ঠ-লোকজ বাংলায় নিজেকে আবিষ্কার। আশা-নিরাশার কুহকে যাবতীয় উন্মুখতার প্রকাশ। কিন্তু ‘কলহবিদ্যুৎ’-এ কবি যাপনের যন্ত্রণাকে করুণ আর তীব্র স্বরে বাজিয়েছেন নতুন নতুন অভিধায়।
সম্পর্কের সন্ত্রাস, যাপনের বিড়ম্বনা, দুঃস্বপ্ন-হতাশা আর অবরুদ্ধতায় কবির সব কলহাস্য জড়ো হয়েছে এই গ্রন্থভুক্ত কবিতাসমূহে। সময়কে নিংড়ে নৈমিত্তিক বোঝাপড়াকে চিত্রিত করেছেন শব্দে-বাক্যে। শক্তিশালী চিত্রকল্প, ব্যতিক্রমী শব্দবন্ধ আর হালকা পরিহাসে কবির উদ্ধত স্বর পাঠককে আন্দোলিত করে। কবির তীব্র-ধারালো অনুভব পাঠকমনেও সঞ্চারিত হয় অবলীলায়। কিছু একটা নড়েচড়ে বসে- মনোগহনে।
‘কলহবিদ্যুৎ’ শিরোনামধারী দীর্ঘ কবিতাটিকেই গ্রন্থের মুখ্য-কবিতা হিসেবে মান্য করা যেতে পারে। আপোস করে বেঁচে-বর্তে থাকতে গিয়ে আমরা যেসব কলহকে মেনে নিই কিংবা নির্বিবাদী মানুষ হয়েও যে সকল কলহ থেকে পরিত্রাণের উপায় নেই- কবি এর একটা ঠিকুজি করেছেন এতে। চলতে-ফিরতে আমাদের জীবনে ঢুকেপড়া নিয়মিত সন্ত্রাসই যেন এ কবিতার উদ্দিষ্ট :
‘হাটবাজারগুলো কলহ করে খাতা ছেড়ে ঢুকে পড়ে হাঁ-জীবনে,
এবং বিদ্যুৎ, দুর্ধর্ষ আগস্ট মাস জ্বলে ওঠে
ঘোরে তারে তারে,
পরিবাহিত কিরণ এ দেহে হিসাবের ফর্দ খুলে
আমাদের শুইয়ে দেয় ফুটন্ত জালানি ব্যবস্থার পাশে;’
(কলহবিদ্যুৎ, পৃ. ৩৬)
অবিশ্বাস, হিংসা আর উদ্বেগের ভেতর আলতাফ শাহনেওয়াজ ঘাড় ঘুরিয়ে তাড়া খাওয়া সময়কে দেখার চেষ্টা করেছেন। ঘটনার মধ্যে দাঁড়িয়ে, ঘটনা থেকে দূরে সরে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন নিরাবেগ ভঙ্গিতে। নিজের সমাধি খুঁজেছেন সেই শরীরে যেখানে মানুষেরা মরে গিয়ে বেঁচে আছে। অদ্ভুতভাবে তাঁর যন্ত্রণাদীর্ণ হৃদয় থেকে প্রতিশোধের বদলে ভালোবাসার আহ্বানই উৎসারিত হয় :
‘বন্ধুরা, অন্তরে বিষ আর মুখে মধু নিয়ে
তোড়ে চোখপাল্টি দাও,
হিংস্র কুপিত নজর, ওজর-আপত্তির গোমড়ামুখ
ফেরো, বন্ধু!’
(কলহবিদ্যুৎ, পৃ. ৪৬)
অতীত থেকে বের হয়ে বর্তমানে নিজের চোখে নিজেকেই খোঁজেন আলতাফ শাহনেওয়াজ। নির্লিপ্ত নয়ন নামে হারানো সত্তাকে তালাশ করেন বিরামহীন। এই সন্ধানে বাদ যায় না সত্তার ভাবাবেগ কিংবা অনন্ত নির্জনতা। যেমন :
‘আজ দুপুরে হঠাৎ নির্লিপ্ত নয়নের সঙ্গে দেখা হলো। তাকিয়ে আমার দিকে ঘন সূর্যকে প্রলম্বিত করছিল ছেলেটি। … তার চোখের গভীর খাদে তখন হয়তো ফোটে রহস্যভাষা; আনমনে না বলেও বলে যে, পৃথিবীর প্রতিটি জাহাঙ্গীরনগরে ১১৪ নম্বর কক্ষ বড় নির্জন!’
(আমি, পৃ. ১৩)
এই গ্রন্থে কেবল যে হাহাকার আর কলহের কবিতাকথনই বেশি, এমন না; সম্পর্ক, উদযাপন আর দেহকাতর বাসনাও এসেছে পরিমিতভাবে। কিছুটা ছন্দে, গীতলতায়। একধরনের কবিতার ভাষায় সাম্প্রতিক যাপন-যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে ‘কলহবিদ্যুৎ’-এ। ভাষার ব্যাঞ্জনা-দ্যোতনা আর অভিঘাতের উল্টো পিঠে সামাজিক সংকট আর বিপন্নতা থেকে মুক্তি পেতে নিমগ্ন হতে চেয়েছেন প্রেমের শীতলতায়, শরীর-আত্মাসমেত ফানা হওয়ার অন্তর্গূঢ় দর্শনে :
গিরি খাদের গাঢ় অবরোধ
কে খুলে নিল, গলে পড়া ফুলে
ঘুম হবে না কোনো দিন আর;
তাই ফিরেছি দেহসন্ধ্যার
পাশে বৃথাই, মরে যাব বলে…
(দেহসন্ধ্যার শেষে, পৃ. ৩০)
কবিতাগ্রন্থটি ভেতরে ভেতরে জমতে থাকা ক্ষোভ, হাহাকার ও আকাঙ্ক্ষার সহজ উচ্চারণ। ছকভাঙা নতুন ভাষাভঙ্গি ও অভিনবত্ব সর্বোপরি হৃদয়গামী ভাবের উচ্ছ্বলতা বাংলা কবিতার পাঠকের মননে খানিকটা হলেও স্বস্তি আনবে। ভেতরঘরকে সৌন্দর্যে মোহিত করবে।
যন্ত্রণার তর্জমা
‘সামান্য দেখার অন্ধকারে’ কবি আলতাফ শাহনেওয়াজের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ এবং প্রথম দীর্ঘকবিতার বই। কবিতাটিতে আলতাফ শাহনেওয়াজ বিস্তৃত একটা ল্যান্ডস্ক্যাপে নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সময়ের এবড়োখেবড়ো জমিনে নিজের অবস্থানকে আবিষ্কারের প্রয়াস এ কবিতাটি। নিজ সত্তা ও সময়কে তর্জমা করেছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে, একদমই আলাদা ঢঙের তাজা-টাটকা ভাষায়।
অস্তিত্বের সংকটে পড়া সাম্প্রতিককালের যন্ত্রণাদীর্ণ মানুষই তার এ কবিতার আলাদিন। যারা তীব্র সংকটে নিজেরা নিজেদের খুঁজে ফেরে হামদহ গ্রামে অথচ কোথাও নেই সেই গ্রাম :
কখনো কোথাও নেই হামদহ গ্রাম,
রাত্রিকুয়াশায় ছায়া বিজলী চমকে
সে গ্রামে হাঁটেনি তাই
দূর গ্রীষ্মের সমতলে;
(সামান্য দেখার অন্ধকারে, পৃ. ১১)
এরকম একটা প্রবল ঘোর, তীব্র সংশয় আর মাদকতায় শুরু হয় আলতাফ শাহনেওয়াজের দীর্ঘ কবিতা ‘সামান্য দেখার অন্ধকারে’; যেন নশ্বর চারপাশ ভেঙে পড়বে আকস্মাৎ। সবকিছু এলামেলো, নিয়ন্ত্রণহীন। কী এক অরজকতায় আক্রান্ত সবাই, সবকিছু। ছিন্নভিন্ন গ্রাম, ঢালভাঙা জবা কিংবা উগ্র সন্ধ্যা কেউই তাদের মতো করে স্বস্তিতে নেই। থেকেও যেন নাই হয়ে যাচ্ছে সবাই। আত্মনিয়ন্ত্রণহীন। যেমন কবির নিয়ন্ত্রণে নেই তার শরীর :
ছায়াহীন লাশ যায় আসে-
আমি যাই
আমি কিন্তু আমি নই,
আমার জিম্মায় নেই আমার শরীর!
(সামান্য দেখার অন্ধকারে, পৃ. ১৭)
এখানে বিরাজ করছে নাজুকতা, সন্ত্রাস। এখানে আছে একাকীত্ব আর অসহায়ত্ব। আছে নগরমানসের উদভ্রান্তি ও মনস্তাপ এবং ছিন্নভিন্ন মনোজগতের সংবেদ ও চিৎকার। না দেখা একটা ভয়, একটা আতঙ্ক তাড়া করছে পুরো সময়টাকে। পুরো সমাজটাকে। এসব থেকে পালিয়ে বাঁচার সুযোগ সন্ধান করে যান কবি :
না-দেখা ভয়ের উপমা পেছন থেকে
তাড়া করে
প্রতি রাতে,
দৌড়াতে দৌড়াতে প্রহরীর করতলে
নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ি
আমি।
(সামান্য দেখার অন্ধকারে, পৃ. ১৭)
দীর্ঘকবিতাটি এগিয়ে যায় যেন ঘোরগ্রস্ত সওয়ারী দল এগুচ্ছে কুয়াশা ভেদ করে করে- দূর্গম গন্তব্যে। সভ্যতার ভবিতব্যহীন প্লাবনে ভেসে যাওয়া এক উদ্দাম অনিশ্চিত যাত্রা। বক্তব্যের দ্বান্দ্বিকতার সাথে তার বাগভঙ্গির হেঁয়ালিপনা পাঠককে আচ্ছন্ন করবে, মাঝে মাঝে মোহাবিষ্ট। যান্ত্রিকতা আর লৌকিকতার ঔরসে রচিত ছিন্নতা আর বিচ্ছিন্নতার গল্প বলেন তিনি, তীব্র অভিমানে –
মস্ত গুগলের গরিমা
তোমাকে অনলাইনে, অফলাইনে সুইচের পাশে
অফ করে রেখে দেয় রোজ;
হা-রে-রে সংযোগ… যাহা ছিন্ন
তাহাই তো বিচ্ছিন্নতা, এ সুবাদে
‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলে তোমায় নামিয়ে দিচ্ছি দেখো
(সামান্য দেখার অন্ধকারে, পৃ. ১৯)
‘সামান্য দেখার অন্ধকারে’ কবিতাটি এভাবেই বিচ্ছিন্নতা ও বঞ্চনাকে বয়ান করে করুণ আর্তনাদে। কখনো-বা রাগত স্বরে আবার কখনো পরিহাসে। নিমজ্জিত মানুষকে ভাসিয়ে তোলার প্রচেষ্টা চলে শব্দের ভেলায়। কেননা এটি এমনই একসময়ের কবিতা যখন মানুষ ভুলতে বসেছে যে, সে একজন মানুষ। রাষ্ট্র, রাজনীতি আর প্রেমের এই করুণ সংরাগে তার কবিতা হয়ে ওঠে তীব্র দীর্ণ :
আমার দু-জোড়া ঠোঁটে তুমি
রাষ্ট্র
প্রেম
টাকা বানানোর প্রেস বসিয়ে ঘুমাও
প্রেসনোট লিখে লিখে আমিই
জানিয়ে দেব সোনা
এখানে এসো না।
(সামান্য দেখার অন্ধকারে, পৃ. ৩৩)
ব্যক্তিযাপন থেকে সমষ্টির অনুভবে, সমকালীন ভাবনা থেকে চিরায়ত বোধে প্রসারিত হয়ে যায় তার কবিতা। নিজের স্বর আর শৈলীর তীব্র সংবেদ তার কবিতাকে সমকালের অন্য কবিদের তুলনায় পৃথক বলে চিনে নিতে পারি সহজেই। সেদিক থেকে আলতাফ শাহনেওয়াজ নিঃসন্দেহে সমকালীন বাংলা কবিতার একজন বিশিষ্ট কবি।