বিমল লামা > প্রত্যাখ্যানের দর্শন ও দেবেশ রায় >> স্মৃতি-মূল্যায়ন

0
167

প্রত্যাখ্যানের দর্শন ও দেবেশ রায়

সাহিত্যিক দেবেশ রায় আর আমাদের মধ্যে নেই। এটা আমার কাছে শুধু একটা দুঃসংবাদ নয়। একটা বিরাট ভাঙন। বাইরে থেকে দৃশ্যমান নয় এমন একটা ভাঙন যা আমার অন্তঃকরণকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। কারণ আমার নিজস্ব নির্মাণের ভরকেন্দ্র বরাবর প্রধান খুঁটির মতো ছিলেন দেবেশ রায়। দীর্ঘ চুরাশি বছরের অশক্ত শরীরে আমাকে কতটা শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন সেটা আমি আগে বুঝলেও তার সম্যক উপলব্ধি ছিল না। সেটা হল যখন তিনি আর নেই। আমার বাকি জীবন কেটে যাবে দেবেশ রায়-বিহীন পৃথিবীতে নিজেকে পুনর্নির্মাণ করতে করতে। জানিনা কোনও দিন পুরোপুরি তা করে উঠতে পারব কি না।
দেবেশ রায়ের কাজ-কর্মের উচ্চতা ব্যাপকতা গভীরতা নিয়ে কিছু বলার মতো যোগ্যতা আমার নেই। তাঁর লেখা আমার কেমন লাগে, কেন লাগে, সেসব কথাও একেবারেই অবান্তর। তাঁকে আমি যখন দেখেছি তখন তিনি তাঁর তপস্যা সাঙ্গ করে বসে আছেন আলোকপ্রাপ্ত এক মহাপুরুষের মতো। তিনি তখন অবস্থান করছেন কলকাতায়। বাগুইহাটির বল্মিক আবাসনে। এই বল্মিক আবাসন কোনও উইঢিবি ছিল না। ছিল এক বাল্মীকির অধিষ্ঠান ক্ষেত্র। একেও শূন্য করে মহাপ্রস্থানের পথে বেরিয়ে গেলেন তার বাল্মীকি।
এখন তিনি শুধু রয়ে গেলেন আমাদের স্মৃতিতে। সেই স্মৃতির পথে বিচরণ করতে গিয়ে মনে পড়ে সেই সাধক মানুষটাকে যাঁর কাছে গল্প শুনেছি তাঁর শৈশবের পাবনা পর্বের। কৈশোর যৌবনের জল্পেশভূমি পর্বের। ডুয়ার্সের অরণ্যভূমি জুড়ে তার অবাধ বৈপ্লবিক বিচরণের।
ভাবতে অবাক লাগে, এত কিছু মহৎ কাজ করার জন্য যিনি জন্মেছেন তিনি শৈশবে শিশুই ছিলেন আর সবার মতো। কৈশোরে ছিলেন কিশোর। আর যৌবনে যুবক। যেন বা একটু বেশিই যুবক। একটু তাড়াহুড়োর যুবক। আর তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দেওয়ার জন্য কাছাকাছি ছিলেন এক নাবালিকা, কাকলি। মাত্র নয় বছর তার বয়স তখন। যাকে তিনি ফুলু বলে ডাকতেন। ফুলুদের বাড়ি পড়তে যেতেন কিশোর দেবেশ রায়। ফুলুর বাবার কাছে। পরে তারা পালিয়ে বিয়ে করেন এবং একত্র বসবাস করেন, ২০১৭ সালে কাকলি রায়ের মৃত্যু পর্যন্ত।
সেই কিশোর বয়সেই বোধ হয় যা একটু তাড়াহুড়ো ছিল দেবেশ রায়ের। তাড়াহুড়োয় প্রেম করে বসলেন কাকলি রায়ের সঙ্গে। তাড়াহুড়োয় পা দিলেন যৌবনে। এমনকি তাঁর ডেস্টিনিও ঠিক হয়ে গেছে ততদিনে। সাগরময় ঘোষের ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর গল্প বেরিয়ে গেছে মাত্র ১৯ বছর বয়সে। তারপর তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন জীবনের সব তাড়াহুড়ো। তাঁর স্বভাবের মধ্যে আর কখনও পাওয়া যায়নি কোনও ব্যস্ততা। দেখা যায়নি কোনও সময়াভাব।
অথচ কি তীব্র উল্টো টান ছিল তখন তাঁর চারপাশ ঘিরে। সদ্য স্বাধীন হওয়া এক মহান দেশ তখন নির্মিত হতে শুরু করেছে নিজের শর্তে। দেশের যুবসমাজের মনে তার তীব্র অভিঘাত। দেশগঠনের কাজে যোগ দেওয়ার ডাক দেওয়া খোলা চিঠি আকাশে-বাতাসে উড়ছে গ্রামেগঞ্জে। কোনও শিক্ষিত সংবেদনশীল যুব-হৃদয়ের পক্ষেই সম্ভব ছিল না সেই ডাক উপেক্ষা করার। দেবেশ রায়ও পারেননি উপেক্ষা করতে। বামপন্থাকেই দেশগঠনের সর্বোত্তম পন্থা মনে করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন পার্টির কাজে। হয়ে গেলেন কমিউনিস্ট পার্টির হোল-টাইমার নেতা। আর সেই কাজ করতে গিয়েই তিনি দীক্ষিত হলেন প্রত্যাখ্যানের দর্শনে। কারণ, তিনি উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত বনাঞ্চলে, শোষণপীড়ন আর প্রাগৈতিহাসিক বঞ্চনার বিগলনক্ষেত্র চা বাগানে, বিচিত্র মানুষের মেলায় হাটে বসতিতে খুঁজে পেয়েছিলেন অচেনা এক ভারতবর্ষকে, যার বাসিন্দারা অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করে বসেছিল সেই স্বাধীনতাকে। সেই নির্মাণকে।
পরবর্তীতে এই প্রত্যাখ্যানের দর্শন তাঁকেই ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল জীবনের সমস্ত বাণিজ্যিকতা থেকে। তিনি আশ্রয় নিলেন জ্ঞানের তপস্যায়। মগ্ন হয়ে গেলেন নিজের কর্মযজ্ঞে। কোথাও কোনও রকম প্রতিদানের প্রত্যাশা না রেখেই। কাকলি দি’র কাছে শুনেছি, তিস্তাপারের বাঘারু কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়। এমনকি বিচ্ছিন্ন মানুষও নয় বাঘারু। এখনও তারা বেঁচেবর্তে আছে তাদের নিজস্ব নিভৃত ভূবনে। তিস্তা উপত্যকার আনাচেকানাচে আজও তারা প্রতিনিয়ত প্রত্যাখ্যান করে চলেছে বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হস্তক্ষেপের। কারণ হারাবার মতো তাদের শৃংখলও নেই। তারা স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী তিস্তার মাছের মতো, ডুয়ার্সের পাখির মতো।

দেবেশ রায় থাকতেন কলকাতায় চার তলার ফ্ল্যাটে। কিন্তু লিফট ছিলনা। অশীতিপর তিনি অনায়াসেই ওঠানামা করতেন সিড়ি বেয়ে। কাকলি দি-ও। ভাবতাম লিফট আছে এমন কোথাও থাকলেই তো পারতেন। কিন্তু ওদের কখনও অনুযোগ করতে শুনিনি। পরে বুঝেছি এটাও আসলে একধরনের প্রত্যাখ্যানই ছিল। যেমন প্রত্যাখ্যান ছিল নিজের যে-কোনো পাওনা-গন্ডার ব্যাপারে। সে বইয়ের রয়েলটিই হোক, বা কোনও অনুষ্ঠানের রাহা-খরচ দর্শনীই হোক।
হয়তো এটা বোঝা যেত না। তিনি কিছু বলতেন না। কিন্তু এই পৃথিবীর বাঘারুরা ভেতরে ভেতরে জয় করে নিয়েছিল তাকে। একেবারে নিজের করে টেনে নিয়েছিল নিজেদেরই মধ্যে। দীক্ষিত করেছিল তাদের অসামান্য প্রত্যাখ্যানের দর্শনে। না হলে কি কেউ বলতে পারেন, আমার কোনওদিনই কোনও কিছু হয়ে ওঠার তাড়া ছিল না। অথবা বৃহত্তম মিডিয়া হাউজকে কি বলতে পারেন, তোমাদের পত্রিকায় কখনো কিছু লিখব না। অথবা কাউকে পয়সার জন্য হ্যাক-রাইটিং করতে দেখলে বলতে কি পারেন, “খেতে তো পান। তাহলে এইসব রাবিশ লেখেন কেন?”
এটাই তো কাজ একজন প্রকৃত অভিভাবকের। সেই অভিভাবককে হারিয়ে ফেলল বাংলা সাহিত্য। এপার-ওপার দুই বাংলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য কথাটা। কারণ, দেবেশ রায়কে অন্তরে স্থান এ বাংলার চেয়ে ওপার বাংলাই বেশি দিয়েছিল। বাংলাদেশে তার জনপ্রিয়তা পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বেশি ছাড়া কম ছিল না। যদিও তাতে তার কিছুই যেত আসত না। কারণ সাহিত্যক্ষেত্রে জনপ্রিয়তাও কিছুটা সচেষ্ট নির্মাণের একটা বিষয়। সাহিত্যিককে খেটেখুটে দৌড়ঝাঁপ করে তিল তিল করে গড়ে তুলতে হয় সেটা।
দেবেশ রায়ের কাছে এসব ছিল কল্পনারও অতীত। তিনি কখনও কারো কাছে ভালো সাজার জন্য ছলনার আশ্রয় নেননি। এমনকি সত্য কথা কটু হলেও তা মুখের ওপর বলতে দ্বিধা করেননি। স্বাভাবিকভাবেই এতে অনেকের বিরাগভাজন হয়েছেন। কিন্তু তার তোয়াক্কা তিনি করেন নি। চুরাশি বছর বয়সে যখন তার শরীর দুর্বল তখনও সমান প্রখর তার জেদ। তার একরোখামি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেটা বজায় রেখেই তিনি চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে।
হয়ত সেই বটতলাটা আর রইল না যার ছায়ায় গিয়ে বসলে ব্যাটারির মতো নিজেকে রিচার্জ করে নেওয়া যেত। কারণ মহাবট আর নেই। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ সাধনার ফসল ছাপার অক্ষরে অক্ষয় হয়ে রয়ে গেল আমাদের কাছে। এখন সেখান থেকেই আহরণ করতে হবে আমাদের সেই অমোঘ শক্তি, যে শক্তিই একমাত্র পারবে এই ক্ষয়িষ্ণু সময়ের হাত থেকে আমাদের সাহিত্যকে বাঁচাতে। কারণ যতদিন না আমরা প্রলোভনকে প্রত্যাখ্যান করতে শিখব, ততদিন আমরা পারব না তার মতো সাধক হতে। তাপস হতে। হয়তো এই বার্তাই তিনি দিয়ে গেলেন আমাদের আমৃত্যু চারতলায় ওঠানামা করতে করতে।

বিমল লামা

জন্ম : ৪ জুলাই ১৯৬৮
প্রকাশিত গ্রন্থ : নুন চা (সপ্তর্ষি, ২০১২), রুশিকা (আনন্দ, ২০১৬)
পুরস্কার : জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় স্মারক সম্মাননা (২০১৩)