বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর > আত্মজৈবনিক কবি >> প্রবন্ধ

0
234
শহীদ কাদরীর শক্তির উৎস তাঁর অভিজ্ঞতা। ওই অভিজ্ঞতা একান্তভাবে ব্যক্তিক, কিন্তু সেই সঙ্গে সাম্প্রতিক। তাঁর কবিতায় তিনি মিলিয়েছেন এই দুই অভিজ্ঞতা, দুই অভিজ্ঞতা মিলে মিশে গেছে, ওই মিশ্রণ থেকে জন্ম নিয়েছে তাঁর মেজাজ ও কবিতার আঙ্গিক। মেজাজ তাঁর আর্তবেদী, কিন্তু ব‍্যঙ্গনিপুণ; সচেতন পরিকল্পনা তাঁর লক্ষ্য, কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি উচ্চকণ্ঠ; ধিক্কারে তিনি আত্মমগ্ন, সেইসঙ্গে বক্তব্যনিষ্ঠ। ওই মেজাজ ও আঙ্গিক তিনি আহরণ করেছেন দুই উৎস থেকে। একটি কথ্যরীতিজাত ব্যঙ্গ উদ্দীপক, অন্যটি গম্ভীর কাল্পনিক।
এইসব তাঁর কবিতার কাঠামো, কবিতার স্তবক, কবিতার বিন্যাসে স্তরে স্তরে ব্যাপ্ত। আর পরতে পরতে লিপ্ত অভিজ্ঞতা, প্রবল ও নিবিড়, আত্মজৈবনিক; ওই অভিজ্ঞতার কেন্দ্র তাঁর স্বপ্ন, সত্য, আশা, হতাশা, আর্তি ও আনন্দ। ওই অভিজ্ঞতার কেন্দ্র ব্যক্তি, যিনি জীবনযাপন থেকে অভিজ্ঞতার ওই সব বিষয় উপার্জন করেছেন। অভিজ্ঞতার একান্ত এই ব্যক্তিকতা তাঁর কবিতায় ভিন্নতর স্বাদ সঞ্চারিত করেছে।
অন্যপক্ষে ওই অভিজ্ঞতা সাম্প্রতিক কালের, সাম্প্রতিক কাল এভাবেই ব্যক্তির অভিজ্ঞতায় মিশে গেছে, তাই ভেদরেখা অস্পষ্ট, সেজন্য তাঁর কবিতার দ্যোতনা দূরস্পর্শী, ব্যক্তি এভাবেই গ্রথিত কালের সঙ্গে কিংবা কাল এভাবেই ব্যক্তিকে গিলে নিয়েছে, অভিজ্ঞতার এই বহুস্তর তাঁর কবিতাকে অমোঘ করে তুলেছে। তাঁর অভিজ্ঞতা জীবনজাত, সেজন্য তাঁর অভিজ্ঞতার প্রতাপ অনায়াস, সাবলীল ও স্বচ্ছন্দ, উপমা রূপকল্পের জনক ওই অভিজ্ঞতা, সেজন্য তাদের অব্যর্থ সিদ্ধিতে উল্লসিত হতে হয়।
অভিজ্ঞতার ওই ব্যবহার বাংলা কবিতার ধারায় হয়তো এই প্রথম সাবলীল। রোমান্টিক কাব্যাদর্শের বাঙালি সন্তান সকলও কবিতায় অভিজ্ঞতার ব্যবহার করেছেন। তবে ওই ব্যবহার অভিজ্ঞতার আবেগ নিয়ে, তাই তাঁদের কবিতায় আবেগের অসংহত প্রকাশ, উপমা তুলনার অন্য নাম, প্রতীক শিথিল, উক্তি ও উপলব্ধির মধ্যে ফারাক যুগান্তরের। তিরিশের কবিদের অভিজ্ঞতা ব্যবহার প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ, প্রায় পঠনজাত, পাঠের মাধ্যমে তাঁরা আন্তর্জাতিক মানসলোকের নাগরিক, সেজন্য তাঁদের কবিতায় অভিজ্ঞতার লোকজ ব্যাপ্তি ও গভীরতা অনুপস্থিত, কিন্তু কালের স্বাক্ষর তাঁদের কবিতায় স্পষ্ট, যথার্থ, প্রতীকী।
শহীদ কাদরীর মানসলোক গড়ে উঠেছে প্রতিবেশ থেকে, ওই ছন্নছাড়া, উন্মুল, পতনপ্রিয়, মূল্যবোধহীন প্রতিবেশ তাঁর ব্যক্তিতার মধ্যে প্রবিষ্ট, সেজন্য অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় ব্যক্তির জীবনযাপনজাত, সেই সঙ্গে প্রতিবেশেরও। নিসর্গ ও নগরের দ্বন্দ্বে তিনি মথিত নন, কিংবা ওই প্রতিতুলনা ছলনা শুধু, নগরের বিভিন্ন চিত্রাবলী তিনি সজ্জিত করেছেন, ওই চিত্রাবলী গ্রামীণ ভাবনালোক কিংবা রোমান্টিক কাব্যাদর্শ থেকে দূরে, তাই তাঁর নগরমনস্ককতা নগরের নিসর্গেই চিহ্নিত।
বাংলা কবিতার দুই বলিয়ান ধারা তিনি উপেক্ষা করেছেন। তুলনীয় এই প্রসঙ্গে শামসুর রাহমান ও হাসান হাফিজুর রহমান। শামসুর রাহমান কাজ করছেন আধুনিক বাংলা কবিতার সহজ, বোধনির্ভর কিন্তু অত্যন্ত প্রকরণ-কৌশল ঐতিহ্যের পরিমণ্ডলে, তিনি ঐতিহ্য অস্বীকার করেননি, ঐতিহ্যের পরিসর বাড়িয়ে চলেছেন ক্লান্তিহীনভাবে, যুক্ত করেছেন নতুন ভুবন ওই পরিমণ্ডলে। হাসান হাফিজুর রহমান কাজ করছেন সমাজ-সচেতনতার পটে। তাঁর কবিতায় বক্তব্য সিঁড়ির মতো সাজানো, বক্তব্য তিনি নানা দিক থেকে অবলোকন করেন, তাই বিভিন্ন বিরোধী রূপকল্প, উল্লেখ, ওই সবের মধ্য দিয়ে তিনি বক্তব্য তীব্র, তীক্ষ্ণ করে চলেন।
কিন্তু শহীদ কাদরী ওই দুই রীতি অস্বীকার করেছেন, কবিতাকে সুন্দর শব্দের তৃষ্ণা ও সমাজবোধ থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তিনি কবিতাকে ব্যবহার করেছেন অভিজ্ঞতার পটভূমি হিসেবে। সেজন্য শব্দের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ শামসুর রাহমানের মতো প্রখর নয়, তিনি উজ্জ্বল শব্দের ভক্ত নন, শব্দ তাঁর অভিজ্ঞতার কাছে দ্যোতনা-জ্ঞাপক, তাই প্রাত্যহিক শব্দ, জাঁকালো শব্দ, মূলজাত শব্দ সবই ভিড় করে এসেছে, সব শব্দ তিনি প্রয়োগ করেছেন সমান্তরালভাবে বক্তব্য প্রবল করে তুলবার জন্য। অন্যপক্ষে তাঁর বক্তব্য হাসান হাফিজুর রহমানের মতো সমাজবোধনির্ভর নয় বলে তিনি স্বতন্ত্র, স্বাধীন, একক, বিচ্ছিন্ন মানুষের মতো উক্তি করে চলেন অনবরত। যা ঘটছে প্রাত্যহিকে কিংবা মনে কিংবা মননে সবই তাঁর কবিতায় উৎসারিত, কিন্তু সমাজ আস্তিক্যে তিনি নিষ্ঠাহীন, দার্শনিকতায় তাঁর প্রেম নেই, তিনি গন্তব্যবিলাসী কিংবা সিদ্ধান্তপ্রয়াসী নন, তার দরুন কবিতা তাঁর কাছে স্মৃতি ও সত্যের দ্বন্দ্ব, কিংবা বর্তমান ও বিশ্বাসের মল্লযুদ্ধ কিংবা স্বীকারোক্তির ক্লেদ অথবা সৌরভ।
কবিতার কাঠামো তাঁর সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো ঋজু ও দৃঢ়নিবদ্ধ। কিন্তু দুইয়ের তফাৎ অসীম। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাঠামো দুর্গের মতো, কোন একটি দার্শনিক সত্য উদ্ঘাটনে অবিরল ধাবিত, কিংবা সিদ্ধান্তের বাহক। সে ক্ষেত্রে শহীদ কাদরীর কাঠামো কোন সিদ্ধান্ত উপস্থিত করে না, স্তবকে স্তবকে বক্তব্য কিংবা স্বীকারোক্তি হাজির করে, তাতে ধ্বনিত কখনো ব্যঙ্গ, কখনো উল্লাস, কখনো আর্তি; অন্যপক্ষে তাঁর বক্তব্য, স্বীকারোক্তি যুক্তিনিষ্ঠ নয়, তিনি ভালবাসেন প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে যেতে, স্বীকারোক্তির স্বর্গ ও নরকে আলো ছড়াতে, তাই তাঁর স্তবকপুঞ্জ চিত্রল ও ধ্বনিময়।
কিন্তু শহীদ কাদরীর অভিজ্ঞতা ব্যবহার অভিনব হলেও তাঁর পরিসর সংকীর্ণ। অমন অভিজ্ঞতার অসুবিধে হচ্ছে এ নিয়ে বহুবার কাজ করা সম্ভব নয়। শহীদ কাদরীর মানস আপাতত প্রেম, প্রকৃতি, মনুষ্যস্বভাবে উৎসাহী নয়। ফলে তাঁর ভবিষ্যত পরিক্রমণে বিঘ্ন হতে পারে। শহীদ কাদরী খুব সম্ভব সে সম্বন্ধে সচেতন। তাঁর কৃতিত্ব ব‍্যক্তিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার গ্রন্থনে, কিন্তু কতক ক্ষেত্রে আঙ্গিক ও বক্তব্যে সে গ্রন্থন নিষ্ঠ নয়। হয়তো যে ঐতিহ্যের হাত থেকে তিনি মুক্তি খুঁজছেন সে-ঐতিহ্যই তাঁকে অন্যমনস্কতার সুযোগে গ্রাস করে, তখন তিনি চৈতন্যের বদলে স্বতঃস্ফূর্তে উচ্চকিত হন, নির্মিত সড়কে পরিভ্রমণে নিরাপত্তা খুঁজে পান।

 

কভারের স্কেচ : ‘শঙ্খচিল’ পত্রিকার সৌজন্যে।
[এই লেখাটি ১৯৬৯ সালে একটা সাময়িক পত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রাবন্ধিক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর এটি লিখেছিলেন শহীদ কাদরীর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ “উত্তরাধিকার”-কে কেন্দ্র করে। লেখাটি প্রাবন্ধিকের কোনো বইতে সংকলিত হয়নি।]