বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর > স্বাধীনতা মানবিক স্বাধীনতা >> জার্নাল

0
725

স্বাধীনতা মানবিক স্বাধীনতা

বক্তব্য একটাই : স্বাধীনতা। বারেবারে ঘুরে ঘুরে বলা, বারেবারে ঘুরে ঘুরে আসা, যেন স্তব যেন তীর্থ; আমরা দিনে কিংবা রাত্রে, কাজে কিংবা অবসরে, মিছিলে কিংবা আলাপে স্তব করে চলি : স্বাধীনতা আমরা তীর্থযাত্রী : স্বাধীনতার।

ভোরে উঠি, জানালায় সে; কাজে যাই, কাজের পাশে সে; খেতে বসি, সামনে সে; মিছিলে, চারপাশে সে; গুলিবর্ষণের মধ্যে দীপ্ত সে; এভাবেই স্বাধীনতা আমাদের ঘিরে আছে, স্বাধীনতার মধ্যে আমরা বেড়ে উঠি। রক্ত নির্ধারিত, মৃত্যু অনিবার্য, তবু স্বাধীনতা; ধ্বংস সত্য, সর্বনাশ নিশ্চিত, তবু স্বাধীনতা। আমি এবং পূর্বপুরুষেরা কয়েদি, তাই স্বাধীনতা; আমি এবং পূর্বপুরুষেরা বিদ্রোহী, তাই স্বাধীনতা। স্বাধীনতা উপায় আমি থেকে আমরাই আসার; যেই আমরা কথা বলি ভয় পিছু হটে যায়, যেই আমরা জয়ধ্বনি তুলি শহরের সবাচ্ছাদন দূরে উড়ে যায়; আমাদের যত শব্দ আছে সবকিছুতে ধ্বনিত : স্বাধীনতা।

স্বাধীনতা এক বিশুদ্ধ ক্রোধ। স্বাধীনতা এক অপ্রকাশিত ভালোবাসা। স্বাধীনতা এক সিংহের বিচরণ। আমি এবং পূর্বপুরুষেরা, আমরা এসবই।

সূর্য তখন ছাই, গান গাওয়া পাখিটা বাসায় ফিরে গেছে, তখনই আকাশের স্পন্দিত হয়ে উঠল : স্বাধীনতা। স্বাধীনতা, মানুষের গলায় গলায় শহর চিৎকার করে উঠল, দূর থেকে দূর গোলাপের মতো ফুটে উঠতে লাগলো, যেন মানুষ জয় করেছে চোখে দেখা যায় সবকিছু। তারা দলে দলে রাস্তায়, তাদের হাত আকাশে, আর তাদের গলাই অস্ত্র; সজ্জিত, কখনো বিশৃঙ্খল, উত্তাল, কখনো বিষন্ন; তারা বারেবারে রাস্তায়; এভাবেই দিনের অন্তিমে তারা পৌঁছেছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যত বন্ধন, জাগরণ থেকে নিদ্রা পর্যন্ত যত বন্ধন, জীবন যাপনের যত বন্ধন সবকিছু মিথ্যা; সত্য শুধু বন্ধনের অবসান, তাই তারা রাস্তায়, শহরটা তারা শব্দ দিয়ে শোধন করে দিচ্ছে। ঘুম থেকে উঠেই অভাব আর অনটন; ঘুম থেকে উঠেই মালিন্য আর কুশ্রীতা; সে সবের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান, তাদের বাধা দেওয়ার কেউ নেই, সবই লুকিয়েছে গর্তে, আড়ালে, অন্তরালে, সেখান থেকে সতর্ক চোখে দেখছে দেখছে দেখছে। কিন্তু তারা বেপরোয়া, তারা বিদ্রোহী, তারা বিপ্লবী; তারা চিৎকারে চিৎকারে তৈরি করছে সুন্দর, জীবনযাপনের জন্য ভাববার জন্য চোখ মেলে তাকাবার জন্য। তাদের চিৎকারে রাস্তার বাড়িসকল গা ঝাড়া দিয়ে উঠছে, পার্কের গাছসকল ডালে ডালে স্বপ্ন মেলে দিচ্ছে।
আর রাত্রে সেই চিৎকার সেই প্রতিবাদ সেই বিদ্রোহ দীর্ণ করে ভেসে এলো রাইফেলের আর মেশিনগানের আওয়াজ, তবু চিৎকার তবু প্রতিবাদ তবু বিদ্রোহ রাইফেলের আর মেশিনগানের আওয়াজ ছাপিয়ে, রাইফেলের আর মেশিনগানের আওয়াজ গলাটিপে কেশর ফুলিয়ে গর্জন করে উঠছে : স্বাধীনতা, স্বাধীনতা; সমস্ত আকাশটা নিশেন হয়ে উঠছে চাঁদের আলোয়, যতদূর চোখ যায় নিশেন, কাল থেকে কালান্তরের নিশান হাতে হেঁটে চলেছে মানুষ। কিন্তু রাইফেল আর মেশিনগান ঝাঁঝরা করছে চেনা শহরটা, আর শহরের সব রাস্তা বজ্রের মতো উদ্যত হচ্ছে হত্যাকারীর দিকে, মতিঝিলের টেলিভিশন, লাটভবন, মালিবাগ, কমলাপুর, ফার্মগেটম সব রাস্তাই বজ্রের মতো ফেটে পড়ছে হত্যাকারীর ওপর; চেনা শহরটা, আমার চেনা শহরটা চোখের সামনেই বিদ্রোহী, বিপ্লবী হয়ে যাচ্ছে, ঝাঁঝরা বুক নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আমি দুহাতে তাকে জড়িয়ে ধরেছি, আমার স্বাধীনতা। রাত বেড়ে চলে, তারারা ছড়িয়ে যায় আকাশে, আর আমার দুহাতে আমার শহর, আমি ঘুমুতে ভুলে গেছি, আমি দুচোখ মেলে স্বাধীনতা পাহারা দিচ্ছি।
ভোর এসেছে, নেবুপাতার গন্ধ বাতাসে, ভোরের আলোর নীল আর সাদা ছড়িয়ে যাচ্ছে, পাতার সবুজ উঁকি দিচ্ছে রক্ত গোলাপের গুচ্ছে গুচ্ছে; ভোর এসেছে, রাস্তা ফাঁকা, গাছের গুড়ি আর ইট আর কংক্রিটের ব্যারিকেড সার সার বাড়িতে মানুষেরা কান খাড়া করে শুনছে; ভোর এসেছে, একটি ছেলে বুক ঝাঁঝরা করে শুয়ে আছে মাটিতে, বন্ধুরা শহিদ মিনার গাঁথছে। আর আমি দুচোখ মেলে স্বাধীনতা পাহাড়া দিচ্ছি। আমি, বাংলাভাষার একজন লেখক, আমার ভাষার সব শব্দে স্পন্দিত একটি সত্য : স্বাধীনতা : আমি, বাংলাদেশের একজন ব্যক্তি, আমার দেশের চতুর্দিকে উচ্চারিত একটি শব্দ : স্বাধীনতা; আমি বাঙালি জাতির এক প্রতিনিধি, আমার জাতির হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত এক ভাষা : স্বাধীনতা; ওই স্বাধীনতা প্রার্থিত এক রাষ্ট্র খুঁজছে, সেজন্যই বিদ্রোহ, সেজন্যই বিপ্লব; বিদ্রোহ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে, বিপ্লব মানকসম্পর্ক ও সমাজসম্পর্ক জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য। তাই বিদ্রোহ আর বিপ্লব পরস্পর প্রবিষ্ট, পরস্পর সম্পর্কিত, তাই বিদ্রোহের পর বিপ্লব নয়, একসঙ্গে পাশাপাশি সমান্তরাল, আমাদের বিদ্রোহ বিপ্লবের জন্য। ঢাকা শহরের চিৎকারে আমি তাই শুনি। সারা বাংলাদেশের চিৎকারে আমি তাই শুনি। আমি বাংলা ভাষার একজন লেখক, আমার কাছে মানুষের ভাষা তো মিথ্যা বলে না। আমার দায়িত্ব ওই ভাষা জাগিয়ে দেয়। ভাষা ওই স্পষ্ট, সোচ্চার, দ্ব্যর্থহীন, সূর্যের মতো উজ্জ্বল, আকাশের নীলের মতো অবারিত, তাকে বিকৃত করার অধিকার কারোর নেই, সূর্যকে বিকৃত কে করতে পারে, কিংবা আকাশের ঘননীল কিংবা বাংলাদেশের এই চিৎকারকে। মানুষের চিৎকার থেকে যে শব্দের জন্ম তাকে লালন করা আমার কর্তব্য, কারণ ভাষার রক্ষক আমি, কারণ ওই চিৎকারে ভাষার উদ্ভব হয়েছে। ওই চিৎকারে মানুষের সমগ্র অন্তরাত্মা সক্রিয়; বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়বোধ, হৃদয়বৃত্তি, পূর্বপুরুষ ওই চিৎকারে অধিষ্ঠিত; সেজন্য ওই ভাষা আমার অধিকারে, তাকে নষ্ট হতে দেয়া যায় না। ভাষাকে বিকৃত করে পেশাদার রাজনীতিকরা, তাদের কাছে উচ্চারণ মাত্র কৌশল, সেজন্য ঢাকা শহরের চিৎকার তারা ব্যাখ্যানে ব্যাখ্যানে এখানে মলিন করে তুলেছে, কিন্তু ওই চিৎকারে উচ্চারিত : স্বাধীনতা; লেখক হিসেবে আমার কর্তব্য ওই উচ্চারণ অবিকৃত রাখা, সারা দেশে পৌঁছে দেয়া, ভাবীকালের জন্য গুছিয়ে রাখা।
ধ্যান-ভাবনায় রোদ পড়েছে, ঝকঝক করছে, অনেক দূর উদ্ভাসিত। প্রতিরোধের শহরেও পাখি ডাকে, মহিলাদের কোলাহল শোনা যায়, শিশুর হাসি ভেসে আসে, প্রাত্যহিকতায় জীবনের জয়গান ওঠে। সেজন্যই জীবনে কোন দুর্ঘটনা নেই, প্রতিরোধের মতো ঘটনায় আমি জড়িত, ওই ঘটনা বাইরের কোনো কিছু নয়। প্রতিরোধে আমি অন্তর্ভুক্ত, ওই প্রতিরোধ আমারও, এড়িয়ে যাওয়ার জো নেই, সেজন্য ওই পরিস্থিতি আমি বেছে নিয়েছি। ওই বাছাইয়ের শেষ নেই, কখনো নেই। সেজন্য ওই প্রতিরোধের সব দায়িত্ব আমার। কোন বাধ্যতা নেই, কোন জবাবদিহি নেই, আসলে মানুষী বাস্তবতা অমনই। ওই প্রতিরোধ আমার। কারণ পরিস্থিতি উৎসারিত, ওই পরিস্থিতিতে আমার আবিস্কার : প্রতিরোধের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে। আমি তাই সম্পূর্ণ দায়িত্বই কর্তব্য বলে বেছে নিয়েছি।

প্রতিরোধে আমি, লেখক হিসেবেই, যা আমি করব প্রতিরোধের পক্ষে যাবে। কিন্তু এক্ষেত্রে দুই ভিন্ন কর্মপদ্ধতির আমি সম্মুখীন; একটি কংক্রিট, অব্যবহিত কিন্তু লেখার প্রতি নির্দিষ্ট; অন্যটি সকলের সঙ্গে যুক্ত, মিছিলে, ব্যারিকেডে, সাক্ষাৎ সংগ্রামে। সংলগ্ন দুই নীতিবোধ; একপক্ষে লেখার প্রতি ব্যক্তিক কর্তব্য, অন্যপক্ষে বিশাল পরিধিতে প্রসারিত কর্মক্ষেত্র। আমাকে বেছে নিতে হবে ওই দুইয়ের মধ্যে কোনটি বেশি জরুরি; সকলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে লড়াই করা, কিংবা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অবিচলিত থেকে লিখে যাওয়া?

যদি আমি লিখে চলি, লেখাই আমার লক্ষ্য, মাধ্যম নয়; কিন্তু একই যুক্তিতে তাদের আমি সত্য হিসেবে মেনে নেব যারা লড়াই করে চলেছে আমার হয়ে; বিপরীতও সত্য যদি আমি সকলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রত্যক্ষ প্রতিরোধে এগিয়ে আসি, তাহলে সকলকে আমি লেখার বিনিময়ে লক্ষ্য হিসেবে মেনে নেব। তাহলে? তাহলে আমি কি বলবো যা আমি পারিনা অন্যরা তা করবে? বরং বিপরীত, বাস্তবতায় কর্ম, সেজন্য কর্মমাত্র অনন্য, সেই সঙ্গে অন্য সম্পর্কিত। প্রতিরোধ পর্যায়ে পর্যায়ে, স্তরে স্তরে; প্রতিরোধ সময়ে কৃষক ক্ষেতে সক্রিয়, শ্রমিক কারখানায়, সৈনিক যুদ্ধে, সবাই নিজের নিজের কর্ম দিয়ে প্রতিরোধ করে করে চলেছে, প্রতিটি কর্ম অনন্য, জরুরি, প্রত্যক্ষ; সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি কর্মে যুক্ত, তার নাম প্রতিরোধ। সেজন্য কর্মক্ষেত্রে কিংবা কারখানায় উৎপাদনে জড়িত; ওই উৎপাদন প্রতিরোধের জন্য জরুরি, তাই সম্পর্কিত, উৎপাদন ওইভাবে প্রতিরোধ প্রচেষ্টায় যুক্ত। সমাজের সব উদ্যোগ এক লক্ষ্যে নির্দিষ্ট, সেজন্য প্রতিটি উদ্যোগ সমমূল্যের, সেই সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কিত। ওই কারণে লেখক হিসেবে আমার কর্তব্য দৃশ্যমান বাস্তবতার বিরোধিতা করা, অনুপস্থিত বাস্তবতাকে অবিরাম করে তোলা, বলা বারেবারে বলা : স্বাধীনতা। প্রতিটি লক্ষ্যেই অন্তরিত সর্বজনীনতা ওই অর্থে প্রতিটি লক্ষ্য প্রতিটি ব্যক্তির বোধগম্য। ওই হচ্ছে মানুষী সর্বজনীনতা, যা কিনা নিরন্তর তৈরি করা যায়। আমি ওই সর্বজনীনতা তৈরি করছি নিজেকে বিশেষ কর্মে বাছাই করে; ওই সর্বজনীনতাও তৈরি করছি ফের অন্য মানুষের লক্ষ্য বোঝার মধ্য দিয়ে। প্রতিটি ব্যক্তির সংজ্ঞা সেজন্য তার কর্ম সম্পর্কিত, মানুষী বাস্তবতায় প্রতিটি ব্যক্তি কর্মী, তার দায়িত্ব প্রতিরোধ কালে সব কর্ম এক লক্ষ্যে উৎসর্গিত করা। ওই উৎসর্গ থেকে জন্ম নেয় সর্বজনীনতা, অনন্যতা, সমমূল্যতা। ওই সর্বজনীনতা বোধগম্য, ওই অনন্যতা প্রতিটি কর্মের চরিত্র, ওই সমমূল্যতা প্রতিটি কর্মের সারাৎসার।

সেজন্য আমার কর্ম স্বচ্ছ ও প্রসারিত হচ্ছে, তাতে ধরা পড়ছে দেশ, থমথমে ও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে, সব অন্যায় বহিস্কৃত হচ্ছে, শব্দে এসে যাচ্ছে দুঃসাহসী আক্রমণ, মানুষ মানবিক হচ্ছে এইভাবে। রক্ত, হত্যা, ঘুরেঘুরে বারেবারে, ওই রক্ত স্বাধীনতাকেই ডাকে, ওই হত্যা মানুষদের সাহসী করে তোলে, ওই ডাক ওই সাহস ভাবনার মধ্যে আন্দোলন তোলে, সাদৃশ্যের সূত্রগুলি ছড়িয়ে পড়ে চেতনালোকে।

ওই চেতনার পক্ষপাত কর্মের দিকে, উজ্জ্বল রৌদ্রের দিকে, যেখানে জীবন প্রাত্যহিকতায় ইতিহাস তৈরি করে। আসাদ কিংবা ফারুক, আসাদ কিংবা ফারুকের আত্মীয়স্বজন, আসাদ কিংবা ফারুকের বন্ধুবান্ধব, সবাই ব্যক্তি থেকে সমাজে গ্রথিত হচ্ছে, ঘরের শান্তি থেকে প্রতিরোধের সাহসে উদ্দীপিত হচ্ছে, নিছক ঘৃণা থেকে সশস্ত্র সংগ্রামে উন্মীলিত হচ্ছে, সেখানে কেউ আর নিছক ব্যক্তি নয় কিংবা নিরুদ্বেগ সমাজও নয়, বদলে যাচ্ছে দ্রুত, অমোঘ, অনিবার্য; মানুষ নিরন্তর নিজের পরিসর পেরিয়ে যাচ্ছে : নিজের পরিসরে প্রতিক্ষেপণ ও নিমজ্জন করেই সে মানুষের অস্তিত্ব অর্থবহ করে তুলছে, সেই সঙ্গে নিজেকে অতিক্রমণের লক্ষ্যে নিমজ্জিত রেখে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে সমর্থ হচ্ছে। এই হচ্ছে মানবিকতা; মানুষ নিজেই, নিজের নিয়ন্তা নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব সজাগ, নিজেকে অনবরত অতিক্রম করে মানুষ মানবিক হচ্ছে। নিজের মধ্যে সাহস, নিজেকে অতিক্রম করার সাহস থেকে জন্ম নিচ্ছে বিশ্বাস : নিজের প্রতি বিশ্বাস; আসাদ কিংবা ফারুক বিশ্বাসের এক-একটি নক্ষত্র, জ্বলে অনির্বাণ, কিংবা তারা বিদ্রোহের গর্জন, দিন থেকে রাতে, জীবনযাপনে তারা সঙ্গে সঙ্গে থাকে, কিংবা তারা বিদ্রোহী ওই বিপ্লব প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
স্বাধীনতায় আমি প্রতিশ্রুত, সেখানে আমার সমগ্র সম্ভাবনার প্রতিক্ষেপণ, বিদ্রোহ ও বিপ্লব ওই সম্ভাবনার পথে দুই আলোকচিহ্ন। বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে আমি বাস্তবতার বর্তমানতা বিনাশে এগিয়ে যাচ্ছি, নতুন সম্ভাবনা বর্তমান বিনাশের শর্ত, চিন্তা কিছুতেই নতুন অস্থিত্ব নয়। সেজন্য স্বাধীনতার চিৎকার প্রথমে, সেই সঙ্গে বর্তমানতার বিনাশ, ওই দিক থেকে ওই চিৎকার পরিস্থিতির অভ্যন্তরীণ বিনাশ, সেইসঙ্গে চৈতন্যের দিক থেকে সম্ভাবনায় অংশগ্রহণ। স্বাধীনতার অর্থ বাছাইয়ের স্বাধীনতা, বাছাই না-করার স্বাধীনতা নয়। সেজন্য যে বর্তমানতার বিরুদ্ধে চিৎকার কিংবা বিক্ষোভ কিংবা বিদ্রোহ, সে বর্তমানতা দুই দিক নিয়ে উত্থিত : উপস্থিতিস্থাপকতা বিদ্রোহ একসঙ্গে দুই লক্ষ্যে; সেজন্য একটির বিনাশ অন্যটির বিনাশ নয় কিংবা সম্ভাবনায় অংশগ্রহণ নয়। বিদ্রোহকে বিপ্লবে রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে চৈতন্যের সম্ভাবনার সমগ্র অংশগ্রহণ সত্য হয়ে ওঠে, স্বাধীনতার বাছাইয়ের পরিসর ব্যস্ত, বিস্তৃত ও সামগ্রিক হয়ে ওঠে। আগে মুক্তি পরে বিপ্লব; এর মধ্যে বাছাই না করার স্বাধীনতা সোচ্চার, অথচ স্বাধীনতা সামগ্রিক, সম্ভাবনায়, সৃষ্টিশীল, তাকে খণ্ডিত করার অর্থ চৈতন্যের সম্ভাবনায় অংশগ্রহণ, খর্ব করে তোলা। সেজন্য বিদ্রোহ থেকে বিপ্লব পরবর্তী স্টেশন নয়, একই স্টেশনে বিভিন্ন ট্রেনের সিগন্যাল দেয়া, একই পরিস্থিতির বর্তমানতা বিনাশ করা, সেইসঙ্গে সম্ভাবনা সত্য হতে দেয়া।

আসলে তাই কি হচ্ছে না এখন? মানুষ, দলে দলে রাস্তায়, চিৎকার করছে : স্বাধীনতা; তাদের আওয়াজে উচ্চারিত : স্বাধীনতা; তাদের চোখে সংহত : স্বাধীনতা; তাদের স্বপ্ন লেলিহান মধ্যদিনের রৌদ্র, শহীদের লাশ তাদের শিরস্থান। আমার হৃদয়ে নির্মিত হচ্ছে ওইসব, জীবনের দিনরাত, বিদ্রোহ আর বিপ্লব, চেতনা আর স্বপ্ন, স্বপ্নের লেলিহান রৌদ্র, রৌদ্রের স্বচ্ছতা, আর স্থিরতা : স্বাধীনতা মানবিক স্বাধীনতা।